মহিলা সমাজ

সাফল্যের পঞ্চসূত্র

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৪:২৫ | সংবাদটি ১১৫ বার পঠিত

সাকসেস বা সাফল্য প্রতিটি মানুষের কাছে একটি চিরআকাক্সিক্ষত শব্দ। মানুষ জীবনে যে কাজই করে তার পেছনে মূলত উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে সেই কাজে সে যেন সফল হতে পারে। তারপরো জীবনে চলার পথে সব মানুষ সব কাজে সফল হয় না। কেন? এর পেছনে অসংখ্য কারণ জড়িত থাকতে পারে। তবে সেই সব কারণ বিশ্লেষণের দিকে না গিয়ে আজ আমরা মূলত যেকোন কাজে সফল হবার জন্য যে পাঁচটি সূত্র পালন করা জরুরী সেই সূত্রগুলোর উপর আলোকপাত করব। এই পাঁচটি সূত্র অনেকেরই জানা নেই আবার জানা থাকলেও তা নিয়মিত চর্চা করার ব্যাপারে অনেক সময়ই অনীহা, উদাসীনতা ও আলস্য কাজ করে। তাই সাফল্য থেকে যায় সুদূর পরাহত। আর তখন সাফল্য অর্জন না করার কারণ হিসেবে আমরা একটি সহজ অযুহাত ভাগ্যকে দায়ী করে ফেলি। অথচ ভেবে দেখি না একবারও যে এই সূত্রগুলো নিয়মিত নিষ্ঠার সাথে আন্তরিকভাবে পালন করে আমরা আমাদের কাংখিত সাফল্যকে ছিনিয়ে আনার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছি কিনা। তাহলে চলুন জেনে নিই সেই পঞ্চসূত্র:-
এক. স্বপ্ন (Dream) : মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। যে মানুষের মনে কোন স্বপ্ন নেই সে মানুষ জীবিত থেকেও মৃত। কোন বিষয়ে সফল হতে হলে সর্বপ্রথম সে ব্যাপারে মনে স্বপ্ন থাকতে হবে। আমরা অনেক সময় স্বপ্ন দেখতে বিশেষ করে বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পাই। কারণ শৈশবে পাঠ্যপুস্তকে আমাদেরকে কিছু নেতিবাচক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেমন, ’ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখো না’, ’বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিওনা’ এরকম আরো কিছু বাগধারা ও প্রবাদ প্রবচন আমরা পড়েছি যা আসলে ঠিক নয়। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে যদি লাখ টাকার স্বপ্ন না-ই দেখতে পারলেন তাহলে ঐ লাখ টাকা আজীবন আপনার কাছে অধরাই থেকে যাবে আর ছেঁড়া কাঁথাতে শুয়েই জীবন কাটাতে হবে। স্বপ্ন দেখার সাহসই যদি না থাকে তাহলে সেই স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবে ধরা দিবে? আগে তো স্বপ্ন দেখতে হবে। তাই শুধু লাখ টাকা নয় কোটি টাকার স্বপ্ন দেখুন। কারণ স্বপ্ন দেখলে এরপর তা বাস্তবায়নের আইডিয়াগুলো একের পর এক মাথায় আসবে। স্বপ্নগুলো লিখে ফেলা উত্তম। মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে স্বপ্ন লিখে রাখলে তা বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়। তাই আজই বসে আপনার খাতা বা ডাইরীর পাতায় আগামী পাঁচ বা দশ বছরে আপনার জীবনের স্বপ্নগুলো কি কি তা লিখে ফেলুন। মোবাইল বা পিসিতে লিখে সেইভ করে রাখার চাইতে খাতা বা ডাইরীতে নোট করে রাখা অধিক কার্যকরী।
দুই. বিশ্বাস (Believe) : স্বপ্ন তো লেখা হলো। এবার সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিবে তা বিশ্বাস করার পালা। আপনি স্বপ্ন দেখেন কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে এই বিশ্বাসই যদি আপনার মধ্যে না থাকে তাহলে অন্য কেউ এসে আপনার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দিবে না। আগে নিজের মধ্যে বিশ্বাস রাখতে হবে যে আপনার এই স্বপ্নগুলো একদিন বাস্তবায়ন হবে। স্বপ্ন দেখার পর আপনি যদি সেই স্বপ্নের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন তাহলে আপনার সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আপনি যত নেতিবাচক চিন্তা করবেন ততো সেই স্বপ্নগুলো আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। তাই ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে এবং বিশ্বাস রাখতে হবে। কথায় আছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’। পজেটিভ থিংকিং বা ইতিবাচক চিন্তা এবং পজেটিভ বিলিভিং বা ইতিবাচক বিশ্বাস হলো চুম্বকের মতো যা পজেটিভ ড্রিম বা ইতিবাচক স্বপ্নগুলোকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিজের দিকে টেনে আনে। আপনি যে স্বপ্ন দেখলেন সেই স্বপ্ন আপনার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বিশ্বাস করে কিনা সেটা কোন ব্যাপার না। আসল কথা হলো আপনি বিশ্বাস করেন কিনা! কারণ ব্যক্তি যে স্বপ্ন দেখে সেই ব্যক্তির বিশ্বাসের উপর নির্ভর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তাই তো পৃথিবীতে এমন বহু ঘটনাই দেখা যায় যে সফল ব্যক্তিদের এমন স্বপ্নও বাস্তবায়ন হয়েছে যা সেই ব্যক্তির সমসাময়িক সমাজের দৃষ্টিতে বাস্তবায়িত হওয়া ছিলো অসম্ভব ব্যাপার! তাই মনের মাঝে বিশ্বাস রাখতে হবে, যেনোতেনো নড়বড়ে বিশ্বাস নয়, অটল মজবুত ও দৃঢ় বিশ্বাস।
