সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের সিলেট মুগ্ধতা

সায়েদ আব্দুল্লাহ যীশু প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৯ ইং ০০:২৮:২২ | সংবাদটি ১৮১ বার পঠিত

বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষই সিলেটের পূণ্যভূমিতে পা রেখেছেন। আধ্যাত্মিক নেতা হযরত শাহজালাল, রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শ্রী চৈতন্য সহ অনেক মানুষের নামই এই তালিকায় স্মরণ করার মতো। ভারত উপমহাদেশের এক নামে পরিচিত শ্রী চৈতন্যর জন্মভূমি সিলেট।
সাহিত্য এবং সাহিত্যের সাধকদের প্রতি সিলেটিদের আজন্ম অনুরাগ। এ অঞ্চলে সাহিত্য সাধনাও হয়েছে প্রচুর। তার উজ্জ্বল নিদর্শন ‘নাগরিলিপি’ নামে সিলেটিদের নিজস্ব বর্ণমালা। প্রতিদিনের জীবনে এর ব্যবহার না থাকলেও সাহিত্যিক মূল্য রয়েছে অনেক। বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন অধ্যয়ন করতে নাগরিলিপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সেজন্যই বোধ হয়, সিলেটিরা খাঁটি বাংলা বলাতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। সিলেটে জন্ম নেয়া একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুরু-শিষ্যের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সৈয়দ মুজতবা আলী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, তার মুখ থেকে সব সময় কমলার সুভাস নিঃসৃত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেটে আসার সময়টায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল। শিলং রোড কিংবা কিনব্রিজ তখনও হয়নি। সিলেট ব্রাহ্ম সমাজ, সিলেট মহিলা সমিতি, আঞ্জুমানে ইসলাম তাঁকে সিলেট আসার আমন্ত্রণ জানায়। শুরুতে ব্রাহ্ম সমাজের সেক্রটারি গোবিন্দ নারায়ণ সিনহা টেলিগ্রাম করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সিলেট সফর করার আমন্ত্রণ জানান। মুরারী চাঁদ কলেজের অধ্যাপক সুরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত কবিকে টেলিগ্রাম করে আমন্ত্রণ জানান, ‘ভারতের বরপুত্র শ্রীহট্ট ভ্রমণ করে তাকে গৌরবান্বিত করুন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন শিলংয়ে অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন। খারাপ যোগাযোগ ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে তিনি সিলেটে আসতে চাননি। তারপরও বারবার আমন্ত্রণ জানানোতে তিনি তা ফেলে দিতে পারেননি। শিলং থেকে গৌহাটি, লামডিং, বদরপুর, কুলাউড়া হয়ে কবি সিলেটে আসেন।
রবীন্দ্রনাথের সিলেটে আসার খবর বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ে। সংবর্ধনা জানানোর জন্য গঠন করা হয় কমিটি। তাঁকে স্বাগত জানাতে বেশ কয়েকটি দল নিরলস পরিশ্রম করে। একটি দলকে বদরপুর জংশন (করিমগঞ্জ, আসাম) এ পাঠানো হয়। এ দলের সিংহ ভাগই ছিল শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নরত সিলেটের শিক্ষার্থি। তারা বদরপুর জংশনে কবিগুরুর সাথে যোগ দেয়। আরেকটি দল পাঠানো হয় কুলাউড়া রেল স্টেশনে। কবির সাথে তারা ৪ নভেম্বর ১৯১৯ তারিখে কুলাউড়া স্টেশনে রাত্রি যাপন করে। সিলেটের প্রেসবিটারিয়ান চার্চের ইথেল রবার্টস কুলাউড়ায় কবির সাথে সাক্ষাৎ করে সম্মান জানান। কুলাউড়া থেকে সিলেট আসার পথে বেশ কয়েকটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়া হয়। পথে মাইজগাঁও, বরমচাল, ভাটেরা, ফেঞ্চুগঞ্জসহ অনেক স্টেশনে কবিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিশাল বহর নিয়ে কবি যখন সিলেট রেল স্টেশনে পা রাখেন তখন খুব সকাল। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ০৫ নভেম্বর ১৯১৯, ১৯ কার্তিক ১৩২৬। রবীন্দ্রনাথের সফর সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ছেলে বউ প্রতিমা দেবী। হাজারো উৎসুক জনতা স্টেশনে সমবেত হয়। আতশবাজি ফুটিয়ে বিপুল করতালির মাধ্যমে কবিকে সিলেটে স্বাগত জানান বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ। এঁদের মধ্যে ছিলেন, সিলেটের তৎকালীন পৌর মেয়র রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী, কাপ্তান মিয়া হিসাবে খ্যাত খাঁন বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ (পরে আসামের মুসলিম মন্ত্রী), মৌলভী আব্দুল করিম, রায় বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, মহিলা সমিতির নলিনীবালা চৌধুরী প্রমুখ।
সুরমা নদীতে বজরা অনেকগুলো নৌকা প্রস্তুত ছিল। বজরায় কবি এবং অন্য একটি নৌকায় কবির ছেলে রথীন্দ্রনাথ ও ছেলে বউ প্রতিমা দেবী সুরমা পাড়ি দেন। এ পাড়ে, গান্ধী ঘাটে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রচুর মানুষ কবিকে এক নজর দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গান্ধী ঘাট সেদিন সেজেছিল ফুলে, পতাকায়, ফেস্টুনে। দিনের আলো ফুটতে শুরু করে। মৌলভী আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে একদল অশ্বারোহী কবিকে এ পাড়ে স্বাগত জানান। কবি মিষ্টি হাসিতে এসবের জবাবও দেন। ফুল দিয়ে সাজানো মৌলভী আব্দুল করিমের ফিটন গাড়িতে করে নগরীর উত্তর-পূর্ব দিকের নয়া সড়কে পাহাড়ি পরিবেশে অবস্থিত পাদ্রী বাংলোতে নিয়ে আসা হয়। পাদ্রী টমাস রবার্ট ছিলেন কবির অনুরগী। সেখানেই তিনি বিশ্রাম নেন। একই দিনে তাঁকে ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনার জবাবে তিনি নিজের কণ্ঠে গান গেয়ে শোনান ‘বীণা বাজাও হে মম অন্তরে’ এবং উপনিষদের শ্লোক আবৃত্তি করেন।
পরদিন, ০৬ নভেম্বর ১৯১৯, ২০ কার্তিক ১৩২৬, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লোকনাথ রতন মণি টাউন হল (বর্তমান সারদা হল) এ শ্রীহট্টবাসীর পক্ষ থেকে গণ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি ছিলেন খাঁন বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রায় ৫ হাজারের বেশি লোক জমায়েত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি, সংস্কৃত, মারাঠা, ফার্সি ভাষা জানতেন। তবে উর্দুর প্রতি তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল। অন্যদিকে সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ আব্দুল মজিদ ভাল ইংরেজি জানতেন। বাংলা বলায় তেমন একটা পারদর্শী ছিলেন না। সেজন্য তিনি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন। কিন্তু শেষ অবধি তিনি উর্দুতে বক্তব্য রাখেন। বক্তৃতায় তার শব্দ চয়ন ও বিন্যাস ছিল অসম্ভব সুন্দর যা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের বিমোহিত করে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও অভিভূত হন এবং চেয়ার থকে উঠে গিয়ে সভাপতিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। হলের ভিতরটা তখন প্রশংসাসূচক করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠে। অনুষ্ঠানে উকিল আম্বিলা চরণ দে’র লেখা উদ্বোধনী গান পরিবেশন করেন যতীন্দ্র মোহন দেব চৌধুরী। ‘মাতৃভাষার দৈন্য নেহারী কাঁদিল তোমার প্রাণ/ হৃদয় কমলে শ্রেষ্ঠ আসন বাণীরে করিলে দান/ পুরিল বঙ্গ নবীন আনন্দে/ উঠিল বঙ্গ পুলকে শিহরি শুনিয়া নবীন তান/ এ নহে দামামা, নহে রণভেরী, এ যে বাঁশরীর গান/ সে সুধা লহরী মরমে পশিয়া আকুল করিল প্রাণ/ সপ্ত সাগর সে সুরে ছাইল, চমকি জগৎ সে গান শুনিল/ বিশ্ব কবির উচ্চ আসন তোমারে করিলে দান/ হেথায় ফুটেনা শ্বেত শতদল, ফুটেনা হেথায় রক্ত কমল, বনফুল দু’টি করিয়া চয়ন, এনেছি দিতে উপহার/ এ দীন ভূমির ভক্তি অর্ঘ্য চরণে লভুক স্থান।’ অনুষ্ঠানে ভায়োলিন বাজিয়ে কবিকে আনন্দ দেন জামিনিকান্ত রায় দস্তিদার। সব শেষে রবীন্দ্রনাথ ‘বাঙ্গালির সাধনা’ নামে দেড় ঘণ্টা ব্যাপি বক্তৃতা প্রদান করেন। পরে তিনি এই বক্তৃতা ঞড়ধিৎফং ঃযব ভঁঃঁৎব শিরোনামে মডার্ন রিভিউ প্রত্রিকায় প্রকাশ করেন।
রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী তাঁতশিল্প এবং তাদের জীবনযাত্রা দেখার জন্য মাছিমপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া গ্রামের মণিপুরী পাড়ায় যান, নিজেদের ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু কাপড়ও কিনেন। মণিপুরীদের গোস্থা লীলা, রাখাল নৃত্য, রাশ নৃত্য ইত্যাদি খুব আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন। নৃত্য দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে পরে তাঁর নৃত্যনাটকে এসবের প্রয়োগ করেন। মণিপুরী নৃত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শান্তিনিকেতনে এ বিষয়ে কোর্স প্রবর্তন করেন। মণিপুরী নৃত্যের গুরু নীলেশ্বর মুখার্জীকে শান্তিনিকেতনে শিক্ষক নিয়োগ দেন। তার সহায়তায় চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাটকে এর সফল প্রয়োগ করেন। চিত্রাঙ্গদা নাটকটি ১৮৯২ সালে রচিত হলেও মণিপুরী নৃত্যের সংমিশ্রণ ঘটান ১৯৩২ সালে। পরবর্তীতে ‘চ-ালিকা’, ‘মায়ার খেলা’, ‘নটীর পূজা’, ‘শাপমোচন’, ‘ভানুসিংহের পদাবলি’ ইত্যাদিতে এ নৃত্যের প্রয়োগ করেন। সত্যি বলতে রবীন্দ্রনাত ঠাকুরই মণিপুরী নৃত্যকে ম-প থেকে বের করে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দেন।
রবীন্দ্রনাথ যে কয়দিন সিলেটে ছিলেন, পুরো সময়টা ব্যস্ততার মধ্যেই কাটান, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ০৭ নভেম্বর মুরারী চাঁদ কলেজ হোস্টেলে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন, পরবর্তীতে যা ‘আকাঙ্খা’ শিরোনামে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়। বক্তৃতায় তিনি মণিপুরী নৃত্যে তাঁর মুগ্ধতার কথাও বলেন। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে রবীন্দ্রনাথ এতই মুগ্ধ হন যে, তিনি তাৎক্ষণিক একটি কবিতা লিখেন এবং সিলেটকে ‘শ্রীভূমি’ নামে আখ্যায়িত করেন।
মমতাবিহীন কালশ্রোতে/ বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে/ নির্বাসিতা তুমি/ সুন্দরী শ্রীভূমি।/ ভারতী আপন পুণ্য হাতে / বাঙালীর হৃদয়ের সাথে / বাণী মাল্য দিয়া/ বাঁধে তব হিয়া।/ সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে/ বাঙলার আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।’
১৪ বছরের একটি বালক সে বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখে জানতে চান, ‘আকাঙ্খা উচ্চ করতে হলে কী করা প্রয়োজন?’। রবীন্দ্রনাথ সে চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু হয় গুরু শিষ্যের ইতিহাস। সেই বালকটি ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। শান্তিনিকেতনে কলেজ পর্যায়ে, তার নিজের ভাষায়, প্রথম ‘বিদেশি’ ছাত্র। সৈয়দ মুজতবা আলীর নিজেকে বিদেশি ছাত্র বলারও ইতিহাস আছে। তখন সিলেট ছিল ‘বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে’ দূরে, আসামের সাথে। বিষয়টি রবীন্দ্রনাথকে বেশ আহত করেছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন, সিলেট বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির লীলাভূমি, অথচ বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন। সে দুঃখবোধ থেকে তিনি সিলেটে বসে লিখেছিলেন, ‘মমতাবিহীন কালশ্রোতে/ বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে/ নির্বাসিতা তুমি/ সুন্দরী শ্রীভূমি।’
সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথকে অসম্ভব মুগ্ধ করেছিল, যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর লেখালেখিতে। সিলেট সফরের পরে প্রকাশিত দু’টি লেখায় সিলেটের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে ...ইঁটের পাঁজা পোড়ালে বিস্তর, নেপাল থেকে এল বড়ো বড়ো শালকাঠ, সিলেট থেকে চুন, কলকাতা থেকে মালগাড়ি বোঝাই করোগেটেড লোহা। ‘শেষের কবিতা’য়ও সিলেটের নাম উল্লেখ রয়েছে, ...তাই ও যখন ভাবছে, পালাই পাহাড় বেয়ে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে সিলেট-শিলচরের ভিতর দিয়ে যেখানে খুশি, এমন সময়ে আষাঢ় এল পাহাড়ে পাহাড়ে, বনে বনে, তার সজল ঘনচ্ছায়ার চাদর লুটিয়ে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT