ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৬:০৬ | সংবাদটি ১৭২ বার পঠিত

একটি শিশু পৃথিবীতে এসে চিৎকার দিয়ে জানিয়ে দেয় তার উপস্থিতি, বলে দেয় তার জন্যে দরকার একান্ত নিজের কিছু জায়গা নিজের একটা জগৎ। প্রতিটি মানুষ প্রতিটি জাতি গোষ্ঠী পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায় স্বাতন্ত্র্যবোধ নিয়ে নিজস্বতা নিয়ে। মণিপুরী সম্প্রদায় তেমনি এক জাতি, যারা জাতিসত্ত্বা সংস্কৃতি কোনো কিছুতেই কখনও বিসর্জন দেয়নি আপন বৈশিষ্ট্যকে।
একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা :
সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন জাতি বা সম্প্রদায়ের লোকজন। এরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। ছোট ছোট পাহাড় টিলা, বন, ফলফসলের বাগান আর হাওর বিল বেষ্টিত সিলেট অঞ্চলের বিচিত্র রূপের সঙ্গে মিশে আছে এই সম্প্রদায়ের জাতিসত্ত্বা। বাঙালি জাতির সঙ্গে শত শত বছর একত্রে পাশাপাশি বসবাস করেও মণিপুরী, খাসিয়াসহ অন্যান্য জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের লোকেরা আজও তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে চলেছে। নৃবিজ্ঞানীগণ বলেন, মণিপুরী সম্প্রদায় মঙ্গোলীয় মানবধারার তিব্বত বর্মী পরিবারের কুকিচীন গোষ্ঠীর লোক। ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, মণিপুরীরা ‘বড়ো’ অথবা ‘বরা, গোষ্ঠীর অন্তর্গত। বাংলাদেশের মণিপুরীরা হচ্ছে এমন এক সম্প্রদায় যাদের এখনও বিশেষভাবে চিহ্নিত ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে জাতি, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, তার সবকিছুই রয়েছে অন্য রাষ্ট্রে। সেটা হচ্ছে মণিপুর, ভারত প্রজাতন্ত্রের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত একটি অঙ্গরাজ্য। মণিপুরীদের আদি বাসস্থান এই মণিপুর। মহারাজ গরীব নেওয়াজের শাসনামলে অর্থাৎ ১৭০৯ থেকে ১৭৪৮ সালের মধ্যে এই রাজ্যের নামকরণ করা হয় মণিপুর। যে মণিপুরের কথা মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে। মণিপুরীরা সিলেট অঞ্চলে তথা বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে। কারও কারও মতে তারও আগে থেকে এরা ত্রদেশে আসতে শুরু করে। মণিপুরের সঙ্গে বার্মার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শুরু হয় এই অভিভাসন প্রক্রিয়া জোরেশোরে। ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত বর্মী দখলদাররা মণিপুর রাজ্য শাসন করে। এ সময় মণিপুররাজ চৌরাঞ্জিত সিংহ তাঁর দুই ভাইসহ সিলেটে আশ্রয় নেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন অনেক ধন সম্পদ। তখন তারা সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গালে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। যার ধংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। এই যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও বাংলাদেশের উর্বর পলিমাটির ফসলের প্রাচুর্যের মোহও অনেক মণিপুরীকে ঘরছাড়া করেছিলো। এভাবেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে মণিপুরী বসতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর, ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় মণিপুরী বসতিগুলো গড়ে ওঠে সেই সময়। তবে সেসব বসতি এখন আর নেই। মণিপুরীরা বর্তমানে সিলেট অঞ্চলেই বসবাস করছে বেশি। সিলেট শহর ও শহরতলী, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বড়লেখা উপজেলা, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং সুনামগঞ্জের ছাতকে মণিপুরীদের বসবাস রয়েছে।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম :
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মণিপুরী সম্প্রদায় একটা সংগ্রামী জাতি। সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসত্ত্বা রক্ষায় বারবার যুদ্ধ করতে হয়েছে তাদের। বর্মীরা সর্বপ্রথম মণিপুর আক্রমণ করে ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তীতে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে বর্মীরা মণিপুর দখল করে বসে। সাত বছর থাকে মণিপুর বর্মীদের দখলে। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে মণিপুর পুনরুদ্ধারের অভিযান শুরু হয়। এতে সিলেট থেকে ৫শ’ মণিপুরী সৈন্য অংশ নেয়। তখন থেকে ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মণিপুরীদের স্বাধীনতা অক্ষুণœ ছিলো। তখন ব্রিটিশদের সঙ্গে একটি ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে পরাজিত হয় মণিপুরীরা। মণিপুরীদের সেনাপতি বীর টিকেন্দ্রজিৎ এবং থাঙাল জেনারেলকে তখন বিচারের নামে এক প্রহসনে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে হত্যা করা হয়। এই যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশরা মণিপুর রাজাকে বছরে পাঁচশ থেকে ছয়শ’ পাউ- কর প্রদান করতো। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের বিখ্যাত গোবিন্দজীর মূর্তি ছিলো সিলেটে। সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় ছিলো সেটা জানা যায়নি। তবে সিলেটে তিনটি রাজবাড়ি বা ‘নিংখৌ কনুং’ এর সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে শহরের কেন্দ্রে মণিপুরী রাজবাড়ি, একটি হচ্ছে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের কানিশাইলে, ‘মায়াম্বা’ কনুং’ এবং অপরটি হচ্ছে ভানুগাছ তিলকপুর গ্রামে ‘মৈতৈ কনুং’।
সিলেটের মণিপুরী রাজবাড়িতে মণিপুরীদের মন্দিরটি দেড়শ’ বছর পুরনো। তৎকালীন মণিপুরী রাজবংশ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এছাড়া, রিকাবীবাজার-লামাবাজার রাস্তার পশ্চিমে পাশাপাশি তিনটি মণিপুরী প্রাচীন মন্দির রয়েছে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে। মণিপুরীদের আদি ধর্ম ‘অপোকপা’র দেবতাদের নামে মন্দির তিনটি পরিচিত। এগুলো হলোÑ ‘পাখংবা’, ‘সানামহী’ এবং ‘লৈমারেল’। হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারে মণিপুরীদের বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে।
গোত্র, ভাষা ও ধর্ম :
মণিপুরী জাতি মূলতঃ সাতটি গোত্রে বিভক্ত। তাদের সমাজ কাঠামো বিন্যস্ত তিনটি উপভাগে। যেমন মৈতৈ, বিষ্ণুপ্রিয়া এবং পাঙ্গাল। মৈতৈ ও পাঙ্গাল উভয়ের ভাষা মৈতৈ। মণিপুরী মুসলিমদের বলা হয় পাঙ্গাল। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আসাম এবং বাংলার একটি মিশ্রিত ভাষা। মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মূলতঃ হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। মৈতৈ মণিপুরীরা তাদের আদি ধর্ম অপোকপা ধর্মমতও পালন করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসামী ভাষার পরই মণিপুরী অথবা মৈতৈ ভাষার স্থান। মণিপুরী মুসলমানরা নিজেদের একমাত্র ধর্ম ছাড়া মৈতৈদের প্রাচীন সংস্কৃত ও ঐতিহ্যের বিশ্বাসী। ‘কীতনা’ নামে আরও একটি শাখা আছে মণিপুরীদের। তাদের ভাষাও মৈতৈ।
মণিপুরীদের নিজস্ব একটি বর্ণমালা রয়েছে। একে বলে ‘লুপতিনমরেক’। ঐতিহাসিকদের মতে, মণিপুরীরা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তারা নিজস্ব বর্ণমালার প্রচলন বন্ধ করে দেয়। এর স্থলে গ্রহণ করা হয় বাংলা বর্ণমালা। এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে, সিলেটী নাগরীলিপির সঙ্গে মণিপুরী বর্ণমালার অনেক মিল রয়েছে। এই সিলেটী নাগরীলিপি হচ্ছে সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন এবং নিজস্ব বর্ণমালা। মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য খুবই প্রাচীন। এর রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এই ভাষা আজ শুধু মণিপুরের রাষ্ট্রভাষাই নয়, এটি ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে।
মণিপুরী সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় অষ্টম শতাব্দীতে। একটি তামার পাত্রে পাওয়া যায় প্রথম লিখিত সাহিত্য। এটি মহারাজা খংটেকচা’র সময়ে লেখা হয়। এছাড়া ৩৩ সালে মণিপুরী রাজা পাখাংবা’র সিংহাসনে আরোহন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে গীত হয় ‘ঔগরি’ নামে একটি গীতি কবিতা। এটি মণিপুরী সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম নিদর্শন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মণিপুরী সাহিত্যেরও ক্রমবিকাশ ঘটেছে। আধুনিক মণিপুরী সাহিত্য বিজ্ঞ মহলে বিপুল প্রশংসিত হচ্ছে। প্রাচীন মণিপুরী হরফের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিটি হরফের নামকরণ করা হয়েছে মানবদেহের এক একটি অঙ্গের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা গরীব নেওয়াজের শাসনামলে মণিপুরী হরফকে বাংলা হরফে প্রতিস্থাপিত করা হয়। মণিপুরী সাহিত্যের বিকাশে কয়েকটি সংগঠন কাজ করছে সিলেট অঞ্চলে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। সিলেটের অধিবাসী মণিপুরীদের শিক্ষিতের হার বেড়ে চলেছে। বাড়ছে উচ্চ শিক্ষিতের হার। স্বাক্ষরতার হার ৫০ শতাংশের ওপরে।
সংস্কৃতি-কৃষ্টি :
মণিপুরীদের আদি নিবাস ভারতের মণিপুর একটি নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যম-িত রাজ্য। তাই প্রকৃতিগতভাবেই এ জাতি সংস্কৃতি-প্রিয়। তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ-বর্ণিল শিল্পকলার ইতিহাস। মণিপুরী সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য শাখা হচ্ছে মণিপুরী নৃত্য। উপমহাদেশের চারটি বিখ্যাত ধ্রুপদাঙ্গের নৃত্যের মধ্যে একটি হচ্ছে মণিপুরী নৃত্য। অন্য তিনটি হচ্ছে ভারত নাট্যম, কথাকলি ও কত্থক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালে প্রথম সিলেটেই মণিপুরী নৃত্য দেখেছিলেন এবং পরে শান্তিনিকেতনে এই নৃত্যের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এর প্রশিক্ষক ছিলেন সিলেটেরই মণিপুরী নৃত্যশিল্পী বুদ্ধিমন্ত সিংহ।
মণিপুরী ভাষায় নৃত্যের প্রতিশব্দ হচ্ছে জাগই (ঔধমড়র)। এই নৃত্যে শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চালনার মাধ্যমে বৃত্ত বা উপবৃত্ত সৃষ্টি করা হয়। মূলত ধর্মাশ্রয়ী এই নৃত্য। মণিপুরী নৃত্যের মধ্যে রয়েছেÑ রাস, গোষ্ঠ, গোপ-গোপী, চলম, পুংচলম, লাইহারাওবা, খাম্বা-থইবি, মেইবি, জাগই, লেইশাম জাগই ইত্যাদি। এইসব নৃত্যের মধ্যে পরিস্ফুট হয় ধর্মীয় অনুভূতি। পাশাপাশি এগুলোকে লাস্য বা কোমল ধরণের নৃত্যও বলা হয়। কারণ এর প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে কোমলতা ও ন¤্রতা। লাইহারাওবা নৃত্যে দেখা যায় অপরূপ শারীরিক ভঙ্গিমা, সৌন্দর্য্য ও নিবেদনের আকুতি। মৃদঙ্গ নৃত্যেও এরকম ভাব প্রকাশ লক্ষণীয়। শ্রীকৃষ্ণ- নৃত্যে আছে অসীমের প্রতি জীবনের আকুতি। খাম্বা-থইবি নৃত্যে শক্তিমত্ত্বা ও লাস্যময়তার সংমিশ্রণ ঘটেছে।
মণিপুরী নৃত্যের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং জমকালো অধ্যায় হচ্ছে রাস নৃত্য’। এ ব্যাপারে গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায় বলেন, মণিপুরী নৃত্যে নাট্য, নৃত্য এবং নৃত্ত-নর্তনকলার এই তিন গুণই বিদ্যমান। তবে মণিপুরী নৃত্যে নৃত্য অংশই প্রধান। এখানে আঙ্গিকাভিনয় অংশই প্রাধান্য পায়। এই অপরূপ নৃত্যছন্দে তনুদেহ লীলায়িত ব্যঞ্জনায় দেহভঙ্গীর সঙ্গীতে সৌন্দর্যে পুষ্পিত হয়ে ওঠে। এই সাবলীলতা ও স্বচ্ছতা অন্য কোনো নৃত্যধারায় দৃষ্টিগোচর হয় না।’ ঐতিহাসিকগণ ‘রাসলীলা’ সম্বন্ধে ব্যাখা দিয়েছেন এভাবেÑ ‘রস থেকেই রাস কথাটির উৎপত্তি। আর রসাস্বাদনের জন্য যে ক্রীড়া বা লীলা তা-ই ‘রাসলীলা’।
রাসলীলা সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সেটি হতো বৃন্দাবনে। কিন্তু বর্তমান যুগের যে রাসলীলাকেন্দ্রিক রাস উৎসব হয়ে আসছে তার প্রচারক হচ্ছেন মণিপুরী রাজা ভাগ্যচন্দ্র। প্রচলিত আছে কয়েকশ’ বছর আগে তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নতুনভাবে রাসলীলার প্রচলন করেন। ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দের কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে শ্রীগোবিন্দের মূর্তি নিরূপণ করে নিবেদন করেন মহারাস। আর সেই থেকে রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রতি বছর কার্তিকের পূর্ণিমাতে। এদেশে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে সূচনা হয় রাসলীলার। প্রতি বছর বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয় রাসলীলা ব্যাপক আয়োজনে।
রাসলীলা উৎসবের পোশাক পরিচ্ছদ, মঞ্চ-সজ্জা এবং নৃত্য গীতে যে রাজকীয় গাম্ভীর্য রয়েছে তা অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উৎসবে চোখে পড়ে না। বিশেষ করে, বর্তমানে যে রাস উৎসবের আয়োজন করা হয় তার পুনরুজ্জীবনের ইতিহাসটাই রাজকীয়। আধুনিক রাসলীলার প্রবর্তক ভাগ্যচন্দ্র নিজেই রাস উৎসবের পোশাক পরে নেচেছিলেন বলে শোনা যায়। তাই রাসের জন্ম রাজ দরবারে হলেও তাকে বরণ করে নিয়েছে সাধারণ মণিপুরীরা। সাধারণতঃ পাঁচ ধরণের রাসনৃত্যের প্রচলন রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে বলা যায় কার্তিকের পূর্ণিমাতে আয়োজিত মহারাস নৃত্য। আরেকটি হচ্ছে ‘কুঞ্জরাস’Ñ যা আশ্বিনের পূর্ণিমাতে অনুষ্ঠিত হয়। পদ্মপুরাণের পাতাল খ-ের কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই নৃত্য। চৈত্রমাসের পূর্ণিমাতে অনুষ্ঠিত হয় বসন্তরাস। এতে আছে হোলিখেলা, কৃষ্ণ ও চন্দ্রাবলীর নৃত্য। মহারাস, কুঞ্জরাস ও বসন্তরাস থেকে বিভিন্ন নৃত্যঅংশ গ্রহণ করে যেকোনো ঋতুতে আয়োজন করা যায়, এমন রাসনৃত্য হচ্ছে ‘নিত্যরাস’। এই চার ধরণের রাসনৃত্য রাতেই অনুষ্ঠিত হয়। এর বাইরে দিনের আলোতে অনুষ্ঠিত রাসনৃত্য হচ্ছে ‘দিবারাস’। ভিন্ন প্রকৃতির এই রাসনৃত্যের প্রচলন হয় মহারাজ চূড়াচান্দ সিংহের শাসনামলে।
শতবর্ষের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর পাশাপাশি নিজস্ব স্বকীয়তা অক্ষুণœ রেখে বসবাস করছে মণিপুরীরা। ফলে রাসনৃত্য অন্য জাতির কাছেও সমাদৃত।
বিবাহ অনুষ্ঠান :
মণিপুরীদের বিয়ে অনুষ্ঠানেও রয়েছে ঐতিহ্য ও বৈচিত্রের ছোঁয়া। বিয়ের প্রধান প্রধান অনুষ্ঠান চলতে থাকে চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে পরিচয়ের সূত্র ধরেই পছন্দ করা হয় বর-কনে। এখানে কোনো ঘটকের প্রচলন নেই। বরের পক্ষ থেকে কনের বাড়িতে প্রথম যে প্রস্তাব পাঠানো হয় একে বিষ্ণুপ্রিয়ারা বলে ‘মাংকল কাপা’ (চিনিপান)। একে মৈতৈরা বলে ‘মাঙন কাবা’। এর পরবর্তী ধাপে রয়েছে বিয়ের ব্যাপারে এলাকাবাসীকে অবগত করা। মূলতঃ বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে এর প্রচলন বেশি। তারা একে বলে ‘হেইসবত’ বা ‘হেইসিং’। এই পর্যায়ে মৈতৈদের মধ্যে ‘হাজিবত’ নামে একটা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য হলো বর কনে উভয়ের পক্ষ থেকে নানান উপহার সামগ্রী বিনিময় করা। এর পরের পর্বটি মূলতঃ বিয়ের দিন। এ দিন কনের বাড়িতে বরকে নিমন্ত্রণ করা হয়। এর নাম ‘বরবার্তন’। এদিনের অন্যান্য অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ সাজানো কুঞ্জে সাতপাঁকে বাঁধা। এ সাতপাঁকে অংশ নেন শুধু কনে। আর বর বসে থাকে পিঁড়িতে। অবশ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতে বর-কনে উভয়কেই সাত পাঁকে অংশ নিতে হয়। এই সাত পাঁক পর্ব শেষে বর তুলে নেয় কনেকে। তখন বিয়ের মূল অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। এছাড়া, বিয়ের চতুর্থ দিন রয়েছে ‘চতুর্থ মঙ্গল’ এবং পঞ্চম দিন ‘ফিরাযাত্রা’। এই ফিরাযাত্রাকে বিষ্ণুপ্রিয়ারা বলে ‘পাশর ভাত’। বিয়েতে তাদের আরেকটি পর্ব রয়েছে ‘ফিরই শিল্পা’। এটাও বর-কনে উভয়ের মধ্যে জামাকাপড় ও অলংকার বিনিময়।
শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা খেলাধূলায় মণিপুরীদের রয়েছে সমৃদ্ধ অবদান। যা আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে রসদ যোগাচ্ছে।
তথ্যসূত্র :
০ বাংলাপিডিয়া, জাতীয় গ্রন্থকোষ, এশিয়াটিক সোসাইটি।
০ জেলা পরিক্রমা সিলেট, জেলা তথ্য অফিস।
০ ইঙ্খোল, সাহিত্য সাময়িকী, সম্পাদক, নামব্রম শংকর।
০ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ, সিলেট আয়োজিত নৃত্য উৎসব ২০০২ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা।
০ কালের খেয়া, ৭ এপ্রিল’ ২০০৬, দৈনিক সমকাল এর সাহিত্য সাময়িকী।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT