উপ সম্পাদকীয়

মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১১-২০১৯ ইং ০০:৪১:০৭ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। জন্মগ্রহণের সময় মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একবারে নিষ্পাপ, নিষ্কলুস রূপে। জন্মের পর থেকে শিশু বিস্ময়ে চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখে, তার মা-বাবা, তাকে ঘিরে থাকা মানুষজন, সামগ্রিক পরিবেশ থেকে সব বুঝতে শুরু করে, ধীরে ধীরে সকল বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাকে আপন মহিমায় বড় করে তোলে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ রয়েছেন যারা কোন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মহামানবের গুণাবলী নিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে শিক্ষা তা যেখানে যেভাবেই গ্রহণ করা হোক না কেন তাকে অবশ্যই হতে হয় সুশিক্ষা। এর ব্যতিক্রম হলে যা হয় তার উদাহরণ তো আমাদের চারপাশেই রয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টিকারী আবরার হত্যা কি কোন মানুষ দ্বারা সম্ভব! হয়ত একদল ছাত্র নামধারী অমানুষ তাকে পিটিয়ে মেরেছে যারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন বুয়েটের মেধাবী ছাত্র ছিল। একইভাবে বরগুনার কলেজছাত্র রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করেছে তারই কিছু বন্ধু। রিফাতকে মেরে ফেলার দৃশ্য ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়েছে। কোন মানুষ কি একটি পাঁচ বছরের শিশুর বুকে ছুরি বসিয়ে মেরে তাকে গাছে ঝুলিয়ে রাখতে পারে! তাও সম্ভব হয়েছে শিশুটির পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। অবুঝ শিশু ধর্ষিত হচ্ছে তারই নিকটাত্মীয় দ্বারা। সামান্য স্বার্থের জন্য অবাধে শিশু, নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। বাবা-মায়ের দ্বারাও সন্তান হত্যার নজির আজ আর বিরল নয়।
শিক্ষা হচ্ছে চরিত্র পরিবর্তনের সুস্পষ্ট লক্ষণ, সচ্চরিত্র গঠনই শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য। ঘরে বাবা-মা, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক বা পারিপার্শ্বিকতা থেকে শৈশব-কৈশোরে যে মানবিক মূল্যবোধের সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর বীজ বপন করেন তা সঞ্চারিত হয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং এসব গুণাবলী একজন মানুষের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। আর তা মানুষকে সব পাপাচার থেকে দূরে রেখে সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে সাহায্য করে। বাংলাদেশে শিক্ষার হার নিঃসন্দেহে বাড়ছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত বেড়ে চলছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এ শিক্ষা তাদের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে কতটা ভূমিকা রাখছে? বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিয়োজিত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের নানা কর্মকান্ডে। কেউ কেউ বহাল হচ্ছেন রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্বপূর্ণ পদে। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের সার্বিক অগ্রগতির বিশাল কর্মযজ্ঞে শিক্ষিত মানুষের বিকশিত মানবিক মূল্যবোধ কতটা ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে?
আজকাল আমাদের দেশে শিশু শিক্ষার পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধ বিকাশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তেমন স্থান পেতে দেখি না। সীতানাথ বসাকের আদর্শলিপির সুবচনগুলো নির্বাসনে আজ। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকরা পাঠ্যক্রমের বাইরে তার শিক্ষার্থীকে তেমন কিছু শেখাবার তাগিদ অনুভব করেন বলে মনে হয় না। আজকাল ধর্মশিক্ষার নামে পাঠ্যপুস্তকে যা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তার অন্তর্নিহিত সূক্ষ্ম বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের হৃদয়ঙ্গম করে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার তেমন সুযোগ রয়েছে বলেও মনে হয় না। সন্তানের মা-বাবারাও তাদের জীবনের স্থুল চাহিদায় এত ব্যস্ত থাকেন যে, সন্তানের চরিত্র গঠনের দিকে খেয়াল রাখার সুযোগ তাদের কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গৃহকর্মীর ওপর সন্তানের দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান তারা। কখনো পাঠিয়ে দেন শিশুপালন কেন্দ্রে। শিশুমন হচ্ছে কাদা মাটির মতো। তাকে যে ভাবে ইচ্ছে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সুষ্ঠু পরিচর্যা। এ সবের প্রতি যতœশীল না হয়ে আজকাল কর্মব্যস্ত জীবনের জাঁতাকলে পিষ্ট মা-বাবা সন্তানের মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছেন। জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভের প্রত্যাশায় শিশুর সামনে তুলে দিচ্ছেন কতগুলো ভারি ভারি বই। সারাদিন তাকে ব্যস্ত রাখেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দানে। শুধু ভালো একটি স্কুলে ভর্তির টার্গেট নিয়ে একজন শিশুর জীবনের যে শুরুটা হয় তার পরিসমাপ্তি ঘটে নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণিল একটি সনদপত্র প্রাপ্তির মাধ্যমে। আমাদের দেশে আজকাল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, ব্যবসায়ী বা বড় আমলা হওয়ার ইচ্ছা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার আসল লক্ষ্য হয়ে যায় গৌন। জীবনে বিত্তশীল হয়ে ওঠার নেশায় নষ্ট করে দেওয়া হয় শৈশব-কৈশোরের সব আনন্দ আয়োজন। বন্ধ ঘরে বই আর কম্পিউটারের চাপে তাকে নিয়ত হতে হয় পিষ্ট। মাঠে খোলা সবুজে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস টেনে, কিছু সময় দিয়ে প্রকৃতি থেকে কিছু শিখে বড় হওয়ার কোন সুযোগই আজকালকার শিশুদের নেই। সীমিত গন্ডির মাঝে বিচরণ করে বৃহত্তর পরিসরে আত্মীয়-স্বজনের সান্নিধ্যে থেকে সুকুমার বৃত্তি চর্চার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। সমাজের প্রতিটি পদে সে প্রত্যক্ষ করে চরম ভন্ডামী আর নীতিহীনতা। ঘরে, শিক্ষায়তনে চারপাশের কোথাও তেমন মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানোর খুব একটা সুযোগ তার নেই। কাজেই জীবনে বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ার পেছনে ছুটে চলার দুর্নিবার নেশা তাকে চেপে ধরে জীবনের শুরুতে। বিত্ত-বৈভব আর প্রাচুর্যে জীবনকে রাঙিয়ে তোলার প্রবল বাসনা মানুষের ভেতরকার জীবনবোধকে ক্রমশ কুরে কুরে খেতে থাকে। এক সময় সে নিজের অজান্তেই হারিয়ে ফেলে জীবনের মূল চালিকা শক্তি। সততা ও নিষ্ঠার মতো গুণাবলী অর্জনের সকল শক্তি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেরই অর্থনৈতিক কাঠামো এত সহজে, রাতারাতি বিশাল জনগোষ্ঠীর বিত্তশীল হওয়ার তেমন অনুকূলে নয়। কাজেই দ্রুতগতিতে অর্থবিত্ত কামাতে হলে অনেকেরই আশ্রয় নিতে হয় অনিয়ম আর দুর্নীতির। আর একবার ওই পথে পা বাড়ালে সেখান থেকে ফিরে আসা বড্ড শক্ত হয়ে যায়। একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী বা যেকোনো পেশায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে গাড়ি-ঘোড়ায় তার ঠিকই চড়া হয়, কিন্তু জীবনের সত্যিকারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ যুগে কেউ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রসরমান ধারার বিপক্ষে নয়। তারপরও বলতে হয়, আজকাল প্রয়োজন ছাড়াই অনেক মা-বাবা অথবা অভিভাবক সামান্য স্কুলপড়ুয়া ছোট্ট ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেন নামি দামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনসেট। মোবাইল ফোনের অপব্যবহারে শিশু-কিশোর অপরাধও সংঘটিত হতে শোনা যাচ্ছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সন্তানকে অজান্তেই খারাপ পথে ঠেলে দিচ্ছি। ব্যর্থ হচ্ছি সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে। একজন শিশু-কিশোরকে যদি তার মা-বাবাই বিপথগামী হতে বাধা দিতে না পারেন, তাহলে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কারো পক্ষে এ কাজটি করা সহজ নয়। আজকাল শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান থেকে বিরত থেকে তাদের ঠেলে দেয় প্রাইভেট কোচিং সেন্টারের দিকে। শিক্ষকদের মধ্যেও তো রয়েছে বিভাজন, দলাদলি। আর শিক্ষার্থীরা এ সবের সুযোগ নেবে তা অস্বাভাবিক নয়। শিক্ষকদের দলাদলির কারণে তাদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাবোধের স্থানটি অনেকটা বিচ্যুত হয়েছে সন্দেহে নেই।
রাষ্ট্রীয় বিধান মেনে চলা যেমন ধর্মের বিধান, তেমনি প্রতিটি মানুষের নাগরিক ও মানবিক দায়িত্ব। এ থেকে বিচ্যুত হলে যেমন রাষ্ট্রকে ঠকানো হয়, তেমন নিজের মানবিক গুণাবলী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ধীরে ধীরে অধঃপতনে চলে যায় চারিত্রিক সব সুকুমার বৃত্তি। দেশের প্রচলিত আইনকানুন মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা তার নৈতিক দায়িত্ব। উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের মনে সঠিক দায়িত্ব পালন এবং কর্তব্যবোধের সৃষ্টি হয়। সুশিক্ষা বিকাশ ঘটায় মানবিক মূল্যবোধের। ঘরে বাবা-মা, অভিভাবকের কাছ থেকে শিশুকালে যে শিক্ষার শুরু হয় তার ধারাবাহিকতা চলে আমৃত্যু। পরবর্তীতে শিক্ষক এবং পরিপার্শি¦কতা থেকে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণই মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে পারে। সততা, নিষ্ঠাবোধ ছাড়া মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হয় না। আর মানবিক মূল্যবোধ ব্যতীত মানুষ কখনো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। সৎকর্ম করা ছাড়া কোনো ধর্মবিশ্বাসেরও সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধর্মের মূলমন্ত্রকে কর্মে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কাজেই শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং সমাজ কাঠামোর প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধের পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব নিতে হয় পরিবার ও সমাজকে। মানুষ হচ্ছে এ সমাজ ও রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি। সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের মানবিক শক্তি, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশের মাধ্যমে সৎকর্মে ব্রতী হওয়া সম্ভব। ধর্মীয় অনুশাসন মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা তাড়িত সৎকর্মের দ্বারাই গড়ে তোলা সম্ভব-সুন্দর বসবাসযোগ্য রাষ্ট্র, সমাজ, আলোকিত পৃথিবী।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT