পাঁচ মিশালী

আধুনিক বোরো ধানের বীজ শোধন পদ্ধতি

বিপ্রজিৎ কুমার দেব প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৯ ইং ০০:১৯:৪৪ | সংবাদটি ৩৫৭ বার পঠিত

বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে সব চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। কারণ তখন হাওর অঞ্চলে ধান চাষাবাদ করা যায় এবং বোরো ধানের ফলন বেশি হয়ে থাকে। সিলেট হচ্ছে হাওর বাওর এর দেশ। সিলেটে রয়েছে ছোট বড় অনেক হাওর। যেখানে বছরে একবার ধান চাষ করা সম্ভব। এসব জমি বছরের ৬ মাস পানির নিচে থাকে আর ৬ মাস ধান চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত। নদীর পলি মাটি বর্ষার সময় জমিতে পড়ার কারণে জমি উর্বর থাকে। এর কারণে বোরো ধান চাষাবাদ করা আরো সহজ করে দেয়। আমাদের দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহ বোরো ধানের অনেক জাত আবিষ্কার করছেন। তার মধ্যে হাওর অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য বেশ কিছু ভাল জাত রয়েছে। মওসুম, জমি ও চাষের অবস্থা অনুযায়ী জাত নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে মনে রাখতে হবে যে সব জাত সব মৌসুম ও অবস্থায় উপযোগী নয়। আমাদের সিলেটের জন্য উপযোগী বোরো ধানে কিছু আধুনিক জাত রয়েছে যা চাষাবাদের ফলে আমাদের ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। সিলেটে বোরো ধান উৎপাদনের সমস্যা হচ্ছে ধানের ফুল ফোটার সময় অধিক ঠান্ডার কারণে ধানের চিটা হয়ে যাওয়া। আমরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক জাতের বীজ বপন করতে পারি আর সঠিকভাবে চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে ধান চাষাবাদ করতে পারি তাহলে এই সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ধান চাষাবাদে রোগের আক্রমণও একটি বড় সমস্যা। আর ধানের যেসব রোগ বেশি ক্ষতি করে থাকে তার বেশির ভাগ রোগের জীবাণু বীজের মাধ্যমে ছড়ায়। ধানের বীজ বাহিত রোগসমূহ হচ্ছে ধানের বাকানী রোগ, খোল পচা রোগ, ধানের বাদামী দাগ রোগ, ব্লাস্ট রোগ, ধানের বাদামী দাগ রোগ, ধানের পাতা ফোস্কা রোগ, কান্ড পচা রোগ। অনুকূল পরিবেশে ধানের রোগ জীবাণুগুলো আশংকাজনক হারে ধানের ফলন কমিয়ে দেয়। যেমন ব্লাস্ট রোগে ৫০%, বাকানী রোগে ৩০%, খোল পচা রোগে ২৭% ফলন কম হয়ে থাকে। তাই বীজ শোধনের মাধ্যমে এই সব রোগের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়। বীজ বপনের পূর্বে যদি বীজ শোধন করা যায় তাহলে এসব রোগের ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। সিলেট অঞ্চলের চাষ উপযোগী কিছু আধুনিক বোরো ধানের যে সব জাত রয়েছে তাদের সম্পর্কে জেনে নেই।
বিআর ১৭ ঃ এটির জীবন কাল ১৫৫ দিন। চাল মাঝারি মোটা। গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর। বিআর ১৮ ঃ এটির জীবন কাল ১৭০ দিন। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর। বিআর ১৯ ঃ এটির জীবন কাল ১৭০ দিন। চাল মাঝারি মোটা। গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ২৮ ঃ এটির জীবন কাল ১৪০ দিন। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ২৯ ঃ এটির জীবন কাল ১৬০ দিন। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। গড় ফলন ৭.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৩৬ ঃ এটির জীবন কাল ১৪০ দিন। চাল লম্বা, চিকন। ঠান্ডাসহিষ্ণু জাত। গড় ফলন ৫.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৫০ (বাংলামতি) ঃ এটির জীবন কাল ১৫৫ দিন। চাল লম্বা, চিকন, সুগন্ধি ও সাদা। গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৫৫ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৫ দিন। চাল লম্বা চিকন, মধ্যম মাত্রায় ঠান্ডা লবণাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু। গড় ফলন ৭,০-৭.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৫৮ ঃ এটির জীবন কাল ১৫৫ দিন। দানা অনেকটা ব্রি ধান ২৯ এর মত। গড় ফলন ৭.২ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৬৪ ঃ এটির জীবন কাল ১৫০ দিন। চাল মাঝারি মোটা এবং সাদা, উচ্চ মাত্রার জিংক সমৃদ্ধ। গড় ফলন ৬.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৭৪ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৭ দিন। চাল মাঝারি মোটা এবং সাদা, জিংক সমৃদ্ধ। গড় ফলন ৭.১ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৮১ ঃ এটির জীবন কাল ১৪০ দিন। চাল জিরার মত লম্বা ও চিকন, রং সাদা। গড় ফলন ৬.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৮৪ ঃ এটির জীবন কাল ১৪২ দিন। এই ধানের আকুতি প্রায় ব্রি ধান ২৮ এর মত, এ জাতের চালে উচ্চ মাত্রার জিংক ও মধ্যম মাত্রার আয়রণ ও প্রোটিন বিদ্যমান। গড় ফলন ৬.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৮৬ ঃ এটির জীবন কাল ১৪২ দিন। এ জাতটি হেলে পড়া প্রতিরোধী, চাল লম্বা চিকন, রং সাদা। গড় ফলন ৬.৫ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৮৮ ঃ এটির জীবন কাল ১৪২ দিন। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা, স্বল্প জীবন কাল সম্পন্ন জাত হিসেবে হাওড় এলাকার জন্য উপযোগী। গড় ফলন ৭.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৮৯ ঃ এটির জীবন কাল ১৫৬ দিন। চাল মাঝারি মোটা ও সাদা। গড় ফলন ৮.০ টন/হেক্টর। ব্রি ধান ৯২ ঃ এটির জীবন কাল ১৫৬-১৬০ দিন। চাল লম্বা ও চিকন। গড় ফলন ৮.৪ টন/হেক্টর। ব্রি হাইব্রিড ধান ১ ঃ এটির জীবন কাল ১৫৫ দিন। চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা। গড় ফলন ৮.৫ টন/হেক্টর। ব্রি হাইব্রিড ধান ২ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৫ দিন। চাল মাঝারি মোটা এবং আগাম জাত। গড় ফলন ৮.০ টন/হেক্টর। ব্রি হাইব্রিড ধান ৩ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৫ দিন। চাল মাঝারি মোটা এবং আগাম জাত। গড় ফলন ৯.০ টন/হেক্টর। ব্রি হাইব্রিড ধান ৫ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৪ দিন। চাল সরু ও লম্বা। গড় ফলন ৯.০ টন/হেক্টর। ঝখ-৮ঐ হাইব্রিড ধান ঃ এটি বিএডিসি কর্তৃক উদ্ভাবিত বোরো ধানের জাত, এর জীবন কাল ১৩০-১৩৫ দিন। মাঝারি চিকন। একর প্রতি ফলন ৪.০-৪.৮ মে.টন। বিনা ধান ১৮ ঃ এটির জীবন কাল ১৪৫-১৫০ দিন। গড় ফলন ৭.৫-৮.০ মে.টন/হেক্টর।
বীজ শোধন পদ্ধতি
বীজ শোধনের অনেক পদ্ধতি রয়েছে। তার মধ্যে সহজ কয়েকটি পদ্ধতি আমরা জেনে নেই।
১৫-২০টি জামপাতা পিষে রস বের করে ছেকে নিয়ে ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে তাতে ১ কেজি ধান আধা ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। উক্ত ভিজানো বীজ পানি থেকে তুলে ভালভাবে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এতে অনেক বীজ বাহিত রোগ দমন হয়।
গরম পানি দিয়ে বীজ শোধন ঃ ৫২-৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে (হাতে সহনীয়) ১৫ মিনিট বীজ ভালভাবে ভিজিয়ে রাখলে জীবাণুমুক্ত করা যায়।
ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন ঃ যে কোনো ছত্রাকনাশক (কার্বেন্ডাজিম গ্রুফ) ৩ গ্রাম ঔষধ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১ কেজি বীজ পানিতে ডুবিয়ে নাড়াচাড়া করে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। তার পর বীজকে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। বোরো মৌসুমে ৭২ ঘন্টা জাগ দিলে বীজের অংকুরোদগম হলে বীজ বপন করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT