উপ সম্পাদকীয়

অস্ত্র বাণিজ্য : নিরাপত্তা হুমকিতে বিশ্বব্যবস্থা

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৩:১৪ | সংবাদটি ১৫১ বার পঠিত

সকল প্রকার আগ্নেয়াস্ত্রমুক্ত বিশ্বব্যবস্থা মানব সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা। যুগ-যুগান্তরের শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার মানব সম্প্রদায়ের এ প্রত্যাশার লক্ষ্যার্জনের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্রের উৎপাদন, মজুতকরণ, বিপণন ও বিশ্বব্যাপী সেটা স্থানান্তর ও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টাকে দায়ি বলে মনে করা হয়ে থাকে।
সমগ্র পৃথিবীকে শুধুমাত্র মানব সমাজের কল্যাণের জন্য এবং শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংঘাতমুক্ত ও যুদ্ধমুক্ত শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা কায়েমের জন্য যুগে যুগে বিশ্বনেতৃবৃন্দ এ ব্রহ্মান্ডকে আগ্নেয়াস্ত্রমুক্ত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা স্বত্ত্বেও আগ্নেয়াস্ত্রমুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং পৃথিবীতে আগ্নেয়াস্ত্রের উৎপাদন, বিপণন এবং সে সাথে জাতিতে জাতিতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে গেছে। আর দুর্ভাগ্য এটাই যে,-এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে নিরীহ মানুষ হত্যায়।
অস্ত্র উৎপাদন ও বিপণনের সাথে রয়েছে-অর্থ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক। পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র; বিশেষ করে ক্ষুদ্র-দুর্বল ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র উৎপাদন করতে পারে না। অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র উৎপাদন করতে পারে বলে এগুলো বিশ্ব ব্যবস্থায় ক্ষমতাবান রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত ও সমীহযোগ্য, বিশ্বব্যবস্থায় এগুলোর রয়েছে আলাদা মর্যাদা। অন্যদিকে, অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হওয়ার কারণে এসব রাষ্ট্রগুলো অধিক মুনাফায় পৃথিবীর শতাধিক রাষ্ট্রের নিকট অস্ত্র বিক্রি করে নিজেদের দেশের অর্থভান্ডারকে অধিকতর সমৃদ্ধ করে ধনী রাষ্ট্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ অস্ত্র উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলো ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত-‘অস্ত্র এবং অর্থ’ দুটোরই অধিকারী হয়ে বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে।
ক্ষুদ্র-ভারী-মাঝারি-সকল ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করে অস্ত্র প্রস্তুত, উৎপাদন এবং বিপণনকারী রাষ্ট্রগুলো উৎপাদিত অস্ত্রের সিংহভাগই বিশ্বের নানা প্রান্তের ক্ষুদ্র, দুর্বল ও অস্ত্র উৎপাদনে অক্ষম রাষ্ট্রগুলোর নিকট বিক্রি করে দিয়ে থাকে বলে একদিকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেয় এবং অন্যদিকে, অস্ত্র ক্রেতা রাষ্ট্রগুলো নিজ দেশের মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের চাহিদা অপূরণ রেখেই অস্ত্র ক্রয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে অস্ত্র ক্রয়কারী রাষ্ট্রগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। অস্ত্র ক্রয়ের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে নিজেদের জনগণকে দারিদ্র্যতার চরমে ঠেলে দিয়ে থাকে অস্ত্র ক্রয়কারী রাষ্ট্রগুলো। পক্ষান্তরে-অস্ত্র বিক্রিকারী রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার আয় করছে প্রতি বছর। ফলে এ রাষ্ট্রগুলো সমৃদ্ধ ও ক্ষমতাশালী হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র ক্রয় করে নিজেদের রাষ্ট্রকে ক্ষমতায়িত করার জন্য, তার জাতীয় নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বহিঃশক্তির হুমকি থেকে রক্ষা করার অজুহাতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো হতদরিদ্র মানুষের রক্তঘামে অর্জিত অর্থের বিনিময়ে ক্রয়কৃত অস্ত্র বহিঃশক্তির পরিবর্তে নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে কেবলমাত্র শাসকদের শাসন কর্তৃত্ব দীর্ঘায়িত, নিরংকুশ ও টিকিয়ে রাখার জন্য।
মূল বিষয়টা হলো, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র উৎপাদন ও বিপণন করে অত্যধিক মুনাফায় ব্যবসা করার জন্য। আর অস্ত্রক্রয়কারী রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র ক্রয় করে মূলত: নিজেদের জনগণকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ করার জন্য এবং এর সাথে অবশ্যই দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু লোকের অর্থ লাভের সম্পর্কিত জড়িত থাকে। উল্লেখ্য যে, অস্ত্রের ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিপূর্ণ-অস্বচ্ছ ব্যবসার অন্যতম ব্যবসা হিসেবে অভিহিত।
অস্ত্র-বিশ্ববাসীর কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই ডেকে আনে-এটা সুবিদিত। অস্ত্রের উৎপাদন ও বিপণন এবং ক্রয়-বিক্রয়, দেশ-দেশান্তরে স্থানান্তরের ফলে গোটা বিশ্বকে সবসময় নিরাপত্তাহীন ও যুদ্ধ ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। অন্যদিকে-এসব অস্ত্র বিশ্বের কোনো-না কোনো অংশে নিরীহ মানুষদের ওপর নিষ্ঠুরতা ও দমনপীড়নে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অস্ত্র মানুষের দুর্দশার এবং বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হওয়া সত্বেও এর উৎপাদন, বিপণন ও ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ হয়নি; বরং প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। এর সাথে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অস্ত্র ভান্ডার সমৃদ্ধ করার প্রতিযোগিতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অস্ত্র ভান্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে সারা বিশ্বের সর্বত্র অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে এবং এসব অস্ত্রের মধ্য হতে কিছু কিছু অস্ত্র রাষ্ট্র বহির্ভুত বেসামরিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, যা মানব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা সংস্থা (সিআইপিআরআই) ২০১৯ সালের মার্চে অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় বা স্থানান্তরের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে তা থেকে দেখা যায়-২০১৩ সালের পর থেকে অস্ত্র উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয় বেড়েছে ব্যাপকভাবে। পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে গোটা বিশ্বে ২০১৪-২০১৮ সময়কালে যে পরিমাণ অস্ত্র স্থানান্তরিত হয়েছে তার পরিমাণ ২০০৯-২০১৩ সালের সময়কালের চেয়ে ৭.৮% শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যানে এটা বলা হয়েছে যে, ২০১৪-১৮ সময়কালে বিশ্বের ১৫৫ রাষ্ট্র অস্ত্র ক্রয় করেছে। এর মধ্যে এশিয়া-ওসেনিয়া অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র ক্রয়-আমদানী করেছে বিশ্বের মোট আমদানীকৃত অস্ত্রের ৪০% শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো আমদানী করেছে ৩৫% শতাংশ, ইউরোপীয়ান রাষ্ট্রগুলো ১১% শতাংশ, আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো ৭.৮% শতাংশ এবং আমেরিকা মহাদেশীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো আমদানী করেছে-৬.২% শতাংশ অস্ত্র। পরিসংখ্যানে এটা দেখানো হয়েছে যে, ২০০৯-২০১৩ সময়কালের চেয়ে ২০১৪-২০১৮ সময়কালে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অস্ত্র আমদানীর পরিমাণ বেড়েছে ৮৭% শতাংশ।
উক্ত গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, ২০১৪-১৮ সময়কালে বিশ্বের ৬৭ রাষ্ট্র সর্বাধিক অস্ত্র ক্রয়-আমদানী করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানীকারক রাষ্ট্র হলো পাঁচটা। এগুলো সর্বমোট অস্ত্রের ৩৫% শতাংশ আমদানী করেছে। অন্যদিকে, সর্বাধিক অস্ত্র রফতানীকারক রাষ্ট্র হলো পাঁচটা। এগুলো অস্ত্র রফতানী করেছে মোট অস্ত্রের ৭৫% শতাংশ।
সিআইপিআরআই-এর পরিসংখ্যানে সর্বাধিক অস্ত্র রফতানীকারী (২০১৪-১৮) পাঁচ রাষ্ট্র ও বিক্রিত অস্ত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে-(১) আমেরিকা-১০.৫ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার, (২) রাশিয়া-৬.৪ বিলিয়ন ডলার, (৩) ফ্রান্স-১.৭৬ বিলিয়ন ডলার, (৪) জার্মানী-১.২৭ বিলিয়ন ডলার এবং (৫) চীন-১.১৮ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, এ সময়কালে সর্বাধিক অস্ত্র আমদানী করেছে মোট পাঁচ রাষ্ট্র, এগুলো হলো-(১) সৌদি আরব-৩৮১০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার, (২) অস্ট্রেলিয়া-১৫৭২ মিলিয়ন ডলার, (৩) চীন-১৫৬৬ মিলিয়ন ডলার, (৪) ভারত-১৫৩৯ মিলিয়ন ডলার এবং (৫) মিসর-১৪৮৪ মিলিয়ন ডলার।
এ সংস্থার পরিসংখ্যান তথ্য মতে, আমেরিকা হচ্ছে সর্বাধিক অস্ত্র রফতানীকারী দেশ। ২০১৪-১৮ সময়কালে সারা বিশ্বের রফতানীকৃত মোট অস্ত্রের ৩৬% শতাংশ এককভাবে রফতানী করেছে আমেরিকা। ২০০৯-২০১৩ সময়কালের চেয়ে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধির পরিমাণ ২৯% শতাংশ। ২০১৪-১৮ সময়কালে আমেরিকা সারা বিশ্বের মোট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এককভাবে ৯৮ রাষ্ট্রে অস্ত্র রফতানী করেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অস্ত্র বিক্রি-রফতানী করেছে ৫২% শতাংশ। আফ্রিকান দেশগুলোর নিকট বিক্রিত অস্ত্রের পরিমাণ ২৬% শতাংশ। আর সৌদি আরবের নিকট বিক্রিত অস্ত্রের পরিমাণ এককভাবে সর্বোচ্চ যার পরিমাণ হলো-২২% শতাংশ, যেটি ২০০৯-২০১৩ সময়কালের চেয়ে ৪.৯% শতাংশ বেশি। ২০১৪-১৮ সময়কালে আমেরিকা-ইসরাইল, তাইওয়ান এবং কাতারের নিকটও অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ২০০৯-১৩ সময়কালের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে।
অপর এক পরিসংখ্যানে এসআইপিআরআই ১৯৫০-২০১৭ সময়কালে বিশ্বের মোট চারটা রাষ্ট্রের বিক্রিত-রফতানীকৃত অস্ত্রের মূল্য প্রদর্শন করেছে। এর থেকে দেখা যায়, আমেরিকা রফতানী করেছে ৬৭৩০১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র। রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। রফতানী করেছে ৫৮৮১৫০ বিলিয়ন, বৃটেন বিক্রি করেছে ১৪০৩৮০ বিলিয়ন এবং ফ্রান্স বিক্রি-রফতানী করেছে ১২০৭০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র। অর্থাৎ এ সময়কালে বৃহৎ চার অস্ত্র রফতানীকারক রাষ্ট্র সর্বমোট ১৫২২২৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র রফতানী করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
২০১৯ সালের সর্বশেষ তথ্য দিয়ে গবেষণা সংস্থাটা দেখিয়েছে, বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ১০০ বৃহৎ অস্ত্র নির্মাণ কারখানাতে ভারী যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এসব কারখানায় গেলো বছরে সর্বমোট ৩৯৮.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র নির্মাণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য ১০০ কারখানার মধ্যে চীনের কোনো কোম্পানীর উল্লেখ নেই বিধায় চীনা কোম্পানীগুলো কী পরিমাণ অস্ত্র উৎপাদন করে বা এর বাজার মূল্যই বা কতো সেটা জানা সম্ভব হয়নি।
১০০ কারখানার মধ্যে বৃহৎ ১০ কারখানায় গত বছর যেসব অস্ত্র উৎপাদন করা হয়েছে তার মূল্যসহ একটা তালিকা দিয়েছে গবেষণা সংস্থাটা। ১০ কারখানার নামসহ উৎপাদিত অস্ত্রের মূল্য উল্লেখ করা হলো। উল্লেখ্য ১০ কোম্পানীর মধ্যে ৫ কারখানার মালিকানা আমেরিকার। (১) লকহীড-উৎপাদিত অস্ত্রের মোট মূল্য ৪৪.৯ বিলিয়ন ডলার, (২) বোয়িং-২৬.৯ বিলিয়ন, (৩) রেথিয়ন-২৩.৮ বিলিয়ন, (৪) বিএই সিস্টেমস-২২.৯ বিলিয়ন, (৫) নর্থরূপ গুরুমান-২২.৩ বিলিয়ন, (৬) জেনারেল ডাইনামিকস-১৯.৪ বিলিয়ন, (৭) এয়ারবাস-১১.২ বিলিয়ন, (৮) তাহেলস গ্রুপ-৯.০ বিলিয়ন, (৯) লিওনার্ডো-৮.৮ বিলিয়ন এবং (১০) আলমাজ এনজে-৮.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানী করেছে।
বিশ্বব্যাপী ভারী যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও হালকা অস্ত্রের উৎপাদন, বিপণন এবং চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে জেনেভা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা-‘স্মল আর্মস সার্ভে।’ এ সংস্থার ২০১৯ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বের প্রায় একশ দেশের এক হাজার কারখানায় হালকা-ক্ষুদ্র অস্ত্র উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের দেশে দেশে এসব অস্ত্র বিক্রি-রফতানী হচ্ছে। আর এসব অস্ত্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অপরাধ, খুন, রাহাজানি ও মানব সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
স্মল আর্মস সার্ভে এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে ১০১৩ মিলিয়ন হালকা অস্ত্রের বিস্তার ঘটেছে, যার মধ্যে ৮৫৭ মিলিয়নই বেসামরিক লোকজনদের হাতে রয়েছে। অর্থাৎ মোট হালকা অস্ত্রের ৮৫% শতাংশই সিভিলিয়ানদের হাতে রয়েছে। সিভিলিয়ানদের হাতে থাকা অস্ত্রের মধ্যে ৩৯৩ মিলিয়নই আমেরিকানদের নিকট আছে, যা প্রায় ৪৬% শতাংশ। আমেরিকান গবেষক জি. স্টিফেন এক প্রতিবেদনে (২১ জুন ২০১৮) জানিয়েছিলেন প্রায় ৪০০ মিলিয়ন আমেরিকান সিভিলিয়ানদের নিকট হালকা আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। ইউ.এন রিপোর্ট অনুযায়ী (টাইম কম. জুন ১৮) সমগ্র বিশ্বের মোট ক্ষুদ্রাস্ত্রের ১৩৩ মিলিয়ন বা ১৩% শতাংশ রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। আর রাশিয়ার নিকট রয়েছে ৩০.৩ মিলিয়ন এবং চীনের নিয়ন্ত্রণে আছে ২৭.৫ মিলিয়ন ক্ষুদ্রাস্ত্র। ২০১৪-২০১৮ সময়কালে বিশ্বের দেশগুলোর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর হাতে মোট ক্ষুদ্রাস্ত্রের ২% শতাংশ বা ২৩ মিলিয়ন ক্ষুদ্রাস্ত্র রয়েছে বলে স্মল আর্মস সার্ভে জানিয়েছে।
উপরোক্ত পরিসংখ্যান ও তথ্যাবলি এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাপী সর্ব প্রকারের ভারী, হালকা ও ক্ষুদ্রাস্ত্র তথা সমরাস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি বছর সেটা বেড়েই চলেছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। এসবের মধ্যে কোনো কোনো অস্ত্র যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিছু অস্ত্র চলে গেছে সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠীর দখলে। আর ক্ষুদ্রাস্ত্রের ৬০% শতাংশই মানবাধিকারী পরিপন্থী নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অস্ত্রের অপব্যবহারে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ লোক নিহত হচ্ছে। আর যুদ্ধ গৃহযুদ্ধেও অসংখ্য লোক মারা যায় প্রতি বছর। কাজেই সর্বপ্রকার অস্ত্রই মানব সম্প্রদায় ও বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই অস্ত্র উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT