পাঁচ মিশালী

৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক মণিপুরী সাহিত্য সম্মেলন

নামব্রম শংকর প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৯ ইং ০০:২০:৩০ | সংবাদটি ২৫৫ বার পঠিত

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর সিলেটে আসেন। শ্রীভূমি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এম সি কলেজে ভাষণ, ব্রাহ্ম মন্দির, সারদা হল, পাদ্রী বাংলোয় রাত্রীযাপন, সুললিত মণিপুরী নৃত্য দর্শন সর্বোপরি অতিথি পরায়ন সিলেটবাসীর আতিথ্যে কবিগুরু অভিভূত হয়েছিলেন। কবির সিলেট আগমনের শতবর্ষ উপলক্ষে এ বছর ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ: শতবর্ষ স্মরণোৎসব পর্ষদ’ চারদিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী ও নানান অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে সিলেটে কবিকে স্মরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ (বামসাস) প্রতি দু’বছরে আয়োজন করে আন্তর্জাতিক মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন। তারই ধারাবাহিকতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমনের শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণ করে গত ১ নভেম্বর আয়োজন করে ‘৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন ২০১৯ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মণিপুরী নৃত্য’ শীর্ষক আর্ন্তজাতিক সেমিনার। কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় মুখরিত ছিল অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গন। প্রাচীনতা ও ঋদ্ধতার এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অধিকারী মণিপুরীদের মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা ও বিকাশে বাংলাদেশে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদ। দীর্ঘ এ পথ চলায় নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ৪৪ বছর ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ, কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে নিজ মণিপুরী ভাষা সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্রিয় বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদকে ধন্যবাদ জানান আর্ন্তজাতিক মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলনে আগত অতিথি এবং বক্তারা।
মণিপুরী সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসের প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সমাপনী অনুষ্ঠানের আন্তর্জাতিক সেমিনার পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ও ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ পর্ষদ এর আহ্বায়ক আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, আজ থেকে শতবর্ষ আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট সফরে এসেছিলেন। তখন তিনি মণিপুরী নৃত্য দেখে মুগ্ধ হন এবং শান্তি নিকেতনে গিয়ে এই নৃত্যশিক্ষা প্রবর্তন করেন। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভাধর মানুষের স্পর্শ পেয়েছিলেন বলেই মণিপুরী নৃত্য বিশ^খ্যাতি অর্জন করেছিল। বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদের রবীন্দ্রনাথকে স্মরণের এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের আজকের এই আয়োজন যথার্থ অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মণিপুর জওহরলাল নেহেরু মণিপুর ডান্স একাডেমির ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর এইচ. তোম্বী সিংহ। বামসাসের উপদেষ্টা এডভোকেট এস সি সিনহা’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
‘মণিপুরী নৃত্যের বিশ^যাত্রায় সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বামসাস’র সভাপতি কবি গবেষক এ কে শেরাম। মণিপুরের বিশিষ্ট লেখক সমালোচক প্রফেসর ড. নোংমাইথেম তোম্বী সিংহ উপস্থাপন করেন ÔRabindranath Thakur and Manipuri Dance’ এবং ত্রিপুরার মণিপুরী সাহিত্য পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক, লেখক ও গবেষক এল. বীরমঙ্গল সিংহ উপস্থাপন করেন ‘শান্তি নিকেতনে মণিপুরী নৃত্যশিক্ষা প্রচলনে ত্রিপুরার নৃত্যগুরুদের ভূমিকা’ শিরোনামে প্রবন্ধ। নীহার রঞ্জন শর্মা’র সঞ্চালনায় প্রবন্ধ তিনটি পাঠ শেষে সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন মদনমোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ এবং মেট্রোপলিটন ইাউনিভার্সিটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার, লেখক ও গবেষক মিহির কান্তি চৌধুরী। সেমিনারের শুরুতে অতিথিদের ফুল ও উত্তরীয় দিয়ে বরণ করেন সংগঠনের সহ সভাপতি প্রশান্ত কুমার সিংহ, এন যোগেশ^র অপু ও যুগ্ম সাধারন সম্পাদক কেএইচ সমেন্দ্র সিংহ।
আন্তর্জাতিক মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন এ মণিপুরের জওহরলাল নেহেরু মণিপুর ডান্স একাডেমি থেকে অতিথি এবং আর্টিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিজম তোম্বী সিংহ, ডিরেক্টর এল. উপেন্দ্র শর্মা, কৈশাম যাদু সিংহ, অতোম মধুসূদন সিংহ, ওইনাম জীতেন সিংহ, থোংগ্রাম কাঙজম্বা, খুন্দ্রাকপম রমেশ কুমার সিংহ, পোৎশাংবম মেঘচন্দ্র সিংহ, নিংথৌজম অজিত সিংহ, নামৈরাকপম সুরেন্দ্রজিৎ সিংহ, থোকচোম ইবেমুবী দেবী, থৌনাওজম পারুল দেবী, য়ু¤œাম গীতারাণী দেবী, অহোংশাংবম প্রিয়ারাণী দেবী, ওইনাম দেবলা দেবী, গুরুময়ুম চন্দন দেবী, পুখ্রম্বম বিলাস সিংহ, য়ুমলেম্বম ইনাওচা সিংহ, এস. নয়নসখী দেবী, থিংবাইজম নকুলজিৎ, য়ু¤œাম কুমার সিংহ, এম. কেশরীমোহন সিংহ, শরাংথেম সুশীল সিংহ। মণিপুরের কবি লেখিকাদের সংগঠন লৈমরোল খোর্জৈকোল (লৈকোল) থেকে মণিপুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর নহাকপম অরুণা দেবী, খুম্বোংময়ুম বীমাবতী দেবী, নেপ্রম মায়া দেবী, কাঙাবম ইবেতোন দেবী, তখেলময়ুম বীণা দেবী, মুতুম লৈরেনতোম্বী দেবী, অথোকপম হেলেনা দেবী, ঙাঙোম একাশিনী দেবী, লেঅংজম সংগীতা দেবী, ওয়াহেংবম কুমারী চনু। আগরতলার ত্রিপুরা মণিপুরী সাহিত্য পরিষদ এর জেনারেল সেক্রেটারী বীরমঙ্গল সিংহ, মিনা সিনহা এবং আগরতলার ত্রিপুরা বাণী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রঘুনাথ সরকার। এছাড়া নীলিমা সিনহা মেমোরিয়েল এওয়ার্ড ২০১৯ এর এবারের এওয়ার্ডি প্রফেসর ড. নোংমাইথেম তোম্বী সিংহ।
দিনব্যাপি অনুষ্ঠানমালায় সকালের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো: তাহমিদুল ইসলাম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক এম. কাজী এমদাদুল ইসলাম, সমাজসেবা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক সন্দ্বীপ কুমার সিংহ, নীলিমা-এসসি সিনহা ট্রাস্ট এর চেয়ারম্যান এডভোকেট এস সি সিনহা, জওহরলাল নেহেরু মণিপুর ডান্স একাডেমি, ইম্ফাল’র ডিরেক্টর এল. উপেন্দ্র শর্মা, মণিপুরের মণিপুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর নহাকপম অরুণা দেবী। কবি এ কে শেরাম’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে নীলিমা সিনহা মেমোরিয়েল এওয়ার্ড গ্রহণ করেন মণিপুরের বিশিষ্ট লেখক প্রফেসর ড. নোংমাইথেম তোম্বী সিংহ। এওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক প্রফেসর ড. নোংমাইথেম তোম্বী সিংহ’র সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন খোইরোম অন্নপূর্ণা দেবী। সভায় অতিথিগণ মণিপুরী সাহিত্য সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশে মণিপুরী সাহিত্য চর্চায় নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে যথাসাধ্য সহযোগিতার আশ^াস দেন। উদ্বোধনী পর্ব পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নামব্রম শংকর।
দ্বিতীয় অধিবেশনে দুপুর আড়াইটায় মণিপুরী ও বাংলা ভাষার কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর কবি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কবি এন যোগেশ^র অপু’র সঞ্চালনায় এবং কবি শেরাম নিরঞ্জন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কবি সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট কবি গবেষক প্রফেসর নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন মণিপুর থেকে আগত কবি ঙাঙোম একাশিনী দেবী। কবি সম্মেলনে কবিতা পাঠ করেন কবি এনায়েত হাসান মানিক, কবি পুলিন রায়, কবি আবিদ ফায়সাল, ছড়াকার পরিতোষ বাবলু, কবি সুমন বনিক, কবি বিমান তালুকদার, কবি খোইরোম কামিনী কুমার সিংহ, কবি এন অতুল প্রমুখ বাংলা ও মণিপুর থেকে আগত মণিপুরী ভাষার অনেক কবিসহ অর্ধশতাধিক কবি স্মরচিত লেখা পাঠ করেন।
মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলনে দুপুর ১২টায় সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যে ৭টায় সাংস্কৃতিক পর্বে সংক্ষিপ্ত রূপে রাসনৃত্য ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৃত্যনাট্য ‘বিদায় অভিশাপ’ পরিবেশন করেন জওহরলাল নেহেরু মণিপুর ডান্স একাডেমি, মণিপুর’র শিল্পীবৃন্দ। বিখ্যাত নাট্যজন পদ্মশ্রী রতন থিয়ামের অনুবাদ ও ভাষ্যে দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ এবং দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর প্রণয় ও বিদায় নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাটিকা ‘বিদায় অভিশাপ’ কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের দর্শক উপভোগ করেন। নৃত্য প্রশিক্ষক শান্তনা দেবীর নির্দেশনায় সিলেটের ‘এমকা’ পরিবেশন করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গীতিনাট্য ‘ভানুসিংহের পদাবলী’। বিকেলে সূচনা সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী রানা কুমার সিনহা ও তবলায় ছিলেন তাওরেম রাতুল। সকালের অধিবেশনে কোরাস সূচনা সংগীত পরিবেশন স্থানীয় শিল্পী মিনতী দেবী, ঝুমকোলতা সিনহা ঝুমা, মিলনী দেবী, অপর্ণা রানী সিনহা, নোংপোকলৈ সিনহা, রুমা সিনহা, নীরদা দেবী, মনিকা দেবী, অক্ষয়া দেবী, অনামিকা সিনহা নূপুর এবং তবলায় ছিলেন বিধান সিংহ। দু’পর্বের মনোজ্ঞ এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাই¯œাম রাজেশ।
৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক মণিপুরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন এবং ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মণিপুরী নৃত্য’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বামসাসের অনিয়মিত সাহিত্যপত্র ‘মৈরা’র বিশেষ রবীন্দ্র সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন অনুষ্ঠানের অতিথিবৃন্দ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT