উপ সম্পাদকীয়

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল

মো. হাফিজুর রাহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১১-২০১৯ ইং ০১:১২:১৩ | সংবাদটি ১০৫৩ বার পঠিত

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে আতংকিত হই। দেশের প্রায় সবকটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যা আমাদেরকে ভাবায়। প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের এ দশা কেন? এটা ত হওয়ার কথা নয়, তারপরও হচ্ছে। কিন্তু কেন? আমাদের ছেলেমেয়েরা কী এতটাই শিক্ষাবিমুখ যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে? না কী অন্য কিছু হতে পারে? বাবা-মা তার সন্তানকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে কেন পাঠায়? সন্তানরা কী এক বারের জন্য হলেও ভাবে? আসলে দোষ কাকে দিব? আর আমরা কি দায় এড়াতে পারি? কোন সুযোগ নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের অন্যতম একটি বিদ্যাপীঠ। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় এর বর্তমান দৃশ্যপট খুবই করুণ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বেশ হৈচৈ হয়েছে, আমরা প্রত্যক্ষ করেছি অনেক তুলকালাম কান্ড। সর্বশেষ যে ডেভলাপমেন্ট হয়েছে তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে কেন এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কারা হচ্ছে? লাভবান কারা হচ্ছে? হিসাব মিলানো এতটা কঠিন হবে না যতটা না আমরা ভাবি। দিন শেষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান যেখানে শিক্ষার্থীরা মুক্তবুদ্ধি চর্চা করবে। কিন্তু সেই জায়গাটিতে যদি ভর করে দুর্নীতি, ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম , অবিচার অনৈতিক কর্মকান্ড তাহলে ত একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করবে। যা লক্ষণীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্যদের বিতর্কিত ও অনৈতিক কর্মকা- নিয়ে তাদের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বছর জুড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে আন্দোলন করেছে। ঐসব উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন কী প্রমাণ করে?
বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় যখন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম টপে খুঁজে না পাই তখন আর হতাশ না হয়ে পারি না। লন্ডনভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রতি বছর বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে র‌্যাংকিং প্রকাশ করে তাতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এক হাজারের পরে। আমাদের শিক্ষার মান কী এত নি¤œগামী? কষ্ট হয়, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমরা গর্ব করি তার অবস্থান যদি শীর্ষ তালিকায় না থাকে তখন যন্ত্রণার মাত্রা আর প্রকট হতে থাকে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকদের অদ্ভুত ধরণের দুর্নীতি দেখে তাজ্জব হই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি শিরোনাম ছিল গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শেমুরবিপ্রবি) কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির বই কেনার জন্য বিস্ময়করভাবে চুক্তি করেছেন খুলনার জাহাজ নির্মাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ডের সঙ্গে। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি, চুক্তির পর বই কেনার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে বলেও দেখানো হয়েছে। কিন্তু এরপর এক বছর চলে গেলেও লাইব্রেরির জন্য বই আসেনি। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জেগে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। হায়রে দুর্নীতি তুমি কী এত মধুর? জ্ঞানীরা কেন নীতি নৈতিকতা হারিয়ে দিক-বেদিক? লজ্জা শরম কী হারিয়ে যাচ্ছে?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল পুরো ক্যাম্পাস। আমরা অবাক হয়েছি জাবিতে ভিসির আচরণে। এত কেলেঙ্কারি থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে স্বপদে বহাল থেকেছেন? দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠে যখন ছাত্র-শিক্ষকরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তখন আমাদের ভাবায় এই ভেবে যে, আসলে আমরা কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছি? বিশ্ববিদ্যালয়ের মত পবিত্র অঙ্গনে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা অভিভাবক সমান ভিসির বিরুদ্ধে কেন অবস্থান নিবে? আর ভিসি মহোদয় কী কিছুই বোঝেন না? এই যদি হয় প্রকৃত সত্য তাহলে ত ভয়ানক অবস্থা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষককে পেটানোর ঘটনা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এটা কী অন্ধকার যুগের দিকে ইঙ্গিত করে না? বর্বরতা এবং নির্মমতা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। শিক্ষক পেটানো এটি কোন নতুন ঘটনা নয়। তারপরও আমরা বিব্রতবোধ করি যখন দেখি অভিভাবক সমান শিক্ষকের গায়ে কেউ হাত তুলে। এটি কোন ধরণের বর্বরতা? এই ঘটনাগুলো কারা করে? লেজুড়বৃত্তি ক্ষমতার প্রভাব এদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? হা, কিছু সংখ্যক শিক্ষক অধিকতর ক্ষমতার লোভে অপকর্মে জড়াচ্ছে। এদেরকে কী বলা উচিত? আর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় তাদের মনুষত্ব জাগ্রত করতে কিন্তু যারা শিক্ষকদের অপমান লাঞ্ছিত করে তাদেরই বা কী বলা উচিত? শিক্ষক হচ্ছেন পিতার সমান তার প্রতি কেন অসম্মান করা হবে?
শিক্ষক হচ্ছেন আমাদের অভিভাবক। তারা তিলে তিলে একটি ছাত্রকে মানুষের মত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেন। তাদের হাত ধরে একটি ছাত্র পরিপূর্ণতা পায়। মানুষের ভিতরে একটা পশুত্ব রয়েছে যা সার্জারির মাধ্যমে মানবিক করে তৈরি করা হয়। আর এই মহান কাজটি শিক্ষকরা করে থাকেন। তাদের স্পর্শে ছাত্রারা হয়ে উঠে অসাধারণ প্রতিভাবান। অথচ এই শিক্ষকরা অপমানিত হন তাদেরই হাতে গড়া ছাত্রদের হাতে। আসলে এরা কী? এদের মন মানসিক উপাদানগুলো কী পচন ধরেছে? অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই, আমাদের জেনারেশনটা আসলে কি রকম হয়ে গেছে। এর দায় দায়িত্ব কী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এড়াতে পারে? কিছু সংখ্যক বিপথগামী ছাত্রের জন্য মূল দলগুলোকে দায় নিতে হয়। আর এই বিপথগামীরা কলুষিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ।
আবার কিছুসংখ্যক শিক্ষক আছেন যাদের অনৈতিকতার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় শিক্ষকদের। যেমন, ২০ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক একটি খবরে উল্লেখ করে যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন অনুষদে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এক শিক্ষার্থীকে তিনটি কোর্সের পরীক্ষা একই সাথে গ্রহণের সুযোগ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর সাজ্জাদুর রহমান এর বিরুদ্ধে। একই অনুষদের অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ওহাব শাহীন মাত্র দুই ঘণ্টায় আটটি ইনকোর্স পরীক্ষা গ্রহণ করার ঘটনা ফাঁস হওয়ায় রীতিমত আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঝড় ত উঠবেই এরকম অনৈতিকতা শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যায় না। টাকার জন্য নীতি নৈতিকতা বিসর্জন, অবাক হই।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বেহাল দশা কেন? ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে যে সম্পর্ক হওয়ার কথা তা না হয়ে বরং কেন বিষাক্ত হচ্ছে? প্রকৃত অর্থে ক্ষমতা এবং দুর্নীতি ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছে যা ভালবাসার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। শিক্ষাব্যবস্থার যে ঘাটতি রয়েছে তা কী কাটিয়ে উঠা যায় না? আর কেন বা যাবে না? আমরা বাংলাদেশী, কি না পারি, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময় পেয়েছি স্বাধীন ভূখন্ড। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সমস্যাসমূহ প্রকট আকারে রূপ নিচ্ছে তা অঙ্কুরে নির্মূল করতে হবে তা না হলে চরমপন্থীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলার সাথে জড়িত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে, তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। তবে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • Developed by: Sparkle IT