উপ সম্পাদকীয়

মানবতার কল্যাণে মহানবী

ডা: মাও: লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৬:২৭ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাক্সক্ষী এবং বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করে। (সূরা আল আহযাব-২১)। বিশ্বমানব সভ্যতার ইতিহাসে হজরত মুহাম্মদ সা: সর্বপ্রথম এমন এক সভ্যতা সংস্থাপন করলেন, যা ছিল সত্যিকার অর্থেই মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ। তাঁর আগমনপূর্ব যুগটি ছিল দলাদলি, হানাহানি ও রক্তারক্তির যুগ। মানুষে মানুষে ছিল রক্ত, বর্ণ, ভাষা ও আভিজাত্যের দুর্লঙ্ঘনীয় প্রাচীর। সমাজ ছিল তখন পশুত্ব ও পৌত্তলিকতার নিকষ কালো অন্ধকারে আচ্ছাদিত। মানুষ ছিল তখন শান্তিহারা, অধিকারহারা, নির্মমভাবে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত। নারী জাতির অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। এককথায় তৎকালীন মানবসমাজে মুক্তি, শান্তি ও প্রগতির আশা হয়ে উঠেছিল সুদূরপরাহত। মানব ইতিহাসের এই ঘোর দুর্দিনেই বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: মানবতার মুক্তির সনদ নিয়ে সুন্দর এই বসুন্ধরায় আগমন করেছিলেন। আধুনিক সভ্যতার সব ভালো, সব সুন্দরের ভিত্তি মহানবি সা:-ই স্থাপন করেছিলেন। মূলত তাঁর আগমনই ছিল মানবকুলের জন্য অপূর্ব নিয়ামত, রহমত ও চিরন্তন শান্তির মহান সওগাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।’(সূরা আম্বিয়া : ১০৭)।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে সভ্য জগৎ বিশৃঙ্খলার চরমপর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। মানবজাতি বর্বরতার এমন এক চরম অবস্থায় ফিরেছিল যেখানে প্রতিটি জাতি, গোত্র একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব-বিবাদে লিপ্ত ছিল, আইনশৃঙ্খলা ছিল না, শৃঙ্খলার বদলে বিভেদ ও ধ্বংসের কাজ চলছিল। এমনি একসময় বিশ্বজগতের জন্য, তিনি বিশ্বমানবতাকে এমন এক সভ্যতা দান করলেন, যা তাওহিদ ও রিসালাতের নীতি দিয়ে গঠিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।’(সূরা আলে ইমরান : ১৯) । অর্থনৈতিক মুক্তি : প্রিয়নবী সা: বিশ্বমানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম ধনসম্পদে দরিদ্রদের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করেন। দারিদ্র নিরসনে মহান আল্লাহর বাণী, ‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।’ এই বাণীর প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে মহানবী সা: মানবজীবনের অন্যান্য দিকের মতো অর্থনৈতিক দিকেরও বাস্তব সমাধান দিয়ে গেছেন। সুদভিত্তিক ঋণ, জুয়া, লটারি ইত্যাদি শোষণমূলক ব্যবস্থা চিরতরে নিষিদ্ধ করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণে আজো মানবজাতিকে রাষ্ট্রের দাসত্ব ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে প্রকৃত আজাদ ও সুখী করা সম্ভব।
মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে একটি সত্যনিষ্ঠ বিশ্বভ্রাতৃসমাজ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই যে কেবল একটি সত্যিকার শান্তির পৃথিবী সংস্থাপন করা সম্ভব সেই শিক্ষা প্রিয়নবী সা: দিয়েছেন এবং সেই শান্তির দুনিয়া গড়ার নমুনা হিসেবে মদিনা মুনাওয়ারায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। একনায়কত্ব ও রাজতন্ত্রের চির অবসান ঘটানো সেই রাষ্ট্র বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে দীর্ঘকালব্যাপী সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে। আজকের যে রচম উৎকর্ষ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা সেই সভ্যতারই ফসল। তাই তো পাশ্চাত্যের খ্যাতিমান মনীষী জর্জ বার্নার্ড শ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, `I believe if a man like Mahammad (sm) were to assume the dictatorship of modern world, he would succeed in solving the problems in way that would bring much beaded peace and happiness’.
ষষ্ঠ শতকের আরব ছিল পাপের কলুষ কালিমায় আচ্ছান্ন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ছিল তখনকার প্রচলিত নীতি। এককথায় নির্যাতিত মানবতা অমানুষিক পশুশক্তির শিকারে পরিণত হয়েছিল। এরূপ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মুক্তির নিশ্বাস ফেলার জন্য গুমরে মরছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত অসহায় মানুষের আত্মা। এ অবস্থায় মহানবী সা: ঘোর অজ্ঞানতার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বসমাজে ইসলামের সুবিমল জ্যোতি বিকিরণ করেন। নিঃস্ব ও অসহায়দের সেবা, অত্যাচারীদের বাধা প্রদান, বঞ্চিতদের আশ্রয় এবং বিভিন্ন গোত্রের মাঝে পারস্পরিক শান্তিশৃঙ্খলা ও সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা প্রভৃতি কর্মসূচি সামনে রেখে যৌবনকালে তিনি যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে কল্যাণধর্মী একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করে গেছেন সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়। আজকের এ ঝঞ্চাবিক্ষুব্ধ সমাজেও মহানবীর সা: আদর্শ অনুসরণে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বিখ্যাত মনীষী David Urquhart বলেন, `Let them investigate fully for themselves : Let them read the Holly Quran, Let them try to understand and they may find peace which all are seeking’.
ইসলাম আগমনের আগে দুনিয়া নারীকে অকেজো ও অকল্যাণকর সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিপন্থী বা তার প্রতিবন্ধক মনে করে জীবনের কর্মক্ষেত্র থেকে একেবারে বাইরে ফেলে দিয়েছিল। তাকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, নিষ্ক্রিয়তার এমন এক গহবরে যেখান থেকে উঠে আসা ও উত্থান-অগ্রগতি লাভ করা কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। মানবতার পরম বন্ধু মহানবী সা: তাদের এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। নারী সমাজকে হীনতার নি¤œতম স্তর থেকে তুলেছেন অনেক ঊর্ধ্বে। দিয়েছেন তাদের তুলনাহীন মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার। দিয়েছেন সামাজিক আর্থিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা। সম্পদে নারীর অধিকার করেছেন প্রতিষ্ঠা। ঘোষণা দিয়েছেন, নারী-পুরুষ উভয়ে উভয়ের জন্য ভূষণস্বরূপ। মেয়েদের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী সা: বলেন, ‘নিশ্চয় সন্তানের বেহেশত মায়ের পদতলে।’ সম্মান, সেবা ও সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে মায়ের কথা তিনি তিনবার উল্লেখ করেছেন এবং একবার উল্লেখ করেছেন বাবার কথা।
বর্তমান বিশ্বে ‘নারী অধিকার’ ইস্যু নিয়ে যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে এবং ব্যয়িত হচ্ছে লক্ষকোটি বিলিয়ন ডলার তার সমাধানে আল্লাহ প্রদত্ত ও মহানবী সা: প্রদর্শিত বিধান মেনে চললেই নারী অধিকারসহ বিশ্ব মানবতার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সভ্যতার প্রধান উপাদান শিক্ষা। আর সুশিক্ষা হচ্ছে আদর্শ মানুষ ও সমাজ বির্নিমাণের হাতিয়ার। তাই মহানবী সা: বলতেন, ‘হে আল্লাহ! যে জ্ঞান উপকারে আসে না আপুনার কাছে তা থেকে পানাহ চাই।’ মানুষ কেবল অন্যান্য জীবের মতো নয়, বরং আধ্যাত্মিক তথা আদর্শিক জীবও বটে। যৌক্তিকতার মানদ-ে উন্নত মানুষই প্রকৃত মনুষত্বের মানদ-। মহানবী সা: বলেছেন, ‘পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম আর কিছুই দিতে পারে না।’ Stanely Hall যথার্থই বলেছেন`if you teach your child the three `R’ Reading writing  and Arithmetic and leave the 4th `R’ Religion you will get a 5th  `R’ Rascality.তাই মহানবী সা: প্রত্যেক নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক (ফরজ) করে দিয়েছেন।
সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির দর্পণ। সংস্কৃতি হচ্ছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, ধ্যানধারণা, নৈতিকতা, নিয়মকানুন, আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক-পরিচ্ছদ, সাহিত্য, ঐতিহ্য সব কিছুর সমাহার। মহানবী সা: যে সাংস্কৃতিক সৌকর্য স্থাপন করেছিলেন তা মানবতার প্রকৃত মর্যদা নিরূপণ করে দেয়। প্রিয় নবী সা: যে সংস্কৃতি সংস্থাপন করলেন তার দিকনির্দেশনা কুরআন মাজিদের ‘ঈমান আনো ও সৎকর্ম করো’ এ নির্দেশেরই বাস্তবায়ন। পাপ-পঙ্কিলতা, অসভ্যতা ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাই হচ্ছে তাকওয়ার মূল আবেদন। এর আলোকেই গড়ে ওঠে এক অনন্য সভ্যতা যা বিশ্ব মানব ইতিহাসে সুন্দরতম সভ্যতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আর সে সভ্যতার আলোকধারা পৃথিবীর মানুষকে আলোকিত করে আসছে যুগপরম্পরা মহানবী সা:-এর বদৌলতেই। প্রকৃতই মহানবী সা: বিশ্বকে যে সভ্যতা শিক্ষা দিয়েছেন তা অনন্যতায় ভাস্বর। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক নীতি, ধর্মীয় নীতি অর্থাৎ মানব জাতির প্রয়োজনের সর্বক্ষেত্রের জন্য তিনি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা দিয়েছেন ও সেগুলো স্থাপন করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে সুন্দরতম আদর্শ।’ (সূরা আহজাব: ২১)। তাই সৎকাজে তোমরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা কর, কল্যাণসমূহকে যথাযথভাবে প্রাপ্ত হওয়ার জন্য।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT