উপ সম্পাদকীয়

আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১১-২০১৯ ইং ০০:৩০:৫১ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

আর স্থির থাকতে পারছি না। একের পর এক ঘটে চলেছে বর্বরোচিত ঘটনা। চোখ-মুখ-বুজে, দাঁতে দাঁত চেপে শুধু দেখে যেতে হচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে, একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে এ যে কতোটা কষ্টের কে বুঝবে? কে অনুধাবন করতে পারবে আমাদের সেই বেদন? কে আছে? পত্রিকায় পড়লাম জুলাইয়ের শেষদিকে বগুড়ায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে এক বখাটে ও তার সাঙ্গপাঙ্গ। তারা আবার প্রবল ক্ষমতাশালী। জাতীয় শ্রমিক লীগ বগুড়া শহর শাখার আহ্বায়ক ওই ঘটনার নেতৃত্ব দানকারী। সেই অপরাধীর নাম তুফান সরকার। তারা সদলে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ তো করেছেই এরপর মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে। কিশোরীর মাকেও তারা ছাড়েনি। পুনরায় তুলে নিয়ে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে মরেও। ভাবতে অবাক লাগে, তার এ বর্বরতায় সহায়তা করেছে দুই নারী তথা অভিযুক্ত ধর্ষক তুফানের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকি। পত্রিকায় আরও প্রকাশ শ্রমিকলীগে যোগ দিয়ে দুই বছরেই কোটিপতি বনে গেছে বগুড়ার সেই ধর্ষক তুফান সরকার।
ঘটনা ঘটার দুয়েকদিন যেতে না যেতেই আবারও পত্রিকায় পড়লাম রাজধানীর বাড্ডায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলের পাশেই একটি ঘরে বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুটি থাকত। তাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। মেয়েটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
এরপর আবারও ৩ আগস্ট পত্রিকায় পড়লাম-ফেসবুকে অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেয়ার অপমান সইতে না পেরে কুমিল্লার লাকসামে স্মৃতি নামে এক কলেজছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। তার চিরকুট থেকে জানা যায়, আলম নামের এক বখাটে ছেলে সম্প্রতি তার ছবি অশ্লীলভাবে এডিট করে তা ফেসবুকে পোস্ট করে। বিষয়টি স্মৃতি জানার পর লজ্জায় অপমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ব্যাস, আর লিখতে পারছি না। হাত ধরে আসছে। ভাবা যায়? লিখা যায় এইসব যন্ত্রণা?
কিন্তু ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে এই বর্বরোচিত ঘটনার মিছিল। ছোটোবেলায় পড়তাম-অত্যাচারী চিরকালই ভীরু। এখন দেখছি অত্যাচারী হয়েও একের পর এক বর্বরোচিত কর্ম সম্পাদন করে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আরও বেশি বেপরোয়া ও দুসাহসী হয়ে উঠছে তারা দিনকে দিন। প্রকৃতপক্ষে, লাগাতার বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্রমাগত আমাদেরকে অসুস্থ করে তুলছে। অস্থির করে তুলছে। এই পৈশাচিক কাপুরুষোচিত অন্যায় বারবার সংঘটিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। তবু আমরা এর বিরুদ্ধে কোটি কন্ঠের প্রতিবাদ তুলতে পারছি না। আমাদের চেতনা ও চৈতন্যে ক্রমাগত ভয় ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছে তারা সেই অন্ধকার শক্তি। কিন্তু এখনো আমরা নির্বাক।
কিন্তু এভাবে আর কতো? আমরা কি তবে মানুষ? আমাদের সামনে এতকিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ নির্লিপ্ত থাকছি এই ভেবে যে আমার তো কিছু হচ্ছে না! আমরা কি তবে সেই মানুষ যারা খুব তাড়াতাড়িই পরিস্থিতির সাথে ইউজ টু হয়ে যাচ্ছি। কোনো একটা ঘটনা ঘটলো, চ্যানেল বদলে-বদলে সারারাত ধরে দেখলাম, বিরক্তি ঝরালাম, ক্ষোভ ঢাললাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। পরদিন পত্রিকায় পড়লাম, কিছু ম্যাসেজ দিলাম, কিছু কল করলাম-তারপর ভাবলাম-আমার কিছু হয়নি-আমার নিকটাত্মীয় কারও কিছু হয়নি সুতরাং চুপ থাকাই শ্রেয় এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ। আর এরপর সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি আমার ও আমার আপনজন কারও কিছু হয়নি বলে? এরপর পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার পরিবর্তে এর সাথে এডজাস্ট হয়ে যাচ্ছি!
কিন্তু আমরা তো সরকার বানাই রাষ্ট্র চালাবে বলে, জাতিসংঘ গঠন করি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য। আমরা বিশ্বাস করতে চাই-এই রাষ্ট্র, সরকার, এর পুলিশ ফোর্স-আর্মি-র‌্যাব-এপিবি-বিজিবি-গোয়েন্দা সংস্থা-রাষ্ট্রীয় আইন-এমনকি জাতিসংঘ এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সক্ষম। কিন্তু, তুফান সরকারদের কতোটুকু শাস্তি দিতে পারছি আমরা? আলমদেরকে আমরা কতোবার বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছি? এক আসামী দোষী কি না তা খতিয়ে তেখতেই তো আমাদের ১০ বছর লেগে যাচ্ছে। আমার দেশের রাষ্ট্রীয় অপরাধী অন্যায় করে দেখছি-দিব্যি ছড়ি ঘুরাচ্ছে ভিকটিমের সামনে। আমরা হাত গুটিয়ে আছি, কিছু করতে পারছি না বলে।
কথা হচ্ছে এতো কিছুর পরও আমি, আমরা যেনো এখন কিছুই বলছি না-কারণ, আমাদের ঘনিষ্ঠ কারও এমন হয়নি বলে। এটাই কি তবে অন্যতম কারণ? তবেই আমি-আমরা এসবের প্রতিবাদে নামবো? কেবল তখনই প্রতিবাদটুকু আমার কাছে জায়েজ মনে হবে? রাষ্ট্রের কাছে জায়েজ মনে হবে? এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। হতে পারে না। এমনটা ভাবা যায় না। কারও হাতের রিমোট দ্বারা আমার প্রতিবেশি আক্রান্ত হবে-এমনটা মানা যায় না।
আমরা অবাক হয়ে দেখছি-আশ্চর্য গতিতে আমাদের মনুষ্যত্ববোধ উধাও হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সমাজবোধ ভাঙছে। সমাজ ভাঙছে। মূল্যবোধ ভাঙছে। আমরা ভাঙছি। সামাজিক মানুষ দিনকে দিন একাকি মানুষে পরিণত হচ্ছে। আজ যারা ওইসব বর্বরোচিত কান্ডের সাথে জড়িত-তাঁরাওতো কোনো না কোনো নারীর সন্তান। কারও ভাই। কারও ছেলে। কারও প্রিয়তম। মানুষ হয়ে এতো বড় বর্বরতা-এরচেয়ে জঘন্য কান্ড আর কী হতে পারে?
আজ যেভাবে এসব পৈশাচিক ঘটনা ঘটে চলেছে-এর বিচার না চেয়ে যদি কালো গাড়ির ভিতর থেকে উড়ালসেতুর দিকে তাকিয়ে উঁচু-উঁচু তলার ভবন দেখি আর উন্নতি হচ্ছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি, যদি হৃদয়ে ঘৃণার বারুদ সাথে নিয়ে তা প্রতিবাদের আগুণে পরিণত না করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াই তবে সেই এক তরফা আনন্দ হয়তো উপভোগ করবো কিন্তু আমাদের দিকে ধাবমান অন্ধকারের বিপদ সংকেত আমরা কি শুনতে পাবো? যদি এসবের বিচার না হয়, যদি এর শেষ না হয়, যদি চলতেই থাকে এমন তান্ডব তবে আমরা আমাদের শিশুদের কোথায় রেখে যাবো? আমরা কি এর জবাব দিতে প্রস্তুত হবো না? সারা জীবন ধরেই কি তড়পাতে তড়পাতে অত্যাচারিত হতেই থাকবে দুর্বল। তুফানরা মানুষ হয়ে যেভাবে পশুত্বে নেমে গেছে-এর শেষ তবে কোথায়? যেখানে বাঁচার অধিকার ভালো থাকার অধিকার মানুষের প্রথম ও প্রধান ন্যায্য অধিকার। যখন সেই অধিকার কেউ কেড়ে নেয় এবং আমি, আমরা এমনকি রাষ্টযন্ত্র এর কাঠোর বিহিত করতে অক্ষম হই তখন সেই রাষ্ট্রযন্ত্র, আমি-আমরা কী এর দায় কখনও কোনোভাবে এড়াতে পারবো?
শেষ করছি একটি বৈজ্ঞানিক গল্প দিয়ে। ইংরেজিতে বয়লিং ফ্রগ সিনড্রোম নামে একটি ধারণা চালু আছে। এটা একটা জনপ্রিয় মেটাফোর। এই মেটাফোরটি হচ্ছে একটা ব্যাঙকে যদি আপনি একটি পানি ভর্তি পাত্রে রাখেন এবং পাত্রটিকে উত্তপ্ত করতে থাকেন তবে ব্যাঙটি পানির তাপমাত্রার সাথে সাথে নিজের শরীরের তাপমাত্রায় ভারসাম্য আনতে থাকে। লাফ দিয়ে বেরোনোর পরিবর্তে সে পানির উত্তাপ সহ্য করতে থাকে। কিন্তু এক সময় পানির তাপমাত্রা সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে ব্যাঙের শরীর আর তা মানিয়ে নিতে পারে না। যখন পানির অসহনীয় তাপমাত্রার সাথে তার নিজের শরীরের তাপমাত্রার আর সমতা রাখতে পারে না, তখন ব্যাঙটি ফুটন্ত পানির পাত্র থেকে লাফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু হায়! সে লাফ দিতে পারে না তখন, কারণ সে তার সমস্ত শক্তি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করে ফেলেছে। অতঃপর সে পানিতে সিদ্ধ হতে থাকে। তার মৃত্যুর কারণটা আসলে গরম পানি হলেও এর প্রকৃত কারণ কিন্তু লুকিয়ে আছে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে। সব কিছু সহ্য করে নেবার মত বড় ভুল তার মৃত্যুর কারণ। পাত্রের পানি গরম কেন, তার প্রতিবাদ না করে বরং এর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়াই তার জীবন্ত সিদ্ধ হবার কারণ। সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে না নেয়াই তার মৃত্যুর কারণ। হঠাৎ করে সেই সিদ্ধ হওয়া ব্যাঙের কথা মনে পড়লো। খুব সম্ভবত আমরাও ঐ ব্যাঙের মত মানিয়ে নিচ্ছি আমাদের চারপাশের সাথে। সহ্য করছি সব, আর ভাবছি টিকে আছি, টিকে থাকবো। আমার তো কিছু হয়নি। তাহলে কেন আমি রুখে দাঁড়াবো? আসলে আমরা সেই বয়লিং ফ্রগ সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে পড়ছি। হয়তো বা অজান্তেই। হয়তো বা সচেতনভাবে অচেতন পদার্থের মতো আচরণ করার কারণে। কিন্তু যখন মনে উদয় হবে প্রকৃত সত্য, প্রকৃত অবস্থা। যখন আমরা বুঝবো, তখন ডিসিশান মেকিং এর কোন শক্তিই আর শরীরে অবশিষ্ট থাকবে না। তখন আমাদের সমূহ পতন ঠেকাবে কে?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক আইন-২০১৮
  • বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গ
  • বাঙালির ধৈর্য্য
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • Developed by: Sparkle IT