উপ সম্পাদকীয়

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা

মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১১-২০১৯ ইং ০০:২২:৪৫ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

সময়ের আবর্তে ঋতু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে নানা রকম ঝড় হয়। এর কোনোটির উৎপত্তিস্থল সমুদ্র, আবার কোনোটির স্থলভাগ। আমাদের দেশের স্থল ভাগের ঝড়, যেমন কালবৈশাখী, টর্নেডো, ইত্যাদি। কাল বৈশাখীর উৎপত্তি স্থল উড়িষ্যা-বিহারের এলাকা থেকে। অবশ্য ঝড় বলতে যা বোঝায় তার অধিকাংশের উত্স হলো সমুদ্র ও মহাসমুদ্র। মূলত ঘূর্ণিঝড় হলো গ্রীষ্মম-লীয় ঝড়। এটি বায়ুম-লীর একটি উত্তাল অবস্থা, যা বাতাসের প্রচ- ঘূর্ণায়মান গতির ফলে সংঘটিত হয়। প্রতি বছর এ পৃথিবী জুড়ে গড়ে ৮০টি গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮ কিলোমিটারের ওপরে। উল্লেখ্য, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা তার বেশি হয়, তখন ঘূর্ণিঝড় উত্পত্তির অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। সাধারণত ৫ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ হতে ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের উদ্ভব ঘটে। একটি ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীর আবর্তন থেকে সৃষ্ট কোরিওলিস ফোর্স থেকে ঘূর্ণায়মান গতিপ্রাপ্ত হয়। কার্যত বিষুবরেখায় এই শক্তি শূন্য (০) পর্যায়ে থাকে বিধায় ঠিক বিষুবরেখা থেকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় না। যাহোক, এদের স্থানীয় নাম সম্পর্কে বলা চলে, আটলান্টিক মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে ‘হারিকেন’ বলে। ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে যথাক্রমে ‘সাইক্লোন’ ও ‘টাইফুন’ হিসেবে অভিহিত। তবে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড়ের নানা রকম আকর্ষণীয় নাম আছে। অবশ্য এই নামকরণের পেছনে চমকপ্রদ প্রতিনিধিত্বমূলক বিষয় বিদ্যমান। সাধারণত অবস্থান, ঋতু-বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে কতগুলো এলাকায় মাঝে-মধ্যে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। আর তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা অন্যতম। প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছিল, সেটা ছিল প্রায় ৩০০ বছর আগে শ্রীলঙ্কার মহাপরাক্রমশালী রাজা মহাসেনের নামে। আর এ ব্যাপারে নাম প্রবর্তনকারী সংগঠন হলো জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়া সংস্থা ‘এস্কেপ’। এ বিশ্বে প্রত্যেকটি জীবজন্তুর মধ্যে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে সবাই নারী নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে। কেননা নারীরা আকর্ষণীয় বিধায় সহজে স্মরণে থাকে। সেজন্যে ঝড়ের নামের ব্যাপারে রমণীদের নাম অগ্রগণ্য স্থান পায়। তাই বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড়ের নাম নারীদেরকে ঘিরে, যেমন নার্গিস, বিজলি, রেশমি, ক্যাটরিনা, রিটা, ইত্যাদি। নারীদের নাম নিয়ে মাতামাতি দেখে বিশ্বের কিছু সুধীজন নারীদের নামের পাশাপাশি পুরুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক বলে মনে করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে উল্লেখ করেন যে, তা না হলে বিষয়টি এক চোখা হয়ে যাবে। অতঃপর ঝড়ের নাম হিসেবে পুরুষের নাম সংযোজিত হতে থাকে। বর্তমানে অবশ্য বস্তু বা অন্য বিষয়ের নাম অবস্থাভেদে টেনে আনা হয়েছে, যেমন সিডর, মেঘ, বায়ু, সাগর, ইত্যাদি। আর যেহেতু ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস ও মৃত্যুর হাতছানি থাকে। সেহেতু একবার একটি নামে নামকরণ করা হলে, দ্বিতীয়বার তা পুনরায় ব্যবহূত হয় না। অবশ্য অতীতেও ঘূর্ণিঝড়কে ঘিরে নামকরণ করা হতো। সেটা ছিল ঝড়ের উত্পন্ন অবস্থান থেকে। তা আবার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশভিত্তিক।
এখানে উল্লেখ্য, সংঘটিতব্য এলাকার মধ্যে অবস্থিত দেশ হিসেবে ভারত, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ওমান ও শ্রীলঙ্কা দশটি করে নাম এস্কেপে জমা দিয়েছে, তাতে মোট নামের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০টি। আর ওখান থেকে এস্কেপ যাচাই-বাছাই করে ৩২টি নাম ঠিক করেছে, যেমন হেলেন, লহর, মাদী, নানাউক, হুদহুদ, নিলুফার, প্রিয়া, কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়নতদ, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা, কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা ও আমপান। এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘বুলবুল’ এখান থেকেই নেয়া হয়েছে।
তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এস্কেপ কর্তৃক নামকরণের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কেননা সময় ও অবস্থান ধরে ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে রাখা কঠিন। কারণ যদি নামকরণ না করা হয়, তাহলে এক প্রজন্মের পরেই বিস্মৃতির কোঠায় চলে যাবে। যদিও বলেন, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সময় ও অবস্থান ধরে সংরক্ষণ করলে, তা পরবর্তীকালে প্রয়োজনে খুঁজে পাওয়া যাবে। তথাপিও বিভিন্ন জটিলতা হেতু সঙ্গতকারণেই তা মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এই আকর্ষণীয় নামে নামকরণ থাকলে মনে রাখার সুবিধা হয়। আর এই নামের আদলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সেই প্রলয়ঙ্ককরী ধ্বংসযজ্ঞের কথা তুলে ধরে অনাগত ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সুগম হবে।
লেখক : গবেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ছায়াসঙ্গিনী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক প্রবাহিত নদী
  • বলিভিয়া : ইভো মোরালেসের উত্থান-পতন
  • সিলেট অঞ্চলের পর্যটন ভাবনা
  • মিড-ডে মিল
  • যৌতুক প্রথা নিপাত যাক
  • সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে
  • মানবাধিকার দিবস ও বাস্তবতা
  • বুয়েটের শিক্ষা
  • পাল্টে গেল শ্রীলঙ্কার ভোটের হিসাব
  • গড়ে তুলতে হবে মানবিক সমাজ
  • পাখি নিধন, অমানবিকতার উদাহরণ
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান সফল হোক
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • Developed by: Sparkle IT