পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৭:৫১ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত



প্রকৃতিকন্যা সিলেট বিভাগের একটি প্রাচীন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’। আমার লজিং জীবন ও শিক্ষা জীবনের চার-পাঁচটি বছর উক্ত জ্যোতির্ময় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির আঙ্গিনায় কাটিয়েছিলাম; এবং নিজেকে কলেজটির জ্যোতির্ময় আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। দুঃসহ কষ্টের লজিং জীবনের সফলতার মূল সূতিকাগার আমার প্রাণপ্রিয় ‘মদন মোহন কলেজ’ সম্পর্কে দু’চারটি কথা লিখা আমার কর্তব্য। সিলেটের অন্যতম প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সিলেট শহরের লামাবাজার এলাকায় বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ সংবলিত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মদনমোহন কলেজ’ নামে ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তৎকালীন সিলেটের বাসিন্দা প্রখ্যাত শিক্ষাদরদী ও শিক্ষানুরাগী প্রয়াত মদনমোহন দাসের সুযোগ্য সন্তান মোহিনী মোহন দাস ও যোগেন্দ্র মোহন দাস ভ্রাত্রিদ্বয় তাদের স্বর্গীয় পিতার স্মরণে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারা সিলেটের লামাবাজারস্থ তাদের দানকৃত নিজস্ব জায়গার উপর কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে কলেজটির মোট আয়তন বা জমির পরিমাণ ৩.৩৭ একর। বর্তমানে কলেজটিতে অনার্স, মাস্টার্সসহ উচ্চ শিক্ষার প্রায় সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভুক্ত হয়ে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পূর্বের চেয়ে বর্তমানে কলেজটির যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে। সম্প্রতি কলেজটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনগুলোর মধ্যে মোহিনী মোহন ভবন, যোগেন্দ্র মোহন ভবন, এম সাইফুর রহমান ভবনসহ তারাপুর ক্যাম্পাস। উল্লেখিত ভবনগুলো সাধারণত শ্রেণীকক্ষ, লাইব্রেরী, অফিস ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একাডেমিক ভবনের নীচতলার উত্তরাংশে সু-বৃহৎ পরিসরে যে লাইব্রেরী রয়েছে তাতে প্রায় পঁচিশ হাজারেরও অধিক দুষ্প্রাপ্য, গবেষণাধর্মী ও ডিজিটাল যুগের সমসাময়িক নানা বইপত্রের সমাহার বিদ্যমান। যা শিক্ষার্থীদেরকে আলোর পথের পাথেয় হিসাবে কাজ করে থাকে।
১৯৪০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের লামাবাজার এলাকায় বাণিজ্য বিভাগে অধ্যয়ন প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা সংবলিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মদনমোহন কলেজটি’ প্রতিষ্ঠা করার পর হতে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ও কালক্রমে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোজন নিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। আমরা যখন ১৯৭৩ সালে কলেজটিতে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই তখন সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ততটা ভালো ছিল না। তথাপি সুখ্যাতি ও সুনামের কারণে শিক্ষার্থী ছিল প্রচুর। তখন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাদরদী অধ্যাপক কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী। তখন কলেজটির একাডেমিক ভবনের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তখন নির্মাণাধীন নিচ তলা নির্মিত ছাত্রাবাস ভবনটিতে ছাত্র-ছাত্রীর তুলনায় আবাসিক সিট ছিল স্বল্প তাই অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় লজিং থেকে অথবা ম্যাচের ব্যবস্থা করে কলেজটিতে লেখাপড়া করতে হতো। তখন মহিলা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। তাছাড়া স্থানীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল নগণ্য। তথাপি সিলেট বিভাগের অন্যান্য অঞ্চলে ভালো কলেজ না থাকায় বিশেষ করে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ কলেজটিতে ভর্তি হতো। ফলে ছাত্রছাত্রীর আধিক্যের কারণে অনেক সময় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়তো। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ইন্টারমিডিয়েট এবং মধ্যখানে মেডিকেল কলেজে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট করার পর পুনরায় ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ¯œাতক বাণিজ্য (বি.কম) বিভাগের ছাত্র হিসাবে দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়নে লজিং বাড়িতে থেকে মদনমোহন কলেজে শিক্ষা জীবন কাটিয়েছিলাম। তখন কলেজে অনার্স এবং মাস্টার্স কোর্স ছিল না বিধায় বাধ্য হয়েই ডিগ্রী পর্যন্ত শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে বাধ্য হয়েছিলাম। তখন মাস্টার্স কোর্স থাকলে হয়তো সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হতো না।
মদনমোহন কলেজেরপ্রতি নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ প্রমোদ কুমার গোস্বামীর উত্তরসুরী আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীবান্ধব অধ্যক্ষ কে.কে পাল চৌধুরীর কার্যকালে কলেজটি শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার নিবিড় পরিবেশ ও ভৌত অবকাঠামোসহ কলেজের সুনাম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর ব্যক্তিত্ব, উদ্যম ও সাহসী কর্মপ্রেরণায় সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আলোকিত হয়ে উঠে। তাঁর আত্মত্যাগ, ঔদার্য্য, সৎকর্ম, সংবেদনশীলতা সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের প্রতি অসীম দরদ ও ¯েœহমমতা প্রতিষ্ঠানটিকে মহিমান্বিত করে তোলে। আমি এম.এম কলেজ ও সম্মানিত সাবেক অধ্যক্ষ কে.কে পাল চৌধুরীর ন্যায় কর্মবীর নিবেদিতপ্রাণ অধ্যক্ষ মহোদয়ের ছাত্র হতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি। কালের প্রবাহে পরবর্তী অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও অধ্যাপকবৃন্দের নিপুণ কর্মপ্রেরণা ও দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় প্রাচীনতম এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অত্রাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সীমাহীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বলেই ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে প্রথমেই বাণিজ্য বিভাগের হিসাব বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বাংলাসহ অন্যান্য বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সগুলো চালু করা হয়। অনার্স, মাস্টার্স কোর্সগুলো চালু হওয়ার কারণে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যতম সেরা ‘মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ হিসাবে সারাদেশে সুনাম ও সুখ্যাতি আরও অধিক বিস্তৃতি ঘটে। ফলে কলেজটির গুরুত্ব বিবেচনায় সদাসয় সরকার কলেজটিকে সরকারীকরণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
নগরীর অন্যতম ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে সরকারিকরণের জন্য দীর্ঘদিন যাবত দাবি জানিয়ে আসছিল অত্রাঞ্চলের সাধারণ জনতা, অভিভাবক, সুধীসমাজসহ শিক্ষাথীবৃন্দ। ২০১৫ সালে কলেজটিতে ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘হীরক জয়ন্তী’ পালন করা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ও কলেজের সভাপতি জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত এমপির উপস্থিতিতে কলেজটিকে সরকারীকরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত ১২ আগস্ট ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রজ্ঞাপনে দেশের অন্যান্য কলেজের সাথে মদনমোহন কলেজকেও সরকারিকরণ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কলেজটিকে সরকারিকরণ করায় সিলেটবাসী ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীতো বটেই আমরা প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী ও শুভাকাঙ্খিবৃন্দও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আমরা যখন কলেজটির ছাত্র ছিলাম তখন সবাই মিলেমিশে আনন্দ ফুর্তিতে মেতে থাকতাম। আমাদের মধ্যে এখনকার মত ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বেষারেষি ছিল না। তখন অবশ্য ছাত্রলীগ জাসদের দাপট ছিল বেশি তথাপি আমাদের মধ্যে বৈরিতার প্রভাব ছিল না। তখন কলেজটিতে এখনকার মত চতুর্দিকে বাউন্ডারী ওয়াল ছিল না ফলে আমরা কলেজটির সম্মুখস্থ লামাবাজারের রাস্তা দিয়ে তো বটেই দাড়িয়াপাড়া অথবা মির্জাজাঙ্গালের ভিতর দিয়ে পেছনের দিক দিয়েও কলেজটিতে আসা যাওয়া করতে পারতাম। এখন সুরম্য মজবুত গেইট ও বাউন্ডালী দেওয়াল হওয়ায় সহজে কলেজে প্রবেশ করা কঠিন। তাছাড়া এখন নতুন নতুন মনোরম একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ফলে ভবন, শ্রেণীকক্ষ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও অফিস যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি পূর্বের তুলনায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ‘হীরক জয়ন্তী’ অনুষ্ঠান ২০১৫ এর হিসাব অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১০৪৫১ জন। এখন হয়তো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া কলেজটিকে সরকারিকরণের কারণে কলেজটির গুরুত্ব ও সম্মান দেশ বিদেশে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মদনমোহন সরকারি কলেজটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সিলেট অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার কর্ণধার হিসাবে সুনাম সুখ্যাতি অর্জনসহ প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা ও আদর্শ মানুষ গড়ার সুতিকাগার হিসাবে সুনাম অর্জন করে চলেছে। তাছাড়া উক্ত কলেজ থেকে হাজার হাজার কৃতি শিক্ষার্থী আলোকিত মানুষ রূপে সমাজ, অঞ্চল ও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে অথবা দেশমাতৃকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমার জীবনের মধুর একটা সময় উক্ত কলেজের আঙ্গিনায় কাটিয়েছিলাম। সোনালী সেই দিনগুলোর কথা এখন মন থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো স্মৃতির অন্ধকারে। তবু সেই লজিং জীবন আর কলেজ জীবনের স্মৃতি বিজড়িত সোনালী সময়ের উজ্জ্বল দিনগুলো শরতের নীল আকাশের মতো ছেয়ে থাকবে আমৃত্যু আমার মনের গভীরে। তাই সদ্য সরকারি হওয়া মদনমোহন কলেজটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি। আরও বহুদূর এগিয়ে যাক আমার এই উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীট ‘সরকারি মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ’, আরোহণ করুক সাফল্যের চূড়ান্ত শীর্ষে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT