উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৯:২৭ | সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

শিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের কোনো মহাপরিকল্পনা না থাকায় শিশু-কিশোররা গিনিপিগে পরিণত হয়ে চলেছে। যেমন শিক্ষাবর্ষের এক তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পর গত বছরের এপ্রিলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার (পিইসি) পরীক্ষার্থীরা জেনেছে, তাদের প্রশ্নপত্রে ভিন্নতা আসছে এবং পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) থাকবে না। অথচ এমসিকিউ রেখে এর দুই মাস আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কাঠামো ও নম্বর ঠিক করেছিল জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নপ)। এর দুই মাস পর হঠাৎ এমসিকিউ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা খাত নিয়ে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই সরকারের। সরকার বা মন্ত্রী পরিবর্তন হলেই পরিবর্তন হয় পাঠ্যবই। এছাড়াও কারণে-অকারণে বছর বছর পাঠ্য বইয়ের কনটেন্টে আসে পরিবর্তন। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা না থাকায় ঘন ঘন পাল্টাচ্ছে পরীক্ষা পদ্ধতি। একটি পদ্ধতি ঠিকমতো কার্যকর হতে না হতেই আবার আসছে নতুন পদ্ধতি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে এসব পদ্ধতি রপ্ত করার আগেই আবার আসছে নতুন সিদ্ধান্ত। নতুন এসব পদ্ধতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বিপত্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। গিনিপিগের মতো নতুন নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে তাদের ওপর।
গত ১৪ বছরের শিক্ষা পদ্ধতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন পাঠ্যবই বদল হয়েছে সাতবার। বিভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতি বদলেছে চারবার, একাদশে ভর্তি পদ্ধতি একবার ও খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলেছে দু’বার। এছাড়া পদ্ধতি বদলের ঘোষণা দিয়েও সেখান থেকে সরে এসেছে বেশ কয়েকবার। এর ফলে বারবার বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের। বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর, নতুন মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পর এবার স্কুল ও মাদ্রাসার কারিকুলামে ফের আসছে পরিবর্তন। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা নতুন তথ্যসমৃদ্ধ বই হাতে পাবে। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় আগে প্রথম অংশে লিখিত ও পরের অংশে এমসিকিউ পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল। পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ২০১৫ সালে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার বিষয়ক এক সভায় নেয়া হয় আরেক নতুন সিদ্ধান্ত। বলা হয়, প্রথমে শিক্ষার্থীরা এমসিকিউ ও পরে দ্বিতীয় অংশে পরীক্ষার্থীরা লিখিত পরীক্ষা বা সৃজনশীল অংশের পরীক্ষা দেবে। একই সঙ্গে এমসিকিউ পরীক্ষার ১০ নম্বরও কমিয়ে আনা হয়। এই ১০ নম্বর যোগ করা হয় সৃজনশীল অংশে। বর্তমানে মাধ্যমিকে বিভিন্ন বিষয়ে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ ও ৭০ নম্বরের বহুনির্বাচনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী, সচিবরা এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতি বন্ধের ব্যাপারে বেশ কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও এটি এখনো বাস্তবায়ন করেনি সরকার। এছাড়া গণিতেও বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু রয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে এসে শিক্ষার্থীদের বুঝে পড়া উৎসাহিত করতে সরকার গত ২০০৮ সালে চালু করে সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি। বলা হয়েছিল, সৃজনশীল প্রশ্নের গঠন কাঠামো শিক্ষার্থীর পরীক্ষাভীতি দূর করবে। কিন্তু সৃজনশীল নিয়ে খোদ শিক্ষকদেরই ভীতি কাটেনি। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে গিয়ে শেখাতে পারছেন না শিক্ষার্থীদের। প্রশ্ন তৈরি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেরা প্রশ্ন করতে না পেরে বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করছেন। আবার কোনো কোনো শিক্ষক গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দিয়ে নিচ্ছেন সৃজনশীলের পরীক্ষা। শিক্ষকদের অযোগ্যতায় মাঠেই মারা যাচ্ছে এই শিক্ষা পদ্ধতি। ভেস্তে যাচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতির উদ্দেশ্য। শিক্ষকদের এ পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দেয়ায় সৃজনশীল চালু হওয়ার ১১ বছর পরও এ পদ্ধতি চলছে জোড়াতালি দিয়েই। জাতীয় শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা যায়নি। ২০১৬ সালের মে মাসে সচিবালয়ে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত এক সভায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন করার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব ধরণের শিক্ষা এখন গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। কিন্তু এ পর্যন্ত এটি কার্যকর হয়নি। বন্ধ হয়নি পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষাও। ফলে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় নাজেহাল হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা (বাংলাদেশ প্রতিদিন ঃ ১ জুন-২০১৯)।
ভৌত অবকাঠামোগত সংকট আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ শিফট বিশিষ্ট হোক আর ২ শিফট বিশিষ্ট হোক ৮/১০টি কক্ষের অতি প্রয়োজন। ১ শিফট বিশিষ্ট বিদ্যালয়ে তো কক্ষ সংখ্যা আরো বেশি থাকা প্রয়োজন। ৬টি ক্লাসের জন্য ৬টি কক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, উপকরণ কক্ষ, লাইব্রেরী, গার্ড রুমসহ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে ১০/১২টি কক্ষের অতি প্রয়োজন। আর শিক্ষকদের আবাসন ব্যবস্থা করলে তো কক্ষ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। দুঃখজনক হলেও বাস্তব ঘটনা হচ্ছে আমাদের দেশের সিংহভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ই ৩ কক্ষ বিশিষ্ট। এখানে না আছে ক্লাস রুম, না আছে অফিস রুম! সিংহভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তো প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে এখনও বারান্দায় ক্লাস করতে দেখা যায়। এখনও অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘরের চালগুলো টিনসেড বিশিষ্ট রয়ে গেছে। পুরাতন টিনের ফাঁক দিয়ে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি পড়ে। এই বৃষ্টির পানিতে ভিজে অনেক সময় শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাস করতে হয়। এছাড়া জরাজীর্ণ ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তো আছেই। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধ্বসে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আমাদের দেশে এমন ঘটনাও বিরল নয়। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে অবকাঠামো সমস্যার আশু সমাধান করতে হবে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে যদি আনন্দঘন পরিবেশ না পায় তাহলে কিভাবে মানসম্মত শিক্ষা লাভ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এর জন্য অতি প্রয়োজন প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নতমানের ভবন তৈরি করা। প্রাথমিক শিক্ষায় আরো একটি বড় সমস্যা হচ্ছে শিক্ষক সংকট। শিক্ষক সংকটের কারণে মানসম্মত শিক্ষা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বার বার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বটে; কিন্তু এরপরও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ৪/৫ জন শিক্ষক বিশিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদেরকে বিরতিহীনভাবে ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষকদের এই বিরতিহীন ক্লাস দ্বারা মানসম্মত শিক্ষা হয় না। ৪/৫ শিক্ষক বিশিষ্ট বিদ্যালয়ে প্রায়ই কেউনা কেউ মাতৃত্ব ছুটিতে আবার কেউ প্রশিক্ষণে থাকেন। এমতাবস্থায় শিক্ষক সংকট লেগেই থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই অচলাবস্থা আর কতকাল?
শিক্ষার মানোন্নয়ন জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। শিক্ষার মানোন্নয়নের সকল বাধা দূর করতে দীর্ঘ মেয়াদী মহাপরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে সকল কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসা সরকারের মহান দায়িত্ব।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • Developed by: Sparkle IT