ধর্ম ও জীবন সৈয়দ জয়নুল শামস

রাসূল (সা.) এর প্রতি মুহব্বত ও আহলে বাইত প্রসঙ্গ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১১-২০১৯ ইং ০১:৩৩:০৩ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

একজন ব্যক্তি মুসলমান কিনা এবং হলে কী পরিমাণ কতখানি মুসলমান তার নির্ভুল কষ্টিপাথর হলো আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) ও তার দ্বীনের প্রতি ওই ব্যক্তির মুহব্বত কতটা গভীর, কতটা নিরঙ্কুশ।
মহানবী (সা.) দুনিয়ায় এসেছিলেন মানুষকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে, মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে, তার জীবনই একমাত্র আদর্শ জীবন, যাকে অনুসরণ করা যায়। রাসূল (সা.) হচ্ছেন ‘হাবিবুল্লাহ’ অর্থ-মাহবুবুল্লাহ তথা আল্লাহর প্রিয়। কোরআনে আছে: আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর প্রতি রহমতের তরে দোয়া কর এবং তার প্রতি সালাম প্রেরণ কর। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, মুহাম্মদ (সা.)কে অনুসরণ করা ফরয। আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেন “রাসূল (সা.) তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।
আল কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মহান চরিত্রের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ'র মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। কুরআনে আছে, “তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু'মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচারভার তোমার ওপর অর্পন না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়”। আল্লাহ তা'আলা রাসূল (সা.) কে পাঠানোর উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন: “নিশ্চিতভাবেই আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা এবং অজ্ঞদের জন্য রক্ষাকবচ । সরলতা ছিল তাঁর অন্যতম গুণ। তাঁর সাথে যত সহজে মেশা যেত বা যত সহজে কথা বলা যেত তেমন আর কারো সাথে পারা যেত না। জনৈক সাহাবী (রা:) বলেন “রাসূলুল্লাহ (সা.) সহজ-সরল লোক ছিলেন।” ইব্রাহীম ইবন মুহাম্মদ (যিনি আলী (রা.) এর বংশধর) বলেন, আলী ইবন আবি তালিব (রা.) যখন নবী (সা.) এর সুন্দরতম গুণাবলী বর্ণনা করতেন, তখন বলতেন যে, তিনি সবচেয়ে উদারহস্ত, সবচেয়ে সাহসী হৃদয়, সবচেয়ে সত্যভাষী, সবচেয়ে ওয়াদা পালনকারী, সবচেয়ে নম্র-স্বভাব এবং সবচেয়ে ভদ্র জীবন যাপনকারী ছিলেন। যে ব্যক্তি তার সাহচর্য লাভ করতে ও তাঁর অতুলনীয় স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো, সে তাকে অপরিসীম ভালবাসতে শুরু করতো। আমি তার পূর্বে কখনো তাঁর মতো (সবগুণে গুণান্বিত) মানুষ দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি। মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) যখন কাবা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন তখন ফুজালে ইবনে উমাইব তাকে হত্যার সংকল্প করে হত্যার উদ্দেশ্যে যখন মহানবী (সা.) এর নিকটবর্তী হয় তখন মহানবী (সা.) তাকে বললেন, কী ফুজালা নাকি? “জী হা” “ইয়া রাসুলুল্লাহ' তিনি বললেন, মনে মনে কি ভাবছিলেন? সে বলল, 'কিছুই না' 'আমি আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম'। মহানবী (সঃ) বললেন, 'আল্লাহর কাছে তওবা করো। তারপর মহানবী (সঃ) ফুজালার বুকের ওপর হাত রাখলেন। এর ফলে ফুজালার হৃদয় মনে প্রশান্তি আসে। পরবর্তী সময়ে ফুজালা বলত, ‘মহানবী যে মুহূর্তে আমার বুকের ওপর হাত উঠিয়ে নিলেন তখন থেকে দুনিয়ার আর কোনও কিছুই আমার কাছে তার চেয়ে প্রিয় মনে হয় না।’
নবীজি দয়া দাক্ষিণ্যের নতুন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, 'প্রত্যেক শুভ কাজই দয়া-দাক্ষিণ্যের সমতুল্য' তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসাটাও একই পর্যায়ে পড়ে। তোমার সহপাঠীদের ভালো কাজ করতে বলা দয়া দাক্ষিণ্যের সমতুল্য। পথভ্রষ্ট পথিককে ঠিক পথ দেখানো দয়া দাক্ষিণ্যের পর্যায়ে পড়ে। অন্ধ লোককে সাহায্য করা একই সওয়াবের কাজ। রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ইট, পাথর বা কাঁটা অপসারণ করাও দয়া দাক্ষিণ্যের মধ্যে পড়ে। তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানোও একই শুভ কাজের অন্তর্গত। (সূত্র: দি স্পিরিটি অভ ইসলাম)
ইমাম বুখারী (র.) বর্ণনা করেন যে, একবার এক শোকাবহ মিছিল যাচ্ছিল, রসূল (সা.) শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য দাড়ালেন। তার সঙ্গিরাও তাঁকে অনুসরণ করলেন। কিন্তু পরে তারা বলেন এটা তো একটা ইহুদির শোক মিছিল। এতে রসুল (সা.) উত্তর দেন, এটা কি একটি আত্মা নয়? কোনও শোক মিছিল দেখলেই তোমরা উঠে দাঁড়াবে।'
ভাল মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানতে হলে মানুষকে অবশ্যই রাসূল (সা.) এর জীবন অনুসরণ করতে হবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে ভাল মানুষ, সর্বাধিক সাহসী এবং সর্বোচ্চ দয়া দাক্ষিণ্যের অধিকারী। নবী মুহাম্মদ (সা.) এত বেশী দান করতেন যে, তিনি কাউকে কখনো ফিরিয়ে দেননি। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী (সা.) এর নিকট কোন বস্তু প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তিনি নিষেধ করেছেন এরূপ কখনো হয়নি। উপরের হাদিস থেকে বুঝা যায়, প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা ও অভাবগ্রস্থের অভাবপূরণ করা ছিল নবী (সা.) এবং প্রকৃতি ও স্বভারের অন্তর্গত। তিনি কাউকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেননি। কখনো মুখে 'না' শব্দ উচ্চারণ করেননি। জনৈক আরব কবি এখানে উল্লেখ করেছেন, কালিমা শাহাদত ছাড়া তিনি কখনো ‘লা' (না) বলেননি। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকেও উপবাস যাপন করেছেন একজন সাহাবী (রা:) বলেন, 'আল্লাহর নবী (সা:) একাধারে তিনদিন তৃপ্তি সহকারে খাননি। বায়হাকী বর্ণনা করেন, একবার রাসূল (সা) হজরত আয়েশা (রা.) কে দিনে দুবার খেতে দেখে বললেন: হে আয়েশা তুমি কি পছন্দ কর যে, আহার করাই তোমার একমাত্র কাজ হোক? (মা'আরেফুন কোরআন পৃ:৪৩৮) নবী মুহাম্মদ (সা.) বিবাহিত জীবন শুরু করার (৫৯৫ খ্রি:) পর থেকে অর্থাৎ পঁচিশ বছর বয়স থেকে পরবর্তী পনেরো বছর অর্থাৎ চল্লিশ বছর (৬১০ খ্রি:) পর্যন্ত তিনি কদাচিৎ প্রকাশ্যে মক্কার রাস্তায় বের হতেন। নেহাৎ প্রয়োজনে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যেত। এ সময়ে তিনি আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণা, চেতন ভাবনার প্রতি অধিক মনোনিবেশ করেন। রাসূলে খোদা যখনই কোথাও যেতেন, তখন বিন¤্র চরণে পথ হাঁটতেন এবং কারও গৃহদ্বারে এলে গৃহস্বামীকে সম্মানের সাথে সম্ভাষণ করতেন, তিনি গৃহের অভ্যন্তরে পাদুকা পরিহিত অবস্থায় পা রাখতেন না, পাদুকা খুলে প্রবেশ করতেন। এক কথায় বলা যায় রাসূলের আদর্শ ছিল বিনয় ধৈর্য, অহমিকাশূন্যতা এবং আল্লাহর কাছে সর্বস্ব সমর্পণের একটি প্রত্যয়, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কোনো একদিন বেদুঈন মসজিদে পেশাব করলে, লোকরা উঠে তাকে মারার জন্য উদ্যত হলো। আল্লাহর রসুল বললেন: তার প্র¯্রাব করা বন্ধ করো না। অতপর, তিনি এক বালতি পানি আনলেন এবং পানি প্র¯্রাবের উপর ঢেলে দিলেন, (বুখারী হাদিস নং-৬০২৫, মুসলিম : ২৮৪) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেন বুইছতু লিউতাম্মিমা মাকারিমান আখলাক’ অর্থাৎ আমাকে পাঠানো হয়েছে সুন্দর চরিত্রের পূর্ণতা প্রদানের জন্য। (মুসলিম ও তিরমিজি)
রবিউল আউয়াল আরবি হিজরি চান্দ্র বর্ষের তৃতীয়মাস। রবি অর্থ-বসন্তকাল, আউয়াল অর্থ প্রথম। রবিউল আউয়াল অর্থ-প্রথম বসন্ত, রবিউল সানি মানে-দ্বিতীয় বসন্ত বা বসন্তের দ্বিতীয় মাস। এই দুই মাস মিলে ছিল বসন্তকাল। বসন্ত ঋতু হলো পত্র পল্লবে সুশোভিত ঋতুরাজ। পৃথিবীতে শুভাগমন করলেন রহমাতুল-লিল আলামিন তথা সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও করুণার আকর নবী মুহাম্মদ (সা.)! সঙ্গে নিয়ে এলো সভ্যতার বসন্তকাল। যে দিনটি ছিল সোমবার আজও মদিনাবাসী সাপ্তাহে সোমবারে রোজা পালন করেন, মসজিদে নববিতে করা হয় ইফতারের বিশেষ আয়োজন। সারা বিশ্বে নবী প্রেমিকগণ প্রতি সোমবার রোজা পালন করেছেন, রসুলের প্রতি মহব্বত ও আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন স্বরূপ।
হযরত আয়েশা (রা.) একটি কবিতায় লিখেছেন লানা সামছুন ওয়লিল আফাকি শামছুন, ওয়া শামছি আফদালুশ শামছি ছামায়ি। ফা ইন্নাশ শামছা তাৎলাউ বাদাল ফাজর, ওয়া শামছি তাৎলাউ বাদাল ইশায়ি। অর্থাৎ আমার আছে সূর্য, দিগন্তে ও আছে সূর্য, আমার সূর্যটি আকাশের সূর্য হতে শ্রেষ্ঠ, দিগন্তের সূর্য ওঠে ফজরের পরে, আমার সূর্য উদিত হয় ইশারঅন্তরে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর ফাতেমা (রা.) একটি এলিজি লিখেন : এতে বলা হয়েছিল, ‘বৃষ্টি ব্যতিত মাটির যে অবস্থা হয় তোমাকে হারিয়ে আমারও সেই অবস্থা হয়েছে।" রসুলের কবি বলে খ্যাত হযরত হাসসান ইবনে সাবিত তাঁর দীর্ঘ মার্সিয়াটি ইবনে হিশাম তাঁর সিরাত গ্রন্থের শেষাংশে সংযোজন করেছেন। তা থেকে মাত্র দু’টি লাইন-
হে শ্রেষ্ঠ মানব, আমি ঝরনার মধ্যে ছিলাম / কিন্তু এখন আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছি।
আহলে বাইত অধিকাংশ তথ্যাবিজ্ঞ আলিম বলেছেন নবী (সা.) এর পবিত্র পতœীগণ তাঁর জামাতা হযরত আলী (রা.) কন্যা ফাতেমা (রা.) এবং দুই দৌহিত্র হাসান (রা.) হোসাইন (রা.) আহলুল বায়ত এর অন্তর্ভুক্ত ।
সৈয়দ বা স্যাইয়িদ শিয়া মতবাদ ও ধ্যান ধারণা একাধিকভাবে সুন্নিদেরকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আহলে বাইত বা রসুলের পরিবারের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি। হযরত আলী (রা.) র প্রতি সুন্নিগণ শিয়াদের চেয়ে কোন অংশে কম শ্রদ্ধাশীল নন। অনুরূপভাবে ফাতেমা (রা.) ও হোসেন (রা.) জয়নাল আবেদীন ও অন্য শিয়া ইমামদের প্রতি সুন্নি মুসলমান অতিশয় শ্রদ্ধাশীল। মহানবী বলেছেন, আমার বংশধরেরা কোনও বিষয়ে একমত হলে তা ভুল হতে পারে না। এটাই মুসলমানের স্মৃতিতে “ইজমা" হিসাবে গৃহিত হতো। নবী মুহাম্মদ (সা.) একদিন তাঁর প্রিয় দৌহিত্র শিশু হাসানের (রা.) প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমার এই বংশধর ‘সৈয়দ’ হবে। সেখানে নেতা এবং উম্মতের পথ প্রদর্শক রূপেই শব্দটির ব্যবহার হয়েছে। নবী করিম (স.) এর সন্তানের বংশধরকে ‘সৈয়দ’ বলা হয়। অর্থাৎ যাঁদের বংশের ধারাবাহিকতা হযরত হাসান কিংবা হোসাইন (রা.) মাধ্যমে হযরত ফাতেমা ও হযরত আলী (রা.) হয়ে নবী (স.) পর্যন্ত পৌছে, তারাই সৈয়দ' বলে পরিগণিত। মহানবী (সা.) তার দুই দৌহিত্র হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.) কে খুবই ভালবাসতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ আমি তাদেরকে ভালোবাসি তুমিও তাদেরকে ভালোবাস। আর যে তাঁদের ভালোবাসবে আমিও তাদেরকে ভালোবাসবো। সাইয়্যীদ বা সৈয়দ বিশ্ব মানব সম্প্রদায়ের অবিসংবাদিত নেতা। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন তিনিই সাইয়্যীদ যিনি আল্লাহর বিচারে সর্বাধিক অনুগ্রহশীল। কাতাদা (রা.) এর মতে সাইয়্যীদ উপাধি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা ইবাদত পরিপূর্ণরূপে খাঁটি ও নিখাদ। যিনি সর্বাধিক ধর্মনিষ্ঠ ও পবিত্র। যিনি অন্যায় অত্যাচারের প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করে দেন। ইকরাম (রা.) বলেন তিনি সাইয়িদ, ক্রুদ্ধ কি সন্তুষ্ট উভয় অবস্থাতেই যিনি একইরকম। রসুল নিজে বলেছেন আমি সাইয়্যিাদ শেষ বিচারের দিন আমি সমগ্র মানবমন্ডলীর নেতা। রসুল (সা.) তার আল্লাহ প্রদত্ত গায়ের দর্শনের যোগ্য নযরের মাধ্যমে দেখেছেন, আহলে বাইত ইসলামি জগতের মাঝে একটি নূরানী বৃক্ষের ন্যায় প্রসারিত হবে। ইসলামি জগতের সমস্ত স্তরে পরিপূর্ণ মানবতার শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শক ও মুরশিদের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের অধিকাংশই আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হবে। নামাযের শেষ বৈঠকে দরুদের মাঝে উম্মতের সকলেই তার আ'ল অর্থাৎ পরিবার ও বংশধর সম্পর্কে যে দোয়া করে তা হলো, হে আল্লাহ সাইয়েদিনা হযরত মুহাম্মদের উপর এবং তার পরিবারের উপর দরুদ নাযিল করুন যেমনি ভাবে তুমি ইব্রাহিম (আ.) এর উপর এবং তার পরিবারের উপর দুরুদ নাযিল করেছেন। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত মহিমান্বিত। মহানবী (সা.) আহলে বাইতের কুতুবদেরকে দেখতে পেয়েছেন, আর একারণেই "হে নবী আপনি বলুন, আমি আমার কর্মের প্রতিদান হিসেবে আত্মীয়েদের প্রতি সৌন্দর্য্য ভালবাসা ব্যতীত তোমাদের থেকে আর কিছুই চাই না”। (সূরা: শুরা: ২৩) মহানবী অন্যত্র (সা.) বলেছেন, তোমাদের নিকট দুইটি জিনিস রেখে যাচ্ছি; তোমরা যদি শক্ত ভাবে আকড়ে ধর তবে নাজাত লাভ করবে; তার একটি কিতাবউল্লাহ' আর অপরটি হলো আমার আহলে বাইত। সহীহ রিওয়ায়েতে আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন; প্রত্যেক নবীর বংশ তার নিজের থেকে। আমার বংশ হলো আলী রাদিয়াল্লাহ আনহুর থেকে। বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে আমার পথে রাসূল (সা.) আঠারই যিলহজ্জে আল যাহফা’র কাছে আল গাদির খুমে আরেক জনসমাবেশে ভাষণ দেন। এ সময় তিনি আলী ইবনে আবু তালিবের হাত উপরে তুলে ধরে বললেন, " আমি তারই বন্ধু যার বন্ধু আমি নিজে" আলী (রা.) ইয়েমেন থেকে ফিরে এসে বিদায় হজ্জ পালন করেন । গাদির খুমে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.) র মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণনা করেন এবং তার গুনাবলীর বিষয়ে বলেন। অদূর ভবিষ্যতে হযরত আলী (রা.) যে যন্ত্রণাদায়ক দুঘর্টনা ও আভ্যন্তরীণ কোন্দলের মুখোমুখি হবেন তা হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন, তাই তিনি হযরত আলী (রা.) কে হতাশা থেকে এবং উম্মতকে ভ্রান্থ ধারণা পোষণ করা থেকে মুক্ত করার জন্য বলেছেন, আমি যাঁর গোলাম, আলী ও তার গোলাম। মদীনায় এসে রাসূল (সা.) আরেকটি ভাষণ দেন এবং বলেন, "তোমরা কুফরীর দিকে না ফিরে যেয়ো। আমার ওফাতের পর একে অপরের মুন্ডুপাত করো না। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, উত্তর হিজায়ের মরুদ্যান বিজয়ের পর হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর স্ত্রীগণের জন্য যেমন বাৎসরিক ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন, তেমনি ফাতিমা (রা) এর জন্য তদ্রুপ ভাগ নির্ধারণ করেন। তাঁর ভাগে পড়েছিল ৮৫ বস্তা গম। নবীজি (সা.) ওফাতের পর হযরত আবু বকর (রা.) এর নিকট, ফাতিমা (রা.) “ফাদাক' নামক মরুদ্যানের অন্যতম উত্তরাধিকারী রূপে তিনি তাঁর প্রাপ্য অংশ দাবি করেন। খলিফা তার উত্তরাধিকারের দাবি নাকচ করে দেন। ইউরোপীয় পন্ডিতদের মধ্যে কয়েকজন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, প্রাথমিক যুগের মূলগ্রন্থগুলিতে হযরত ফাতিমা (রা.) সম্বন্ধে অতি সামান্য বিবরণ পাওয়া যায়। হাদিস সংকলকগণও অতি অল্প সংখ্যক হাদিস উল্লেখ করিয়াছেন। অথচ রাসূল (সা.) বলেছেন, ইমরানের কন্যা মরিয়মের পরেই নারীদের মধ্যে ফাতিমা (রা.) বেহেশতের রাণী হবেন।’ (ইসলামী বিশ্বকোষ ঃ ইঃফাঃবাঃ১৯৮২, পৃষ্ঠা:৮১)। হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রা.) হলেন জান্নাতি রমণীদের প্রধান, (মুস্তাদরাকে হাকেম, ৩:১৮৫ সিলসিলাতুস সহিহালিল আলবানি ৩.৪১১)। হযরত হাসান (রা.) ও হজরত হোসাইন (রা.) হলেন বেহেশতি যুবকদের সরদার (মুসনাদে আহমদ ১৭:৩৭) নবী বংশেরই ৭০ জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শাহাদাত বরণ করেছেন, আশুরার দিনে, ইরাকের মক্কা নগরীর কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সম্মান ও মহব্বত সবকিছুর চাইতে বেশী হওয়া আমাদের ঈমানের অঙ্গ ও ভিত্তি: অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে যার যত নিকট সম্পর্ক আছে, তার সম্মান ও মহব্বত এবং সে অনুপাতে জরুরী হওয়া অপরিহার্য। ঔরসজাত সন্তান সর্বাধিক নিকটবর্তী আত্মীয়। তাই তাদের মহব্বত নিশ্চিতরূপে ঈমানের অঙ্গ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নবী পত্মীগণ ও সাহাবায়ে কেরামকে ভুলে যেতে হবে। আসল কথা এই যে, নবী পরিবার ও নবী বংশের মহব্বত নিয়ে কোন সময় মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়নি। সর্বসম্মতিক্রমে তাদের মহব্বত অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (স.) এর বংশধর হিসেবে যত দূর সম্পর্কের সৈয়দই হোক না কেন, তাদের মহব্বত ও সম্মান সৌভাগ্য ও সওয়াবের কারণ। অনেকেই এ ব্যাপারে শিথিল্যের পরিচয় দিতে শুরু করলে হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ:) কয়েক লাইন কবিতায় তাদের তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর কবিতার উদ্ধৃত করছি;
হে অশ্বারোহী তুমি মহাসসাব উপত্যকার অদূরে থাম। প্রত্যুষে যখন হাজিদের ¯্রােত সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় মীনার দিকে রওয়ানা হবে, তখন সেখানকার প্রত্যেক বাসিন্দা ও পথচারীকে ডেকে তুমি ঘোষণা কর, যদি কেবল মুহাম্মদ (সাঃ) এর বংশধরের প্রতি মহব্বত রাখলেই মানুষ রাফেয়ী হয়ে যায়, তবে বিশ্বজগতের সমস্ত জিন ও মানব স্বাক্ষী থাকুক, আমিও রাফেয়ী।
আল্লাহ তা’য়ালার কৃপাদৃষ্টি লাভ করতে হলে তাঁর প্রিয়তম রাসূলে করিম (সা.) এর প্রতি সর্বাধিক মহব্বত রাখতে হবে এবং তার পূর্ণঅনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন আমাদের নেতা মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবার পরিজনের প্রতি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT