ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পুরান পাথরের যুগ থেকে

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৭:১২ | সংবাদটি ১৩১ বার পঠিত

মানুষের কথা বলা শেখা ও লেখাপড়া শেখার কৌশল আয়ত্তে আনা অনেক বড়ো এক অর্জন। মানুষ যদি পড়া ও লেখার কৌশল আবিষ্কার করতে না পারতো, তাহলে ধারাবাহিকভাবে আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা ও নতুনদেরকে তা জানানো দূরূহ ব্যাপার হতো। কাজেই বিভিন্ন ভাষার মানুষ যারা বিভিন্ন রকমের বা আকৃতির চিহ্ন বা বর্ণ দ্বারা লেখার রীতি আবিষ্কার করে সেই কঠিন কাজটিকে সহজ করে রেখে গেছেন, তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখতে হবে। প্রাচীন যুগের ওই মানুষেরা শুরুতেই খুব বুদ্ধিমান ছিলো না। আবির্ভাবের লক্ষ লক্ষ বছর পার করে মানুষ বুদ্ধিতে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিস্তারিতভাবে জেনে মনে রাখতে না পারলেও মাঝে মাঝেই অতীত থেকে হেঁটে আসার টুকরো টুকরো গল্প জানা দরকার। আমরা বিপথগামী হই মূলের খবর রাখি না বলেই।
আমাদের এই গোলাকার পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষের উৎপত্তি বা আবির্ভাব ঘটেছে এখন থেকে প্রায় বিশ লক্ষ বছরেরও পূর্বের প্রাগৈতিহাসিক যুগে অর্থাৎ যে যুগের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ জানা সম্ভব হয়নি সেই সময়ে। প্রথম দিকের মানুষ এখনকার মানুষের মতো করে অর্থ বোধগম্য শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে কথা বলতে পারতো না। তাদের এতো বুদ্ধিও ছিলো না। তারা শুধু জীবন ধারণের জন্যে বন জঙ্গলের ফল গাছের শিকড়-বাকড়, আর ইদুঁর, কাঠবিড়ালী, ছোটো ছোটো পাখি ইত্যাদি খেয়ে চলতো। তবে মানুষেরা তখনও দলবদ্ধভাবেই বিচরণ করতো। ওই মানুষগুলো এক সময় পাথর খন্ড ঘষে ঘষে ধারালো অস্ত্র বা হাতিয়ার বানাতে শিখে ফেলে এবং তা দিয়ে আঘাত করেই ছোটো বড়ো পশু শিকার করে খেতে আরম্ভ করে। প্রাচীন যুগের ইতিহাসের ওই সময়টাকে পুরান পাথরের যুগ বলা হয়। ওই সময়ে মানুষ পাথরে ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখে এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে মাংস খাওয়াও শিখে নেয়। গবেষকদের ধারণায় ফুটে উঠেছে যে, ওই যুগের মানুষের মগজ গরিলার মতো ছোটো ছিলো, বুদ্ধি ছিলো কম। শারীরিক গঠনও ছিলো অন্য রকম, চোয়াল ছিলো বেশ বড়ো। সময়ের সাথে সাথে ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে চোয়াল ও অন্যান্য অঙ্গে পরিবর্তন আসে। পুরান পাথরের যুগের মানুষ ছিলো প্রধানত পশু শিকারী। তারা শিকারে দল বেঁধে বের হতো। যখন পশু শিকারের উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে বের হতো, তখন প্রয়োজন বুঝানোর জন্যে বা একে অন্যকে উদ্দেশ্য বিনিময় করার জন্যে অল্প স্বল্প কণ্ঠের আওয়াজ করতো এবং বিভিন্ন ইশারায় একজন অন্য জনকে নির্দেশ করতো। এভাবেই কণ্ঠ ধ্বনি বা আওয়াজ থেকেই ধীরে ধীরে নিজস্ব অর্থবোধগম্য কথা বলতে শিখে নেয়।
প্রাচীন যুগের ইতিহাসের পুরান পাথর যুগের ওই মানুষরাই কালক্রমে বিভিন্ন আকৃতির পাথর ঘষে বা ভেঙে নানান রকম অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি বানানো শিখে নেয়। পরে ওইসব যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারের সাহায্যে ক্রমশঃ আদিম মানুষগুলো তাদের জীবনের অনেক কঠিন কাজকে সহজে করে ফেলতে শিখে। এরপর কেটে গেছে ধারাবাহিকভাবে হাজার হাজার বছরের পথের দুঃসহনীয় যাত্রা। ওই প্রাচীন যুগের আদিম মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে চিন্তারও পরিবর্তন আসে। সেই সময়ের মানুষের পরিবর্তন হতে হতে মানুষের বুদ্ধিও উন্নত হয়। আজকের আমরা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত বুদ্ধিমান মানুষ তা কিন্তু ওই পুরান পাথর যুুগের মানুষের বংশধর। আনুমানিক প্রায় এক লক্ষ বছর আগেই এই বুদ্ধিমান মানুষের উৎপত্তি হয়েছিলো। পন্ডিতদের মতে, এই আধুনিক মানুষদের উৎপত্তি আফ্রিকাতে হয়েছিলো। এর পরবর্তীতে আফ্রিকা থেকে এই মানুষেরা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় জীবনের প্রয়োজনেই ছড়িয়ে পড়েছিলো। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও, তখন পর্যন্ত মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত ও সম্পদে ভরপুর আমেরিকায় পৌঁছায়নি। আমেরিকায় মানুষেরা পৌঁছে আরো অনেক অনেক বছর পরে। এখন থেকে অর্থাৎ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ওই আগের মানুষেরা বেরিং প্রণালী হয়ে উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করে। তখন বরফ যুগ চলছিলো, তাই অনেক জায়গা বরফে ঢাকা থাকতো। এছাড়াও এশিয়া ও আমেরিকার মাঝে দূরত্ব বেরিং প্রণালীর কাছে মাত্র প্রায় আশি কিলোমিটার। তাই তারা সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যায় এবং সেভাবেই বহু কষ্টে আমেরিকাতেও পৌঁছে যায়। এদের বংশধররাই ছড়িয়ে যায় দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ আমেরিকার পথে। প্রাচীন ইতিহাসের বরফ যুগ শেষ হয়েছে আজ থেকে দশ হাজার বছর আগে। তখনকার বরফ গলে গলে পানির প্রবাহ নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। আরেকদল শিকারী মানুষ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে এশিয়া অঞ্চল থেকে ইন্দোনেশিয়ার ছোটোবড়ো দ্বীপগুলো পার হয়ে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। সেখানে তারা ক্যাঙারো প্রভৃতি প্রাণী শিকার করে জীবন অতিবাহিত করতো।
সুপ্রিয় পাঠক, এভাবেই আদিম মানুষের বংশানুক্রমে প্রাচীনকাল থেকে ক্রমশঃ শিখে শিখে এগুতে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। আমরা সেই পুরান পাথর যুগ থেকে এ পর্যন্ত আধুনিক সভ্য জগতের মানুষ। এখানে খুবই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছি ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া থেকে। পৃথিবীটা আমাদের এবং আমরা এই পৃথিবীর মৃত্তিকায় বেড়ে ওঠা নানান ভাষার, নানান বর্ণের, নানান ধর্মের, নানান সংস্কৃতির মানুষ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে পাই, আমরা আসলে একই বংশধারার মানবজাতি। এদিক থেকে আমাদের সারা দুনিয়ার মানুষের জীবনে একটি কথাই সত্য মানা উচিত যা কবি বলেছেনÑ ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই/ একই বরণ দুধ,/ জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম/ একই মায়ের পুত’। সেই আদি থেকে মানুষ সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়তে গড়তে এগিয়ে এসেছে সভ্যতার বিকাশমান মাঠে। মানুষ সমৃদ্ধির পথে এভাবেই এগিয়েছে। এখানে মানুষে মানুষে পশুদের মতো হানাহানি মানুষেরই অপমান। আমরা কথা বলতে শিখেছি, ভালোমন্দ চিনেছি। অতএব, আমরা কথায় ও কাজে সুন্দর ফুটিয়ে তুলবো। মনে রাখতে হবে, ‘সুবচন সুখ্যাতি মানুষেরই হয়/ কুবচন কুখ্যাতি অমানুষে বয়’।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT