ধর্ম ও জীবন

দেনমোহর নিয়ে যতো কথা

কাজী শাহেদ বিন জাফর প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-১১-২০১৯ ইং ০১:০৮:২৮ | সংবাদটি ৩৬০ বার পঠিত

মোহর আরবী শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ হলো মাল বা সম্পদ। আর শরিয়তের পরিভাষায় স্ত্রীর যৌনাঙ্গ উপভোগ করার বিনিময়ে স্বামীর পক্ষ হতে বিবাহের সময় যে সম্পদ লাভ করে কিংবা আদায়ের প্রতিশ্রুতি পায়, তাকে মোহর বলে।
মোহর আবার দুই প্রকার :
১. মূয়জ্জল- তলেবী অর্থাৎ- তাৎক্ষণিক আদায়। ২. মূয়াজ্জল- মিয়াদী বা ক্রমান্নয়ে পরিশোধ। মানুষ গর্ব ও খ্যাতির অন্ধ মোহে অনেক সময় বড় অংকের মোহর ধার্য্য করে থাকে। অথবা কখনো স্বামী যাতে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ছেড়ে যেতে না পারে। আবার এও দেখা যাচ্ছে স্ত্রীর অসহায়ত্বের দিক বিবেচনা করে অনেকে কম মোহর ধার্য্য করে থাকেন। সাথে স্ত্রীকে যতো সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় দিলে বাঁেচ। ইসলামি শরিয়তের এ ধরনের বুদ্ধি বৃত্তিক কোনো কৌশলই বিবেচনায় গ্রহণযোগ্যতা নেই। রাসুল (সা.) বলেন। ‘স্বল্প ব্যয় বিশিষ্ট বিবাহ অধিক বরকতময়’।
হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতেমা (রা.) বিবাহে স্বয়ং আল্লাহর হাবিব রাসুল (সা.) পাঁচশত দিরহাম ধার্য করেন। ‘আশরাফুল হেদায়া এবং ভাষায় গভীরভাবে বিচার বিশ্লেষণ পূর্বক লিখক এ হিসেব বের করেছেন। যারা মোহরে ফাতেমী ধার্য্য করতে চান তাদের উচিত ৫০০ দিরহামের বাজার মূল্য রুপার দাম নির্ধারণ করতে হবে। ৫০০ দিরহাম= ১৩১ তোলা তিন মাশা= ১৫৩১ গ্রাম প্রায়, বাজার মূল্য যতো ততো হবে। যদি নগদ আদায় করতে চায় সুন্নত মনে করে। কিন্তু শুধুমাত্র একে সুন্নত ভাবাও ভুল, কেননা রাসুল (সা.) নিজের বিবাহের মোহর হাজার দু’হাজার দিরহামেও রয়েছে।
কোনটি নির্ধারণ করবেন?
আমাদের চলমান সমাজ ব্যবস্থায় পরিশোধযোগ্য স্ত্রীর দেহ দানের বিনিময়ে যে অর্থ বা সম্পদ বিবাহের সময় প্রাপ্ত হয় এনিয়ে অধিকাংশ মানুষই ভ্রান্ত ধারণায় লিপ্ত রয়েছে। তারা মোহর নির্ধারণে বিভিন্ন অজুহাত উপস্থাপন করেন, যাতে কমিয়ে করা যায়। আবার এই কর্মের বিপরিতেও অনেক মজলিশে পারিবারিক ইমেজ ও বংশের মর্যাদার দোহাই দিয়ে মোহরের পরিমাণ অনেক গুণ বাড়িয়ে দেন। পরিশোধের ক্ষমতা বা সাধ্য আছে কিনা তা চিন্তা করে না এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারনা। এই ধারনা পরিহার করতে হবে। কেননা এই ধারনা বা প্রথা ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের প্রতি আঘাত করে। এই জন্যই যে, বিবাহের আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ব মজলিশে মুরব্বীয়ানদের আলোচনায় প্রথমেই উপলদ্ধি করা উচিত। বরের সঙ্গতী, সাধ্য ও সচ্চলতার বিষয়টি মাথায় রেখে মোহর নির্ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন। আর এ-প্রয়োজনীয় ও পরিশোধ যোগ্য (ঋণ) কতোটুকু ন্যায় বিচারে বুদ্ধি সম্মত তাও উপলদ্ধি করা উচিত। মাওলানা শাহ মেহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাহেবের লিখিত ‘মোহর’ বই খানা আমার পড়া হয়েছে। তিনি মোহরের বিভিন্ন দিক নিয়ে অতি সুন্দর ও সুচারু আলোচনা করেছেন তার বইটিতে।
মানব জগতে প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ মত ও পথ যার যার আলাদা রয়েছে। জীবন ও জিবিকা ভিন্ন ভিন্ন তাই মানব জগতে এমনও মানুষ রয়েছে একদিনে যে পরিমাণ উপার্জন করতে পারে, তার বিপরিতে এমন মানুষও আছে এক বছর তথা সারা জীবনে তার সমপরিমাণ অর্জন করতে পারে না। এছাড়াও একজন ধনী বা সম্পদশালী লোক একদিনে বা বিশেষ দিনে যে পরিমাণ খরচ করে। একজন গরীব মানুষ সারা জীবনেও সে পরিমাণ খরচ করতে পারেনা। ইসলামি শরিয়া ব্যক্তির উপার্জন ও আয় ব্যয়ের দিক চিন্তা করে দায়িত্বের বোঝাও চাপিয়ে দেয়। যা সে অনায়াসে বহন করতে পারে। অনুরূপ বিবাহের বেলায়ও দেন মোহর নির্ধারণের জন্য বলা হয়েছে। যাতে বর ও কনের প্রতি কোনো রূপ জুলুমের শিকার কোনো একজন না হয়।
এই মোহর লিখিত ও মৌখিক হতে পারে। আর তা হতে হবে প্রচলিত টাকা অথবা ক্রয়-বিক্রয় যোগ্য বৈধ জিনিসপত্র মোহর হিসেবে ধার্য্য করা যেতে পারে। যেমন- নগদ অর্থ, ব্যবসার মাল, ভূ-সম্পত্তি, কোম্পানীর শেয়ার বা লভ্যাংশ ও ইমারত প্রভৃতি নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে স্ত্রীকে মোহর হিসেবে যা দেওয়া হয় তার উপর পূর্ণ অধিকার তথা- আয়-ব্যয়, ক্রম-বিক্রয়ে স্ত্রীর পূর্ণ দখল দিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে স্ত্রীর মোহর পরিশোধ না করে মারা গেলেও মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদ হতে উদ্ধার করে নিতে পারবে। স্ত্রীর এ-হক হতে বঞ্চিত করার কৌশলে বা দায়ে ফেলে মাফ চাইলেও তা মাফ হবার নয়। মোহর অবশ্যই পরিশোধ যোগ্য ঋণ। যা তার গায়ে হাত দেবার আগেই শোধ করা উচিত ছিল। আর এ-মোহরের কারণেই বিবাহ বন্ধনের সুচনা সৃষ্টি করে। স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ জন্মায় তাকে পাওয়ার জন্য। যদি তা পরিশোধ আগে বা পরে হয়ে থাকে।
সে বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইসলাম সর্বোনি¤œ মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে ১০ দিরহাম। আল্লাহর রাসুল (সা.) এর বাণী ‘১০ দিরহামের কমে কোনো মোহর নেই’। (আশরাফুল হেদায়া)
কিন্তু সর্বোচ্চের কোনো পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। তার নীতিমালা হচ্ছে বরের আর্থিক সঙ্গতি, সচ্চলতা ও সাধ্যের উপর নির্ধারণ হতে হবে। ১০ দিনার হতে হাজার লাখ কোটিতে যেতে পারেন কোনো বাঁধা নেই। তবে বরের পরিশোধ ও সাধ্যের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আজ হয়তো বরের যে অবস্থা আছে, কাল এই অবস্থা নাও থাকতে পারে। তাই পরিমিত বিষয়টা বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক।
আজকাল এও দেখা যাচ্ছে বিবাহে যে পরিমাণ খরচ করার কথা তার চেয়ে ১০/২০ গুণ খরচ করে থাকেন অনইসলামিক আচার অনুষ্ঠানে। শেষ পর্যন্ত কাজী সাহেবের খাতায় লিপিবদ্ধ করিয়ে নেবার পর রেজিঃ ফিসটাও যথা নিয়মে আদায় করতে পারে না। ৫ হাজার টাকা ফিসের বেলায় ২/৩ হাজার টাকা দিয়ে নির্লজ্জের মতো এক কুড়ি দলিলদের সহায়তায় মাফ চায়। দেখেন মূলের মধ্যে কতো গয়লত। এ হতে ভালো ফসল কিভাবে আশা করা যায়। যা ইসলাম সহ্য করতে পারে না বলে ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই’ আখ্যা দিয়েছে।
আমাদের সমাজে আরেকটি রেয়াজ রয়েছে। ছেলের পক্ষে ওকালতি করতে যেয়ে মোহর কমিয়ে মেয়েকে ঠকাতে চায়। আবার মেয়ে পক্ষের ওকালতি করতে গিয়ে যুক্তিক অজুহাত ও কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করেন ছেলের সাধ্যের বাইরে ১০/১৫ গুণ বাড়িয়ে মোহর ধার্য্য করে থাকেন। আর ইউরোপ আমেরিকার গন্ধ হলে তো সীমার শেষ নেই। এর জন্য মজলিশের মুরব্বীয়ান যে বা যারা, বিবাহের ফয়সালায় মাতেব্বরী করেন এরাই এর দায়টা বরের ঘাঁড়ে চাপিয়ে দেন। এটা আদৌ উচিত নয়। আল্লাহর বাণী ‘আমি এমন কোনো দায়িত্ব কাউকে চাপিয়ে দেইনি, সে তা’ বহন করতে পারবেনা’।
মনে করেন একজন ছেলে সে বিবাহ করবে তার সঙ্গতি পর্যালোচনা করে দেখা গেল মোহরানা ২ লক্ষ টাকা ধার্য্য করলে কোনো মতে আদায় করা সম্ভব। কিন্তু বিবাহের মজলিশে উভয় পক্ষের আলোচনায় দেন মোহর ধার্য করা হলো ৫ লক্ষ টাকা। তারা আদৌ পরিশোধ যোগ্য ওয়াজি এই ঋণটা ছেলেটির ঘাঁড়ে অনায়াসে চাপিয়ে দেন। তারা একবার চিন্তাও করলেন না যে, তা শোধ করার ক্ষমতা ছেলেটির আছে কী না। খোদায় না করুক বিবাহের আনুষ্ঠানিকতার পর পর শুধু এক বার মিলন করেই মারা গেল। তার উপর স্ত্রীর মোহর আদায় ৫ লক্ষ টাকার ঋণ আদায় করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। এমন কি সহবাস না করেই যদি মারা যায়। তার উপর অর্ধেক মোহর আদায় করতে হবেই, মেয়েকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকতার আলাপচারিতার কারণে তার মর্যাদা স্বরূপ। ছেলেটির রেখে যাওয়া সম্পদ হতে। অন্যতায় দায়ী থাকলে। কিন্তু ঐ মাতেব্বররা ছেলেটার এই পরিমাণ সম্পদ আছে কিনা তাও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করে না? তার জন্য দায়ী কে? পাঠক তার বিচার করুন।
এই চলমান ভ্রান্ত সমাজের পরিবর্তন করে ন্যায় ও ইনসাফের ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে পাত্র-পাত্রীদের এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন হতে হবে, এই পরিশোধ যোগ্য মোহরের ওয়াজিব এ ঋণের ব্যপারে। ভালো চাষে উন্নত ফসল লাভের আশায়। আসলে ওয়াজি এ ঋণটি অধিকাংশের বেলায় কোনো কালেই পরিশোধ করা হয় না। স্ত্রীও স্বামীর বন্ধন ও মনের পরিবর্তনের ভয়ে কোনো দিন মোহর আদায়ের ব্যপারে মুখ খুলে না। [অসমাপ্ত]

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম ও তিরমিজি
  • নবীজিকে ভালোবাসার দাবী সমূহ
  • বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী (রহ.)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • কুরআন চর্চা অপরিহার্য  কেন 
  • একদিন নবীজির বাড়িতে
  • বেহেস্তের সিঁড়ি নামাজ
  • দেন মোহর নিয়ে যত কথা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • মানব সভ্যতায় মহানবীর অবদান
  • মানব সভ্যতায় মুহাম্মদ (সা.) এর অবদান
  • দেনমোহর নিয়ে যতো কথা
  •   উম্মাহাতুল মুমিনীন
  • ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম
  • তাফসিরুল কোরআন
  • রাসূল (সা.) এর প্রতি মুহব্বত ও আহলে বাইত প্রসঙ্গ
  • মহানবীর প্রতি ভালোবাসা
  • Developed by: Sparkle IT