বিশেষ সংখ্যা

সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ

বিপ্রদাস ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৯ ইং ০১:১৮:৩৮ | সংবাদটি ৩৩ বার পঠিত

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে খুব ভালবাসতেন। প্রকৃতির অপরূপ লিলামন্ডিত স্থান হলো শিলং। মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত শিলং। শিলং চিরকালই পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির এই সৌন্দর্যঘেরা পাহাড় পর্বত বেষ্টিত শিলং এ অবকাশ যাপন করতে বারবার ছুটে এসেছেন। শেষের কবিতা উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথ শিলং এ বসেই লেখা শুরু করেছিলেন। এক জায়গায় কবি লিখেছিলেন ‘সেই সময়েই তার জীবনটা অকস্মাৎ তার নিজের কাছে দেখা দিয়েছিল নানা রঙে, বাদলের পরদিনকার সকালবেলায় শিলং পাহাড়ের মত- সেদিন নিজের অস্তিত্বেও একটা মূল্য সে পেয়েছিল, সে কথাটি প্রকাশ না করে সে থাকবে কী করে’।
এভাবে উপন্যাসের বহুস্থানে শিলং এর বর্ণনা এসেছে। সিলেটের খুব কাছেই শিলং। প্রকৃতিগতভাবেই কিছু অন্তর্মিল রয়েছে সিলেটের সাথে। সিলেট অঞ্চলের বহু মানুষ শিলং এ স্থায়ী বসবাস করেন। যদিও খাসিয়া অধ্যুষিত মেঘালয় রাজ্য তদুপরি সিলেটের মানুষের যাতায়াত বহু প্রাচীন কাল থেকে এবং এরা সিলেটি ভাষায় কথাও বলে। একইভাবে খুব কম লোকের যাতায়াত ছিল কলকাতায়। সে সময়ে অনেক পন্ডিত গুণী ব্যক্তিরা রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে এসেছিলেন। সিলেট অঞ্চলে মানুষের সাথে কবিগুরুর একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। কবিগুরু সিলেট আগমনের বহু পূর্ব থেকেই এখানকার মানুষের সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি হয়।
রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস ছিল যশোর জেলায়। কয়েক পুরুষ আগে কুশারী বংশের পঞ্চানন কুশারী যশোরের পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে ১৬৯০ খ্রিষ্টীব্দে ভাগীরথী তীরে গোবিন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এ সময়ে সুতাপুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এ তিনটি গ্রাম নিয়ে কলকাতা শহরের পত্তন হয়। পঞ্চানন কুশারী তাঁর যাজন বৃত্তির জন্য ঠাকুর নামে পরিচিত হন এবং ক্রমে তা উপাধিতে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতিতে জানা যায় ছেলেবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের যশোর অঞ্চলে যাতায়াত ছিল। নদীয়া হয়ে যশোর ও ফরিদপুর জেলার মধ্য দিয়ে গোড়াই ও পদ্মা চলে গিয়েছে আর সেই নদী পথে রবীন্দ্রনাথ প্রায় এক যুগ ভ্রমণ করেছেন। শিলাইদহ, শাহাজাদপুর, পতিসর. কল্যাণপুর, হানিফের ঘাট, হাসিমপুর, মোমিনের দরগা, আউরিয়া, কুঠির হাট, ঘোষপুর, খোরশেদপুর, বাজিতপুর, কুমারখালি, বনগ্রাম, মুন্সিপাড়া আরো কত স্থানে রবীন্দ্রনাথের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তাঁর জীবন স্মৃতিতে জানা যায় প্রায় এক দশক এ সব অঞ্চলে কাটিয়েছেন আর সে সময়েই সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, ক্ষণিকা, কল্পনা, কথা, নৈবেদ্য, চিত্রাঙ্গদা, মালিনী, গান্ধারীর আবেদন, বিদায় অভিশাপ, কর্ণ কুন্তী সংবাদ, নরকবাস, সতী, লক্ষ্মীর পরীক্ষা, ছিন্নপত্রাবলী এবং আরো বিখ্যাত সব লেখা লিখেছেন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপন্ডিত ছিলেন হবিগঞ্জের পন্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে উপনিষদ পড়াতেন। বোলপুর যখন রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন সেখানে পন্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব আচার্য হিসেবে যোগ দিলেন। হবিগঞ্জের শশধর সিংহ কুলাউড়ার দেবেন্দ্র দত্ত মহাশয় ব্রহ্মচর্য স্কুলের ছাত্র ছিলেন। সিলেটের সুবিদবাজারে অবস্থিত অক্ষয় কুমার দস্তিদারের দুই সুযোগ্য পুত্র অনাদি কুমার দস্তিদার ও অবনী কুমার দস্তিদার ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে বোলপুর ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে অনাদি কুমার দস্তিদার কলকাতা সিটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রনে শান্তিনিকেতনে সঙ্গীতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে অনাদি কুমার দস্তিদারকে রবীন্দ্র সঙ্গীতাচার্য উপাধি প্রদান করা হয়। হবিগঞ্জের সাটিয়াজুড়ি নিবাসী উপেন্দ্র কুমার কর “গীতাঞ্জলি সমালোচনা প্রতিবাদ” শীর্ষক ক্ষুদ্র একটি বই রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কবিগুরু উপেন্দ্র কুমার কর কে প্রশংসা করে পত্র লিখেন, এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে কবিগুরুকে সিলেটে আসার আমন্ত্রন জানানো হয়। আমন্ত্রনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ব্রহ্ম সমাজ, সিলেট মহিলা সমিতি ও আঞ্জুমানে ইসলাম। সিলেট থেকে ডাউকি হয়ে শিলং যাওয়া খুবই কঠিন বিষয় ছিল। মধ্যখানে মানুষের কাঁধে চড়ে নালা খানা খন্দ পাড় হতে হতো। রবীন্দ্রনাথ এ সব শুনে রাজী হলেন না, অবশেষে ট্রেনে চেপে বদরপুর, করিমগঞ্জ, লাতু, শাহবাজপুর হয়ে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর কুলাউড়া এসে পৌছান। কুলাউড়া স্টেশনে রাত্রি যাপন করেন এবং ৫ নভেম্বর সিলেটে এসে পৌঁছান। ৫ থেকে ৭ নভেম্বর সিলেটে কবিগুরু অবস্থান করেন। সিলেটের মণিপুরী পল্লী মাছিমপুরে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবারের মতো মনিপুরী নৃত্য - রাস নৃত্য উপভোগ করেন। নৃত্য দেখে কবিগুরু আবেগ আপ্লুত হয়েছিলেন। মণিপুরী পোষাক, নৃত্যের তাল ছন্দ মাত্রা এবং মুদ্রাগুলো কবিগুরুর মনে রেখাপাত করেছিল। সিলেট টাউন হলে কবিগুরুকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বাঙালির সাধনা শীর্ষক দেড় ঘন্টা বক্তৃতা দেন কবিগুরু। পরে তিনি তা নিজেই অনুবাদ করে ঞড়ধিৎফং ঃযব ভঁঃঁৎব নাম দিয়ে মর্ডান রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। সিলেট এমসি কলেজে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এমসি কলেজে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্য আকাঙ্খা নামে পুস্তকে প্রকাশ করা হয়।
সৈয়দ মুজতবা আলী ১৪ বছরের একটি বালক রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখেন আকাঙ্খা উচ্চ করতে হলে কি করা প্রয়োজন? রবীন্দ্রনাথ সৈয়দ মুজতবা আলীকে পত্র মাধ্যমে উত্তর দিয়েছিলেন। এরপর গুরু শিষ্যের নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হলো। সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতন কলেজ পর্যায়ে প্রথম বিদেশী ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলেন। সিলেট অঞ্চল তখন আসামের সাথে যুক্ত ছিল। বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে বহুদূরে এর অবস্থান, কবিগুরু সিলেটের কথা ভেবেই লিখলেন “মমতা বিহীন কাল¯্রােতে/বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে/নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রী ভূমি-” এম সি কলেজ অনুষ্ঠান শেষে কবিগুরু চৌহাট্টায় সিংহবাড়ীতে কিছুক্ষণের জন্য আসেন। সেখানে সঙ্গীত নৃত্যের আয়োজন করা হয়। কবিগুরু নয়াসড়কে প্রাদ্রী বাংলায় রাত যাপন করেন। বন্দরবাজার ব্রহ্ম মন্দিরে ভাষণ দেন। চৌহাট্টার গোবিন্দ সিংহ কবিগুরুকে বাসায় আমন্ত্রন জানান, এটি একটি বিশেষ স্মৃতি বহন করে। সিলেট থেকে ফিরে গিয়েই রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে মণিপুরী নৃত্য বিভাগ চালু করেন। এরই আলোকে চিত্রাঙ্গদা, চ-ালিকা, মায়ার খেলা, নটীর পূজা, শাপমোচন নৃত্য নাট্যে মণিপুরী নৃত্যকে স্থান দিলেন, মণিপুরী নৃত্যকে বিশ্ব পরিমন্ডলে তুলে ধরলেন রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরু শান্তি নিকেতনে মণিপুরী শিক্ষকের প্রয়োজন অনুভব করলেন। তখন সিলেট ও মণিপুর রাজ্য থেকে নৃত্য, মৃদঙ্গ শিক্ষক ও বয়ন শিল্পী শান্তি নিকেতনে হাজির করা হলো। শিক্ষদের মধ্যে ছিলেন বুদ্ধিমত সিংহ ও তার পতœী, রাজকুমার সিংহ, নীলেম্বর মূখার্জী প্রমুখ। সিলেটের কৃতি সন্তান ক্ষিতিশ চন্দ্র চৌধুরী কিছু দিন বিশ্ব ভারতীতে ভাইস চেন্সেলর পদ অলংকৃত করেছিলেন।
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ সিলেট ভ্রমণ শেষে সিলেটের বহু গুণী পন্ডিত ব্যক্তিদের সাথে পত্র যোগাযোগ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈয়দ মুজতবা আলীকে লেখা পত্র ২৯ কার্তিক ১৩২৬,সতীশ চন্দ্র রায় কে লেখা পত্র ১৯২২খ্রিঃ, লীলানাগকে লেখাপত্র ১৯৩৮ খ্রিঃ, জগদিশ ভট্টাচার্য্যকে লেখা পত্র ১৯৪০ খ্রিঃ, রেবা রায়কে লেখাপত্র ১৯২৭ খ্রিঃ, মোহাম্মদ সিকন্দর আলীকে লেখা পত্র ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ, গুরু সদয় দত্তকে লেখা পত্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ ইত্যাদি। জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ছয় হাজারের বেশী পত্র লিখেছেন তার জীবদ্দশায়। সিলেটের অন্যতম লোক কবি হাছন রাজার সাথে কবিগুরুর সখ্যতা উল্লেখ্যযোগ্য। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় মহাসভার অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন হাছন রাজার কথা। “মম আখি হইতে পয়দা আসমান জমিন ও রূপ দেখিলাম রে নয়নে, আপনার রূপ দেখিলাম রে”- হাসনের এই দুটি গান উদ্ধৃত করে কবিগুরু বলেন “পূর্ববঙ্গের একজন গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই”। কবিগুরু হাছনের দর্শন চিন্তার পরিচয় দেন। রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিবার্ট লেকচারে জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ শীর্ষক যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তাতেও হাছনের উল্লেখ মেলে। সুধী সমাজে হাছনের নাম ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ও উদ্যোগ স্মরণীয়। সিলেট সফরের পরে প্রকাশিত দুটি লেখায় সিলেটের উল্লেখ পাওয়া যায়। যোগাযোগ উপন্যাসে- ইটের পাঁজা পোড়ালে বিস্তর, নেপাল থেকে এল বড় বড় শালকাঠ, সিলেট থেকে চুন, কলকাতা থেকে মালগাড়ী বোঝাই করোগেটেড লোহা”। শেষের কবিতার উপন্যাস- “তাই ও যখন ভাবছে, পালাই পাহাড় বেয়ে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে সিলেট-শিলচরের ভিতর দিয়ে যেখানে খুশি এমন সময়ে আষাঢ় এল পাহাড়ে পাহাড়ে বনে বনে তার সজল ঘনছায়ার চাঁদর লুটিয়ে”। রবীন্দ্রনাথ সিলেটকে ভালবেসেছিলেন। সিলেটের মানুষের সাথেও যোগাযোগ রেখেছিলেন এটা আমাদের গৌরবের বিষয়। আজ শতবর্ষ পরে রবীন্দ্র স্মরণোৎসবে আমরা আবার কবিগুরুকে স্মরণ করবো।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ
  • দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ
  • রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের হাতে ১২শ’ টাকার চেক দিয়েছিলেন এক সিলেটি
  • বাঙালির শোক ও বেদনার দিন
  • ইতিহাসের চোখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড
  • দাবায়ে রাখতে পারবা না
  • কুরবানি : ইতিহাসের আলোকে
  • রক্তিম সূর্য
  • খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা
  • কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা
  • সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই আমাদের দৃঢ় অবস্থান
  • আমার লেখকস্বত্তার অংশীদার
  • এই জনপদে ঐতিহ্যের ধারক সিলেটের ডাক
  • প্রিয় কাগজ, সাহসী কাগজ
  • পাঠকের প্রিয় সিলেটের ডাক
  • পাঠকনন্দিত সিলেটের ডাক
  • সিলেটের ডাকের তিন যুগ
  • সিলেটের ডাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে
  • সিলেটের ডাক : আলোর দিশারী
  • Developed by: Sparkle IT