উপ সম্পাদকীয়

হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী

মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৯:৪৮ | সংবাদটি ৩২৪ বার পঠিত

জীবন মৃত্যু এক অনিবার্য্য সত্য। মানব জীবন ক্ষণকালের তবে ক্ষণজীবন সুকীর্তি থাকলে তা হয়ে উঠে ফুলের মতো মহৎ। সৃষ্টির কীর্তিতে যুগ যুগ ধরে মানুষ বেঁচে মানুষের মাঝে। যদি জীবনকে সদ্ব্যবহার করা যায় তবে তা সুদীর্ঘকাল দুনিয়ায় আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। এমনি এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সিলেটের কৃতি সন্তান হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী। তিনি সিলেট সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। অত্যন্ত সৌম্য, শান্ত, নিরীহ প্রকৃতির ভদ্রলোক ছিলেন। আলাপ-আলোচনা, পোষাক পরিচ্ছেদে আভিজাত্যের ছাপ ছিল। সমাজ থেকে তিনি শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা, সুনাম, খ্যাতি, যশ কুঁড়িয়েছেন। তিনি ১৯০৯ সালে ২রা অক্টোবর বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুর এলাকার সুলতানপুর গ্রামের এক স¤্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম জিল্লল হক চৌধুরী। শিক্ষা জীবনে বশিরুল হক চৌধুরী খুবই মেধাবী ছিলেন। গ্রামের পাঠশালায় ৫ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলীম ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। টাইটেল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত পাস করলে আসাম সরকার কর্তৃক ‘প্রফুল্ল চন্দ্র স্কলারশীপ’ লাভ করেন। ফলে ইউনানী মেডিকেল সায়েন্সে ডিগ্রি করার জন্য ভারতের দিল্লী তিব্বিয়া কলেজে তাঁকে ডেপুটেশনে প্রেরণ করা হয়। হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী ১৯৩৯ সালে ফাজিল-ই-তিব্বে-ওয়াল জাহারাত (ঋ.ঞ.ঔ) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। এফ.টি.জে ডিগ্রি তৎকালীন সময়ে ইউনানী আয়ুর্বেদিক মেডিসিন ও সার্জারীতে সর্বোচ্চ ডিগ্রি। তিনিই প্রথম ব্যক্তি আসাম প্রদেশ কিংবা এ অঞ্চলের বাঙালি হিসেবে উক্ত পরীক্ষায় গোল্ড মেডেল লাভ করেন। এছাড়া, এ পরীক্ষায় সার্জারী, প্যাথলজী ও মেডিসিনে ৮০% মার্কস পেয়ে রেকর্ড করেন। এ ফলাফলের জন্য দিল্লি তিব্বিয়া কলেজ হাসপাতালে এক বৎসরের জন্য আবাসিক ফিজিশিয়ান হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। হাকীম বশিরুল হক চৌধুরী সেই ব্যক্তি যাকে হাসপাতালের বহি:বিভাগ ও আন্ত:বিভাগ এককভাবে রোগীকে চিকিৎসা প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়। চিকিৎসায় অসামান্য পারদর্শিতায় ১৯৪২ সালে তাঁকে পোষ্ট গ্রাজুয়েট স্কলার ঘোষণা করা হয় এবং কিছু সময়ের জন্য তাঁকে দিল্লী তিব্বিয়া কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়।
কর্মজীবনে হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং সততার পরিচয় দেন। তিনি ১৯৪৫ সালে কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা যোগদানপত্র ছাড়াই টেলিগ্রাফের মাধ্যমে সিলেট সরকারি তিব্বিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বৎসর প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পাশাপাশি কলেজের কার্য নির্বাহক (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) এর দায়িত্ব পালন করেন। ২৮.১০.১৯৭৮ ইংরেজি তারিখে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি সিলেট তিব্বিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সরকারি তিব্বিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে সিলেটের এই কৃতি সন্তান হাকীম বশিরুল হক চৌধুরীর ইউনানী চিকিৎসায় যশ, খ্যাতি, শ্রমঘাম জড়িত। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন অখন্ড ভারতের মন্ত্রী সাদ উল্লাহ’র এক আতœীয় জঠিল রোগে আক্রান্ত হলে বহু চিকিৎসার পর রোগী ভালো হয়নি। সে সময় বশিরুল হক চৌধুরী এক ভাই আসামের শিলং সচিবালয়েল চাকুরী করতেন। মন্ত্রীর আতœীয় দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ শুনে তিনি পরামর্শ দেন যে, হাকীম বশিরুল হক চৌধুরীর কাছে চিকিৎসা করাতে। তাতে মন্ত্রী সাদ উল্লাহ’র রাজি হন এবং রোগীকে হাকিম সাহেবের নিকট নিয়ে আসেন। তিনি রোগীকে নিয়মিত ইউনানী চিকিৎসা দেন। তাতে রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। মন্ত্রী সাদ উল্লাহ’র এই আতœীয় দ্রুত সুস্থ হওয়াতে তিনি হাকিম বশিরুল হক চৌধুরীর ও ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি হাকিম বশিরুল হক চৌধুরীকে বলেন, আপনাকে আমি কি দিতে পারি, কি দিয়ে খুশি করি। তদুত্তরে হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী বলেন, আমাকে আপনার কিছু দেওয়া লাগবে না, কিছুই করা লাগবে না, আমি খুশি হব যদি আপনি আসাম প্রদেশে একটি সরকারি ইউনানী মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেন।
তৎকালীন সময়ে সিলেট জেলা আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। (১৯৪৭ সালে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়) তাঁর এ কথা শুনে মন্ত্রী সাদ উল্লাহ’র আশ্বাস প্রদান করেন। তড়িগড়ি করে মন্ত্রী থাকাকালীন অবস্থায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার একটি কক্ষে হাকীম বশিরুল হক চৌধুরী কে কার্যনির্বাহক (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) করে কলেজ কার্যক্রম চালু করেন। সিলেট সরকারি তিব্বিয়া কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস লিখতে গেলেই যে ব্যক্তির নাম স্বর্ণক্ষরে লিখা থাকবে তিনি হলেন এ কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী। তাঁরই অবদার চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তাঁর নামে নামকরণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।
হাকিম বশিরুল হক চৌধুরী পেশাগত জীবনে বিভিন্ন সম্মাননা ও কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৯৬৮-১৯৭১ সাল পর্যন্ত বোর্ড অব ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেমস অব পাকিস্তানের সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বোর্ড অব ইউনানী এন্ড আয়ুর্বেদিক সিস্টেমস অব মেডিসিন এর ১ম চেয়ারম্যান হন এবং দীর্ঘ কয়েক বৎসর এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের অধীনে ‘লিউকোর্ডামা’ (শ্বেত রোগী) রিসার্চ প্রোগ্রামে প্রধান তদন্তকারীর (ঈযবভ ওহাবংঃরমধঃড়ৎ) হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘এক্সপার্ট এডভাইজারী’ প্যানেলে সদস্য ও রিসার্চ ফেলো হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য যোগদান করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী হাকিম বশিরুল হক চৌধুরীর ৬ পুত্র ও ২ কন্যার জনক। তাঁরই প্রথম পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ইনামুল হক চৌধুরী বীর প্রতীক। তিনি ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে দু’বার আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে সিলেট-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য (গবসনবৎ ড়ভ চধৎষরধসবহঃ) নির্বাচিত হন। তাঁরই অনুজ ইকরামুল হক চৌধুরী, তিনি টেক্সটাইল বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে অফিসার ছিলেন। ইফজালুল হক চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একজন এনজিও সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ইজাজুল হক চৌধুরী, তিনি চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যবসার সাথে জড়িত। ইসরারুল হক চৌধুরী রাশিয়ার মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। তিনি বৃটেনে ব্যবসার সাথে জড়িত। ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী (দুলাল)। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-মহা ব্যবস্থাপক ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব। সিলেটের এ কৃত্তি সন্তান হাকিম বশিরুল হক চৌধুরীর অমায়িক, পরহেজগার ও প্রচার বিমুখ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন। মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন-আমিন।
লেখক : আইনজীবী

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT