সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষেরা

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৯ ইং ০০:২৫:২৮ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

ঠাকুর বংশের আদি পুরুষ জগন্নাথ কুশারী বর্ধমান জেলার পিঠাভোগ-এর জমিদার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিদিন ভোরে যে মন্ত্রটি পাঠ করতেন এবং পিতৃপুরুষদের বন্দনা করতেন যার আদিতে আছে জগন্নাথ কুশারীর মধ্যম পুত্র পুরুষোত্তমের নাম।
যেমন জগন্নাথ কুশারী-পুরুষোত্তম কুশারী-বলরাম কুশারী-হরিহর কুশারী-রামানন্দ কুশারী-মহেশ্বর কুশারী-পঞ্চানন কুশারী-জয়রাম ঠাকুর-নীলমান ঠাকুর-রামলোচন ঠাকুর-দ্বারকানাথ ঠাকুর-দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন দ্বাদশ পুরুষ। পুরুষোত্তমের জীবনকাল ছিল ষোল শতকের মধ্যভাগে। পঁচিশ বছরে এক পুরুষ ধরলে জগন্নাথ কুশারীর জীবনকাল মোটামুটি ষোল শতকের প্রথমভাগে হয়। ধারণা করা হয়, বর্ধমান জেলার কুশগ্রাম থেকে কুশারী পদবীর উৎপত্তি।
জনশ্রুতি আছে, যশোর জেলার চেঙ্গটিরা পরগনার জমিদার ঙড় বংশীয় দক্ষিণানাথ রায় চৌধুরীর দুই ছেলে কামদেব ও জয়দেব। পীর আলী নামে একজন স্থানীয় শাসকের চক্রান্তে সমাজে পতিত হন। এই সমাজচ্যুতির ফলে স্বশ্রেণীর ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তাদের বিবাহদি ও অন্যান্য সামাজিক ক্রিয়াকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। তাদের চার ভাইদের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন শুকদেব, তার কন্যাকে বিবাহ করেন জগন্নাথ কুশারী, শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয় বংশের ব্রাহ্মণ হয়েও কেন তিনি পতিত ব্রাহ্মণের মেয়েকে বিয়ে করে জাত খুইয়েছিলেন তা জানা যায় না। এই বিয়ের কারণে আত্মীয়-স্বজনরাও জগন্নাথকে পতিত বলে ঘোষণা করেন। ফলে তিনি পিঠাভোগ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন। পিঠাভোগ গ্রাম ত্যাগ করে জগন্নাথ বর্তমান খুলনা জেলার দক্ষিণভিহিতে শ্বশুরালয়ে বাস করতে শুরু করেন। শুকদেব জামাতাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি জগন্নাথকে খুলনা জেলার বারোপাড়া নরেন্দ্রপুর গ্রামের উত্তরপাড়া নামে একটি গ্রাম দান করেন।
পুরুষোত্তমের ছেলে বলরাম কুশারী রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন একাদশ পুরুষ। তার ছেলে হরিহর কুশারী রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন দশম পুরুষ। আনুমানিক সতের শতকের প্রথমভাগ হরিহরের জীবনকাল। হরিহরের পুত্র রামানন্দ কুশারী রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন নবম পুরুষ। রামানন্দের জীবনকাল জোব চার্নকের শহর পত্তনের (প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী) সমসাময়িক কাল বা তার কিছু পূর্বে, সতের শতকের দ্বিতীয় ভাগে। রামানন্দের ছেলে মহেশ (মহেশ্বর) কুশারী রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন অষ্টম পুরুষ। কারো কারো মতে মহেশ্বর কুশারী ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আসেন মহেশ্বর কুশারীর ছেলে পঞ্চানন কুশারী রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ। ইনিই প্রথম সতের শতকের শেষভাগে (জোব চার্নকের সমসাময়িক কালে) নতুন গড়ে ওঠা কলকাতা শহরে বসতি স্থাপন করেন। সেই সময় কলকাতা অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্য ক্রমশ সমৃদ্ধি লাভ করছিল। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি বিদেশী বণিকদের আগমন, শেঠ বসাকদের সূতাবস্ত্রের হাট, যার থেকে সূতানটি নামের উদ্ভব। প্রসঙ্গত, ‘কলিকাতা’, ‘সূতানটি’ ও ‘গোবিন্দপুর’ এই তিনটি গ্রাম নিয়ে সেকালে কলকাতা শহর গড়ে ওঠে। ব্যবসায়িক সুযোগ থাকায় বহু মানুষকে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট করে। পঞ্চানন ও একই আকর্ষণে সেখানে গিয়ে কলিকাতা গ্রামের দক্ষিণে গোবিন্দপুরে আদিগঙ্গার ধারে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে ওখন জেলে, মালো, কৈবর্ত প্রভৃতি মৎস্যজীবী জাতি বসবাস করত। তারা ব্রাহ্মণকে সমাদরে তাদের দেশে বসবাসের বন্দোবস্ত করে দেয়। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যেসব বিদেশী জাহাজ বন্দরে ভিড়ত, পঞ্চানন ও তার ভাই শুকদেব প্রথমে সেসব জাহাজে নানারকম মাল সরবরাহের কাজ শুরু করেন। আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলে ‘শিপ শ্যান্ডলিং’। এইভাবে হাতে কিছু টাকা জমলে পঞ্চানন গোবিন্দপুরে গঙ্গার ধারে জমি কিনে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন।
স্থানীয় মৎস্যজীবী গ্রামবাসীরা পঞ্চানন ও শুকদেবকে ‘ঠাকুর মহাশয়’ বলে ডাকতেন, তাদের দেখাদেখি সাহেবরাও তাই বলে সম্বোধন করতেন। সাহেবদের উচ্চারণে ‘ঠাকুর’ ক্রমে ‘টেগারে’ রূপান্তরিত হয়। এই পঞ্চানন থেকেই কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো ও কয়লাঘাটের এবং শুকদেব থেকে চোরবাগানের ঠাকুর গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। পঞ্চানন কুশারীর দুই ছেলে জয়রাম কুশারী ও রামসন্তোষ কুশারী।
জয়রাম কুশারী দ্বারকানাথের প্রপিতামহ, রবীন্দ্রনাথের উর্ধ্বতন ষষ্ঠপুরুষ। জয়রাম ও তার ভাই রাম সন্তোষের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের মেলামেশা থাকায় তারা কিছু ইংরেজি জানতেন, তাছাড়া তখনকার রীতি অনুসারে ফারসি ভাষাতেও ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। জয়রাম ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কোম্পানির পে-মাস্টারের অধীনে প্রধান কর্মচারী নিযুক্ত হন। ‘কলিকাতা’, ‘সূতানাটি’, ও ‘গোবিন্দপুর’ ইংরেজদের অধীনে আসার পর ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলে প্রথম জরিপের কাজ হয়। এই কাজে দুইজন আমিনের প্রয়োজন হলে পঞ্চাননের অনুরোধে কলকাতার তৎকালিন কালেক্টর ‘রাফল সেলভন’ জয়রাম ও রাম সন্তোষকে আমিনের কাজে নিযুক্ত করেন। এইভাবে তারা ধীরে ধীরে বিত্তশালী হয়ে ওঠেন। ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থে ব্যামকেশ মুস্তফী এদের সম্পর্কে লিখেছেন, জয়রাম ও রামসন্তোষ আমেলী কার্য্যে টাকা উপার্জন করিয়া ধনসায়র (বর্তমান ধর্মতলা) নামক স্থানে বাড়ি, বৈঠকখানা, জমাজমি এবং এখন সেখানে ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা আছে, ঐ স্থানে বাগানবাটি নির্মাণ করিয়াছিলেন। এর দশ বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতার দক্ষিণের দশ মাইল অবধি আটত্রিশটি গ্রাম ক্রয় করলে এগুলোর জরিপের কাজ ও জয়রামও রামসন্তোষই সম্পন্ন করেন। গ্রামগুলোর অধিকাংশ জমি ছিল নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অধিকারে। এই সূত্রে তার সঙ্গে জয়রামের ঘনিষ্ঠতা হয়। জয়রাম যখন নিজের গৃহে রাধাকান্ত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দেবসেবার জন্য তাকে নিজের জমিদারির মধ্যে ৩৩১ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন। শোনা যায় ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে ‘মারাঠা ডিচ’ খননের সময়ও জয়রাম অন্যতম পরিদর্শক ছিলেন।
জয়রামের দুই স্ত্রী গঙ্গা ও রামধান। এদের গর্ভে তার চার ছেলের জন্ম হয়। আনন্দীরাম, নীলমান, দর্পনারায়ন ও গোবিন্দরাম। নীলমনি ঠাকুর দ্বারকানাথ ঠাকুরের পিতামহ, জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ। নীলমনি জয়রাম ঠাকুরের দ্বিতীয় ছেলে। নীলমনির বড় ছেলে আনন্দীরাম বাবার অপ্রিয় কোনো কাজ করায় পিতা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এবং পিতা জীবিত থাকতেই তিনি মারা যান। জয়রামের মৃত্যুর পর নীলমনি ও তার ছোট ভাই দর্পনারায়ণ ধনসায়রের সম্পত্তি বিক্রি করে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরের দেওয়া ক্ষতি পূরণের টাকাসহ মোট তের হাজার টাকা পান। এই টাকা থেকে কিছু টাকা দিয়ে কলকাতা গ্রামের পাথুরিয়া ঘাটায় জমি কিনে ভিটা তোলেন। উদ্বৃত্ত অর্থে দেবতার সেবার জন্য উৎসর্গীকৃত সম্পত্তি করে দেন। ১৭৬৫ সালে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ বাংলা বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করার পর নীলমান উড়িষ্যার কালেক্টরের দেওয়ান নিযুক্ত হয়ে উড়িষ্যায় চলে আসেন। সেখান থেকে উপার্জিত টাকা তিনি দর্পনারায়ণের নিকট পাঠান। দর্পনারায়ণ নানা রকম ব্যবসা সূত্রে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন। নীলমনির কনিষ্ঠ ভাই গোবিন্দরামের মৃত্যুর (১৭৭১) পর তার বিধবা পতœী রামপ্রিয়া দেবী ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। এই মামলার ফলে ঠাকুর পরিবার তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। রামপ্রিয়া দেবী দু’টি বাড়ি পান। ওই মামলা নিয়ে নীলমণি ও দর্পনারায়নের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে গোলযোগ বাঁধে। ফলে নীলমনি নিজের উপার্জিত অর্থ, এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ও গৃহদেবতা লক্ষ্মী জনার্দন শিলার ভার নিয়ে পাথুরিয়া ঘাটার বাড়ি ছেড়ে আসেন। পঞ্চানন থেকে সৃষ্ট ঠাকুর পরিবার দুইটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়।
নীলমনি জোড়াবাগানের বৈষ্ণচরণ শেঠের কাছ থেকে লক্ষ্মীনারায়ণ শিলার জনার্দন নামে মেছুয়া বাজার এলাকায় এক বিঘা জমি কিনে আটচালা বেঁধে বসবাস করতে আরম্ভ করেন।
এইভাবে ১৭৮৪ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি পত্তন হয়। নীলমনি ঠাকুরের তিন ছেলে ও এক মেয়ে-রামলোচন-রাসমনি-রামবল্লব ও কমলমনি। নীলমনি ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র রামলোচন ঠাকুর ছিলেন প্রখর বিষয় বুদ্ধির অধিকারী। প্রচুর বিষয় সম্পত্তির অধিকারী হয়ে রামলোচন ঠাকুর পরিবারের বৈভব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। রামলোচনের পূর্ব-পুরুষেরা সমাজে সম্পন্ন ব্যবসায়ী বলেই গণ্য ছিলেন। রামলোচনই প্রথম জমিদার হিসেবে অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হন। জেলায় জেলায় জমিদারী কেনা ছাড়াও কলকাতা শহরেই বাড়ি ও জায়গা কেনেন অন্তত দশটি। ঠাকুর পরিবারের সৌখিনতা ও আভিজাত্যের প্রকাশ রামলোচনের সময় থেকেই শুরু হয়। অপরাহ্নে জুড়ি গাড়ি চড়ে হাওয়া খেতে বের হওয়ার প্রথার প্রচলন তিনিই করেন। এছাড়া কবিওয়ালা ও কালোয়াতদের (উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী ব্যক্তি) বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে মজলিশ বসানো এবং আত্মীয়-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে গান শোনানো তার অন্যতম শখ ছিল। তার একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করেই মারা যায়। এরপর রামলোচন তার পরের ভাই রাসমনির ছেলেকে দত্তক নেন। রামলোচনের পতœী মেনকা ও রাসমনির পতœী আলকা সহোদর বোন ছিলেন, তাই দত্তক গ্রহণে বংশধারা কোনোদিক থেকেই ব্যাহত হয়নি। এই দত্তক ছেলের নামই হল দ্বারকানাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ। ১৮০৭ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে রামলোচন উইল করে দ্বারকানাথকে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে যান।
দ্বারকানাথ ঠাকুরের (১৭৯৪-১৮৭৬) জন্মের সময়ই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ধনশালী বলে খ্যাতি অর্জন করে। তবে তখনকার দিনে জমিদারী না থাকলে অভিজাত বলে সম্ভ্রম ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া যেত না। দ্বারকানাথের দত্তক গ্রহীতা পিতা রামলোচনই প্রথম কুষ্টিয়ার অন্তর্গত বিরাহিমপুর পরগনা ও উড়িষ্যার কঠক জেলায় পান্ডুয়া ও বালিয়া নামে দু’টি মহাল কিনে জমিদারী লাভে অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হন। দ্বারকানাথ বৈষয়িক সাফল্যে আধুনিক শিক্ষায় উৎসাহ দানে, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠে মেধা নির্ভর ধর্মচর্চায়, শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায়, বাণিজ্য বৃদ্ধিতে, ভোগে ও চিন্তায় সমানভাবে বাঙালির পুনর্জাগণের অন্যতম প্রধান পুরুষ।
বাল্যকাল প্রথামত পাঠশালায় বিদ্যাশিক্ষার পর দ্বারকানাথ মৌলভীর কাছে ফারসি ও আরবি ভাষা শেখেন, চিৎপুরে শেরবোর্ন সাহেবের স্কুলে ইংরেজি ভাষাও আয়ত্ত করেন। পরে রামমোহন রায়ের বন্ধু উইলিয়াম অ্যাডাম, জি.জি গর্ডন, জেমস কলভর প্রভৃতির কাছেও ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে আয়ত্ত করেন।
বিরাহিমপুরের জমিদারী পরিচালনা করতে গিয়ে তাকে জমিদারী সংক্রান্ত আইন-কানুন ভালো করে জানতে হয়। এই বিষয়ে এতই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন যে, তিনি ক্রমে অনেক বিশিষ্ট জমিদার ও অন্যান্য ব্যক্তির আইন বিষয়ক পরামর্শ দাতা হয়ে ওঠেন। পরে দ্বারকানাথ সুপ্রিমকোর্টের ব্যারিস্টার ফার্গুসেনের কাছে আইন বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করেন। এর ফলে তার আরও একটি উপার্জনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। রামমোহন রায়ের সঙ্গে থেকে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও সেই সময়ের নানা জনহিতকর কাজের সঙ্গে দ্বারকানাথের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয়, ১৮২৯ সালে সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন হয়, ১৮৩৬ সালে স্থাপিত হয় মেডিকেল কলেজ। এই প্রত্যেকটি উদ্যোগের সঙ্গেই দ্বারকানাথের যোগ ছিল।
১৮১৮ সালে দ্বারকানাথ চব্বিশ পরগনার কালেক্টরের শেরেস্তাদার নিযুক্ত হন। ১৮২২ সালে তিনি একই পরগনার কালেক্টর ও নিমক মহলের অধ্যক্ষ প্লাউডেন সাহেবের দেওয়ান নিযুক্ত হন। সে সময়ে সরকারী চাকুরির পাশাপাশি স্বাধীন ব্যবসা করার আইনগত বাধা না থাকায় দ্বারকানাথ ব্যবসাও শুরু করেন। তিনি ব্যবসা শুরু করেন নীল ও রেশম কেনা-বেচার মাধ্যমে। ১৮২৮ সালে তিনি শুল্ক ও আইফেল বোর্ডের দেওয়ান পদে উন্নীত হন। সে বছরই তিনি ‘ম্যাকিন্টশ’ কোম্পানীরও অংশীদার হিসেবে গৃহীত হন। এই কোম্পানি তখন কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক ছিল, দ্বারকানাথ এই ব্যাংকের ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। এই সময়ে জমিদারী কিনেও স্থায়ী সম্পদ বাড়াতে থাকেন।
১৮৩০ সালে কালীগ্রাম পরগনা কেনেন, ১৮৩৪ সালে কেনেন সাহাজাদপুর। ১৮২৩ সালে ১৬ লাখ টাকা মূলধন বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইউনিয়ন ব্যাংক’। ১৮৩৩ সালে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র একচেটিয়া ব্যবসা অধিকার খর্ব করার ফলে দ্বারকানাথ পূর্ণ সুযোগ নেন-তার পৈতৃক জমিদারি বিরাহিমপুরের কুমারখালি মৌজায় অবস্থিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেশমের কুঠিটি তিনি কিনে নেন। রামনগরে স্থাপন করেন চিনির কারখানা। রানীগঞ্জে খনি থেকে কয়লা তোলার জন্য ও ‘বেঙ্গল কোল কোম্পানী’ স্থাপন করেন। আসামের চা তিনিই প্রথম কলকাতায় আমদানি করেন। এছাড়া নীলের চাষতো ছিলই। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নীলের কুঠি ছিল। দ্বারকানাথ ক্রমশ আরও নানা দিকে তার বাণিজ্যের শাখা ছড়িয়ে দিতে থাকেন। ‘স্টীম টাগ অ্যাসোসিয়েশন’ নামে জাহাজ কোম্পানীর ব্যবসা শুরু করেন। গঠন করেন ‘কার ঠাকুর কোম্পানী’ আরও ছিল ‘ইন্ডিয়া’ নামে তার একটি জাহাজ। সেই জাহাজ চড়েই তিনি প্রথমবার বিলেত যান।
আনুমানিক ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে যশোর জেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামের রামতনু রায় চৌধুরী ও আনন্দময়ীর মেয়ে দ্বিগম্বরীর সঙ্গে দ্বারকানাথের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় দ্বারকানাথের বয়স ১৫ আর দিগম্বরীর আনুমানিক ৭ বছর। দিগম্বরী ও দ্বারকানাথের পাঁচ ছেলে- দেবেন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, গিরিন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ ও নগেন্দ্রনাথ।
১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট দ্বারকানাথ ঠাকুর তার বিষয় সম্পত্তির উইল করেন। তখন তার বয়স ঊনপঞ্চাশ বছর। উইলে তিনি ভদ্রাসন বাড়ি (৬নং দ্বারকানাথ লেন) বড় ছেলে দেবেন্দ্রনাথকে, বৈঠকখানা বাড়ি (৫নং দ্বারকানাথ লেন) মেজো ছেলে গিরিন্দ্রনাথকে এবং ভদ্রাসনে বাড়ির পশ্চিম দিকের সমস্ত জমি ও বাড়ি তৈরীর জন্য ২০,০০০ টাকা ছোট ছেলে নগেন্দ্রনাথকে দিয়ে যান। তার অপর দুই ছেলে এর আগেই মারা যান। ‘কার ঠাকুর কোম্পানীর’ যে অর্ধাংশ তার অধিকারেও ছিল, তা দেন দেবেন্দ্রনাথকে।
এছাড়াও দরিদ্র সেবার জন্যে নির্দিষ্ট ছিল এক লাখ টাকা। ১৯৪৫ সালের ৪ মার্চ দ্বারকানাথ পুনরায বিলেত যাত্রা করেন। পরের বছর মাত্র ৫১ বছর বয়সে লন্ডনের নিকটবর্তী সারে শহরে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর দেড় বছরও কাটেনি, ইউনিয়ন ব্যাংকের পতন হয়।
কুশারী বংশের অষ্টম পুরুষ পঞ্চানন (যার থেকে ঠাকুর পদবীর উদ্ভব) প্রথম ভাগ্যের অন্বেষণে কলকাতা আসেন। তার অব্যবহিত পরবর্তী পুরুষগণ-জয়রাম-নীলমনি-রামলোচন-দ্বারকানাথ-এরা প্রত্যেকেই সম্পদ সৃষ্টিতে উদ্যোগী ছিলেন এবং সেই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে ছিলেন যতœশীল। নানা ঐতিহাসিক কারণ ও দ্বারকানাথের ব্যক্তিগত স্ফুরণের ফলে তার সময়ে ঠাকুর বংশের সম্পদ উচ্চতম শিখর স্পর্শ করে। সম্পদ বাড়ানোর প্রতি মনোযোগের অভাব প্রথম লক্ষ্য করা যায় দ্বারকানাথের ছেলের দেবেন্দ্রনাথের চরিত্রে। বিষয়-সম্পদের ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ ছিল না, প্রথম যৌবনে সম্ভবত খানিকটা পিতার অমতে যেতে অপারগ হয়েই দ্বারকানাথের ব্যাংকে চাকুরি করেন। প্রথম দিকে তার দিন কাটত বিলাসব্যাসনে। পরে পিতামহীর মৃত্যুর পর অকস্মাৎ তার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। তার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে পড়ে ধর্মাচরণে। সেই আবেগ প্রথম দিকে পারিবারিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণেও তার অনীহা দেখা যায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তিনি এই মানসিক অবস্থা কাটিয়ে ওঠেন। সম্পদ বাড়াতে না পারেন, পিতার সম্পদের অবশিষ্ট ছিল তার রক্ষণাবেক্ষণে যতœবান হন। তবে&

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT