উপ সম্পাদকীয়

আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৪:৪৬ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ হয় না, তেমনি কলম বন্ধ রাখলেই সব সমস্যা থেকে মানুষের চোখ সরে যায় না। জাতি হিসাবে আমরা অবশ্যই কর্মঠ। আমরা মাঠে ঘাটে কাজ করেই চলেছি। আমাদের সাফল্য আমরা প্রমাণ করেই চলেছি। আমাদের সচেতনতা, চাহিদা আর উৎপাদন সবকিছুর মধ্যেই সামঞ্জস্য বজায় রেখেই আমরা পথ চলছি। অগ্রগতির পথে যাত্রা বলতে এটাই আমরা বুঝি। কয়েক বছর আগেও আমরা যেখানে অন্ন সংস্থানটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতাম আজ সে চিন্তাটা দূরে সরে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। আজ মানুষ বিকল্প খাদ্যাভাস নিয়ে চিন্তা ভাবনায় নিমগ্ন হচ্ছে। আজ বিশ্বমানের বিকল্প খাদ্যশক্তি উৎপাদিত হচ্ছে আমাদের দেশটিতে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ভুট্টার ফলন যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে বেড়েছে তেমনি গমের উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ভাত এর উপর নির্ভরতা কমছে কারণ বিকল্প অনেক খাদ্যশস্য মানব শরীরে যথাযথ প্রোটিন সরবরাহ যেমন করছে তেমনি কর্মশক্তি বাড়িয়ে তুলছে পর্যাপ্ত মাত্রায়।
আমাদের দেশে দুধের উৎপাদন ছিল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপর্র্যাপ্ত। বর্তমানে অনেকগুলি চর এলাকায় গবাদি পশুর খামার গড়ে উঠেছে কারণ সেখানে পশু খাদ্যের পরিমাণ এবং উৎপাদন রয়েছে প্রয়োজন মাফিক। সে সকল এলাকায় দুধের উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি সেটির উপজাত দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি পাওয়া যাচ্ছে পরিমাণ মতো। সমস্যা হচ্ছে যে সকল দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি পরিবহন সুবিধার অভাব। যথাযথ পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দুধে পানি মেশানোর যে চিরাচরিত অসৎ পদ্ধতি, সেটারও বিলুপ্তি ঘটবে কারণ পর্যাপ্ত সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণ সুবিধার ব্যাপ্তি ঘটলে পারস্পরিক (ব্যবসায়িক) প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং যৌক্তিক মূল্যে দুধ এর জোগান ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আগেই বলেছি কঠোর পরিশ্রম আর উৎপাদন সক্ষমতা মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকেও বাড়িয়েছে। সে হিসাবে বাজারজাতকৃত দুধ এবং এর উপজাত সমূহ অবিক্রিত থাকার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে।
মাংসজাত দ্রব্যাদি নিয়ে এখন আর চিন্তিত হবার কারণ নাই। মাংস ব্যবসায়ী সংগঠন সমূহ বারবার দাবি জানিয়ে আসছে বিদেশের বাজার থেকে মাংস বা তদজাতীয় দ্রব্যাদি আমদানি বন্ধ করার জন্য। কারণ এতে আমাদের মাংস উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনায় ধীরলয়ের সৃষ্টি হবে আবার মাংস আমদানীর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলেও টান পড়বে। তাই আমাদের দেশের গো মাংস সাথে সাথে মহিষ ছাগল জাতীয় পশুর মাংস উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রণোদনা বাড়াতে হবে সত্ত্বর। আজকাল এ জাতীয় ব্যবসায় অর্ধশিক্ষিত, প্রশিক্ষণ বিহীন মানুষজনও নিয়োজিত হচ্ছে। গ্রামীণ মা বোনেরা আপন আঙ্গিনায় সাধ্যমত দু’একটা বা মুষ্টিমেয় সংখ্যক গবাদি পশু পালন প্রক্রিয়া চালু করেছেন এবং সফল হচ্ছেন নানা উপায়ে। তারা বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব বা সাধারণ ভোক্তাদের জন্যে মাংস সরবরাহে নিজেদের ঘরোয়া খাবার থেকে উৎপাদিত মাংস সরবরাহ করতে পারছেন। সরকারি পরিসংখ্যানে এ জাতীয় তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গরু, মহিষ, ছাগল জাতীয় পশু সম্পদের সংখ্যা বৃদ্ধি বা মাংস উৎপাদন এর খতিয়ান পর্যন্ত উল্লেখ করা হচ্ছে। অবশ্যই এ জাতীয় তৎপরতা জাতীয় অর্থনীতির শক্তি যেমন বাড়াবে তেমনি কর্ম সংস্থান প্রক্রিয়াও জোরদার করবে আশাতিরিক্তভাবে।
বিভিন্ন ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। আজকাল বাজারে হেন ফলমূল নাই যেগুলি দুষ্প্রাপ্য। জানা যায় সেগুলি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সফলভাবে উৎপাদন করতে পারছেন আমাদের দেশের উদ্যমী তরুণ তরুণীরা। তারা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারছেন আবার জৈব সার উৎপাদন প্রক্রিয়া আয়ত্ত করে রাসায়নিক সার এর বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করছেন আপন খামারগুলিতে। এতোকাল আমরা যে সকল ফলফলাদি সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসে বলে জানতাম সেগুলির অনেকটাই আমাদের উদ্যমী তরুণ তরুণীরা উৎপাদন করছেন আমাদের দেশের উর্বরা মাটি ব্যবহার করেই। মরুভূমি ছাড়া খেজুর উৎপাদন সম্ভব নয় বলে জানতাম এতোকাল, হাল আমলে আমরা দেখছি আমাদের দেশের মাটিতেই সেগুলি ভালোভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। বাজারজাতও হচ্ছে। হাতের কাছে যথাযথা মূল্যে ভোক্তারা সেগুলি পাচ্ছেন বলে জানি। বিস্ময়করভাবে মরুদেশের উটের খামারও আমাদের দেশটিতে গড়ে উঠেছে। উটের মাংসের পাশাপাশি উটের দুধও আমরা পাচ্ছি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে বাজার থেকে।
সেদিন একজন বোদ্ধা ব্যক্তি আমাকে মজা করে বলছিলেন আজকালকার মিটিং মিছিলের আকার আয়তন নিয়ে কিছু কথা। তার মতে এ জাতীয় কর্মকান্ডে তরুণ, কিশোরদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। জীবনের কঠোর বাস্তবতা এদের শ্রমবিমুখতা আর সংস্কার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আজ তারা পড়াশোনার পাশাপাশি নানা প্রকার অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে মৎস্য, কৃষিসহ নানাপ্রকার উৎপাদনমুখী খামার তারা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যমী হয়ে উঠেছে। এ জাতীয় কর্মকান্ডকে সামাজিক বিবর্তন হিসাবে দেখতে হবে আর সামাজিক আন্দোলন এর অনুঘটক রূপে এটিকে মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি প্রণোদনা আবার যথাযথ প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করে এই উদ্যমী তরুণ সমাজকে অগ্রসরমান জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করনে সহায়তা করতে হবে।
সারা বিশ্বের পোশাক শিল্পের ব্যাপ্তি ঘটেছে। চাহিদা অনুসারে বাংলাদেশ শতভাগের একভাগ এর চেয়েও কম পরিমাণ পোষাক আমরা উৎপাদন খাতে যোগ করতে পারছি বিশ্ব বাজারে। আজ যদি তরুণ প্রজন্ম পোষাক খাতটিতেও আপন শ্রম ও মেধা কাজে লাগাতে পারে সেটি হবে একটি প্রশংসনীয় মহৎ কর্ম। আমরা অনেকেই ধারণা পোষণ করি পোশাক প্রস্তুত শিল্প বিরাট আকার আর বিরাট পরিসরের একটি কর্মযজ্ঞ। আসলে সেটি যে এমনতরো নয় সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে। একজন তরুণ যদি একটি সেলাই মেশিন নিয়ে আপন ঘরে বসে যায় পোষাক তৈরির উদ্দেশ্যে অবশ্যই যে সফল হবে। তার আগে তাকে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং সে ব্যাপারে সরকারি অনেকগুলি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে পোষাকের নানামুখী বিবর্তনধর্মী ধরন সম্বন্ধে তারা আপন আপন কর্মক্ষেত্র ঠিক করে নিতে পারবে। বাজারজাতকরণ আর কর্মদক্ষতা তাদের জন্য কোন বিপত্তির কারণ হবে বলে মনে হয় না। নিজ কর্মনৈপূণ্য আপন উৎপাদিত দ্রব্যাদির চাহিদা নিশ্চিত করবে অবশ্যই। এমনিভাবে একে অপরের দ্রব্যাদিকে গুণেমানে আকর্ষণীয় করতে কঠোর আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা নিয়োজিত করতে পারবে একমাত্র তরুণরাই। প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে তখনই বাস্তবে।
মনে রাখতে হবে আমাদের দেশে অসংখ্য কিশোর সংশোধন কেন্দ্র রয়েছে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে। এই সমস্ত সংশোধনাগার হয়ে উঠতে পারে একেকটি উৎপাদনমুখী শিক্ষালয়। নানাপ্রকার হস্তশিল্পজাত পণ্য সামগ্রীর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান পোষাক (তৈরি) শিল্প উৎপাদনের মাধ্যম হতে পারে এগুলি। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত এ জাতীয় কেন্দ্রের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন এবং রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো কিশোর, তরুণদের সংগ্রহ করে বেপথু অবস্থা থেকে একটি আলোকিত জীবনধারায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা নেয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে ঢাকা সহ বাংলাদেশের অনেক কারাগারে তৈরি পোষাক খাতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যথাযথভাবে অনুরূপভাবে কিশোর তরুণ সংশোধনাগারগুলিকে এ জাতীয় কর্মধারায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা সত্ত্বর গ্রহণ করা আবশ্যক। বেসরকারি পর্যায়ের এ জাতীয় যে সকল প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলিকেও সরকারি প্রণোদনা ও নজরদারীর আওতায় এনে জাতীয় উৎপাদিকা শক্তির পরিমন্ডলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা দরকার অতি সত্তর।
আমাদের দেশে রয়েছে অসংখ্য এতিমখানা। সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে এগুলি পরিচালিত হয়। এতিমদের আশ্রয়দান করা এবং নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত তাদের শিক্ষা দীক্ষা সহ নিরাপত্তা প্রদান করাই এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ বলেই মনে হয়। সেগুলির পরিসর আরো বাড়িয়ে কারিগরী শিক্ষাক্রমের আওতাধীন বাস্তব জীবনে আবশ্যকীয় শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ অতি জরুরী এই সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তথা পিতৃমাতৃহীন কুলহারাদের জন্য। এরাই ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির জন্য বয়ে আনবে সুদিনের বারতা এবং আপন জীবনকেও ফুলে ফলে ভরে তুলতে নিশ্চিতভাবে সক্ষম হবে। আমাদের দেশে অসংখ্য এবতেদায়ী এবং মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি মাদ্রাসা রয়েছে। শুনতে পাই এগুলির শিক্ষাক্রমে নতুন কিছু সংযোজন এর প্রক্রিয়া চলছে। এদের শিক্ষা কর্মসূচির মান সাধারণ শিক্ষা কর্মসূচির সাথে ইতিমধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। লিল্লাহ মাদ্রাসা বা বোডিংগুলিতে উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং আপন আয়ের যতোটুকু সম্ভব নিজ পায়ে দাঁড়ানোর শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রবর্তন অতি জরুরী বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়। আগর ফেরদাউস বররুয়ে জমিনস্ত।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • Developed by: Sparkle IT