উপ সম্পাদকীয়

গুজব কেন ছড়ায়?

মো. হাফিজুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৫৪ | সংবাদটি ৯৪৮ বার পঠিত



গুজব দিন দিন ভংয়কর আকার ধারণ করেছে। তথ্য-প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে গুজবের ব্যাপকতা তত বৃদ্ধি পেয়েছে। গুজবের ডালপালা ছড়াচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে। আসলে গুজব কী? কেন মানুষ এর পিছনে দৌড়ায়? গুজব কে ছড়ায়? তার মাধ্যম কী? গুজবে কান কারা দেয়? এ প্রশ্নগুলো মাথায় ঘোরপাক খায়, যতই গভীরে প্রবেশ করি বেরিয়ে আসে অজানা সব রহস্য। গুজব এখন মহামারী ব্যাধির মত সমাজকে অসুস্থ করে দেয়। গুজব নামক গজবে কত প্রাণ যে অকালে ঝরে যাচ্ছে তার সঠিক হিসাব হয়ত আমার কাছে নেই। কিন্তু গুজবের ভয়াবহতা আমাদের কাঁদায়।
গবেষক অধ্যাপক আফসান চৌধুরী কোন এক লেখায় বলেছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার উপর নির্ভর করে কেউ তার মতামত প্রকাশ করলে গুজবতো হবেই। আমি সহমত পোষণ করি। আজকাল আমরা খুবই সোশ্যাল মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল। অথচ সামাজিক মাধ্যমগুলো সম্পর্কে কয়জনে সঠিক জ্ঞান রাখে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ পরিপক্ক নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মত একটা গুরত্বপূর্ণ প্লাটফর্মে আমাদের ছেলেমেয়েরা দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ। আর তাদের অদক্ষতার উপর ভর করে গুজব নিয়ে আসে গজব। গুজব সবসময়ই অনাকাক্সিক্ষত সংকটের দিকে ধাবিত করে। গুজবকারীকে কেউ পচ্ছন্দ করে না। এমনকি পবিত্র কোরআনে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ বলেন, যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস নেই আন্দাজে তা প্রচার করো না। কেননা চোখ, কান ও অন্তর এ সবকিছুরই জবাবদিহিতা করতে হবে (আয়াত ৩৬)।
কিছুদিন আগে ছেলে ধরা বা কল্লা কাটা গুজবে আতঙ্কে ছিল দেশবাসী।খুবই মর্মাহত হয়েছি যখন খোদ রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সন্তানকে ভর্তি করাতে যাওয়া এক নারীকে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দেয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত মানুষের তত্ত্বাবধানে যদি এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে,তবে আমাদের সমাজ কত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও গুজবে বিশ্বাসী,তা চিন্তা করে শিউরে উঠতে হয়।
আবার দেখা গেছে পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবুল আকতারের স্ত্রীকে যখন সন্ত্রাসীরা নৃংশসভাবে হত্যা করে তখন সারা দেশের মানুষ বাবুল আকতারকে সমবেদনা জানাচ্ছে। তার প্রতি মানুষের আবেগ ভালবাসা তৈরি হয়ে যায় রাতারাতি। কিন্তু পরের দিন যখন জাতীয় দৈনিকগুলো ফলাও করে নিউজ ছাপে স্ত্রী হত্যা সন্দহে বাবুল আকতার জড়িত কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পরে আবার হৈচৈ পড়ে। বাবুলের বিরুদ্ধে বিষোদগার। তখন ঘটনার সত্য মিথ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে রটনাকারীরা গুজব ছড়ায়।
গত জুলাই মাসে গুজব ছড়ায় যে যত মশা আছে সব মরে যাবে ৫০০ গ্রাম হারপিক ও ৫০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার একসাথে মিশ্রণ করে ড্রেনে ঢাললে। নিউজটি সামাজিক মাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল, মানুষ দৌড়ায় হারপিকের পিছনে। যদিত্ত এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তারপরও সচেতন সমাজের একটা অংশকে এ ধরণের গুজবে বিশ্বাস করতে দেখে অবাক হই।
ভোলায় যে ঘটনা ঘটেছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডি থেকে আমাদের নবীকে কটূক্তির প্রতিবাদে ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী জড়ো হয়েছিল কিন্তু সেখানে এলাকাবাসীকে ফুঁসিয়ে দিয়ে বড় ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করতে চেয়েছিল একটি মহল। ভুল তথ্যে দিয়ে প্রভাবিত করতে চেয়েছিল গুজবকারীরা। এখানে অবশ্যই প্রশাসনের ব্যার্থতা রয়েছে। পুলিশ কেন গুলি করতে গেল? তাদের এ অধিকার দিল কে? আর কোন অপরাধী যদি অপরাধ করেও থাকে তাহলে তাকে কেন আইনের আওতায় আনা হয় না? যদি কেউ ভুল তথ্যে দিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করে তাহলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পদক্ষেপ নিবে। পাশাপশি মানুষের উচিত ঘটনাটি কতটুকু সত্য তা যাচাই করা। রামুর ঘটনা দেশবাসী এখনো ভুলেনি।
গুজব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ১৯৪৭ সালে, আমেরিকান মনোবিজ্ঞানি গর্ডন অলপোর্ট এবং লিও পোস্টম্যান ঞযব চংুপযড়ষড়মু ড়ভ জঁসড়ৎ বইতে গুজব রটানোর ছয়টি উল্লেখযোগ্য কারণ তুলে ধরেন। ১. অনিশ্চয়তা থাকলে লোকেরা গুজব ছড়িয়ে দেয়, ২. মানুষ যখন উদ্বেগ অনুভব করে তখন গুজব ছড়ায়, ৩. ইনফরমেশন অতি গুরুত্বপূর্ণ হলে লোকেরা গুজব ছড়ায়, ৪. লোকেরা যখন তথ্যে বিশ্বাস করে তখন গুজব ছড়ায়, ৫. লোকেরা যখন তাদের আত্ম-চিত্রকে সহায়তা করে তখন গুজব ছড়ায়, ৬. মানুষ যখন তাদের সামাজিক অবস্থানকে সহায়তা করে তখন গুজব ছড়ায়। আবার আমি মনে করি, তথ্যে যাচাই বাছাই এর একটি অন্যতম কারণ হতে পারে যা লোকজন না করে সহমত পোষণ করে।
প্রযুক্তির এ যুগে এসে আমরা নিজেদের খুবই স্মার্ট মনে করি। কিন্তু আসলে কী তাই? স্মার্ট হওয়া কি এত সহজ যেভাবে চাইলাম সেভাবে নিজেকে তুলে ধরলাম। প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তির যে ঢেউ বইছে তা সইতে পারছে না আমাদের সমাজের একটি অংশ। বিশেষ করে তরুণরা বিপথগামী হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এর জন্য অবশ্য আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা দায় এড়াতে পারে না। অভিবাবকদের কথা ত এখন বলিই না। অথচ ছেলমেয়েরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় পরিবারের কাছ থেকে। অভিবাকদের পর্যবেক্ষণ এবং তদারকী সন্তান কখনো বিপথগ্রস্থ হতে পারে না। সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে তরুণরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
তাছাড়া, অনেকে গুজব ছড়ানোর পিছনে সামাজিক মাধ্যম সমূহকে দায়ি করেন। তাদের যুক্তি এরকম আমরা যদি একটু পিছনের দিকে তাকাই অর্থাৎ বিশ বাইশ বছর আগে কিন্তু এরকম ছিল না, তখন কিন্তু ছড়ানোর মাধ্যম কম ছিল। সোজা কথা তারা ইন্টারনেটকে দোষারোপ করছেন। হা, তাদের বিশ্লেষণে যুক্তি আছে, তবে আমি একজন অনলাইন এক্টিভিষ্ট হিসাবে মানতে নারাজ। গুজব আগেও ছিল এখন আছে তবে বর্তমানে মাধ্যমের পরিবর্তন হয়েছে। আগে প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্য গুজব ছড়াত তবে ধীর গতিতে, কিন্তু এখন ছড়ায় তড়িৎ গতিতে।
১৯৯১ সালে, একটি বিস্তৃত গুজব আফ্রিকান আমেরিকান সম্প্রদায়কে ঘিরে ঘটেছিল।গুজবটি ছিল যে সোডা ব্র্যান্ড, ট্রপিকাল ফ্যান্টাসি সোডা পপ, কু-ক্লাক্স-ক্লান তৈরি করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সোডা একটি বিশেষ সূত্র দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল যা কালো পুরুষদের জীবাণুমুক্ত করে তোলে। অবশ্যই, এটি কেবল একটি গুজব ছিল এবং এটি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তবুও, গুজবের পরে সোডা বিক্রয় ৭০% হ্রাস পেয়েছিল এবং এমনকি লোকেরা কোম্পানির সরবরাহকারী ট্রাকে আক্রমণ করে যা তাদে ক্ষতির সম্মুখীন করে। কাজেই গুজব অনেক আগ থেকেই।
ইন্টারনেটের ভাল দিক যদি ব্যাবহার করা হয় তাহলে অবশ্যই মানুষ উপকৃত হবে। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে এসেও মানুষ ভুল তথ্যে উপর বিশ্বাস করে অভিমত প্রকাশ করে। এটাকে কি বলব মূর্খতা না অজ্ঞতা? যেমন অধিকাংশ মানুষ ফেসবুকের সঠিক ব্যাবহার জানে না। সচরাচর যা লক্ষণীয় ছেলেমেয়েরা না বুঝে, না পড়ে ফেইসবুকে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করে যা পরবর্তীতে সমাজে একটা বিরুপ প্রভাব পড়ে। আর এই শেণ্রীটাকে পুজিঁ করে উগ্রবাদী অপরাধীরা গুজব ছড়ায়। যার পরিপেক্ষিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করা শ্রদ্ধাবোধ না থাকা গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে না উঠা অনেকাংশে দায়ি। অদক্ষতা আর একটি বড় কারণ।
মার্ক জুকারবার্গ যখন হার্ভার্ডের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন তখন তিনি সহপাঠী এডুয়ার্ডো সাভারিন, ডাস্টিন মোসকোভিটিজ এবং ক্রিস হিউজের সাথে ফেসবুক আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্যে ছিল সহপাঠী বন্ধু বান্ধবদের কীভাবে এক নেটওয়ার্কের মধ্য আনা যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, ওয়েবসাইটটি শুধু যে বাংলাদেশে তা নয় সারা বিশ্বে অপব্যবহার করা হচ্ছে, তবে উন্নত দেশসমূহে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, তারা ফিল্টার করে। জুকারবার্গ এখন হয়ত আফসোস করছে, তবে তার উদ্ভাবন ভুল ছিল না। আমাদের ব্যবহার পদ্ধতি ভুল।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT