সাহিত্য

গেরুয়া সংস্কৃতির ধারক ফকির বাবর চৌধুরী

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৩:১১ | সংবাদটি ১৩২ বার পঠিত

লালন শাহ’র অনিবার আকুতি ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কেমনে আসে যায়, তারে ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখীর পায়’- কিংবা বাউল সাধক হাছন রাজা’র আর্তনাদ ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে- কান্দে হাছন রাজার মনো ময়নারে....’ উপজীব্য একটাই মাটির দেহের পিঞ্জরে বন্দী প্রাণপাখীটার উড়ে যাবার জন্য ছটফটানি। একই ¯্রােতে বহমান হালের লোক কবি সাধক ফকির বাবর চৌধুরীর সুরের ধারা- ‘আজব একটা রঙের পাখী/ বন্দী মাটির পিঞ্জিরায়/ সদায় পাখী ছটফট করে/ উড়িবার আশায়’। লোকসাহিত্য, লোকগান, বাউল সাধকদের গেরুয়া সংস্কৃতির ধারক এই বাংলায় আবির্ভূত হয়েছেন অসংখ্য লোক কবি। লালন, হাছন, রাধারমণ, দূর্বিন শাহ, শাহ আব্দুল করিম, শিতালং শাহ, আরকুম শাহ ইত্যাদি আরও অনেকের নাম আসে। সেই দীর্ঘ তালিকার নিচের সারিতে হলেও একটি নাম সংযুক্ত করা যায়, তিনি ফকির বাবর চৌধুরী।
ফকির বাবর চৌধুরী অহর্নিশ এই মাটির ঘরে বন্দী পাখীটার ওড়ে যাবার ব্যাকুলতা নিয়ে ভাবেন। তাকে কষ্ট দেয় সেই বিয়োগান্তক মুহূর্ত। তিনি এভাবেই তার কষ্টের কথাগুলো প্রকাশ করেন- ‘একদিন পাখী ওড়ে যাবে ছাড়িয়া তোর মাটির ঘর/ আসবে না ফিরিয়ারে আর যতোই তারে করোরে আদর/’ তবুও ছেড়ে যাবে পাখী। কারণ মৃত্যুই মানবজীবনের অবধারিত পরিণতি। জন্মের সাথে সাথেই নির্ধারিত হয়ে ওঠে মৃত্যুর ঠিকানা। বাবর চৌধুরী বলেন ‘যাইসনারে তুই আমায় ফেলে জঙ্গলায়/তুই বিহনে সোনার অঙ্গ খাইবেরে মাটির পোকায়।’
মৃত্যুর হিমশীতল পরশে ধ্বংস হয় মানবজীবন। মাটির মানুষ মিশে যায় মাটির সঙ্গে। তবু জন্ম মৃত্যুর মাঝখানে একটি নদী পাড়ি দিতে হয়। প্রতিটি মানুষকেই এই জীবননদী অতিক্রম করতে হয়; এটাই জাগতিক নিয়ম। এই অভিজ্ঞতায় কন্টকাকীর্ণ বন্ধুর পথ আছে, আছে পাহাড় ডিঙানো, আছে আলো ঝলমল প্রান্তর, আছে প্রেম-প্রীতি, হাসি-কান্না। তাইতো ফকির বাবর চৌধুরী বলেন- কোকিল ডাকিসনারে কোকিল ডাকিসনারে/ ডাকিয়া বাড়াইসনে আর মনেরও জ্বালারে/ বসন্ত আসিলে তুমি বইসা কদমডালে/ তুমি ডাকো তোমার সুখে আমি মরি জ্বলে।....
ফকির বাবর চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন সুরমা বিধৌত সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার নিভৃতপল্লী আটগ্রামে ১৯৫৫ সালের ১৭ই নভেম্বর। ¯্রােতস্বিনী সুরমা নদীর তীরের সবুজ ছায়ায় বেড়ে ওঠেন তিনি; আর প্রকৃতির অপার রূপ-মাধুর্য থেকেই অনুপ্রেরণা পান সৃজনশীলতার। যার প্রকাশ ঘটে তার সৃষ্টিকর্মে। বাবর চৌধুরীর পিতার নাম আব্দুল ওয়াকিল চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। বাবর চৌধুরীর পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন ভারতের করিমগঞ্জের বারপাড়ার জমিদার। তাদের বংশেরই জনৈক জিতু মিয়া চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে ইছামতি পরগনার এই আটগ্রামে একটি জমিদারী কিনে এখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। তারই চতুর্থ অধঃস্তন বংশধর হলেন ফকির বাবর চৌধুরী। তার পিতামহ মরহুম সিকন্দর আলী ছিলেন এই অঞ্চলের স্বনামধন্য প্রজাহিতৈষী জমিদার। মাতা মরহুম শামছিয়া খানম চৌধুরী ছিলেন বালাউটের জমিদার মরহুম আব্দুল মতিন চৌধুরীর কন্যা। তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু এবং সঙ্গীতানুরাগী রমণী ছিলেন।
সময়টা ১৯৭৫ সাল। কৈশোরোত্তীর্ণ বাবর চৌধুরীর চোখে সবকিছু রঙ্গিন লাগেনি। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস তাকে কাবু করতে পারেনি। বরং তার হৃদগহনে ভর করে আধ্যাত্মবাদ। এ যেন ¯্রােতের বিপরীতমুখী যাত্রা। মরমী সঙ্গীতের অনুরাগী মমতাময়ী মায়ের অস্ফুট প্রেরণা তাকে গান রচনায় অনেকটাই উদ্বুদ্ধ করে। শুরু হয় তার গানের জগতে বিচরণ। লিখতে থাকেন একের পর এক মরমী গান। কথার পরে কথা সংযোজন করে সৃষ্টি করা তার একেকটি গীতিকাব্যে পরিস্ফুট হয় মানব জীবনের পরিসমাপ্তির অমোঘ চির সত্য মুহূর্তটির কথা, ভেসে ওঠে যাপিত জীবনের না বলা অনেক কথা। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার হিসেবে অন্তর্ভূক্তির জন্য পা-ুলিপি জমা দেন। প্রথমে তাকে অনুমোদন দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি বাংলাদেশ বেতারের অনুমোদিত গীতিকারের স্বীকৃতি লাভ করেন ১৯৮৫ সালে। এর মধ্যেই তার লেখা গানের একটি অডিও এলবাম বের হয়। ১৯৮২ সালে ‘বাবরগীতি-১’ শিরোনামের ক্যাসেটটি বের করে হীরা ইলেকট্রনিক্সের প্রযোজনায় ঢাকার বেঙ্গল স্টুডিও। গানের সুরকার ছিলেন প্রখ্যাত সুরকার জাহাঙ্গীর আলম। গানে কন্ঠ দিয়েছেন বিখ্যাত কন্ঠ শিল্পীগণ। এরা হলেন- মুজিব পরদেশী, পান্না বিশ্বাস, শংকরী চক্রবর্তী, মিলন সরকার এবং শিশু রায়। এই এলবামের জনপ্রিয় একটি গান ¯্রােতাদের বিমোহিত করে, আপ্লুত করে। গানটি শুরু হয়েছে এরকম ‘দেখছোনি রে মন দেখছোনি ভাবিয়া/একদিন তোমার যাইতে হবে এই ভবও ছাড়িয়া।’ গানটি রেকর্ডিং এর সময় শিল্পী পান্না বিশ্বাস সুরকার জাহাঙ্গীর আলমসহ সব যন্ত্রশিল্পী আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। অথচ এই এলবামটি তার সংগ্রহে নেই। ফকির বাবর চৌধুরী বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সিলেট বেতার থেকে প্রথম প্রচারিত গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী জামাল উদ্দিন হাসান বান্না’র কন্ঠে গাওয়া গানটি হচ্ছে- ‘ভবে মানুষ হইয়া জন্ম নিয়া/ মানুষ হইলামনারে। সেখানেই থেমে থাকেননি বাবর চৌধুরী। পরবর্তীতে আরও পাঁচটি অডিও ক্যাসেট বের হয় তার। দেশের জনপ্রিয় সুরকার ও শিল্পীগণ এসব গানে সুর করেছেন, কন্ঠ দিয়েছেন। তাছাড়া, দেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্র থেকে তার লেখাগান নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে।
ফকির বাবর চৌধুরী অডিও এবং বেতারে গান প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বিটিভি থেকেও প্রচারিত হয়েছে তার গান। ১৯৮৭ সালে বিটিভিতে আয়োজিত ইসলামী সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় সিলেটের একটি সঙ্গীতদল অংশ নেয়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশিষ্ট কন্ঠশিল্পী মরহুম আতাউর রহমান কাউসার। ফকির বাবর চৌধুরীর লেখা একটি গান গেয়ে প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করে এই দলটি। বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ আলী আকবর খান-এর সুরারোপিত গানটির প্রথম কলি হচ্ছে- ‘কেমন করে দিবো পাড়ি/ পরাণ কাঁপে থরথরী/কা-ারী হইয়া দয়াল/ পার করিও ভাঙ্গা তরী।’
মরমী ভাবধারার গানই তিনি লিখছেন বেশি। এ পর্যন্ত সাতশ’র বেশি গান রচনা করেছেন বাবর চৌধুরী। দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। এগুলো হচ্ছে ‘বাবরগীতি ১ খ-’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর গান’। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত গীতিকাব্যগ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধুর গান’। ২০১২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত গীতিকাব্যের কয়েকটি পংক্তি এরকম- ’৭ই মার্চের ভাষণ হলো/ মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্র/ যে ভাষণে বীর বাঙ্গালী হাতে নিলো অস্ত্র।’
সমাজ-সচেতনতা, মরমীবাদ আর আধ্যাত্মবাদ এই সবকিছুর সমন্বয়ে একজন ফকির বাবর চৌধুরী। তার লেখনী নিরলস সৃষ্টি করে যাচ্ছে অমর গীতিকাব্যগুলো। তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিতেই আমার আনন্দ। আজ হোক কাল হোক এই কর্ম কথা বলবেই; কারণ মানবজীবনের অমোঘ সত্যটি অস্বীকার করার সাধ্য কারও নেই।’- তার এই সৃষ্টিকর্ম কাল-মহাকালে ছড়িয়ে পড়–ক; এমন প্রত্যাশাই রইলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT