ধর্ম ও জীবন

মহানবীর প্রতি ভালোবাসা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১১-২০১৯ ইং ০১:২০:৫০ | সংবাদটি ১৩৩ বার পঠিত

মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘হে নবী! আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন’। (সূরা : আল ইমরান, আয়াত : ৩১)
আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে সর্বপ্রথম নবীকে ভালোবাসতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হলে সর্বপ্রথম নবীজির সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। নবীর প্রতি মহব্বত-আল্লাহ প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। নবী (সা.) এর প্রতি মহব্বত বা সর্বোচ্চ ভালোবাসা ব্যতিরেকে কেউ কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে না, কেউ কখনও মুমিন হতে পারবে না। হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন ‘তোমাদের কেউ ততোক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না। যতোক্ষণ পর্যন্ত না তা তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও দুনিয়ার সবকিছু হতে আমি তার নিকট সবচেয়ে প্রিয় না হই’। (মুসলিম)
রাসুলে পাক (সা.) হচ্ছেনÑ আমাদের মূল ঈমান। জনৈক কবি বলেছেনÑ ‘এ শকে মাহবুবে খোদা জিস দিলমে হাসিল নেহি। লাকো মুমিন হো মগর ঈমান মে কামিল নেহি’। অর্থাৎ, নবী (সা.) এর প্রতি মহব্বত যার মধ্যে নেই সে যতোই মুমিন দাবী করুক না কেন সে কখনও মুমিন হতে পারবে না। যাদের অন্তরে রাসুল (সা.) এর ভালোবাসা রয়েছে, বা যারাই রাসুল (সা.) এর পাদস্পর্শ পেয়েছে তারা ইহ-পরকালে সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন হয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবনী তাঁর জ্বলন্ত প্রমাণ। রাসুল (সা.) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের গভীর ভালোবাসাও ঈমান ছিলো বলে ইতিহাসের সর্বাধিক ঘৃণিত জাহেলী যুগেও সাহাবায়ে কেরামগণ সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। মিসওয়ার ইবনে মাখরামাহ (রা.) ও মারওয়া (রা.) বর্ণিত হাদিসে আছেÑ রাসুলে পাক (সা.) যখন থুথু নিক্ষেপ করতেন তখন সেই থুথু মোবারক সাহাবায়ে কেরামের কারো না কারো হাতে পড়তো। অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামগণ ওঁত পেতে থাকতেন সেই প্রাণের নবীর পবিত্র থুথু মোবারক হাত পেতে লওয়ার জন্য। যখনই রাসুল (সা.) থুথু মোবারক নিক্ষেপ করতেন তখনই সাহাবায়ে কেরামগণ কাড়াকাড়ি করে হাতে নিয়ে তাদের চেহারা এবং শরীরের অন্যান্য স্থানে মালিশ করে নিতেন। সাহাবায়ে কেরামগণ রাসুলে পাক (সা.) এর থুথু মোবারককে তাবাররুক হিসেবে গ্রহণ করে তা তাদের শরীরে মেখে নিতেন। রাসুল (সা.) যখন অজু করতেন তখন তাঁর অজুতে ব্যবহৃত পানি নেয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে রীতিমতো বিবাদ-বিসম্বাদ লেগে যেতো। (বুখারি, আহমদ)
হযরত জায়েদ বিন হারিসা (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.) এর পালক পুত্র। জায়েদের পিতা জায়েদকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে রাসুল (সা.) সম্মতি জ্ঞাপন করেন। কিন্তু হযরত জায়েদ (রা.) কিছুতেই রাজি হলেন না। তিনি বললেনÑ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমার নিকট আমার মাতা-পিতার চেয়েও অধিক প্রিয়। আমি আমার পিতার নিকট কখনও যাবো না।
হযরত খুবাইব ইবনে আদী (রা.) কে শূলিতে নিক্ষেপ করে চল্লিশ জন কাফির বল্লম হাতে নিয়ে তাকে আঘাত করতে করতে বললোÑ হে খুবাইব! তুমি কি এটা পছন্দ করো যে, তোমাকে রেহাই দিয়ে তোমার নবীকে হত্যা করবো? হযরত খুবাইব (রা.) এই অন্তিম মুহূর্তে বজ্রকণ্ঠে বললেনÑ ‘হে নরপশুরা! আমার প্রাণ যায় যাক, আমার প্রাণ থাকতে আমার প্রাণের নবীর পবিত্র দেহে কাউকে একটি কাঁটা বিদ্ধ করতে দেবো না।’ খুবাইব (রা.) দোয়া করলেনÑ হে আল্লাহ! নবীজির দরবারে আমার বিদায় বেলার সালাম পৌঁছিয়ে দিন। মদিনায় বসে নবী (সা.) হযরত খুবাইব (রা.) এর সালামের জবাব দিয়ে তাঁর সাথীদেরকে বললেনÑ ‘কাফিররা খুবাইবকে শহীদ করে দিয়েছে।’ নবী (সা.) মদিনায় হিজরত করবেন। ছয় মাস মতান্তরে সাত মাস পূর্বে তিনি হযরত আবু বকর (রা.) কে বললেনÑ হে আবু বকর! আল্লাহর নির্দেশে আমি মদিনায় হিজরত করবো, তুমি আমার সাথে থাকতে হবে। হিজরত করার সময় রাতে নবী (সা.) হযরত আবু বকরের (রা.) ঘরের দরজার কড়া নাড়তেই আবু বকর (রা.) অতি দ্রুত দরজা খুলে দিলেন। নবী (সা.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ হে আবু বকর! আমি দরজার কড়াটি নাড়ানোর সাথেই তুমি দরজা খুললে কিভাবে? তুমি কি রাতে ঘুমাও নাই? হযরত আবু বকর (রা.) জবাবে বললেন ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যেদিন আমাকে হিজরত করার কথা বলেছিলেন সেদিন থেকে আমি এক রাতও ঘুমাই নাই, আমি প্রতিরাতে দরজায় কান লাগিয়ে জেগে থাকতাম আমার ভয় হচ্ছিলোÑ যদি আমি ঘুমিয়ে যাই আর নবীজি আমাকে ডাক দেন আমি তার ডাকে সাড়া দেইনা, তাহলে নবী (সা.) এর কষ্ট হবে। আর নবীজির কষ্ট হলে আমি কখনও আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে পারবো না’। একবার সহাবায়ে কেরামগণের মধ্যে কার নিকট কোন জিনিষ বেশি প্রিয় সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন দুনিয়ার মধ্যে আমার নিকট তিনটি জিনিষ সবচেয়ে প্রিয়Ñ নবী (সা.) এর প্রতি সর্বদা দৃষ্টিপাত করা, নবী (সা.) এর সন্তুষ্টির জন্যই সম্পদ ব্যয় করা, নবী (সা.) এর সাথে আত্মীয়তা সম্পর্ক থাকা। রাসুলে পাক (সা.) স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মিরাজ গমন করেন। এই মিরাজের ঘটনাটি সর্বপ্রথম হযরত আবু বকর (রা.) বিশ্বাস করলে নবী (সা.) তাকে ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। রাসুল (সা.) এর গভীর মহব্বত ও ঈমান থাকায় হযরত আবু বকর (রা:) এত সুমহান মর্যাদা লাভ করেন যার মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ নবী রাসুলগণের পরে সর্বোত্তম মানব হলেনÑ আবু বকর, তামাম উম্মতে মোহাম্মদীর ঈমান একত্র করা হলেও আবু বকরের ঈমানের সমান হবে না। এক ইহুদী ও এক মুনাফিক একটি বিষয়ে নবী (সা.) এর দরবারে বিচারপ্রার্থী হলেন। ইহুদী ন্যায় থাকায় নবীজি ইহুদীর পক্ষেই রায় দেন। কিন্তু মুনাফিক সে বিচার মেনে না নিয়ে সে আবার হযরত ওমর (রা.) এর নিকট বিচারপ্রার্থী হলো। হযরত ওমর (রা.) সবকিছু শুনে বললেনÑ ‘আমি ঘর থেকে আসি’। এই বলে তিনি ঘর থেকে তলোয়ার এনে সেই তলোয়ার দিয়ে ঐ মুনাফিকের মাথা দিখন্ডিত করে দিলেন। আর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন আমার নবী কখনও কারো প্রতি অবিচার করতে পারেন না। তাঁর বিচার সর্বজনীন। তিনি সর্বদা ন্যায় বিচারই করে থাকেন। হযরত ওমর (রা.) কর্তৃক সেই মুনাফিক হত্যার সংবাদ নবীজির দরবারে পৌঁছলে নবী (সা.) বললেনÑ ‘ওমরের তলোয়ার কোনো মুমিনের ঘাড়ে আঘাত করতে পারে না’। হযরত ওমরের বিচারকে সমর্থন করেই আল্লাহপাক নাযিল করলেনÑ ‘তারা যতোক্ষণ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে আপনার দেয়া ফয়সালাকে সর্বান্তঃকরণে মেনে না নেবে ততোক্ষণ পর্যন্ত তারা কেউ মুমিন হতে পারবে না’। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৫)
রাসুল (সা.) এর প্রতি ওমরের অগাধ বিশ্বাস ও মহব্বত তাঁকে এতোই মর্যাদাবান করে যে, হযরত ওমর এর সিদ্ধান্ত অনুসারেই আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনের বেশ কয়টি আয়াত নাজিল করেছিলেন। হযরত ইমাম আবু ইউসুফ হাদিস পাঠদানকালে বললেনÑ ‘নবীজি কদু অত্যন্ত পছন্দ করতেন’। একজন ছাত্র বিষয়টিকে তুচ্ছ মনে করে বললোÑ ‘একজন নবী হয়ে আবার তিনি কদুকে পছন্দ করতেন?’ এ কথা শুনে হযরত আবু ইউসুফ (র.) অগ্নিশর্মা হয়ে বললেনÑ নবী (সা.) যা পছন্দ করেন, তাকে তুমি তুচ্ছ মনে করছো? নবীজির এমন শত্রুকে আমি আজ অবশ্যই হত্যা করবো। এই বলে তিনি তাঁর ছাত্রকে হত্যা করে ফেললেন। সকল ফতোয়াবিদগণ এ কথায় একমত যে, যদি কেউ নবীজির সমালোচনা করে বা তাঁর কোনো সুন্নতকে খাটো করে বা তাঁকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তবে নবীজির সেই শত্রুকে মৃত্যুদ- দেয়া ওয়াজিব। ‘আল আশবাহ ওয়ান নাজাইর’ নামক কিতাবে আছেÑ ‘যদি আল্লাহকে কেউ গালি দেয় তবে সে কাফির হবে আবার কালিমা পাঠ করে মুসলমান হবে কিন্তু নবী (সা.) কে যদি কেউ গালি দেয় বা তাঁকে তুচ্ছ করে তবে সারা জীবন সে কালিমা পড়লেও মুসলমান হতে পারবে না’।
রাসুলে পাক (সা.) এর প্রতি কিভাবে ঈমান আনলে প্রকৃত ঈমান আনা হবে এবং তাঁকে কিভাবে মহব্বত করলে প্রকৃত মহব্বত হবে তার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা (সাহাবীগণ) যেরূপ ঈমান এনেছো সেরূপ ঈমান যদি তারা (মানুষ) আনয়ন করে তবেই তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে’। (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৩৭)
এক অন্ধ সাহাবী রাসুল (সা.) এর দরবারে এসে তাঁর অন্ধত্ব দূর হবার জন্য দোয়া চাইলো। রাসুল (সা.) বললেনÑ তুমি ধৈর্য্য ধারণ করো, তুমি তো এমনিই জান্নাত লাভ করবে। ঐ অন্ধ সাহাবী আরজ করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার অন্ধত্ব দূর হলে আমার চোখ দিয়ে আপনার নূরানী চেহারা মোবারক দেখবো এজন্য আমি এ আরজ করছি। আর আপনার নূরানী চেহারা মোবারক একবার দেখলেই তো আমি জান্নাত পেয়ে যাবো। রাসুল (সা.) তাকে দু’রাকাত নামাজ পড়ে এই দোয়া পড়ার নির্দেশ দিলেনÑ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকা ওয়া আতাওয়াজ্জাহু ইলাইকা বিনাবিয়্যিকা নাবিয়্যির রাহমাহ। ইয়া মুহাম্মদ! ইন্নি আতাওয়াজ্জাহু বিকা ইলা রাব্বি ফি হাজাতি হাজিহি লিতুক্বদ্বালি আল্লাহুম্মা ফাশাফফি’হু ফিয়্যা’ এই দোয়া পাঠ করার সাথে সাথেই তাঁর অন্ধত্ব চিরতরে দূর হয়ে গেলো এবং প্রাণ ভরে দেখে নিলো নবীজির নূরানী চেহারা মোবারক। যেকোনো নেক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য উক্ত দোয়া পাঠে উদ্দেশ্য সফল হয়Ñ ইহা পরীক্ষিত। (নাসায়ী, তিরমীজি, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)
রাসুল (সা.) এর ওফাতের খবর শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ আনসারী (রা.) অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে অন্ধ হয়ে যাবার জন্য দোয়া করলে আল্লাহপাক তাকে অন্ধ করে দেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোÑ আপনি অন্ধ হওয়ার জন্য দোয়া করলেন কেন? তিনি জবাবে বললেনÑ ‘দৃষ্টির আনন্দ চোখের মধ্যেই। রাসুলে পাক (সা.) এর পর এখন আমার চোখ কাউকে দেখার রুচি রাখে না’। রাসুলে পাক (সা.) এর পবিত্র পায়খানা-প্রশ্রাব মোবারক থেকে সুগন্ধি বের হতো। একদিন উম্মে আয়মন (রা.) তাঁর প্রশ্রাব মোবারক পান করে ফেলেন। রাসুল (সা.) এ খবর শুনে বললেনÑ যার পেটে আমার পবিত্র প্রশ্রাব ঢুকেছে তার জন্য দোযখ হারাম হয়ে গেছে। ওহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.) এর দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছে শুনে ওয়ায়েস করণী একে একে বত্রিশটি দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। নবী প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত সম্বলিত ঘটনাবলী লিখতে হলে হাজার হাজার গ্রন্থ রচনা করতে হবে। ইসলামের চরম শত্রু কট্টর কাফির আবু লাহাব মারা যাবার পর হযরত আব্বাস (রা.) এক রাতে আবু লাহাবকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেনÑ হে আবু লাহাব! তোমার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়েছে? আবু লাহাব জবাবে বললোÑ দুনিয়া থেকে আসার পর আমার সাথে কোনো ভালো ব্যবহার করা হয়নি, তবে আমার দাসী সুয়াইবিয়া আমার ভাতিজা মুহাম্মদের জন্ম সংবাদ দিলে আমি খুশি হয়ে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে সুয়াইবিয়াকে মুক্তি দিয়েছিলাম। এ কারণেই আমাকে প্রতি সোমবারে কিছু পানীয় আমার আঙ্গুলে দেয়া হয়Ñযা পান করে পুরো সপ্তাহ আমি শান্তি পেয়ে থাকি। (বুখারি শরিফ, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৭৬৪)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT