উপ সম্পাদকীয়

জন্ম শত বার্ষিকী ও রবীন্দ্র চর্চা

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৯ ইং ০১:০২:৫২ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

বাহান্ন’র একুশে ফেব্রুয়ারির বাংলা ভাষার আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্ত্বার মোড়ক উন্মোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। একুশের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা যেন আমাদের চিনলাম, জানলাম, জেগে উঠলাম। যেন জাতীয়তার অন্বেষণে স্বদেশ ভাবনায় সচেতন হয়ে উঠলাম। তখন থেকেই আমরা বাঙালি পরিচয়ের মূল মোড়কের প্রতি প্রাণদ আকর্ষণ অনুভব করলাম। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সঙ্গে নাড়ির যোগ আরো বেশি করে উপলব্ধি করলাম। বাংলা নববর্ষ ১লা বৈশাখ ও রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালনে হাজার বছরের ইতিহাস-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে আমাদের যে স্বাভাবিক গাঁটছড়া বা শেকড়ের বন্ধন, অন্তরে অন্তরে হৃদয়ের গহীনে গহীনে, তারই অনুরণনে আমরা আবির্ভুত হলাম। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর অন্য ইচ্ছা। তারা চায় না আমরা আমাদের জাতিগত পরিচয়ে পরিচিত হই। তারা চায়না আমরা আমাদের আবহমানকালের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাহিত্য-সংস্কৃতির লালন করি। বাহান্নর আগে ’৫১ সালে ঢাকায় প্রথম বারের মতো ১লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপনের সাহসী সূচনা হয়। সরকারী রক্তচক্ষু ও রোষানল উপেক্ষা করেই তা করতে হয়েছে। পাকিস্তানী শাসনামলের গোটা চব্বিশটি বছরই শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জনগণের বৈরী ছিল। বৈরী আচরণ করে তারা আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির টুটি চেপে ধরেছে। ১লা বৈশাখ নববর্ষ আপামর বাঙালি জনগণের উৎসবের দিন, আনন্দের দিন। ধনী-গরীব, ধর্ম-বর্ণ সকল বাঙালি জনগণ এদিন মহা আনন্দে মহামিলনে উজ্জীবিত হয়। বৈরী শক্তি দীর্ঘদিন আমাদের নববর্ষ পালনে, রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনে রক্তচক্ষু দেখিয়েছে। বাঙালিত্বের যে কোন আকর্ষণ, যে কোন উৎস উপকরণ সমূলে বল প্রয়োগে উপড়ে ফেলতে এমন কোন হীন অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি নববর্ষ, রবীন্দ্রনাথকে (রবীন্দ্র সাহিত্য, রবীন্দ্র সঙ্গীত) তারা ভয় পায়। কারণ এর মধ্যে বাঙালিত্বের প্রচন্ড শক্তি তারা দেখতে পায়। তাই জোড়াতালির পাকিস্তানে সারা ২৪টি বছরই তারা আমাদের সঙ্গে বৈরী ও উপনিবেশ সুলভ আচরণ করেছে। এই বৈরীতা ও অন্য সকল নিপীড়ন নির্যাতন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে আমরা ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে বৈরীদের পরাজিত করে দেশ স্বাধীন করেছি। তখন থেকে অবস্থা পাল্টেছে। কিন্তু পঁচাত্তরের মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমাদের আবার পিছনে টানার হীন চেষ্টা শুরু হয়। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমদানী করা হয়েছে। বাঙালি বাংলাদেশী বিভ্রান্তি বিতর্কের সৃষ্টি করা হয়েছে।
পাকিস্তানী শাসনামলের গোটা কাল ব্যাপী বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নানাভাবে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাঙ্গালী জনগণের বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র পরিচালনা করা হয়। দেশবাসীর স্বাভাবিক ধর্মানুভূতির সুযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠি দেশময় সাম্প্রদায়িক উম্মাদনা সৃষ্টি করেছিল এবং পরিস্থিতি বহাল রাখার জন্য নানা রকম ফন্দী-ফিকিরও চালায়। সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে তারা প্রচন্ড রবীন্দ্র বিরোধীতায় অবতীর্ণ হয়। এই লক্ষ্যে তার কবি নজরুল ইসলামকে খন্ডিত করে উপস্থাপনার হীন চেষ্টা চালায়। পাকিস্তানের গণ বিরোধী শাসক গোষ্ঠী বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্র সাহিত্যকে এক রকম ভীতির চোখে দেখতো। রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্র সংগীতকে তারা মারাত্মক ক্ষতিকর কিছু মনে করতো। গোটা ষাটের দশক জুড়ে রবীন্দ্র বিরোধী প্রচারণা চালানো হয়। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সমাজের সচেতন অংশ বিশেষ করে ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি গোড়া থেকেই আন্দোলন করে এসেছেন।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পরে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আইয়ুব শাহী বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্র বিরোধীতা আরো তীব্রতর করে। এ সময় বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের এক বড় অংশ ন্যাক্কারজনকভাবে সরকারের ষড়যন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণায় সহায়তা প্রদান করেন। রেডিওতে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার বন্ধ সম্পর্কিত সরকারী ঘোষণার পক্ষে এসব বুদ্ধিজীবি প্রকাশ্যে পত্রিকায় বিবৃতি প্রদানও করেন।
১৯৫১ সালে শাসক গোষ্ঠীর প্রকারান্তরে নিষেধাজ্ঞা ও রক্তচক্ষুকে আমলে না নিয়ে সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী ও অন্যরা ঢাকায় নববর্ষ পালনের পর সম্ভবতঃ ১৯৬৪ সালে আবার নববর্ষ পালিত হয়। এরপর আইয়ুবের উন্নয়ন দশক পালনকালে ১৯৬৬ সালে জাঁকজমকের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়। শুধু ঢাকায় নয়-সারাদেশে উৎসব আমেজে ঘটা করে নববর্ষ উদযাপান করা হয়। এর আগে ১৩৭১ বাংলার (১৯৬৪) ১লা বৈশাখ নববর্ষ উপলক্ষে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার ছুটির ঘোষণা দিয়েছিল। সারাদেশে নববর্ষের অনুষ্ঠানমালায় বিপুল সংখ্যক দর্শক শ্রোতার সমাবেশ ঘটেছিল। এ বছরই প্রথম প্রকাশ্য জনসমাবশ ও সুসজ্জিত প্রভাতফেরীর মাধ্যমে বাঙালির নববর্ষ উদযাপিত হয়। এ রকম কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু)। রাজপথের প্রভাবফেরীতে ছাত্র-জনতার ঢল নেমেছিল। সেদিনের অভাবিত জনসমাবেশ ও প্রভাতফেরীর প্রাণচাঞ্চল্যে বাঙালি জনগণের আত্মসচেতন বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেশের বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। যুদ্ধের পরে যখন পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে আসে। তখন পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতিসেবী, সঙ্গীত পিপাসু, শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-ছাত্র সমাজের প্রবল দাবির মুখে সরকার রেডিও টেলিভিশনে সীমিতভাবে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার শুরু করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ২০ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে সংসদ অধিবেশন চলাকালে সংসদ নেতা খান আব্দুস সবুর খান তাঁর বক্তৃতায় একেবারে গায়ে পড়ে আবার রবীন্দ্র সঙ্গীত ও ১লা বৈশাখ সম্পর্কে কটুক্তি করেন। তিনি নাকি লক্ষ্য করেছেন ‘ইদানিং পূর্ব বাংলায় সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের অশুভ তৎপরতা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন ১লা বৈশাখ ও রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপনের নামে বিদেশী সংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করে ইসলামী জীবনাদর্শের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের মূলে আঘাত হানছে।’ সবুর খানের এই উক্তির একদিন পর ২২ জুন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে জাতীয় আদর্শ ও ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার করা হবে না বলে ঘোষণা দেন। দেশের বিবেক বুদ্ধিজীবী সমাজ সঙ্গে সঙ্গে এই ঘোষণার প্রতিবাদ জানান। বিষয়টি জনগণকে অবহিত করার জন্য তারা সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। বুদ্ধিজীবীদের এই বিবৃতিটি ২৫শে জুন ১৯৬৭, দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত-১৮ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি’ এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় ২৬শে জুন ১৯৬৭ তারিখে মুদ্রিত একটি সংবাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। এতে সরকারী মাধ্যম হতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার হ্রাস ও বর্জনের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করি।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বাংলাভাষাকে যে ঐশ্বর্য দান করেছে, তাঁর সঙ্গীত আমাদের অনুভূতিকে যে গভীরতা ও তীক্ষèতা দান করেছে, তা রবীন্দ্রনাথকে বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। সরকারী নীতি নির্ধারণের সময় এই সত্যের গুরুত্বকে মর্যাদা দান করা অপরিহার্য।
এই বিবৃতিতে সাক্ষরকারী ছিলেন : ডঃ মুহম্মদ কুদরত-ই-খোদা, ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, জনাব জয়নুল আবেদীন, জনাব এম. এ. বারি, অধ্যাপক মুহম্মদ তাবদুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ডঃ খান সরওয়ার মুরশিদ, জনাব সিকান্দর আবু জাফর, জনাব মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডঃ আহমদ শরীফ, ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম, জনাব শামসুর রাহমান, জনাব হাসান হাফিজুর রহমান, জনাব ফজল শাহাবুদ্দীন, ডঃ আনিসুজ্জামান, জনাব রফিকুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
১৮ জন বুদ্ধিজীবীর উক্ত বিবৃতিটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই খাজা শাহাবুদ্দীনের ঘোষণা ও সরকারী নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ ও শিক্ষিত জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভা হতে থাকে মিছিলও বের হয় ঢাকা শহরে। কিন্তু এসব খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি।
গোপন সরকারী নির্দেশে এই সব সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অতঃপর সরকারী নীতির সমর্থনে আরও দু’টি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল এবং জাতীয় পরিষদে এ-ব্যাপারে আরও অনেক আলোচনা হয়েছিল।
১৯৬৭ সালের ২৯শে জুনের দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পৃষ্ঠায় দুটি বিবৃতিই পাশাপাশি ছাপা হয়েছিল। বিবৃতির শিরোনাম ছিল “১৮ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি-বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক কর্তৃক মতানৈক্য প্রকাশ”। এতে বলা হয় : সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে কতিপয় ব্যক্তির বিবৃতিতে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি এবং এই বিবৃতি পাকিস্তানবিরোধী প্রচারে ব্যবহৃত হতে পারে। বিবৃতির ভাষায় এই ধারণা জন্মে যে, স্বাক্ষরকারীরা বাংলাভাষী পাকিস্তানী ও বাংলাভাষী ভারতীয়দের সংস্কৃতির মধ্যে সত্যিকারের কোন পার্থক্য রয়েছে বলে স্বীকার করেন না। বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি সম্পর্কে এই ধারণার সাথে আমরা একমত নই বলেই এই বিবৃতি দিচ্ছি।
বিবৃতির সঙ্গে বিবৃতির স্বাক্ষরকারী হিসেবে দৈনিক পাকিস্তানে যাদের নাম প্রকাশিত হয় তাঁরা হলেন ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীর অধ্যক্ষ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টির ডীন জনাব এম শাহাবুদ্দীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রীডার জনাব মোহাম্মদ মোহর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংক বিভাগের রীডার জনাব এ. এফ. এম. আবদুর রহমান, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার জনাব কে. এম. এ. মুনিম।
এই বিবৃতিটির পাশেই আরেকটি বিবৃতি ছাপা হয়। তার শিরোনাম ছিল ‘৪০ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি-রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্পর্কে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি মারাত্মক'। এ বিবৃতিতে বলা হয় ঃ
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্পর্কে ঘোষিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী মহলের যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে : রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।' এই উক্তির প্রতিবাদ করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি এই কারণে যে, এই উক্তি স্বীকার করে নিলে পাকিস্তানী ও ভাতীয় সংস্কৃতি যে এক এবং অবিচ্ছেদ্য, এ-কথাই মেনে নেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ যে-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক তা হচ্ছে ভারতীয় সংস্কৃতি-যে সংস্কৃতির মূল কথা হলোঃ “শক হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন।’ এবং যে-সংস্কৃতি এই উপমহাদেশের মুসলমানদের অভিহিত করে ‘হিন্দু-মুসলমান’ বলে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম তার এক প্রবন্ধে এই উপমহাদেশের মুসলমানদের ‘হিন্দু-মুসলমান’ বলে অভিহিত করেন।
সংস্কৃতি সম্পর্কে এই যে ধারণা, এর সাথে পাকিস্তানী সাংস্কৃতিক ধারণার আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে এবং বলা যেতে পারে, একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত। যে তামদ্দুনিক স্বাতন্ত্রের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা, উপরোক্ত বিবৃতি মেনে নিলে সে ভিত্তিই অস্বীকৃত হয়। এই কারণে উপরোক্ত বিবৃতিকে আমরা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, অত্যন্ত মারাত্মক এবং পাকিস্তানের মূলনীতির বিরোধী বলেও মনে করি।
এই বিবৃতির সঙ্গে বিবৃতির স্বাক্ষরকারী হিসাবে যাদের নাম ছাপা হয় তারা হলেন, জনাব মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, জনাব আবুল মনসুর আহমদ, জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন, অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খা, বিচারপতি জনাব আবদুল মওদুদ, জনাব মুজীবর রহমান খাঁ, জনাব, মোহাম্মদ মোদাব্বের, কবি আহসান হাবীব, কবি ফররুখ আহমদ, ডঃ কাজী দীন মোহাম্মদ, ডঃ হাসান জামান, ডঃ গোলাম সাকলায়েন, ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, কবি বেনজির আহমদ, কবি মঈনুদ্দীন, অধ্যক্ষ শেখ শরফুদ্দীন, জনাব আ কা মু আদমউদ্দীন, কবি তালিম হোসেন, জনাব শাহেদ আলী, জনাব আ ন ম বজলুর রশীদ, জনাব মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, জনাব সানাউল্লাহ নূরী, কবি আবদুস সাত্তার, কাজী আবুল কাসেম (শিল্পী), জনাব মুফাখখারুল ইসলাম, জনাব শামসুল হক, জনাব ওসমান গনি, জনাব মফিজউদ্দীন আহমদ, আনিসুল হক চৌধুরী, জনাব মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ মতিউর রহমান, জনাব জহুরুল হক, জনাব ফারুক মাহমুদ, জনাব মোহাম্মদ নাসির আলী, জনাব এ কে এম নুরুল ইসলাম, কবি। জাহানারা আরজু, বেগম হোসনে আরা, বেগম মফরুহা চৌধুরী, কাজী আবদুল ওয়াদুদ ও জনাব আখতার-উল-আলম।
রাওয়ালপি-িতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের ঐ অধিবেশনে এবিষয়ে মূল বক্তা ছিলেন পরিষদে সরকারী দলের নেতা আবদুস সবুর খান। তার বক্তৃতায় শুধু রবীন্দ্র-প্রসঙ্গই আলোচিত হয়নি, নজরুল-ইকবালকে কি দৃষ্টিতে দেখতে হবে এবং পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদর্শ কি, সে বিষয়েও বক্তব্য ছিল।
সরকারী এই নীতির বিরুদ্ধে জনমত ও আন্দোলন এতই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে খাজা শাহাবুদ্দীন ৪ জুলাই সংসদে বলতে বাধ্য হন : রবীন্দ্র সংগীত সম্পর্কে সংবাদপত্রে তার মন্তব্য ভুলভাবে ছাপা হয়েছে। এভাবে তখন খান খাজা গোষ্ঠী পশ্চাদপসরণ করে মুখ রক্ষা করেন।
বাংলা ভাষায়, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী-নেতৃবৃন্দের জ্ঞানের বহর রীতি মতো উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে তাদের অজ্ঞতা ও মুর্খতা যে কত মারাত্মক ও লজ্জাজনক তার কোন সীমা নেই। তাদের এই মুর্খতা ও দীনতার কোন ক্ষমা নেই। এটা প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিরোধী প্রচারণার সময় তাদের বক্তব্য ও কথাবার্তায়। জাতীয় সংসদে বক্তৃতা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে সবুর খান বলেন : ‘একথা বলা হচ্ছে যে, ডঃ রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার প্রভুত উন্নতি সাধন করেছেন এবং তার কাব্য বিহনে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা এতিম হয়ে পড়েছেন। এই শ্রেণীর মুর্খদের গলাবাজির প্রতি আমার কোন সহানুভূতি নেই। এ রকম ¯্রফে লজ্জাজনক একটি ঘটনার নায়ক গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান। তার মুর্খতা ও কান্ডজ্ঞানের লাগামহীনতা দেখে এবং শোনে সরকার সমর্থক আত্মমর্যাদা বিক্রেতা বুদ্ধিজীবীদেরও মাথা হেট হয়ে গিয়েছিল। মোনায়েম খান গভর্নর হাউসে পাকিস্তানবাদী কবি সাহিত্যিকদের এক বৈঠকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের বলেন ঃ ‘কি করেন আপনারা, রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখতে পারেন না?
ষাটের দশকের পয়লা দিকে ১৯৬১ সালে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মের শত বার্ষিকীর বছর ছিল। এসময় সারা পৃথিবী ব্যাপী মহা সমারোহে রবীন্দ্র শত বার্ষিকী উদযাপন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে যাতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হৈ চৈ না হয়, শত বার্ষিকী উপলক্ষে যাতে এখানে কোন অনুষ্ঠান না হয় সে জন্য আইয়ুব শাহী আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। সরকার শত বার্ষিকী বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় শিক্ষিত ও সচেতন জনগণের মধ্যে প্রচ- ঘৃণা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে বিপুল উৎসাহ ও সমারোহের মধ্য দিয়ে শত বার্ষিকী অনুষ্ঠান উৎসব আকারে উদযাপন করা হয়।
বিশ্ব কবি’র জনা শত বার্ষিকী উৎসবের ঢেউ সিলেটেও এসে লাগে। সিলেটের বিদগ্ধজন এগিয়ে আসেন শত প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে। রবীন্দ্র চর্চার বিরোধী রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে সেদিন সিলেটে বসেছিল রবীন্দ্র সাহিত্যের মেলা। চারদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালা সিলেটকে মাতিয়ে রেখেছিল, তাতে উৎসবের আমেজ ছিল। সে অনুষ্ঠানাদি সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ করে রবীন্দ্র বিরোধীতার যুগে সিলেটবাসী তথা পূর্ব বাংলার জনগণকে শুধু সাহসই যুগায়নি, এক সাহসী ইতিহাসেরও সৃষ্টি করেছিল। আজিকার দিনের সাম্প্রদায়িক ভেদ নীতি ও পশ্চাদপদ মৌলবাদী শক্তির আস্ফা

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বৈশ্বিক গণতন্ত্র, ব্রেক্সিট এবং বাংলাদেশ!
  • বায়ুদূষণে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
  • আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • Developed by: Sparkle IT