ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ

বিজিত কুমার আচার্য্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-১১-২০১৯ ইং ০০:৪০:২৩ | সংবাদটি ২২২ বার পঠিত

নৌকা বাইচ এর সঠিক ইতিহাস আজও জানা যায় নি। তবে বাইচ শব্দটি ফার্সি। এর অর্থ হল বাজি>বাইজ> বাইচ/প্রতিযোগিতা/ খেলা। কালের পরিক্রমায় ‘মেসোপটমিয়ার’ মানুষের শুরু করা নৌকা বাইচ খেলা আমাদের দেশেও চলে আসে। যা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এরকম নৌকা বাইচের আয়োজন করত। এরপর মিশরের নীল নদ এবং ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ছড়িয়ে পড়ে। ‘বাইচ’ শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে মধ্য যুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীরা যাদের নৌবাহিনী ছিল তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের নদীকেন্দ্রিক নৌশিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে দু’টি জনশ্রুতি আছে।
জগন্নাথ দেবের ¯œানযাত্রা উপলক্ষে ¯œানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকা নিয়ে মাঝিরা নদী পারাপারে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। এ থেকেও নৌকা বাইচের শুরু জনশ্রুতি আছে।
পীর গাজীকে কেন্দ্র করে আটারো শতকের শুরুর দিকে মেঘনা নদীর এক পারে দাঁড়িয়ে অন্য পারে থাকা ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোন নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলে তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হয়। নদী ফুলে ফেঁপে উঠল। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসেন। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়া পত্তন।
সিলেট অঞ্চলে নৌকা বাইচ বহু পুরাতন হলেও তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাহেব এবং সিলেটের সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক মরহুম আব্দুজ জহুর চৌধুরী, জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরী সাহেবের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলালিংক টেলিকমিউনিকেশনের উদ্যোগে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট সুরমা নদীতে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন রূপ লাভ করে।
নৌকার গঠন ও নাম :
নৌকা বাইচের নৌকা হয় সরু এবং লম্বাটে। কারণ সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুত গতিতে চলতে পারে। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয়। কখনো ময়ূরের মুখ, কখনো রাজ হাঁসের মুখ বা পাখির ঠোঁটের অবয়ব তৈরি করে নৌকা বানানো হয়ে থাকে। এতে অতি উজ্জ্বল রং করে ফুল, লতা, পাতা, আরো অনেক রকম জিনিস এঁকে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে থাকেন। সিলেট অঞ্চলে সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহার করা হয়। এর আকার কোশা ও ছিপ জাতীয় বাইচের নৌকার মতই সরু, লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৫-৬ ফুট হয়। নৌকা তৈরিতে সাধারণত শাল, শীল কড়ই, গর্জন, জারুল কাঠ ব্যবহার করা হয়। নৌকাগুলোর নামও রাখা হয় ভিন্ন ভিন্ন। যেমন সোনার তরী, পঙ্খীরাজ, ময়ূরপঙ্খী ইত্যাদি।
নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিকতা :
নৌকা বাইচের আগে মাঝিরা প্রথমে পাক পবিত্র হয়ে বা গোসল করে নতুন গেঞ্জি আর মাথায় গামছা পরে নৌকায় উঠে। তাদের কারো কারো হাতে থাকে কাঁসর, করতাল ঢোল, ডপকি। সবার মাঝখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। প্রতিটি নৌকায় ৭,২৫, ৫০, ১০০ জন মাঝি থাকতে পারেন। নৌকার দুই পাশে মাঝিরা সারি বেঁধে বসে পড়েন বৈঠা হাতে নিয়ে। একজন নৌকা পরিচালনা করার জন্য থাকেন তাকে গায়েন বলা হয়। তিনি বসে থাকেন নৌকার গলুইয়ে। মাঝিরা একত্রে নৌকা জয়ধ্বনি করে ছাড়ার সাথে সাথে সমবেত স্বরে গান ধরে থাকেন এবং ঝোঁকে ঝোঁকে বৈঠা টানতে থাকেন সেই সাথে নৌকাও এগিয়ে যেতে থাকে। সবার নৌকা যখন ছুটতে থাকে তখন প্রতিযোগিতা শুরু হয় । কার আগে কে যেতে পারে। সমস্বরে ঝোঁক তুলে গাইতে থাকে হৈ হৈ হৈয়া হৈ হৈয়া। নৌকার গতিও বেড়ে যায় অনেক। নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় দূরত্ব হয় ৬৫০ মিঃ। এক নৌকা থেকে আরেক নৌকার দূরত্ব থাকবে ১০ মিঃ।
নৌকা বাইচের গান :
নৌকা বাইচের গানকে সারি গান বলা হয়। এ গান শ্রমিকের গান হিসাবে পরিচিত। সিলেট অঞ্চলের অনেক মরমী সাধক নৌকা বাইচ নিয়ে অসংখ্য সারি গান লিখে আমাদের সাহিত্য ভান্ডারকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। শ্হা আব্দুল করিম লিখেছেন-১) আল্লার নাম, নবীর নাম লৈয়ারে ২) কোন মেস্তরী নাও বানাইল ৩) মহাজনে বানাইয়েছে ময়ূরপঙ্খী নাও ইত্যাদি, হাছন রাজা লিখেছেনÑছাড়িলাম হাছনের নাওরে; সৈয়দ শাহ নুর লিখেছেন-পাক পানি চিনিয়া নাও বাইও ; ও সোনা ভাবী গো লিখেছেন তৈমুর রাজা চৌধুরী; এছাড়া অজ্ঞাত শিল্পীদের মধ্যে প্রচলিত গানগুলো হলÑরঙ্গিলা মাঐ গো, সোনামুখীর জামাই আইছে, সোনা দাদার বৌ গো ইত্যাদি।
আমাদের নৌকা বাইচের নদীগুলো সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, মহসিং, বাদাঘাটের চেঙ্গের খাল সহ অনেক নদী দখলদারদের দখলে গিয়ে নদীর প্রকৃত গতিপথ হারিয়ে ফেলছে। সেই সাথে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে নৌ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আমাদের উচিত অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদীর দখলমুক্ত করে নদী শাসন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতি নৌকা বাইচ সহ আরো অনেক সংস্কৃতি সমূহকে পুনঃরুদ্ধার পূর্বক আমাদের লালিত স্বপ্ন আমাদেরই মাঝে বেঁচে থাকুক অম্লান।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT