সাহিত্য

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১১-২০১৯ ইং ০১:২২:৪২ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি, গীতিকার গল্পকার প্রাবন্ধিক ঔপন্যাসিক সর্বোপরি বিশ্বকবি। বিস্ময়কর প্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা সাহিত্য ও বাঙালির মর্যাদার আসন প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে তিনি বাঙালির হৃদয়েও অমর স্থান করে নেন। কবির ভাষায় “আমাদের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় নজরুল। বস্তুত প্রেম বিরহ হাসি কান্না আনন্দ বেদনা আবেগ উৎকণ্ঠার বিশ্বস্ত প্রতিফলন রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে গানে ও বিচিত্র রচনায়। কবির ভক্ত অনুরাগী এবং পাঠক তাই আগে ছিলেন এখনো আছেন। সিলেট স্বতন্ত্র ঐতিহ্যে গরীয়ান এক ভূমি। সাহিত্য সংস্কৃতি সাধনায় প্রাগ্রসর এই জনপদে কবি রবীন্দ্রনাথ পদার্পণ করেছিলেন। এখানকার জীবন প্রবাহে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সাহিত্যানুরাগী সিলেটবাসী এটাকেও শ্রীভূমি সিলেটের গৌরব রূপে গণ্য করে।
সিলেট সাহিত্য সাধনায় ছিল অগ্রসর। তাই রবীন্দ্র প্রতিভা যখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করেছে। তখন থেকেই এখানে তাঁর কবিতার পাঠক ও সমজদার ছিলেন অনেক। নবেল পুরস্কার লাভের সাথে সাথে কবির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র উপমহাদেশে। কৌতুহল জন্ম নেয় তার সম্পর্কে। সিলেটেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তখনকার প্রধান কবি দেশ বিদেশে তার সুনাম ও সুখ্যাতি। সিলেটে তাই চিন্তা ভাবনা চলে কবিকে একবার নিয়ে এসে অভ্যর্থনা দানের। অনেকের মনেই লালিত এ আশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো। সে ছিল ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাস। আর বাংলা ১৩২৬ সনের কার্তিক। না শীত না গরম। চমৎকার আবহাওয়া। সিলেট এলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমগ্র সিলেটে সাড়া পড়ে গেল। হাজার হাজার লোক কবিকে জানালেন তাদের শ্রদ্ধা।
সিলেটের পাশেই শিলং। রবীন্দ্রনাথ এসেছেন শিলং শৈলাবাসে অবকাশ যাপন করতে। এমসি কলেজের অধ্যাপক সুরেশ চন্দ্র সেন গুপ্ত সুযোগ বুঝে পাঠালেন তারবার্তা। ভারতের বরপুত্র শ্রীহট্ট ভ্রমণ করে তাকে গৌরবান্বিত করুন।” এ আমন্ত্রণ ছিল তখনকার সিলেটের সর্বস্তরের জনগণের হৃদয়ের আবেদন। শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজ, আনজুমানে ইসলামিয়া, শ্রীহট্ট মহিলা সমিতিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন কবিকে জানায় আমন্ত্রণ। শিলং থেকে কবি সিলেটের অন্তরের উষ্ণতা অনুভব করে রাজী হয়ে যান সিলেট সফরে। বাংলার অপর প্রান্ত শিলাইদহ, কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকায় কবির যাতায়াত ও চলাচল ছিল। কিন্তু প্রান্তিক জনপদে এটা ছিল তার প্রথম আগমন।
সিলেটে খবর ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ব্যাপক তোড়জোড়। এদিকে শিলংয়ে কবির স্বজনরা বাঁধা দেন। কারণ শিলং থেকে সিলেটে আসার পথ তখনো কষ্টসাধ্য। সেই ১৯১৯ সাল। শিলং রোড তখনো হয়নি। কিনব্রিজও তখন নেই। যাতায়াত ব্যবস্থার এই প্রেক্ষিতে কবির স্বজনরা বারণ করেন। শিলং থেকে সিলেট আসতে হলে তখন চেরাপুঞ্জি থেকে সিলেটমুখী প্রায় আট মাইল পথ পায়ে হেঁটে আসতে হত। খাসিয়া পুরুষ বা নারী শ্রমিক বেতের চেয়ারে বসিয়ে পথচারীদের বহন করতো। কবির পক্ষে হাঁটা ছিল অসম্ভব। অন্যদিকে কবি বলে বসলেন, বরং দশ মাইল হেঁটে পাহাড় চড়াই উৎরাই করতে পারি। তবু মানুষের কাঁধে চড়তে পারবো না। তাই সিদ্ধান্ত হল, শিলং থেকে গৌহাটি, লামডিং বদরপুর, কুলাউড়া হয়ে রেলে কবি সিলেট আসবেন। কবি এ ভাবেই রওয়ানা হলেন। তার সফরসঙ্গী হলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। সিলেটের পথে কুলাউড়া, বরমচাল ফেঞ্চুগঞ্জ, মাইজগাঁও প্রভৃতি স্টেশনে কবিকে এক নজর দেখার জন্য অনুরাগীরা এসে জড়ো হন। কবিকে অভ্যর্থনা জানান তারা।
এদিকে সিলেট শহরে আনন্দের ঢেউ। আনজুমানে ইসলামিয়া নামক সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে। এমসি কলেজেও গঠিত হয় সেবক সংঘ। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া। এদিকে নয়া সড়কের পাদ্রী বাংলো কবির থাকার জন্য মনোরম ভাবে সাজানো গোছানো হয়। পাদ্রী টমাস রবার্ট ছিলেন কবির অনুরাগী।
৫ নভেম্বর ১৯১৯। ১৩ কার্তিক ১৩২৬ বুধবার। বিশ্বকবি ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশে এসে পা রাখেন সিলেটে। আতশবাজি এবং হর্ষধ্বনিতে রেল স্টেশনের আশপাশ মুখরিত আলোকিত হয়ে উঠে। সুরমায় তৈরি রাখা হয়েছিল সুসজ্জিত জুড়ি নৌকা। নৌকায় কবির পাশে বসেন মৌলভী আব্দুল করিম। কবির পুত্র ও পুত্রবধূ পৃথক বজরায় নদী পার হন। কবির আগমন উপলক্ষে চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি লাল সালুতে মোড়া হয়েছিল। পতাকা শোভিত ঘাটে এসে পা রাখেন কবি। ঘাটে উপস্থিত ছিলেন আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া, পৌরসভার চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী, প্রমোদ দত্ত প্রমুখ সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। চাঁদনীঘাটে সকালে এবং বিকেলে রতনমনি লোকনাথ হল বর্তমান সারদা হলে কবিকে সংবর্ধনার আয়োজন হয়েছিল। প্রায় দশ হাজার লোক জড়ো হয়েছিল সকাল আটটায়। প্রায় সোয়া মাইল দীর্ঘ মিছিল কবিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল। কবি নৌকা থেকে নেমে ঘোড়ার গাড়িতে উঠেন। ভক্তরা ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে নিজেরা গাড়ি টেনে অগ্রসর হন। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবী পালকীতে চড়ে শহরে আসেন।
৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় ব্রাহ্ম সমাজগৃহে কবি প্রার্থনায় আসেন। ব্রাহ্ম মন্দিরে উপাসনা শেষে কবি চলে যান তার জন্য নির্ধারিত পাদ্রীর বাংলোয়। রাত যাপন করেন।
পরদিন সকালে টাউন হলে কবিকে দেয়া হয় নাগরিক সংবর্ধনা। মঞ্চে কবির পাশে ছিলেন কাপ্তান মিয়া। উকিল অম্বিকা চরন দে রচিত উদ্বোধনী সংগীত গাইলেন যতীন্দ্র মোহন দেব চৌধুরী। সংগীতটি ছিল এ রকম ঃ মাতৃভাষার দৈন্য নেহারি কাদিল তোমার প্রাণ / হৃদয় কমলে শ্রেষ্ঠ আসন বাণীরে করিলে দান। পুরিলে বঙ্গ নবীন আনন্দে। / উঠিল বঙ্গ পুলকে শিহরি শুনিয়া নবীন তান। এ নহে দামামা, নহে রণেভেরী, এ যে বাঁশরীর গান। সে সুধা লহরী মরমে পশিয়া আকুল করিল প্রাণ । সপ্ত সাগর সে সুরে ছাইল, চমকি জগৎ সে গান শুনিল।/ বিশ্ব কবির উচ্চ আসন তোমারে করিল দান।
হেথায় ফুটেনা শ্বেত শতদল, ফুটেনা হেথায় রক্ত কমল, বনফুল দুটি করিয়া চয়ন এনেছি দিতে উপহার। এ দীন ভূমির ভক্তি অর্ঘ্য চরণে লভুক স্থান।”
অনুষ্ঠানে কাপ্তান মিয়া বক্তৃতা করেন। অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন নগেন্দ্র চন্দ্র দত্ত। এরপর কবি, তাঁর সারগর্ভ ভাষণ দেন। ভাষণটি বাঙালির সাধনা নামে পরে প্রবাসীতে ছাপা হয়।
একই দিনে সকালে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি ব্রাহ্ম সমাজ গৃহে কবিকে সংবর্ধনা দেয়। এরপর মাছিমপুরে কবি মণিপুরী পল্লী দেখতে যান। মণিপুরী নৃত্য দেখে তিনি মুগ্ধ হন। সন্ধ্যা ৭টায় লোকারণ্য টাউন হলে এসে বক্তৃতা করেন। মাইকের প্রচলন তখনো হয়নি। তবু কবির প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সবাই বুঝতে পারেন। সিলেটে শেষ সংবর্ধনা হয় এমসি কলেজে। ছাত্র শিক্ষকরা এর আয়োজন করেছিলেন। এখানে কবি আকাক্সক্ষা বিষয়ে বক্তৃতা করেন। এ বক্তৃতা শুনে সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্র ভক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তি নিকেতন যান। ঐ দিন একটার ট্রেনে কবি তিন দিনের সিলেট সফর শেষ করে কলকাতায় যাত্রা করেন। কবি তৎকালীন আসামের একটি জেলা সিলেট সফর করে অনুভব করেছিলেন, সিলেট বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির এক লীলাভূমি। অথচ সিলেট বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন আসামের এক জনপদ। এ দুঃখ বোধ থেকে লিখেছিলেন ঃ
মমতা বিহীন কালস্রোতে / বাঙলার রাষ্ট্র সীমা হতে / নির্বাসিতা তুমি, / সুন্দরী শ্রীভূমি। / ভারতী আপন পুণ্য হাতে / বাঙালির হৃদয়ের সাথে / বাণী মাল্য দিয়া / বাঁধে তব হিয়া / সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে / বাঙালির আশীর্বাদ গাথা হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে আগে সিলেট এসেছিলেন। জ্ঞানী গুণীর জন্মদাতা সিলেট গুণীদের সমাদরে চিরদিন উদার। কবি রবীন্দ্রনাথকে উদার অভ্যর্থনা দেবার স্মৃতি তাই আজো সিলেটে আলোচিত হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT