বিশেষ সংখ্যা

দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ

ওয়াহিদ সারো প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৯ ইং ০১:০১:৪৯ | সংবাদটি ৩৬ বার পঠিত

রবীন্দ্রদর্শন আলোচনাকালে আমাদের কতকগুলি বিশেষ বিশেষ দার্শনিক সমস্যার বিস্তারিত আলোকপাত করা আবশ্যক। এগুলো হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন, জগতদর্শন, মানবতাবোধ বিশ্বমানববাদ, সবৈশ্বরবাদ, অদ্বৈতবাদ, মরমীবাদ ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যিক হলেও দার্শনিক অনুসন্ধান তাঁর রচনার একটি বিশেষ অংশজুড়ে। এই দার্শনিক আলোচনা তাঁর গদ্যে রচিত প্রবন্ধাবলীর একটি মূল আলোচ্য বিষয়। তাঁর ধর্ম শীর্ষক প্রবন্ধসমূহ এবং শান্তিনিকেতন শীর্ষক প্রবন্ধগুলির প্রধান প্রেরণা দার্শনিক আলোচনা। এছাড়া বিক্ষিপ্ত আকারে সাহিত্য শীর্ষক প্রবন্ধে, পত্র লোপে এবং ছোট ছোট রচনায় দার্শনিক তত্ত্ব মূলস্থান দখল করে আছে। মানুষের ধর্ম শীর্ষক তাঁর ‘হিবার্ট বক্তৃতা’ একটি অমূল্য দার্শনিক রচনা। এই বক্তৃতামালায় তাঁর, সমগ্র দর্শনকে একত্রিত করে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর কাব্য রচনায় অনেকাংশ দার্শনিক তত্ত্ব কণিকা বুকে ধারণ করে আছে। দার্শনিক তত্ত্বই তাদের আধেয়।
রবীন্দ্ররচনা বিচিত্র ও বিপুল। রবীন্দ্রনাথের ভাষার মাধুর্য কল্পনার অভিনবত্ব, ভাবের গভীরতা, রসের প্রাণদর্শিতা বিস্ময়কর। ভিক্টর হুগো বলেছেন, ‘প্রতিভা ঈশ্বরের আত্মস্বরূপের বহিঃপ্রকাশ।’ বেদে ব্রহ্মকেও আত্মদা বলা হয়েছে। এ অপ্রেমেয় প্রতিভার আবির্ভাব মানুষের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী সম্পদ। আমাদের প্রয়োজন ক্ষুব্ধ অর্থহীন তুচ্ছতাজর্জর জীবনে পরিবর্তন ধারা অব্যাহত; কিন্তু সকল ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করে যে মহা জীবনের দিব্য মহিমা আমাদের নিকট উদঘাটিত, তাহাকে যেন আমরা সত্যভাবে শ্রদ্ধা করতে শিখি। সংসারের প্রাত্যহিক জীবনের কৃত্রিমতার কালরেখাগুলি ধীরে ধীরে কালের ‘গহনে’ অন্তর্হিত হয়; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো তেজোদীপ্ত মনস্বী, তপস্বী রসিকের একটা পূর্ণ অবয়ব মহাকালের পটে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ তথা ভারতের বিশিষ্ট কবি, উপন্যাসিক, গল্পকার, সংগীত স্রষ্টা নট ও নাট্যকার, চিত্রকর, প্রাবন্ধিক, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাঁর ৮০ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য সংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর মোট ৯৫টি ছোটোগল্প এবং ১৯১৫ টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারের অপ্রকাশিত রচনা ৩২টি ভূখ-ে রবীন্দ্ররচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্র সাহিত্য ১৯ খ-ে চিঠিপত্র সংকলনে ও অন্য চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি প্রায় দু’হাজার ছবিও এঁকেছিলেন। তাঁর রচনা আজ বিশ্বের নানা ভাষায় অনুদিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
১৯১০ সালে গীতাঞ্জলির কাব্যগ্রন্থের নির্বাচিত কিছু কবিতার অনুবাদ পাশ্চাত্য সমাজ রবীন্দ্রনাথকে পরিচিতির এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। এই অনুবাদগুলোর সংকলন সংস অব রিংস বা ইংরেজি গীতাঞ্জলি ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হবার পর সুইডিস একাডেমি তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম এশীয় নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি প্রদান করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়া নাওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি যার দুটি গান দুটি দেশের শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে অতিষ্ঠিত; ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা তাঁর রচনা, তাঁরই শ্রেষ্ঠ কীর্তি। বিশ্বের এক বিরল ঘটনা। শ্রীলংকারও জাতীয় সংগীত ‘নমঃশ্রীলংকা মাতা’-এর রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি হিসেবে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত। তাঁকে বিশ্ব কবি অভিধায় ও অভিসিক্ত করা হয়। তাঁর কর্মই তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে এক উজ্জ্বল আসনে বসিয়েছে। তাঁর কবিতা কখনও মর্তচেতনা, কখনও ব্যঙ্গ কৌতুক আবার কখনো প্রেম ও সৌন্দর্য চেতনার সঙ্গে বিশ্ব চেতনায় সমকাল সংলগ্ন হয়েছে। তিনি এক অর্থে মরমী কবিও। কারণ উপনিষ্ঠদের ঋসিসুলভ প্রত্যয় তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে। সুফিবাদের ধারা, কবির ও রায় প্রসাদ সেনের আলিঙ্গণ তাঁকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর কবিতা গ্রাম বাংলার বাউল ফকিরদের দ্বারাও সমৃদ্ধ হয়েছে। বাউলদের মনের মানুষের মতোই তিনি জীবন দেবতা সৃষ্টি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাব-গভীরতা, গীতি ধর্মিতা, চিত্ররূপময়তা আধ্যাত্মচেতনা ঐতিহ্যপ্রীতি প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রেম, ভাব-ভাষা ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র, বাস্তবচেতনা ও প্রগতি চেতনা। তার গদ্যভাষা ও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদিও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা দর্শনে গ্রামীণ উন্নয়ন ও গ্রামীণ জন সমাজে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সার্বিক সমাজ কল্যাণের তত্ত্ব প্রচার করেছেন। সামাজিক ভেদাভেদ অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে ঈশ্বর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরের মূল নিহিত রয়েছে মানব সংসারের মধ্যেই। তিনি দেব বিগ্রহের পরিবর্তে মানুষ অর্থাৎ কর্মী-ঈশ্বরের পূজার কথা বলতেন। সমগ্র জীবনের সাহিত্যকর্মে রবীন্দ্রনাথ অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। যিশুখ্রিষ্ট, গৌতম বুদ্ধ ও হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে লিখেছেন প্রবন্ধ। বাংলা সাহিত্য তাঁর প্রচেষ্ঠার পথ ধরেই- এখন পর্যন্ত উদার মানবতার কথা ব্যক্ত করে চলেছে। তিনি উপনিষদের ধর্মীয় আরাধনার পথ বেয়ে মানুষের ধর্মে উপণিত হয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে।
এখানে দর্শন ও সাহিত্যের সম্বন্ধ বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক। বাঙালি ভাবপ্রবণ ও কল্পনা বিলাসী, দার্শনিক জ্ঞান চর্চা ও সত্য সাধনার জন্য যে যুক্তিবিচার অপরিহার্য বাঙালি মানসে তার বড় অভাব- এ ধরণের অভিযোগ যে বাহুলাংশে বিভ্রান্তিকর। বাস্তব সত্য হল বাঙালি সত্তায় ভাবাবেগের প্রবলতা যত বেশিই হোক না কেন বাঙালির সাহিত্যকর্ম দার্শনিক যুক্তি বিবর্জিত, এ কথা বলা সঙ্গত নয়, কাব্য সাহিত্যের মূল উপজীব্য হৃদয়াবেগ আর দার্শনিক প্রধান অবলম্বন যুক্তি বিচার- এ কথা সর্বজন বিদিত। কিন্তু তাই বলে এদের একটিতে অপরটির প্রবেশাধিকার থাকবে না এ ডিক্রি জারি করবে কে?। এবং কোন যুক্তিতে? বুদ্ধি যেমন, ইচ্ছা যেমন, আবেগও তেমনি মানব মনেরই বৃত্তি। এদের পরস্পরের মাঝখানে কোনো গন্ধদন্ত মিনার নেই, থাকার কথাও নয়। এরা একে অন্যের বিরোধী নয়, বরং সম্পূরক ও পরিপূরক। যে হৃদয়াবেগ সাহিত্যের মূল অবলম্বন, তাকে পরিষ্পুট ও পরিপূর্ণ করার জন্যই চাই দার্শনিক যুক্তি, আর যে বুদ্ধি ও যুক্তিতে আবেগের স্পর্শ নেই তা তো উপাত্তবিহীন অসার। তাই তো বুদ্ধিকে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ করতে যথার্থ দার্শনিক অবয়ব দিতে হলে চাই সেই হৃদয়াবেগ যা সাহিত্যের মূল অবলম্বন। আবেগ ও যুক্তির এই ঘনিষ্টতার জন্যেই তো একসূত্রে গ্রথিত রয়েছে দর্শন ও সাহিত্য। একই কারণে পৃথিবীর বেশ কিছু আদি রচনা স্বীকৃতি পেয়েছে একাধারে সাহিত্য ও দর্শন বলে। অনেক সাহিত্যিক স্বীকৃতি পেয়েছেন দার্শনিক হিসেবে। যেমন- উপনিষদের শ্লোকসমূহ, চৈতন্য চরিতামৃত প্রভৃতি ছিল এ ধরণের সাহিত্যিক রচনা। জালাল উদ্দিন রুমী, ওমর খৈয়াম, দন্তে, রবীন্দ্রনাথ ও আরো অনেক কবি সাহিত্যিক ছিলেন এ ধরণের দার্শনিক কবি চযরষড়ংড়ঢ়যবৎ চড়বঃ।
আমাদের সকল জ্ঞানের আধার হচ্ছে সত্য। সত্য হল দুটি বস্তুর সম্বন্ধে নির্দেশক এমন একটি উক্তি যাকে আমরা বিশ্বাস করি; অর্থাৎ যা বিশ্ব সম্পর্কে আংশিক হোক, সাধারণভাবে হোক, যথার্থ জ্ঞান দেয় এ সত্য কে উপলব্ধি করতে আমাদের মনের দুটি প্রক্রিয়া অনুভূতি ও মনন উভয় বৃত্তিরই প্রয়োজন হয়। এখন প্রশ্ন হলো, সত্য সম্বন্ধে জ্ঞান সঞ্চয় করতে এই মনন পথ ও অনুভূতি পথ- এ দুটির কোনটির প্রয়োজন বেশি। বিশেষ করে বিশ্বের পরম সত্যকে পেতে কোন পথটি উপযুক্ততর। পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে আমরা কোন পথ গ্রহণ করবো- মনন পথ না অনুভূতি পথ?
রবীন্দ্রদর্শনে আমরা দেখি এ দুটি পথের মধ্যে তিনি অনুভূতির পথের পক্ষপাতিত্ব করেছেন এবং তাঁর ক্ষেত্রে একে ঠিক অনুভূতির পথ বললে সঠিক হবে না। আমার মনে হয় তিনি যে পথ অবলম্বন করেছেন তাকে অনুভূতির অন্তর্গত একটি বিশেষ পথ বলে আমরা চিহ্নিত করতে পারি।
প্রাত্যহিক জীবনে ছোটখাট নানা বস্তুর সাথে আমাদের যে পরিচয় সেখানেও তিনি দেখিয়েছেন যে মনন শক্তির সাহায্যে যে জ্ঞান আহরণ করি তা হতে অনুভূতি বৃত্তির সাহায্যে যে জ্ঞান পাই তা আরো পরিস্ফুট আরো হৃদয়কে আলোড়িত করে, ভেতর বস্তুর সাথে ঘণিষ্টতর মিলন এনে দেয়। এ অনুভূতির শ্রেষ্ঠ বিকাশে হল প্রেম। এই নানা বস্তুর সাথে কোন ইন্দ্রায়ানুভূতির যোগ নয়। তার সাথে যদি প্রেমের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারি তা’হলে যা পাই তা হলো আরো ঘণিষ্টতর পরিচয়।
মনন শক্তির সাহায্যে যে সত্যকে পাই তা শুষ্ক নীরস তা বস্তুর যে পরিচয় আমাদের এনে দেয় তা নিতান্ত বাইরের পরিচয় অথচ অনুভূতির ভীত্তিতে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে আমাদের কাছে যে সত্য প্রকট হয় তা আমাদের হৃদয়ে আনন্দ আনে, তা হৃদয় বস্তুর সঙ্গে ঘণিষ্টতর সম্বন্ধে স্থাপন করে। মনন শক্তির সাহায্যে আমরা হৃদয়কে জানি মাত্র, তাকে পাই না। প্রেম সিক্ত অনুভূতিতে আমরা হৃদয়কে পাই হৃদয় যেখানে প্রেমস্পদরূপে আমাদের নিকট ধরা দেয়।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘মননপন্থীর সত্য আসলে পা-িত্যপূর্ণ। এ সত্য আনন্দ আনে না, হৃদয় বস্তুর অন্তরের নাগাল পায় না। পা-িত্যের সত্যের চেয়ে বড় সত্য হলো প্রেমিকের সত্য শুকতারা সম্বন্ধে এক কবিতায় তিনি এ কথাটিকেই রূপকের সাহায্যে বুঝাতে চেয়েছেন-
‘হে পা-িত্যের গ্রহ/ তুমি জ্যোতিষের সত্য/ সে কথা মানবই/ সে সত্যের প্রমাণ আছে গণিতে।/ কিন্তু এ ও সত্য তার চেয়ে ও সত্য/ যেখানে তুমি আমাদেরি/ আপন শুকতারা, সন্ধ্যাতারা,/ যেখানে তুমি ছোট্ট, তুমি সুন্দর/ যেখানে আমাদের হেমন্তের শিশির বিন্দুর/ সঙ্গে তোমার তুলনা।’ (শেষ সপ্তক)
কিংবা এ প-িতের উপলব্ধিতে সত্য ও দরদীর অনুধাবনে সত্যের তুলনায় পার্থক্যের নির্দেশ দেয়, এমন একটি কাব্যাংশ আমরা শেষ সপ্তকেই-
‘আমি যে জানি/ এ কথা যে মানুষ জানায়/ বাক্যে হোক, সুরে হোক রেখায় হোক/ সে প-িত।/ আমি রস পাই ব্যাখ্যা পাই/ রূপ দেখি/ এ কথা যার প্রাণ বলে/ গান তারই জন্যে,/ শাস্ত্রে সে আনাড়ি হলেও/ তার নাড়িতে সুর বাজে।’ (শেষ সপ্তক)
রবীন্দ্রনাথের মতে, “নিছক সত্য সম্বন্ধে জ্ঞান বা নিছক শক্তির আবিষ্কার বাহিরের বস্তু, তারা সত্তার অন্তরের নাগাল পায় না।” নিছক মনন বৃত্তির সাহায্যে যে জানা তার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্বন্ধ স্থাপনের দ্বারা হৃদয়বৃত্তির সাহায্যে যে পাওয়া ঘটে, তা আরো গভীর আরো সমৃদ্ধ অনুভূতি- এটিই রবীন্দ্র দর্শনের একটি মূল ভাবধারা। রবীন্দ্রনাথ এ কথাই দার্শনিক ও সাহিত্যিক আলোচনায় বুঝাতে চেষ্টা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ জগৎ সংসারকে দেখেছেন এক নিরবকাশ প্রেমের লীলা হিসেবে। আর মানুষকেও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন এই প্রেমের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হতে। প্রেম সংস্পর্শে কর্মে প্রবৃত্ত হতে। জ্ঞান ও কর্মকে সার্থক করে তুলতে হলে প্রেম অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে জ্ঞানহীন কর্ম মানুষকে অধঃপাতত করে পশুত্বের স্তরে, আর প্রেমহীন কর্ম তাকে চালিত করে হিংস্রতার দিকে। বুদ্ধিবৃত্তির অবলম্বনে জ্ঞানের পথে অগ্রসর হলে আমাদের মনে জাগে বিশ্বের অখ-তা বোধ। সেই বোধ থেকে যখন সঞ্চারিত হয় প্রীতি, তখনি আমরা অনুপ্রাণিত হই পরহিত সাধনে। এ প্রেম প্রীতি সঞ্জাত কর্ম পরিচালিত হয় না সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তা দ্বারা, বরং তা-ই মানুষকে উদ্বুদ্ব করে বিশ্বমানবতা বোধে কর্মের সঙ্গে যখন যথার্থ সংযোগ ঘটে প্রীতির, তখন পরহিতে মানুষ পায় সেই নির্মল আনন্দ, মা যা পেয়ে থাকেন তার সন্তানের সেবা করে।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ
  • দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ
  • রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের হাতে ১২শ’ টাকার চেক দিয়েছিলেন এক সিলেটি
  • বাঙালির শোক ও বেদনার দিন
  • ইতিহাসের চোখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড
  • দাবায়ে রাখতে পারবা না
  • কুরবানি : ইতিহাসের আলোকে
  • রক্তিম সূর্য
  • খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা
  • কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা
  • সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই আমাদের দৃঢ় অবস্থান
  • আমার লেখকস্বত্তার অংশীদার
  • এই জনপদে ঐতিহ্যের ধারক সিলেটের ডাক
  • প্রিয় কাগজ, সাহসী কাগজ
  • পাঠকের প্রিয় সিলেটের ডাক
  • পাঠকনন্দিত সিলেটের ডাক
  • সিলেটের ডাকের তিন যুগ
  • সিলেটের ডাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে
  • সিলেটের ডাক : আলোর দিশারী
  • Developed by: Sparkle IT