উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

দেওয়ান ফরিদ গাজী

মবরুর আহমদ সাজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৫৮ | সংবাদটি ২০৬ বার পঠিত

জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সাহসী রাজনীতিবিদ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, বৃহত্তর সিলেট আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের ৪ ও ৫ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজীকে চেনা সময়ের দাবী। বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর স্বর্ণালী উপাখ্যানের জন্য জাতি যেমন তাঁকে কখনো ভুলবে না, তেমনি ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় থেকে নামটি কখনো মুছে যাবে না। দেওয়ান ফরিদ গাজী ১৯৭২ সালে প্রথম হস্তলিখিত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের স্বাক্ষরকারীদের একজন। ১৯৭৩ সালে সিলেট আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তিনি হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, ২০০১ সালে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সর্বশেষ ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। নবীগঞ্জ-বাহুবলের মানুষের জন্য ৯১ থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার বিরামহীন ছুটে চলা ও জীবনমানের উন্নতির চিন্তাই ছিল যার নিত্য দিনের চিন্তা।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকেও পড়বে না, আবার মাটি থেকেও গজাবে না। সোনার মানুষ আমাদের মধ্যে থেকেই তৈরি হতে হবে।’ সেই সোনার মানুষ, শিক্ষিত ও সুস্থ রাজনীতির পথিকৃৎ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান ফরিদ গাজী। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর। পুরো পাকিস্তানী আমল তিনি ছিলেন প্রতিবাদী ও সংগ্রামী। এই সত্য উপলব্ধি করেই জনগণ তাকে ‘নেতা’ বানিয়েছেন ভোটের মাধ্যমে। দেওয়ান ফরিদ গাজীর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোকপাত করতে হলে কিশোর বয়সের স্কুল জীবনের কিছু কিছু ঘটনাবলী অবলোকন করতে হবে। ১৯২৪ সালের ১ মার্চ হবিগঞ্জ জেলায় নবীগঞ্জ থানার দেবপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা দেওয়ান মোহাম্মদ হামিদ গাজী ছিলেন দিনারপুর পরগণার জমিদার। ফরিদ গাজী হযরত শাহজালাল মুজাররদ-ই-ইয়েমেনীর (র) সফরসঙ্গী হযরত তাজউদ্দিন কোরেশীর (র) ১৬তম বংশধর। দেওয়ান ফরিদ গাজীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। এরপর তিনি মৌলভীবাজার জুনিয়র মাদ্রাসা এবং সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন। পরে মাদ্রাসা কারিকুলাম ত্যাগ করে সিলেট রসময় মেমোরিয়াল হাইস্কুলে ভর্তি হন। তিনি রসময় হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা, ১৯৪৭ সালে সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৯ সালে সিলেট মদন মোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।ফরিদ গাজী ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৪২ সালে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের অঙ্গ সংগঠন আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। তিনি ছাত্র ফেডারেশনের আসাম প্রাদেশিক শাখার সহ-সম্পাদক এবং সিলেট এম. সি কলেজ শাখার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৫ সালে আসামে অহমীয়দের ‘বাঙ্গাল খেদাও’ অভিযানের প্রতিবাদে আন্দোলন এবং লাইন প্রথা বিলোপ আন্দোলনের একজন অগ্রণী কর্মী ছিলেন ফরিদ গাজী। এ সব আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য বহুবার তাঁকে পুলিশী নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোটে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে তিনি সিলেটে আন্দোলন সংগঠনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করার লক্ষ্যে সূচিত শান্তি আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিয়ে রাজনীতি শুরু করা এই রাজনৈতিক ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সিলেট- ১ আসন থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু সরকারের স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ফরিদ গাজী ছিলেন সংস্কৃতিমনা এবং শিক্ষার উদার পৃষ্ঠপোষক। সিলেট অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি সুদীর্ঘকাল সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন। উদার হৃদয়ে মানুষ ফরিদ গাজী অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনযাপন করতেন। নিরহঙ্কার ও সজ্জন এই মানুষটি দলমত নির্বিশেষে ছিলেন সকল শ্রেণির লোকের শ্রদ্ধাভাজন। দেওয়ান ফরিদ গাজী ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সিলেটে হজরত শাহজালালের (রহ.) মাযার সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
লেখক : সাংবাদিক

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • Developed by: Sparkle IT