উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

এম এ জলিল চৌধুরী

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১১-২০১৯ ইং ০১:০১:০৪ | সংবাদটি ২৮৭ বার পঠিত

মহা কবি ও মহানাট্যকার উইলিয়াম সেক্সপিয়ার বলেছেন জন্ম নেয়ার মধ্যেই সার্থকতা নেই। কৃতিত্ব সেখানেই জগতের প্রাণীর যদি উপকার আসতে পারে। যদি হয় মানব উপকৃত, জন্ম তোমার সফল সার্থক।
শিক্ষা একটি জাতির স্বরূপ অন্বেষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি জাতির অবস্থান কোথায় তা চিহ্নিত করা যায় তার শিক্ষার প্রতি আলোক সম্পাৎ করে। কারণ শিক্ষা একটি জাতির অবয়ব নির্মাণ করে। নন্দিত লেখক এম এ জলিল চৌধুরী জ্ঞানের বাতিঘর জ্বালিয়ে আলোকিত করেছেন সমাজকে। কর্মই জীবন-আর জীবনই কর্ম। তিনি শিক্ষার উন্নয়নে নিজের সম্পদ উৎসর্গ করেছেন। তিনি আগামীর প্রজন্মকে মানসিক ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের তথ্য প্রযুক্তিসহ সকল ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষে প্রতিষ্ঠিত করেন “ইনষ্টিটিউট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার”, J.C College, JC School, ETEM Techno রিচার্স সেন্টার। কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করেছেন বহুতল শিক্ষা ভবন। বর্তমানে নব নির্মিত ভবনে শিক্ষাদান কার্যক্রম চলে আসছে। শিক্ষক/শিক্ষিকার বেতনসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যয়ভার তিনি বহন করে যাচ্ছেন। তার বদান্যতায় অনেক হতদরিদ্র ছাত্র-ছাত্রী লেখা পড়ার সুবিধা পাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য প্রয়াত এমএ জলিল সাহেবের স্ত্রী ফাতেমা জলিল চৌধুরীকে চেয়ারম্যান মনোনীত করে নয় সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
লেখক ও গবেষক এম এ জলিল চৌধুরী নির্মোহ, নিরন্তর নিরলস নি:স্বার্থ কর্মযজ্ঞ যে কেউ আভিভূত হয়ে পড়বেন। তিনি সত্যনিষ্ট, অনুসন্ধিৎসু লেখক ও গবেষক। তার সত্যানুসন্ধানী লেখা বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে মূল্যায়ন হয়েছে। গ্রন্থকার প্রণীত ও সম্পাদিত বহুভাষী পুঁথি সমূহ পাঠকের কাছে সাবলিল ভাষায় সুপাঠ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তার রচনাগুলোতে আলোচিত হয়েছে ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও নাগরিলিপির ঐতিহ্য। প্রতিটি গ্রন্থে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং রচনার বৈচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। সর্বোপরি তিনি ছিলেন উদার মনের দুরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন নন্দিত লেখক।
লেখক ও গবেষক এম এ জলিল চৌধুরী ঐতিহ্য সচেতন সুপুরুষ ছিলেন। তার আচার-আচরণে, চলনে- বলনে অভিজাত্য, শরীফ ও শরাফতি নি:সন্দেহে অনুসরণযোগ্য। সিলেটী একটি প্রবাদ আছে- আছলে নছল জমিনে ফসল। অর্থাৎ ভালো উর্বরা জমিতে ভাল ফসল অবশ্যই ফলবে। ভাল মানুষের রক্তের ¯্রােতধারায় গড়ে উঠে মানুষের প্রকৃতি। তাঁর রচিত বইগুলো পড়লে ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ অগাধ শ্রদ্ধা এবং প্রেম বিমুগ্ধ চিত্তই বিদগ্ধজনকে উৎসাহিত করে।
লেখক ও গবেষক এম এ জলিল চৌধুরী সিলেটের ঐতিহ্যবাহী অভিজাত পরিবারের সন্তান। গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামে পিতা শাহ সুফি মুহিবুছ ছমদর ঔরসে এবং মাতা আবেদা খাতুন চৌধুরীর গর্ভে ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পূর্বপুরুষ থেকে তার পরিবার ধর্ম ও সাহিত্য চর্চার ধারা প্রবাহিত থাকায় তিনি রুচিশীল পরিবেশে লালিত হন। তিনি ১৯৫২ সালে সিলেট পাইলট (বালক) বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে যুক্তরাজ্যে উচ্চতর পড়াশুনার লক্ষে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি South Bank westminister University থেকে Polymer Chemistry ও Polymer Technology অধ্যয়ন শেষে বিলেতের Imperial Chemical Industries এর Petrochemical Division এর Research Group এ Research Experimental Chemist হিসাবে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
লেখক ও গবেষক এমএ জলিল চৌধুরী কৈশোর থেকেই ছিলেটি ভাষা পড়া ও চর্চায় গভীর আগ্রহ ছিল। পূর্ব পুরুষের ইতিহাস গৌরব উজ্জল ও সুফিবাদ প্রভাবের ফলে আধ্যাত্মিক জগতের দিকে তার সচেতনতা আসে ও পরিচিতি সহজ হয়। ষাটের দশক থেকে ছিলেটি ভাষায় পিতা মরহুম শাহ ছুফি মহিবুছ ছমদ চৌধুরী (র) কর্তৃক সংরক্ষিত তদীয় পিতামহ মরহুম ওলিয়ে কামেল শাহ্ ছুফি আব্দুল ওহাব চৌধুরী (র.) রচিত পুঁথি প্রকাশের চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে সিলেটের একমাত্র ছিলেটি Latter Casting এর Matrix থাকা সত্ত্বেও ছিলটি হরফকে Simplify ও Modify করে Computer Font এ ১৯৩৩ খ্রী: প্রথম আরবী, ছিলটি, বাংলা ও ইংরেজিতে ইমান ও সালাত প্রকাশ করেন। তাঁর রচিত ছিলটি পয়লা কবিতা ‘জলিল চৌধুরীর হ-য-ব-র-ল কবিতা গ্রন্থ (১-২) রং ঢং কিচ্ছা সম্পাদিত। শাহ ছাহেবের উম্মিতরান, ভেদকায়া, হাশর তরান, রাগ ওহাবি এবং সম্পাদিত ও রচিত ইমান ও সালাম, ছউম ও যাকাত, হজ্ব, তওয়াফ ও সাই এবং অদৃষ্ট পরীক্ষা নামীয় গ্রন্থগুলো ছিলটি ভাষায় পুন:প্রচলন ও সমৃদ্ধি করে ছিলেটি ভাষীদের নিজস্বভাষার গৌরবে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে।
লেখক ও গবেষক এমএ জলিল চৌধুরী ছিলেন পরোপকারী, বিনয়ী এবং দিলখোলা সুন্দর মনের মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্বে গড়ে ওঠে আলোকিত গুণাবলী। তার প্রতিভা ছিল অসাধারণ। তিনি জীবন ঘনিষ্ঠ মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত পরোপকারী মানুষ ছিলেন।
মৃত্যু শাশ্বত চিরন্তন। মৃত্যু পরম এক সত্যের নাম। যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক ও গবেষক এম এ জলিল চৌধুরী বিগত ১০ অক্টোবর ২০১৯ দিবাগত রাত মহানগরীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী ফাতেমা জলিল চৌধুরী, ১ ছেলে ও ১ মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমাজে গরীব দু:খীসহ ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চতর শ্রেণিতে পড়ার আর্থিক সুযোগ করে দিয়েছেন। মানুষের সাথে তার নাড়ীর টান ও আত্মার সম্পর্ক ছিল। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে আলাদা এক প্রজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নন্দিত লেখক এমএ জলিল চৌধুরী আলোকিত মানুষ গড়ার অনির্বান শিখা রেখে গেছেন তা সমাজে আদর্শ বাতিঘর হিসাবে আদৃত হবে। পরমকরুণমায় আল্লাহ তায়ালা তার আত্মার শান্তি দিন, তাকে জান্নাতি করুন।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বায়ু দূষণ
  • বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা
  • বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ও দারিদ্র্য বিমোচন
  • ছায়াসঙ্গিনী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক প্রবাহিত নদী
  • বলিভিয়া : ইভো মোরালেসের উত্থান-পতন
  • সিলেট অঞ্চলের পর্যটন ভাবনা
  • মিড-ডে মিল
  • যৌতুক প্রথা নিপাত যাক
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • Developed by: Sparkle IT