মহিলা সমাজ

ভাগ্যের পরিহাস

আছমা আইরিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৯:৫৫ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

২০ বছর পূর্বে আমাদের অঞ্চলে আসে শিল্পীর মা। কোলে তার ছোট্ট মেয়ে শিল্পিকে নিয়ে। সালটা উনিশের আটানব্বই বা নিরানব্বই হবে। যদিও আটানব্বই নিরানব্বইয়ের কথা বলছি কিন্তু তখনো আমার জন্ম হয়নি, লোকমুখে শুনা কথা।
যতোদূর মনে করা যায় আমি অনেক ছোট ছিলাম। মাঝে মাঝে বাবার সাথে হাটে যেতাম চকলেট, বাতাসা, খই, কাপড়-চোপড়, জুতা এগুলো কিনার জন্য। প্রায়ই দেখতাম একটি মহিলা কোলে একটি মেয়েকে নিয়ে পুরো বাজার ঘুরে বেড়াতো। দেখতাম ঠিকই, তবে ঐ সময়ে তাদেরকে নিয়ে কোনো কিছু ভাবার মতো বয়স আমার ছিলো না।
কিন্তু আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন অনেকটাই বুঝতে শিখি। যদিও বাবার হাত ধরে আর হাটে যাওয়া হতো না। কারণ বাবা না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন। যাইহোক, আমাদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা করি। এমনিতে মাঠ দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতাম। কিন্তু বৃষ্টির দিনে মাঠে কাঁদা পানি থাকতো বলে হাটের মধ্যে দিয়ে স্কুলে যেতাম। অবশ্য আমি একা না। পাশের বাড়ির মারজানার সাথে যেতাম। ও প্রায়ই দাদুর সাথে বাজারে যাওয়া আসা করতো। সবকিছু বেশ ভালো করে চিনতো। কিন্তু আমার তখন আর হাটে যাওয়া হতো না। যা ঐ স্কুলে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে মারজানার সাথে হাটের একপাশ দিয়ে যাওয়া আসা করতাম। আর ঐ মহিলাকে রাস্তার মোড়ে দোকানের পাশে দাড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখতাম। সবসময় তার মাথায় একটা পুটলি আর কোলে ঐ মেয়েটা বসে থাকতো। যতোদিন হাটের মধ্য দিয়ে স্কুলে যেতাম ততোদিন একইভাবে ওদেরকে দেখতে পেতাম। তাই একদিন মারজানার থেকে এদের সম্বন্ধে জানতে চাইলাম।
ওকে জিজ্ঞেস করলাম তুই কী ঐ মহিলাকে চিনিস। ঐ মহিলা আর মেয়েটাকে সবসময় এখানে কেন দেখি? ওদেরকে কী কেউ বাজার করে দেয় না? প্রতিদিন হাটে কেন আসে? আমার আম্মু আপুতো এরকম হাটে আসে না। তখন ও বলে, তুই একসাথে এতো প্রশ্ন করিস! আচ্ছা বলনা, তুই কী এদের চিনিস? হ্যাঁ, চিনি। শিল্পি আর শিল্পির মা। এরা এখানে কেন? বারবার একই প্রশ্ন করিস কেন? আমি বলছি তো। ওদের কেউ নেই। বাড়িঘরও নেই। অনেকদিন আগে এরা তাদের দেশ ছেড়ে চলে এসেছে। কোনো স্থানে থাকার জায়গা নেই বলে এরা এখানে থাকে।
ওদের দেশ কোথায়? এরা কেন দেশ ছাড়লো?
Ñওহ, আমি এতো কিছু জানিনা। তুই এতো প্রশ্ন করিস কোনো বারবার। ওর খেঁপে যাওয়া ভাব দেখে আমি আর কোনো কথা বলি না। ঐ দিন স্কুল শেষে বাড়ি চলে আসি। তখন আমার একটা অভ্যাস ছিলো। কোনো ঘটনা বা কিছু একটা যদি জানতে পারতাম তাহলে যতোক্ষণ না কাউকে বলতাম ততোক্ষণ আমি শান্তি পেতাম না। তাই সেদিনও ব্যতিক্রম হলো না। বাড়িতে এসেই মাকে বলা শুরু করলাম। জানো মা, আমাদের হাটে শিল্পি আর ওর মা থাকে। ওদের কেউ নেই। তাই...। কথা শেষ করতে না করতেই ভাইয়া ডাক দিলো, মনি এদিকে আয়তো দেখি। আমার নাম আইরিন হলেও ভাইয়া আদর করে মনি ডাকতো। ভাইয়ার ডাক শুনে আমি গেলাম। কী ভাইয়া? ডাকছো কেন? তুই এসব কথা কোথা থেকে জানলি? মারজানা বলছে, ভয়ের সাথে বললাম। শুন তুই এদের ধারে কাছেও যাবি না। ঠিক আছে। কেন ভাইয়া? এতো প্রশ্ন করছো কেন? তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। আমি শুনেছি শিল্পির মা ওর বাবাকে গলাকেটে হত্যা করে এখানে পালিয়ে এসেছে। সবাই বলে শিল্পির মা খুব খারাপ, ভয়ঙ্কর এক মহিলা। এক কথায় আমি থমকে গেলাম আর কোনো কথা নেই।
রাতে খাওয়ার পর যখন ঘুমোতে গেলাম তখন দেখি, শিল্পির মা ধারালো ছুরি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ঐ ছুরি দিয়ে আমার গলায় এক টান দিলো। আমার মাথা থেকে দেহ আলাদা হয়ে ছটফট করতে শুরু করলাম। রক্তের নদী বয়ে যেতে শুরু করলো। চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে ওঠি। মা দৌড়ে কাছে আসে। কিন্তু আমি কিছু বলতে পারছি না। শুধু কাঁদতে থাকি।
ঐ রাতটা কোনোভাবে কাটে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেই মারজানার কাছে যাই। সব শোনার পর সেও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। এরপর থেকে যতোদিন স্কুলে যাই শিল্পির মাকে একপাশে দেখলে আমি আর মারাজানা অন্য পাশে দৌড় দেই। ওদের দেখলেই কেবল গলা কাটার দৃশ্য চোখে ভাসে।
কিছুদিন পর পরীক্ষায় পাশ করে গ্রামের পাশের স্কুলে এসে ভর্তি হই। পাঁচ বছর কেটে যায়। ২০১৮ সালে সিলেট আম্বরখানা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ ভর্তি হই। তাই প্রতিদিন হাট পেরিয়ে গাড়ি করে কলেজে যেতে হয়। গত পাঁচ বছরে শিল্পি আর ওর মাকে তেমন একটা দেখতাম না। মাঝে মাঝে স্কুলের পাশের রাস্তায় এক ঝলক দেখা যেতো। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই তাদেরকে দেখতে পাই। চোখে মুখে কষ্টের ছাপ ঠিক আগের মতোই। তবে এখন আর আমার গলা কাটার ভয় নেই। থাকবেই বা কেন? তাদের মধ্যে কখনোই আমি কোনো হিং¯্রতা দেখতে পাইনি। যা শুনেছিলাম তার সবই তো লোকমুখে শুনা। আমার নিজের চোখে দেখা নয়তো। আর অনেক দিন যাবৎ ওরা এখানে থাকে। কখনোতো কারো কোনো ক্ষতি করেনি। সত্যিই কি শিল্পির মা শিল্পির বাবাকে খুন করে এসেছে? আর যদিও হত্যা করে তাহলে এর কারণ কী? এসবের কিছুই তো জানা নেই। তাহলে কীভাবে তাদের খারাপ ধারণা করি।
তাদের দেখে খুব কষ্ট হয়। এভাবেও কী মানুষ বাঁচতে পারে। ভাবতেই অবাক লাগে, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস? একই পৃথিবীতে কেউ আমির আবার কেউ ফকির। কিন্তু শিল্পির মা আর শিল্পিকে কী বলবো। ওদের অবস্থাতো ভিক্ষুকের চেয়ে করুন। থাকার মতো একটা স্থায়ী বতসভিটাও নেই। আজ এক দোকানের সামনে তো কাল অন্য দোকানের সামনে শুয়ে-বসে জীবন পার করছে। বাকি রইলো খাওয়া-দাওয়া। দু’একজনের কাছ থেকে শুনলাম যদি বাজারে কারো কোনো কাজ করে দেয় তাহলে দু’পাঁচ টাকা পায়। আর হোটেলের ফেলে দেওয়া পঁচা-বাসি খাবার কুড়িয়ে এনে মা মেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে। সেদিনও কলেজে যাওয়ার পথে দেখলাম শিল্পির মা হাটের একপাশ ঝাড়– দিচ্ছে আর শিল্পি তার আঁচলে ধরে হাটছে। খুব খারাপ লাগে তাদের অসহায় অবস্থা দেখতে। কিন্তু তার চেয়েও অসহায় নিজেকে লাগে যে তাদের জন্য কিছু করতে পারি না। আর অন্যদের কথা কি বলবো, কারো ধন আছে তো মন নেই আর কারো মন আছে তো ধন নেই। এই মা-মেয়ে দু’জন এতোদিন ধরে এখানে সবাই তাদের ভালো করে চিনে কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার মতো একটি মানুষও নেই। দিন না হয় এটা ওঠা করে কেটে যায় কিন্তু তাদের জীবনে রাত কেমন?
যখন মশার উৎপাত, বর্ষার বৃষ্টির ধারা আর শীতে কনকনে ঠা-া বাজারে টুল অফিসের বাইরে শুয়ে থাকা মা-মেয়েকে চারিদিকে ঘিরে ধরে। তাদের সম্বল বলেও তো মাথায় নিয়ে ঘুরা একটি পুঁটলি মাত্র। যার মধ্যে দু’একটি ময়লা ছেড়া কাপড় একটি হাতপাখা। আর আছে শুধু মা আর মেয়ে। অনেক কষ্টে মেয়েকে আগলে রাখে তার মা। বিয়ের যোগ্য মেয়ে। অনেক খারাপ লোকের নজর তার উপর। কিছুদিন পূর্বে সবাই বলাবলি করছিলো শিল্পিকে বিয়ে করার জন্য নাকি দুই গ্রামের দু’টো লোক ঝগড়া করছিলো। যাদের নিজের ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে নাতি-নাতনি বিয়ের যোগ্য। যারা নিজেরাই পথ চলতে পারে না, তারা কীভাবে অন্যকে চালাবে।
যতোই অসহায় হোক না কোনো মা কী তার মেয়েকে জেনেশুনে এভাবে নদীর জলে ভাসিয়ে দিবে। ভাগ্য বিড়ম্বিত শিল্পির কথা আর কি বলি। হয়তোবা আমি ক্লান্ত হয়ে যাবো। কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু শিল্পির জীবন কাহিনী শেষ হবে না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT