ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একাত্তরের শরণার্থী জীবন

প্রাণকান্ত দাস প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৩:২৬ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত



১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের দেশের সূর্য সন্তানরা পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ নয় মাস সশ¯্র যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে সমগ্র দেশে শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যুদ্ধের বিভীষিকাময় তান্ডবলীলা ছড়িয়ে পড়ে। এ দেশের পাকিস্তানী দোসরা, পাক হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশের শহর এ গ্রামের উঁচু বাড়িতে পেট্রোল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে এবং মা বোনদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে সমস্ত দেশে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
এহেন অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মৃত্যুর মুখোমুুখি হয়ে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ জ্যৈষ্ঠ হতে শ্রাবন মাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরবাড়ি বিষয় সম্পদ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে শূন্য হাতে ভারতের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপরও আল বদর, আল সামশ ও পাক বাহিনী দ্বারা দেশ ছাড়া অসহায় মানুষ বারবার রাস্তায় আক্রমণের শিকার হয়। ভারত সীমান্তের কাছে বিশেষতঃ সুনামগঞ্জের শনির হাওর নামক স্থানে সমুদ্রের গর্জনের মতো ঢেউয়ের মধ্যে দিনের আলোতে শত্রুবাহিনী দেখে ফেলার ভয়ে রাতের অন্ধকারে পাড়ি দিয়েও তাদের কবলে পড়ে অনেক মানুষ নিহত হন। এ সময় একদিকে হাওরে ঢেউয়ের গর্জন আর অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষের আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তবু কেহ কাউকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন নি। কারণ কে কাকে রক্ষা করবে সবাই যে মৃত্যুপথযাত্রী। আমি সেই সময় আমার মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনের সাথে নৌকা থেকে যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার কথা মনে হলে আজো শরীর শিউরে ওঠে। এভাবে পথিমধ্যে বিভিন্ন সময় শত্রু বাহিনীর আক্রমণের মুখে বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে বালাট, মৈলম ও টেংরাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্রমান্বয়ে এসব ক্যাম্পে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের ভীড়ে একেবারে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। এখানে বসবাসের জন্য ভারত সরকার বাঁশ, পাতা, নল, খাড়া ইত্যাদি দিয়ে অস্থায়ী কটেজ তৈরি করে এক একটি পরিবারকে একটি করে রুম বরাদ্দ করে দেন। এসব রুমে ঠাসাঠাসি করে কোনো মতে একটি পরিবার বসবাস করা যেতো। তবে সমস্যা ছিলো সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ থেকে পানি পড়তো। তাই খুব কষ্টের মধ্যেই আমরা নিরূপায় হয়ে এসব কটেজে বসবাস করতে থাকি।
ভারত সরকার আমাদেরকে বসবাসের শুরু থেকেই দৈনন্দিন খাবার হিসেবে প্রতি সপ্তাহে একদিন চাল, ডাল, লবণ, মরিছ, ধনিয়া, চিনিসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিস রেশন হিসাবে দিতেন। এজন্য কোন টাকা দিতে হতো না। রেশন হিসাবে আমরা যা পেতাম তা দিয়ে এক সপ্তাহ অনায়াসেই চলে যেতো। সমস্যা ছিলো অন্যান্য ক্ষেত্রে, এখানে প্রধান সমস্যা ছিলো পানীয় জলের। প্রায় এক কি. মি. দূর থেকে একটি নদী হতে পানি এনে প্রয়োজন মেঠানো হতো। একদিকে ঘন বসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং অন্য দিকে এতে পানিয় জলের সমস্যা থাকায় অতি অল্প দিনের মধ্যেই ডায়রিয়া, কলেরা ইত্যাদি রোগ মহামারী আকারে দেখা দেয়। এসব রোগে প্রতিদিন অনেক মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করতে থাকেন। কারণ কোনো রোগ হলে চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত ডাক্তার ছিলেন না। সামান্য ঔষধ দিয়েই চিকিৎসানামক পার্ট চলতো। সুতরাং কোনো রোগ হলে তখন মৃত্যুই এর করুণ পরিণতি ছিলো। এর ফলে মৃত্যুর হার বেশি হওয়াতে জায়গার অভাবে কবর দিতে সমস্যা হতো। তাই কোথাও অল্প গর্ত করেই লাশ তাতে পুঁতে রাখা হতো। এর ফলে প্রায়ই শিয়াল কুকুর গর্ত থেকে লাশ তুলে খেয়ে ফেলতো। এই অবস্থায় দুর্গন্ধযুক্ত বাতাসে জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠতো।
এখানে আরো একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা ছিলো জ্বালানীর। এজন্য আমাদের পাহাড় থেকে কাঠ কেটে আনতে হতো। পাহাড়ে আবার হিং¯্র বন্য জন্তুর আক্রমণের ভয় ছিলো। মাঝে মধ্যে বাঘের গর্জনে বনে জঙ্গলে কম্পনের অবস্থা সৃষ্টি হতো। তখন মানুষ যার যার সৃষ্টিকর্তার নাম চিৎকার করে বলতে বলতে দৌড়ে আত্মরক্ষা করতেন। কেহ বা বাঘের আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতেন। এছাড়া এখানে প্রায় প্রতিদিনই অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা ঘটতো। সাধারণত এর উৎস ছিলো ডালে বাগাড় দেওয়া। সামান্য আগুন থেকেই অতি সহজে খড় খুটা দিয়ে তৈরি কটেজে অতি দ্রুত ভয়ানক অগ্নিকান্ড পরিণত হয়ে একাধিক কক্ষ পুড়ে ছাই হয়ে যেতো। কারণ আগুন নেভানোর জন্য কোনো অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ছিলো না। তাই পানি ও ধুলা বালি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
এখানে শিশু হারিয়ে যাওয়া একটি নৈমিত্তিক ঘটনা ছিলো। এজন্য মাইকিং হতো। এ নিয়ে চারদিকে রব ওঠতো। অবশ্য অনেক অনুসন্ধানের পর অবশেষে হারানো শিশুকে খুঁজে পাওয়া যেতো। তবে শিশু ছিনতাই নামক ঘটনা কখনও ঘটেনি। এরই মধ্যে আবার কখনও কখনও বিবাহের আসর বসতো। বর ও কনে পক্ষের মিলনের মধ্যে আনন্দ ও হাসি খুশির মাত্রাও কোনো অংশে কমতি ছিলো না। অন্যদিকে এখানে সেখানে মাঝে মধ্যে বাউল, জারি ও সারি গান শোনা যেতো। তাতে মনে হতো দুঃখকে চাপা দেওয়ার জন্যই মানুষ এভাবে গান করতেন।
এভাবে হাঁসি কান্নার মাঝেই মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থী জীবনের নয়টি মাস অতিবাহিত হয়ে গেলো। এমনই এক মুহূর্তে চারিদিক থেকে বাতাসের বেগে খবর আসতে থাকে যে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর নিরান্নব্বই হাজার পাকসেনা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের নিকট ঢাকার রমনা পার্কে নিঃশর্ত আত্মসমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন ভূখন্ড স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্থান লাভ করে নেয়। দেশ স্বাধীনের খবর পেয়ে আমাদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসার জন্য। তাই দেশ স্বাধীন হাওয়ার পর আর এক মুহূর্তও আমরা ভারতের মাটিতে থাকার প্রয়োজন বোধ করিনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত স্বদেশের উদ্দেশ্যে আত্মীয় পরিজন নিয়ে দল বেধে কখনও পায়ে হেটে, কখনও গরুর গাড়িতে আবার কখনও নৌকা দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করতে করতে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়িতে এসে দেখি, আমাদের অনেকেরই ঘর নেই। রাজাকাররা আগুন দিয়ে পুড়ে ছারখার করে দিয়েছে। আবার কারো ঘর আছে বেড়া নেই। যা বসবাসের অনুপোযোগী। এছাড়া ঘরের সামনের উঠান বিভিন্ন প্রজাতির আগাছা জন্মে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে যা দেখে সহজে চেনাই যায় না এটা কার বাড়ী?
নিজের বাড়ি ঘরের এহেন অবস্থা দেখে অন্তরে জ্বালা যন্ত্রণা চেপে রেখে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে আবারো আমরা গৃহ সংস্কারের কাজে মনোনিবেশ করি। দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় যে সব বিষয় সম্পদ আমরা ফেলে গিয়েছিলাম তার কিছু কিছু ফেরত ফেলেও অনেক কিছুই ফেরত পাইনি। খাল, বিল, নদী-নালায় এতোদিন মাছ না ধরার কারনে সবাই যেন মাছে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। চার দিকের প্রাকৃতিক পরিবেশও এতোদিনে বদলে গেছে। গাছে গাছে ফুল ও ফলের পরিপূর্ণ রূপ দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন আমাদের আগমনের বার্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে। সেই সাথে মানুষের আচার আচরণেও এক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সবাই যেন নুতন উদ্দীপনায় সোনার বাংলা স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জেগে ওঠেছেন। সকলের মুখে মুখে তখন একটি কথাই বার বার উচ্চারিত হতো আজ স্বাধীন, স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT