মহিলা সমাজ

জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

রেজুয়ানা খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০১৯ ইং ০১:০৭:০৬ | সংবাদটি ২২২ বার পঠিত

দুই বা ততোধিক মানুষ বা জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের অবস্থান, গুণাবলী ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বা একদলকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদলকে অবমূল্যায়ন করা হয় তাই বৈষম্য। অন্যদিকে নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনমান অর্জনের সঠিক হিসাব-নিকাশের ব্যাখ্যা হলো ক্ষমতায়ন। ক্ষমতায়ন ব্যক্তির আত্মবিশ্বোসকে দৃঢ় করে, যার দ্বারা সে তার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে শেখে। পরমুখাপেক্ষী না হয়ে স্বনির্ভর হয়। এভাবেই একজন নারী বা পুরুষ যখন মতামত প্রদানের ক্ষমতার অধিকারী হন, তখন মনে করা হয় তার ক্ষমতায়ন হয়েছে। এখানে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রধান দিকটিকে বোঝানো হয়েছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ দুপুরে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার চৌগাছা গ্রামের কমরেড আব্দুল মাবুদের ছেলে তরিকুল ইসলাম জয়ের সাথে কুষ্টিয়া ইসলামীয়া কলেজে অনার্স পড়–য়া চুয়াডাঙ্গার হাজরাহাটি গ্রামের কামরুজ্জামানের মেয়ে খাদিজা আক্তার খুশির বিয়ে হয়। এটা খুব সহজ ও স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এটি কোনো সংবাদই নয়। কোনো নিউজ ভ্যালু নেই এতে! আসলে এর নিউজ ভ্যালু অনেকগুণ বেড়ে যায় যখন নিউজটির সূচনা হয় এভাবে- বিয়ের কনে যাত্রীদের নিয়ে স্বয়ং বরের বাড়িতে হাজির হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। যৌতুকমুক্ত বিয়ে ও নারী অধিকার নিশ্চিত করতে উভয় পরিবারের আয়োজনের মধ্য দিয়েই এ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ের আয়োজনে অসংখ্য অতিথির আগমন ঘটেছিল, ব্যতিক্রমী এ বিয়ের আয়োজন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। লাল বেনারসি শাড়ি পরা কনে গাড়ি থেকে নেমে এসে বিয়ের গেটের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফিতে কেটে বরের বাড়িতে প্রবেশ করেন। বিয়ে শেষে বরকে সাথে নিয়ে অন্যান্য আত্মীয়স্বজনসহ বাবার বাড়িতে ফিরেন কনে। আবার সেখানে কয়েক দিন কাটানোর পর কনেকে নিয়ে বর ফিরে আসেন নিজের বাড়িতে।
আজকাল দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীসহ বর কনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মেহেরপুরের গাংনীতে নবযুগলের বিয়ের মধ্য দিয়ে যেন এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। নারীর ক্ষমতায়ন, যৌতুকমুক্ত বিয়ে ও যৌতুকমুক্ত সমাজ গঠন। লিঙ্গ বৈষম্যের কঠিন শিকল ভেঙ্গে নারী জাগরণ ও নারী শিক্ষার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার আন্দোলন স্বার্থক বলে প্রমাণিত হলো। বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বাল্যবিবাহ রোধ ও যৌতুকমুক্ত সমাজ গঠনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। সরকার নারীদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য নানাবিধ কাজ হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার মেয়েদের শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষা দান ও বৃত্তি প্রদান কার্যক্রম এবং গ্রামাঞ্চলে ছাত্রীদের শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি পাস করে সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার ও ব্যবসায় সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করেছে। সমাজে বাল্যবিবাহ রোধ ও বহুবিবাহ বন্ধে সরকার কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ও বিবেকবান মানুষদের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা খবরের পাতাগুলোতে প্রায়ই ওঠে আসছে।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ২০০৯ থেকে এর যাত্রা অব্যাহত আছে। নারীর অগ্রযাত্রা ও ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনীতিতে জেন্ডার সমতায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব সফলতা অর্জিত হয়েছে। সর্বস্তরে নারীদের প্রশিক্ষণ, চাকুরির সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তৈরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ, নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদির প্রয়োগ লক্ষণীয়ভাবে প্রশংশিত। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দারিদ্র্যবিমোচন, নারী পাচার রোধ, নারী নির্যাতন বন্ধ করাসহ নারীদের নিরাপত্তা বিধান ও আর্থ সমাজিক উন্নয়নে সরকার নানা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের সুবিধাবঞ্চিত নারীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অধীন পরিচালিত বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তাদের ভাতা প্রদান কর্মসুচি, বিত্তহীন নারীদের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে ভিজিডি কর্মসূচি, ঋণ প্রদান কর্মসূচি, কৃষি, সেলাই, ব্লক-বাটিক, হস্তশিল্প, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, বিউটি পার্লার, আয়বর্ধক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সহায়তা প্রদান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া সরকারের উদ্যোগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার গৃহহীন নারী ও বিধবাদের আশ্রয়ণ, আমার বাড়ি আমার খামার, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে আবাসনের ব্যবস্থাসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে আশ্রিত পরিবারের সমর্থ যুবক-যুবতীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শিশু নির্যাতন বন্ধ, নারীর প্রতি অবহেলা ও সহিংসতা রোধ এবং বাল্যবিয়ে রোধে বাংলাদেশ অনেক সফলতা দেখিয়েছে। আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে এদেশে শূন্যে নামিয়ে আনার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার ইতোমধ্যে পারিবারিক, সামাজিক ও নানামুখী সহিংসতা মোকাবিলায় আইন, কেন্দ্রীয় সেল, ডিএনএ ল্যাব স্থাপন, নারী পাচার রোধ, বিভাগীয় শহরগুলোতে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারী, কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন ইত্যাদির বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সকল ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সব রকমের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। বর্তমান সরকার দেশে লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা; জাতীয় সংসদে নারী স্পিকার নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নারী নিয়োগ, সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে নারীদের নিয়োগ দান; প্রশাসনিক বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। নারীরা সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বেঞ্চগুলোতে বিচারপতি হিসেবে বিচারকার্য পরিচালনা করছেন। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ দেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পদগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বলেন, বধ্যমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সহিংসতাসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকবেলা করে নারীর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জীবন ও জীবিকার সবক্ষেত্রে নারীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে। কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, এই উপলব্ধি ছাড়া লিঙ্গ সমতা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে না। (তথ্যসূত্র : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিডিনিউজ২৪.কম)। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী লিঙ্গ সমতা দূর করার দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
নারী অধিকার, সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে যৌতুকমুক্ত বিয়ে ও নারী পুরুষ সমান অধিকার, জেন্ডার ইস্যুর বাস্তবায়ন সমাজে নতুন ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নারীদের অগ্রযাত্রায় সরকারের যেসব পদক্ষেপ চলমান রযেছে, তা অতি দ্রুত বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে তুলবে। অন্যের মুখাপেক্ষী বা দ্বারস্থ হয়ে নয়, নারীর ক্ষমতায়ন তখনই স্বার্থক হবে যখন নারীরা সর্বত্র অবাধ বিচরণ করতে পারবেন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জাতির সামনে নিজেদের অবদানকে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। একজন শিক্ষিত নারী একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে উঠে কর্মক্ষেত্রে তার যথার্থ প্রয়োগকে বাস্তব রূপ দিতে পারবেন। এ সাথে সচেতন মা হিসেবে পরিবার ও সন্তানকে যথাযথভাবে পরিচালিত করতে সক্ষম হবেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও কল্যাণের অংশীদার হতে পারবেন গর্বের সাথে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT