বিশেষ সংখ্যা

রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া

সুনীল সিংহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৮:৩০ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

মণিপুর রাজ্য ও সিলেট অঞ্চলে মণিপুরী নাচ গানের বিকাশ হলেও এটি বিশ^ময় ছড়িয়ে দিতে সিলেট অঞ্চলের মণিপুরীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটের মাছিমপুর মণিপুরী পল্লী পরিদর্শন করায় মাছিমপুরে বসবাসকারী বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা মণিপুরী নৃত্যগীত পরিবেশনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করতে পেরেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট থেকে ফিরে গিয়ে বিশ^ভারতীতে মণিপুরী নাচ গানকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেন।
এক সময় পৃথিবীর সকল জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই বিভিন্ন ভাবধারার নৃত্যগীত চর্চার একমাত্র সহজ মাধ্যম ছিল গুরুগৃহ শিক্ষায় প্রশিক্ষণ নেয়া। তখনকার সময় মণিপুরী গান ও নাচ শিক্ষার ব্যাপারে পৃথিবীর কোথাও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের কোনরূপ ব্যবস্থা ছিল না।
তখন সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজের (এমসি কলেজ) রবীন্দ্র অনুরাগী অধ্যাপক সুরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন শিলং এ। ‘ভারতের বরপুত্র শ্রীহট্ট ভ্রমণ করে তাঁকে গৌরবান্বিত করুন’ এই আবেদন জানিয়ে। রবীন্দ্রনাথ তখন শিলং শৈলাবাসে অবকাশ যাপন করছিলেন। তাঁর ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের ‘শিলঙের চিঠি’ কবিতায় এর উল্লেখ আছে-
‘গর্মি যখন ছুটল না আর পাখার হাওয়ায় শরবতে/ ঠা-া হতে দৌড়ে এলুম শিলঙ নামক পর্বতে।/ মেঘ বিছানো শৈলমালা গহন ছায়া অরণ্যে/ ক্লান্ত জনে ডাক দিয়ে কয় ‘কোলে আমার স্মরণ নে।’
সিলেটের তৎকালীন সর্বস্তরের জনগণ ও রবীন্দ্রভক্তরা তাঁকে সিলেট ভ্রমণের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। শ্রীহট্টবাসীর আগ্রহ ও আকুলতা দেখে কবি আসতে রাজি হন। কিন্তু সিলেটে আসার রাস্তাঘাট খুবই অগম্য ও কষ্টসাধ্য জেনে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা আসতে নিষেধ করেন।
বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে এতদূরে আসামের একটি জেলা শহর তাঁর জন্যে ব্যাকুল। তাই কবি সিলেট যাবেন এ সিদ্ধান্ত নিয়েই নেন। এত গুণগ্রাহী যেখানে আছেন, সেখানে যেতে হবে, এটাই কবির ইচ্ছা।
১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর (১৯ কার্তিক ১৩২৬ বাংলা) বুধবার কবি খুব ভোরে সিলেটে আগমন করেন। কবির আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই অনেকগুলি আতশবাজি ফোটানো হয়। বেজে উঠে শঙ্খ। সমবেত জনতা হর্ষধ্বনি করে ওঠে। পরদিন ৬ নভেম্বর (২০ কার্তিক ১৩২৬ বাংলা) বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অভিনন্দন জানায়। কবির বসার সামনের টেবিলের উপর মণিপুরী কাপড় ছিল। বয়ন নৈপুণ্যের জন্য কাপড়টি কবির ভাল লাগে। তিনি মণিপুরী তাঁত ও জীবনযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তাই মহিলা সমিতির অনুষ্ঠান শেষে সিলেট শহরের উপকন্ঠে মাছিমপুর মণিপুরী পল্লী (বর্তমানে নগরীর ২৩নং ওয়ার্ড) দেখতে যান। কবির মাছিমপুর আসছেন খবরে মাছিমপুর মণিপুরীবাসী রাস্তার পাশে সারি সারি কলাগাছ পুঁতে একটি অতি সুন্দর তোরণ নির্মাণ করেছিল। মঙ্গলঘট ও আমপাতার শোভন সজ্জা কবির খুব ভাল লেগেছিল। তিনি মাছিমপুরে মণিপুরী ছেলেদের রাখাল নৃত্য উপভোগ করেন।
মাছিমপুরে মণিপুরী মেয়েদের হাতে বোনা কাপড় কবির দারুণ পছন্দ হয়। তিনি কিছু কাপড় কিনে নেন। তারা কবিকে বিখ্যাত মণিপুরী নৃত্য ও গান দিয়ে আপ্যায়িত করতে চাইলে সমস্ত দিন ব্যস্ত থাকায় ক্লান্ত বোধ করেন। তিনি বলেন, বিকেলে রতনমণি লোকনাথ টাউনহলে বক্তৃতা দেবার কথা, এখন সময় নেই, তারা যদি রাতে কবির (অবস্থানরত) বাংলোয় যায়, তাহলে তিনি আনন্দের সঙ্গে তাদের গান নাচ উপভোগ করবেন।
রাতে মাছিমপুর থেকে একদল মণিপুরী শিল্পী কবিকে বিখ্যাত রাসনৃত্য দেখায় ও গান গেয়ে শুনায়। কবি তাদের নৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে বিশ টাকা উপহার দেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কল্পনা করেছিলেন শুধু মণিপুরী সমাজের মধ্যেই যদি এমন চমৎকার সংস্কৃতি লুক্কায়িত থাকে, তাহলে অনুরূপভাবে পৃথিবীর অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর মাঝেও আরো হরেক রকমের মনোমুগ্ধকর নৃত্যগীত সংস্কৃতি লুক্কায়িত থাকতে পারে- সেসব সংস্কৃতিকে একত্রিত করে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা স্বরূপ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম চালু করলে ভবিষ্যতে বিশ^ব্যাপী সংস্কৃতির মান উন্নত হবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিপুরীর উন্নত সংস্কৃতি বিশ^ দরবারে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যে বিশ^ভারতীতে মণিপুরী নৃত্যগীত বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় ১৯২৬ সালে আগরতলার বুদ্ধিমন্ত সিংহ ও নবকুমার সিংহকে নৃত্যের শিক্ষক ও বাদক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু বুদ্ধিমন্ত সিংহ ও নবকুমার সিংহ যুগের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক প্রশিক্ষণ দানের দর্শক মনোহর কোরিওগ্রাফি ও কম্পোজিশন তৈরীতে আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেন নি। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটে দেখা মণিপুরী রাসনৃত্যের প্রশিক্ষক নীলেশ^র মুখার্জীকে উপযুক্ত মনে করেন। তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়ে কবির সিলেট সফরের ১০ বছর পর ১৯৩৬ সালে বিশ^ভারতী থেকে কবির ব্যক্তিগত সচিবকে সিলেটে পাঠান। বৃহত্তর সিলেটের বর্তমানে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের নীলেশ^র মুখার্জী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণ পেয়ে বিশ^ভারতীতে মণিপুরী নৃত্যের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
রবীন্দ্রনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং নীলেশ^র মুখার্জীর সুশিক্ষায় মণিপুরী সংস্কৃতি আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। নীলেশ^র মুখার্জীর পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘নটীর পূজা’ প্রদর্শিত হলে মণিপুরী সংস্কৃতি ভারতবর্ষের দর্শকদের প্রশংসা পায়। আর নানা পত্র পত্রিকায় ‘নটীর পূজা’র ব্যাপক প্রচার হয়। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাখুশীতে সারা পৃথিবীতে মণিপুরী সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তি আরো ব্যাপকভাবে বিকাশের প্রত্যাশায় জাতীয় শিক্ষাক্রমের আওতায় সিলেবাস প্রণয়নের চেষ্টা চালান। অবশেষে ১৯৫৪ সালে দিল্লীর বিধান সভায় রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী অভিমতের প্রস্তাবটি সাদরে অনুমোদিত হয়।
মণিপুরী নৃত্যের যথাযথ অনুকরণে ঋতুরঙ্গ, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা, সামান্য ক্ষতি, লীলাবিলাস, মণিপুরী নর্তন, নৃত্যনাট্য পরিবেশনাসহ ‘কল্পনা’ চলচ্চিত্রটি পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়।
বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহের পিতা প্রয়াত মণিপুরী তাঁত ব্যবসায়ী শম্ভু সিংহ, বিশ^কবি যখন মাছিমপুরে সফর করেন, তখন মণিপুরীদের ঐতিহ্য অনুযায়ী কবিকে বরণ করেন বয়স্করা। আর কবির সম্মানে মন্দিরে রাখাল নৃত্য পরিবেশন করা হয়। একই কথা তখনকার মুরব্বী প্রয়াত হাওবা সিংহ, রাধিকা মোহন সিংহ ও মথুর সিংহের গল্প কথায় পাওয়া যেতো।
সিলেট মহানগরীর ২৩নং ওয়ার্ডের মাছিমপুরস্থ মণিপুরী পাড়ায় বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি রক্ষার্থে কবির একটি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতি কেন্দ্রীয় ও সিলেট সদর শাখা। সে প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালে মাছিমপুর মণিপুরী পাড়ায় মন্দিরের পাশে ১ শতক ভূমিতে কবির আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের জন্য একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী পদ্মাসেন সিংহ ও মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতি সিলেট সদর শাখার সভাপতি গোপাল সিংহের সহযোগিতায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে ভারত থেকে আবক্ষ মূর্তি আনা হয়। এতে মণিপুরী সমাজের বিশিষ্টজনরা সহযোগিতা করেন।
পরে ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বরে কবির ভাস্কর্য স্থাপনে এগিয়ে আসে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সেই ভাস্কর্য রবীন্দ্র স্মৃতিস্তম্ভে রূপ পায়। আর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সহায়তায় ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর বিশ^কবি মাছিমপুরে আগমনের ৯৯ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান ঘটা করে ডা. পুলিন কুমার সিংহকে আহ্বায়ক ও প্রবাসী বিলাস সিংহকে সদস্য সচিব করে পালন করা হয়।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ
  • দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ
  • রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের হাতে ১২শ’ টাকার চেক দিয়েছিলেন এক সিলেটি
  • বাঙালির শোক ও বেদনার দিন
  • ইতিহাসের চোখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড
  • দাবায়ে রাখতে পারবা না
  • কুরবানি : ইতিহাসের আলোকে
  • রক্তিম সূর্য
  • খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা
  • কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা
  • সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই আমাদের দৃঢ় অবস্থান
  • আমার লেখকস্বত্তার অংশীদার
  • এই জনপদে ঐতিহ্যের ধারক সিলেটের ডাক
  • প্রিয় কাগজ, সাহসী কাগজ
  • পাঠকের প্রিয় সিলেটের ডাক
  • পাঠকনন্দিত সিলেটের ডাক
  • সিলেটের ডাকের তিন যুগ
  • সিলেটের ডাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে
  • সিলেটের ডাক : আলোর দিশারী
  • Developed by: Sparkle IT