তিন. জ্ঞান (Knowledge) : বিশ্বাস করে শুধু বসে থাকলে হবে না। যে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চান সেই বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যত বেশি জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতেও ততো সুবিধা হবে। সেইসাথে স্বপ্ন সফল করতে গেলে কি কি বাঁধাবিপত্তি বা প্রতিকূলতা তৈরি হতে পারে, কিভাবে তা মোকাবেলা করা যায় এসব বিষয়েও জানতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার স্বপ্ন যতো বড়ো হবে তা বাস্তবায়নের পথে বাধাও ততো বেশি থাকতে পারে। কোন স্বপ্নই হুট করে একদিনে বাস্তবায়িত হয়ে যায় না। তাই আগে থেকে এ ব্যাপারে জানা থাকলে তা আপনার মনোবল ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হবে। দমে যাবার পরিবর্তে আপনি হয়ে উঠবেন আরো বেশি আত্মশক্তিতে ভরপুর। বইপত্র ও ম্যাগাজিন পড়ে ইন্টারনেট ঘেঁটে সেই সাথে এপথে সফল অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে কাউন্সিলিং করেও আপনি প্রচুর নলেজ নিতে পারেন। আজকাল কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে মানুষের মনে অনীহা বা আলস্য কাজ করে। কিন্তু আপনি যদি আপনার স্বপ্নের ব্যাপারে আন্তরিক হয়ে থাকেন তাহলে এই আলস্য ও অনীহা আপনাকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে এবং যথাযথ জ্ঞান অর্জনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
চার. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা (Goal Set-up & Plan) : স্বপ্ন দেখলেন, বিশ্বাস করলেন, স্বপ্ন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনও করলেন, কিন্তু স্বপ্নকে কিভাবে ও কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে যদি পরিকল্পনা না করেই কাজে নেমে যান তাহলে কাজে শৃংখলা বজায় থাকবে না এবং কাজগুলো এলোমেলো হয়ে যাবে। তাই আপনি যেসব স্বপ্ন দেখেন তা আগামী কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়িত করতে চান এ বিষয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকতে হবে। ইংরেজিতে যাকে বলে গোল সেটাপ। সেই সাথে কিভাবে কোন্ পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়ন করবেন সেই সম্পর্কিত প্লান বা পরিকল্পনা করতে হবে। মনে রাখবেন, সুন্দর ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা হলো একটি কাজে সফল হওয়ার অর্ধেক বা ৫০%। তাই আগামী পাঁচ বা দশ বছরে আপনি কি কি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চান এবং কিভাবে করতে চান এ ব্যাপারে গোল সেটাপ ও প্লান করে ফেলুন। এ বিষয়টি আপনার মূল্যবান সময়,অর্থ ও শ্রম অধিকাংশই বাঁচাবে এবং অপচয় হওয়ার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
পাঁচ. কাজ (Action) : স্বপ্ন দেখা থেকে নিয়ে পরিকল্পনা করা পর্যন্ত হলো। এবার কাজে নামার পালা। সবকিছু করার পর যদি কাজেই না নামেন তাহলে সাফল্য অধরাই থেকে যাবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন- ‘মানুষের জীবনে কিছুই নেই পরিশ্রম ছাড়া’। আমরা জীবনে সফল হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখি, কিন্তু কাজ করতে আমাদের অনীহা। যে জাতি যত পরিশ্রমী সেই জাতি ততো সফল ও ভাগ্যবান। অলস ও কর্মবিমুখ জাতি জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারেনা, করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আর ক্ষণস্থায়ী দু’দিনের জন্য সাফল্য অর্জন কারোরই কাম্য নয়। সেই সাথে জীবনে কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে সাফল্য অর্জনের জন্য ভালো একজন গাইড বা পথপ্রদর্শক দরকার পড়ে। তা না হলে ভুল কাজের মাধ্যমে ভুল পথে চলে যাবার এবং উল্টো ব্যর্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সফল হবার জন্য সেই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও সফল ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক রাখুন। তাদের সাহচর্য ও পরামর্শ লাভের মাধ্যমে আপনার সফল হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেইসাথে কেউ আপনাকে সুযোগ পেয়ে মিস গাইড করছে কিনা এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকুন।
জীবনে যেকোন কাজে সফল হতে গেলে অনেক সময় ব্যর্থতাও ফেইস করা লাগতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক।
ব্যর্থতা ও সাফল্য একই মুদ্রার দুটো পিঠ, দু‘টো মিলেই জীবন। ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় সাফল্যে চেষ্টা করতে হবে। এ পৃথিবীতে এমন সফল ব্যক্তিদের প্রচুর উদাহরণ আছে যারা জীবনে বারবার অসংখ্যবার ব্যর্থ হয়েও হতাশ হননি, কোন প্রতিবন্ধকতা আলোচনা- সমালোচনাই তাদেরকে তাদের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এবং অবশেষে তারা ঠিকই সফল হয়ে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। যেমন- বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, আলীবাবা ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা। স্বপ্ন, বিশ্বাস, জ্ঞানার্জন, লক্ষ্য- পরিকল্পনা ও কাজ- সাফল্যের এই পাঁচটি সূত্র মনে রেখে চলতে পারলে যেকোন মানুষের জীবনেই যেকোন ক্ষেত্রে সাফল্য অনিবার্য। সেই সাথে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করে যেতে হবে। কারণ জীবনে সাফল্য অর্জনের জন্যে তার সাহায্য ও কৃপা লাভ করাটাও জরুরী। সাফল্য আপনার পদচুম্বন করুক শুভ কামনা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT