উপ সম্পাদকীয়

শিশুর প্রতি পরিবারের কর্তব্য

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৭:২৯ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

প্রতিটি শিশুর জীবন বিকশিত হয় মা-বাবার দেওয়া শিক্ষা ও আদরযতেœ। শিশুরা মা-বাবার ক্ষুদ্র সংস্করণ। পিতামাতার সকল কার্যকলাপ শিশুরা অনুকরণ করে। শিশু বিশেষজ্ঞগণের মতে, শিশুর ছয় মাস বয়স থেকেই পরিবারের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে তাদের মধ্যে একটা অনুভূতির বোধোদয় ঘটতে থাকে। আবার দুই বছরের মধ্যেই শিশুদের মধ্যে ভালোমন্দ বুঝার প্রাথমিক সক্ষমতা গড়ে ওঠে। শিশুর বয়স যখন ৪/৫ বছর হয়, তখন পিতা মাতার কর্তব্য ও দায়িত্ব থাকে অতি গভীর ও বিস্তৃত। শিশুরা সাধারণত কাদার ন্যায়। তাই তাকে যেমনিভাবে গড়তে চাইবেন, সে তেমনিভাবেই গড়ে উঠবে।
তাই শিশুর যখন বোধশক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে, তখন থেকেই তাকে নিয়মশৃঙ্খলা, সৌন্দর্যবোধ, সংযম আচরণ, ধর্মীয়বোধ, ন্যায়-অন্যায় ও আদব-কায়দা ইত্যাদি শিখানোর মাধ্যমে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। অধিকাংশ পিতা-মাতা তার শিশু সন্তানের সামান্য দুঃখ, কষ্ট ও ব্যথা বেদনার কাজ করাতে কিংবা চিন্তা করতে দিতে চান না বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না অথচ তা শিশুর জন্য অমঙ্গল।
শিশু লালন পালনের সময় প্রতিটি ক্ষেত্রে যাতে শিশুর সার্বিক বিকাশ ঘটে তার প্রতি দৃষ্টি দেয়া কর্তব্য, যেমন স্বাস্থ্যগত দিক, ভাষাগত ও কথাবার্তা, আবেগ-অনুভূতি, সামাজিক জ্ঞান বিষয় আচরণ ও খেলাধূলা ইত্যাদি। শিশুর দুধ পান বা খাদ্য খাওয়ানোর সময়, গোসল করানোর সময়, অথবা অন্যান্য পরিচর্যার সময় তার চোখে চোখে তাকিয়ে হাসাহাসি করা, আবেগ ও খুশির ভাব প্রকাশের চেষ্টা করা, নরম স্বরে কথা বলা ও এক দুই লাইনের ছড়া ইত্যাদি শুনানো উচিৎ। তাছাড়া পায়ের ও হাতের তালুতে সুড়সুড়ি দেওয়া বা হালকা চাপ দেওয়া বা হালকা মেসেজ করা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেও কথা বলানো, হাসাহাসি ও ভাব বিনিময় করতে দেওয়া। একটু বড় হলে তাকে তার নাম ধরে ডাকাডাকি করা বা তার সাথে টুকিটাকি খেলনা দিয়ে খেলা শিক্ষা দেওয়া, খাওয়া-দাওয়া শেখানো, উঠা-বসা শিখানো, সালাম দেওয়া, হাত তালি দেওয়া, আনন্দ করা ও হাসাহাসি ইত্যাদি শিখানো।
এক জায়গায় বসে খাওয়া এবং খাবারের নামগুলো যেমন ডিম, দুধ, কলা, মাছ, মাংস ইত্যাদি সহ সব ধরণের খাবারের নাম ও খাবার খেতে শেখানো কর্তব্য। সম্ভব হলে পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্যদের সাথে এক সাথে বসে খেতে শিখানো উচিৎ ফলে শিশুটি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজগুলো সে স্বাবলম্বীভাবে শিখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শিখবে এবং অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে খাওয়া ও উত্তম আচরণ করতে শিখবে। শিশুর সাথে নিয়মিত কথোপকথন করতে হবে, ছড়া, কবিতা বা সম্মানিত ব্যক্তিদের জীবন কাহিনী শুনিয়ে তার সাথে হাসিখুশি ভাব বিনিময় করতে হবে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারিক ও প্রয়োজনীয় শব্দগুলো শিশুকে বলার জন্য সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে। ভুল বললে সোহাগের স্বরে শুধরাতে হবে এবং ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করতে হবে।
শিশুদেরকে ক্রমান্বয়ে বাস্তব জীবনের সম্মুখীন করানো উচিৎ। শিশু যেন ধাপে ধাপে, হাতে কলমে, ঠেকে ঠেকে শিখতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার জন্য তার পরিবেশ ঠিক করে দিতে হবে। শিশুকে মানসিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য নি¤েœর কাজগুলি মা-বাবাকে তার শিশু সন্তানকে করতে দিতে বা শিখাতে হবে। শিশুকে নিজের কাজ নিজেকেই করতে দিতে হবে। ছোট ছোট কাজ করার জন্য শিশুকে দায়িত্ব দিতে হবে। কাজে সফল হলে তাকে উৎসাহ ও প্রশংসা করতে হবে। শিশুকে তার নিজের জগত তৈরী করতে দিতে হবে। কোনো কাজে সমস্যা হলে তাকে তাৎক্ষণিক সমাধান না করে দিয়ে তাকে চিন্তা ও চেষ্টা করে সমাধানের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। দুঃখ, বেদনা, জয়, পরাজয় ইত্যাদির অনুভূতি থেকে বাচ্চাকে আড়াল নয় বরং বুঝতে দিতে হবে। শিশুকে খেলার ছলে বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা বিনিময় করতে হবে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নিজে শিখুন এবং শিশুকে ¯েœহের সাথে সেই মাধ্যম থেকেই শিক্ষা দিতে চেষ্টা করতে হবে। শিশুকে সঠিক স্থান, সময় ও পরিবেশ নির্ধারণ করে দিন, যাতে তাদের মধ্যে সঠিক পরিবেশ, স্থিতিশীল ও সময়জ্ঞান সৃষ্টি হয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুরা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই বেড়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে কেননা বর্তমানে অধিকাংশ বাসা বাড়িতে তো বটেই অধিকাংশ স্কুল কলেজেও বাচ্চাদের জন্য খেলাধূলা করার মত খেলার মাঠ বা খোলামেলা পরিবেশ নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছপালা, বনজঙ্গল ও জলাধার ইত্যাদি এখন শহর বন্দরগুলোতে নেই বল্লেই চলে তাই প্রাকৃতিক ও নির্মল পরিবেশের অভাব তীব্র হয়ে ফুটে উঠছে শিশু কিশোর ও সন্তানদের আচার আচরণেও।
চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ শিশুরা প্রকৃতি বঞ্চিত হওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে নিজের ছোট্ট কর্মক্ষেত্রেও আত্ম-সংলগ্নতা, একাগ্রতা ও একমুখিতা তাদের থাকে না। তাই সহনশীলতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ার কারণে তাদের আচার আচরণ ও ব্যবহার রুক্ষ ও অনমনীয় হয়ে ওঠে। আজকাল জীবন জীবিকার প্রয়োজনেই পিতা-মাতাকে শহর বা কর্মক্ষেত্রে থাকতে বাধ্য করছে, আবার অনেকেই শহরের স্থায়ী বাসিন্দা তাই বর্তমান যুগে অধিকাংশ শিশুকেই শহর বন্দরে বসবাস করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব শিশুকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া প্রতিটি অভিভাবকের কর্তব্য। কাজের ফাঁকে, বিকালে বা ছুটির দিনগুলোতে অভিভাবকবৃন্দকে সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত স্থানগুলোতে শিশুকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া উচিত ফলে শিশুদের মধ্যে বৃক্ষ পরিচিতি, ফল ফুল, পাখিসহ প্রকৃতি বিষয়ে ধারণার সৃষ্টি হবে। কেননা প্রকৃতির সাথে চলাচলকারী শিশুদের মধ্যে ইতিবাচক গুণগুলো আপনা থেকেই গড়ে উঠে ফলে শিশুরা হয় সহিষ্ণু, উদারমনা, সহনশীল, সেচ্ছাসেবী ও মেধাশক্তি সম্পন্ন। প্রকৃতির সাথে থাকলে শিশুদের মধ্যে অধিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক স্থিরতা ও ধৈর্য্যশক্তি বৃদ্ধিপায় এবং অস্থিরতা ও বিষণœতার হার কম থাকে। প্রকৃতির সাথে আত্মীক সম্পর্ককারী শিশুদের কল্পনাশক্তি, মেধাশক্তি ও মনোবিকাশের নানাবিধ কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে তোলে তাই শিশুকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গড়ে তোলে শিশুর মনে পরিবেশ সচেতনতা, সহমর্মীতা ও উদার মনস্ক করে গড়ে তুলুন।
শিশুর যখন বোধশক্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে তখন থেকেই তাকে শান্তি-শৃঙ্খলা, নিয়ম-নীতি, আদব-কায়দা ও সংযত আচার আচরণ শেখানোর মাধ্যমে তাকে উত্তমরূপে গড়ে তোলতে চেষ্টা করুন। তাই পরিবারের সকল সদস্যদের সাথে শিশুকে খোলামেলা আচরণ করতে দিতে হবে, ভুল হলে শুধরে দিতে হবে। ছোট বড় ভাইবোন বা আত্মীয়দের সাথে খেলাধূলা করতে গিয়ে বা খাবার দাবার নিয়ে রেষারেষি বা ঝগড়া বিবাদ যাতে না করে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তাদেরকে বুঝাতে হবে বা আদর সোহাগ দিয়ে তাদের মধ্যকার ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে সহাবস্থানের নীতি শিক্ষা দিতে হবে। খাবার টেবিলে খাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে বা এলোমেলো করে না খাওয়া এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সাথে খাওয়া দাওয়া শিক্ষা দিতে হবে। খাবার সংক্রান্ত কাজগুলো শিশুকে নিজ হাতে করতে দিতে হবে। শিক্ষকদের মান্য ও শ্রদ্ধা করা, তাদের যুক্তিক আদেশ নিষেধ পালন করা, ভদ্র ব্যবহার করা ইত্যাদি শিক্ষা শিশুকে পারিবারিক ভাবেই শিক্ষা দিতে হবে। তাইতো আলবার্ট আইনস্টাইন জার্মান বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘আপনার শিশুকে বুদ্ধিমান বানাতে চাইলে তাকে রূপকথার গল্প শোনান, তাকে আরও বেশী বুদ্ধিমান বানাতে চাইলে, আরো বেশি বেশি রূপকথা শোনান’। তাই আপনার শিশুকে বুদ্ধিমান বানাতে চাইলে শিক্ষনীয় বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন রূপকথার গল্পগুলো শুনানো কর্তব্য।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। আজকের প্রস্ফুটিত শিশুটি একদিন আপনার ও জাতির সার্বিক দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই শিশুকে মমত্ব দিয়ে প্রতিপালন, দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষা দেওয়া সকল পিতামাতার কর্তব্য।
লেখক : সাবেক কর্মকর্তা, সিলেট পাল্প এন্ড পেপার মিল্্স লিঃ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈশ্বিক গণতন্ত্র, ব্রেক্সিট এবং বাংলাদেশ!
  • বায়ুদূষণে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
  • আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • Developed by: Sparkle IT