ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ

শুহেদ উজ জামান প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৯:২৯ | সংবাদটি ৩৬৭ বার পঠিত

সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পুণ্যভূমি সিলেট জেলা। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই জেলার উন্নত উপজেলা গোলাপগঞ্জের অন্তর্গত সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত, লোকহিতৈশী, অনেক রতœ প্রসবিনী ঐতিহ্য মন্ডিত সিলেট শহর থেকে ২৬ মাইল দূরে ভাদেশ্বর এক সমৃদ্ধ জনপদ।
এই গ্রামে খান বাহাদুর নাছির উদ্দিন চৌধুরী ১৮৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মো. মোশাররফ উদ্দিন চৌধুরী, মাতা- আমেনা খাতুন। তিনি অল্প বয়সে পিতাকে হারান। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর মা-ই তাকে লেখাপড়া চালাতে উৎসাহিত করেন। প্রাথমিক শিক্ষা নেন ভাদেশ্বর ও সিলেট শহরে। তারপর নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ভগ্নিপতি গোলাম ইজদানী চৌধুরী তাকে তার কর্মস্থল হবিগঞ্জে নিয়ে যান। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ১৮৯২ সালে ‘এনট্রান্স’ পাশ করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি ইংরেজী অনার্সসহ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। এরপরে ১৮৯৭ সালে ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ১৮৯৯ সালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এল পাশ করেন। ১৯০০ সালে নাছির উদ্দিন বেঙ্গল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯০৪ সালে চাঁদপুরের রূপসার জমিদার শমসের গাজী সাহেবের প্রথমা কন্যা আশরাফুন নেছাকে বিবাহ করেন।
১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদের চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৩৬-১৯৪১ সাল পর্যন্ত সরকার কর্তৃক মনোনীত কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। বিয়ের ৩/৪ বছর পর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মারা যান। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। পরলোকগত স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে ভাদেশ্বর দক্ষিণভাগ গ্রামে ‘আশরাফুন নেছা’ দাতব্য হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া জনহিতকর কাজÑ রাস্তা, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি একজন দানশীল, উদার হৃদয়ের ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৫১ সালের ১লা মে ভাদেশ্বর নিজ বাড়ীতে পরলোক গমন করেন।
১৯১৯ সালে এই মহান ব্যক্তির উদ্যোগে ও অগ্রণী ভূমিকায়, তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে এবং গ্রামের সর্বস্থরের জনগণের উৎসাহ ব্যঞ্জক অংশ গ্রহণে স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে, ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে, কারী সফর আলী সাহেবের বাড়িতে সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী সাহেবকে প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত করে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেন। পুরোদমে ছাত্র ভর্তি শুরু হলে, ঘরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় দক্ষিণ ভাগের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত এক বড় টিলায় স্কুল স্থাপন করা হয় এবং হেড মাস্টারের কোয়ার্টার, হিন্দু শিক্ষক ও হিন্দু ছাত্রদের জন্য বোডিং হাউস ও মুসলমান ছাত্র শিক্ষক যারা আসবেÑ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় প্রত্যেক বাড়ীতে একজন শিক্ষক বা ছাত্রকে জায়গীর দিতে হবে। ভাদেশ্বর দক্ষিণ ভাগ বর্তমান ঈদগাহ টিলায় প্রাকৃতিক সুন্দর পরিবেশে যথারীতি স্কুলের কার্যক্রম চলছে। এমতাবস্থায় আবার অনুধাবন করা গেলো যে, গ্রামের শেষ সীমায় স্কুল স্থাপন হওয়ায়, দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে স্কুলে আসা যাওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা কষ্টকর হয় ছাত্রদের।
আবার স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত। দক্ষিণ ভাগের বর্তমান ঈদগাহ টিলা থেকে ১৯২১ সালে পূর্ব ভাগের বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে, শত বর্ষ ধরে শিক্ষায় আলোয় আলোকিত করছে এই বিদ্যালয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, নিজের উদ্যোগে, নিজের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুল জনগণের দাবী থাকা সত্ত্বেও জীবদ্দশায়, নিজের নামে স্কুলের নামকরণ করতে সম্মত হন নাই। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পরে ১৯৫৯ সালে জনগণ নাম করণ করেছেন ‘নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ভাদেশ্বর’। সম্প্রতি ২০১৫ইং সাল থেকে এই নন্দিত প্রতিষ্ঠান ‘নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ’ নামে উন্নীত হয়েছে।
তাহের আহমদ সাহেবের স্মৃতিচারণমূলক লিখা ‘জীবন পাতার কিছু স্মৃতি’ বই থেকে জানা যায়, তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রথম লগ্ন থেকে ভাদেশ্বর হাই স্কুলের ছাত্র। ১৯২৯ সালে কলকাতা ইউনিভার্সিটির পরিচালনাধীন শিক্ষা ব্যবস্থায় মেট্টিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। তার সময় প্রথম হেড মাস্টার ছিলেন বাবু দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র মজুমদার। প্রথম ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন, তার বাবা গোলাম সামদানী চৌধুরী। উপদেষ্টা খান বাহাদুর মোহাম্মদ মাহমুদ চৌধুরী। সভাপতি খান বাহাদুর আব্দুর নুর চৌধুরী। স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা, হেড মাস্টার, শিক্ষক, পরিবেশ ও ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক, স্কুলের সংবিধান ইত্যাদি খুবই উচ্চ মানের ও আকর্ষণীয় ছিলো। তাদের সময় থেকেই স্কুলে খেলাধুলার চর্চা ছিলো। তাদের সময় খেলার শিক্ষক ছিলেন আহমদ আলী সাহেব। তিনি কোনো কোনো ক্লাসে ইংরেজি ও ইতিহাস পড়াতেন। তার সময়ই খেলাধুলা বিশেষ করে ফুটবল খেলার প্রবর্তন ঘটে। ফলে স্কুলে একটি প্রচ্ছন্ন ও বলিষ্ঠ ফুটবল টিম গড়ে ওঠে। ‘সুরমা ভ্যালী’ এন্ড ‘হিল ডিভিশন’ এর ইন্টারস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে যায় করিমগঞ্জে, ১৯২২-২৩ সালে চ্যাম্পিয়ান হয়ে ‘রামমূর্তি/কৃষ্ণ মূর্তি’ শীল্ড জয় করে নিয়ে আসে। এই গৌরবে স্কুল তথা গ্রামবাসী খেলোয়াড়দেরকে সংবর্ধনা দেয়।
১৯২২ সালে ‘এ. অ. ঝগঅখখ, -রহংঢ়বপঃড়ৎ ড়ভ ংপযড়ড়ষ ‘সুরমা ভ্যালি এন্ড হিল ডিভিশন’ ভাদেশ্বর হাইস্কুল পরিদর্শন করেন। এর কিছুদিন পর তখনকার আসামের শিক্ষামন্ত্রী স্যার সাদুল্লাহ ভাদেশ্বর হাই স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাকে বিরাট সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো। স্কুল সাজানো হয়েছে। বর্ষার দিন ছিলো। অতিথির মনোরঞ্জনের জন্য নৌকা বাইচ হলো। প্রচলিত সারি গানের পরিবর্তে, শিক্ষামন্ত্রীর গুণ কীর্তন করে সারিগান গাওয়া হয়। শিক্ষামন্ত্রী খুবই প্রীত ও সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই স্কুলের ‘এইড’ বাড়ানো হয়েছিলো।
আহমদ চল্লিশ দশকের ছাত্র। ১৯৪৩ সালে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন। নিজের লেখা বই ‘বহে না কুড়া নদী’ এতে স্মৃতিচারণ করেছেন স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকে। রোববার কি কারণে তার পিতা বাড়ী আসতে না পারায়, আহমদকে স্কুলে নিয়ে যেতে বাড়ীতে আর কেউ ছিলেন না। স্কুলে গিয়ে ভর্তি হবে, সে সাহস তার ছিলো না। শুনেছিলো হাইস্কুলের হেড মাস্টার শ্রী সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরী খুব কড়া লোক। ছাত্ররা বাঘের মতো ভয় পায়। মা আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ পাশে আমাদের খালু জোয়াদ আলী সাহেবকে ডেকে বললেন, একে স্কুলে নিয়ে যান, ভর্তি হতে ভয় পাচ্ছে। ফরম আগেই পূরণ করা ছিলো। স্কুরে ঢুকে দারুণ লাগছিলো আহমদের। দরজার মধ্যখানে ব্রাস টেবলেটে লিখা হেড মাস্টার। দরজায় ভারী কাপড়ের পর্দা। ভিতরে দরজার উপরে ষষ্ঠ জর্জ ও তার রাণী রাজকীয় পোশাকে দন্ডায়মান অবস্থায় বিরাট ছবি। রুমের পূর্ব দেয়ালে চার্চিল, রুজভেল্ট, স্টালিন, চিয়াং কাই শেক একত্রে ভাস্ট সাইজের রঙিন ছবি। টেবিলে এটলাস। আয়রণ সেইফ ইত্যাদি। উপরে দেয়াল ঘড়ি। দরজার পাশে এক রেক। তার উপর বই ঠাসা। হেড মাস্টার শ্রী সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরীর রং ফর্সা। তার মাথার সব চুলগুলো দুধের মতো সাদা ধবধবে। দাঁতগুলোও ধবধবে সাদা। পরণে সাদা পেন্ট ও বেগুনী রংয়ের কোট। হোল্ডারে তাঁর ছোলার হেট। হেড মাস্টারের রুম তার কাছে ভীষণ আকর্ষণীয় লেগেছিলো। আহমদ তার বাড়ী থেকে শুনতে পেতো স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি। ছেলেদের হৈ চৈ। এবং শিক্ষকদের পড়ানোর শব্দ। তখন স্কুল ঘর নির্মিত ছিলোÑ টিনের চালা। ভিটা পাকা। ভিটার উপর তিন ফুট নাগাদ ইস্পলটু। তার উপরের মুলী বাঁশের বুননের বেড়া। দরজা জানালা কাঠের। জানালার উপরে আরও এক প্রস্থ টিনের শেড। রোদ বা বৃষ্টি ভিতরে যাতে না যায়। ভিতরে টিনের ফলস্ পার্টিশন দিয়ে ক্লাস ভাগ করা। প্রতিটি ক্লাসের উপরে ঝুলানো বড় হাতে টানা পাখা। ক্লাস থ্রিতে ক্লাস টিচার ছিলেন গঙ্গাধর বাবু। আরোও শিক্ষক ছিলেনÑ জিসি ঘোষ, হাসিবুস সামাদ চৌধুরী, জ্যোতিন্দ্র মোহন দেব চৌধুরী পন্ডিত মশাই শ্রী সতীশ চন্দ্র কাব্যতীর্থ, কেদার নাথ ভট্টাচার্য ছিলেন কেরাণী। হাতের লিখা ছিলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হস্তলিপি খুব স্পষ্ট। তামাক খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। সত্যেন্দ্র নাথ বিএসসি। ক্লাসে শুধু ভাষায় কথা বলতেন রেহান উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। গণিতের শিক্ষক ছিলেন মকবুলুর রব চৌধুরী। ছেলেরা তাকে খুব ভয় করতো। মাথায় টুপি না থাকলে আর উপায় ছিলো না। মকবুলুর রব চৌধুরী কঠোর শৃঙ্খলা পরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের সবাই তাকে আখল মিয়া মাস্টার সাব নামে চিনতো বা জানতো। আফতাব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রবীণ শিক্ষক ছিলেন। ধূতি ও গেরুয়া রংয়ের খদ্দরের পাঞ্জাবী পরে স্কুলে আসতেন। ইমাম উদ্দিন চৌধুরী। বাড়ি ছিলো কানিশাইল। সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসতেন। এসিটেন্ট হেড মাস্টার আজিম উদ্দিন সাহেব কাদিয়ানী নামে পরিচিত ছিলেন। স্কুলের সামনের বাজারে ছনের ছাওয়া বাঁশ বেতের মসজিদ ছিলো। স্কুলের হেড মাওলানা মৌলভী সগীর আহমদ সাহেবের ছাত্রদেরকে নিয়ে জোহরের নামাজে ইমামতি করতেন। আজিম উদ্দিন সাহেব আলাদাভাবে সালাত আদায় করতেন। আরো শিক্ষক ছিলেনÑ অমল পালিত, সাদত আলী প্রমুখ। আহমদ ১৯৫১ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। তার শেষ হেড মাস্টার ছিলেন যতীন্দ্র মোহন দেব চৌধুরী। ভাদেশ্বর হাইস্কুলের প্রশাসন সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরী ইংরেজি শিক্ষায় প্রভাবান্বিত, ব্রিটিশ কায়দায় এক উচ্চমান পর্যায়ে রেখেছিলেন। ব্রিটিশ যুগের পরে পাকিস্তান যুগের সুচনায় জে. এম দেব চৌধুরী ক্লাস নাইন ও টেনে ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি পড়াতেন। আহমদ মেট্রিক ক্লাসে উঠার আগেই সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরী ভাদেশ্বর হাইস্কুল ছেড়ে যান। তাই তার সৌভাগ্য হয় নাই তার কাছ থেকে সরাসরি পাঠ গ্রহণ করতে। সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরী ব্যক্তি জীবনে ধূতি, চাদর ও ভিন্ন রংয়ের শাল পরে অপূর্ব গাম্ভীর্যে ও কঠোর ব্যক্তিত্ব নিয়ে নালিউরির বাসা থেকে বেরুতেন। গ্রামের জনগণ তাকে খুব সম্মান প্রদর্শন করতো। ছাত্ররা ভক্তি আর শ্রদ্ধা স্থাপন করতো। আহমদ দেখেছে ভাদেশ্বরের এক শোভন সংস্কৃতি। কেউ কাউকে বলে দিতে হতো না গুরুজন ও নারীকে কিভাবে সৌজন্য ও ভদ্রতা দেখাতে হবে। শিশু বয়সেই গ্রামের তরুণ, যুবক ছাত্রদের মধ্যে এই আদব গড়ে ওঠেছিলো।
এই প্রবন্ধের লেখক ভাদেশ্বর পূর্বভাগ প্রাথমিক স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে স্বপ্নের বড়স্কুলে ক্লাস থ্রিতে এক স্বপ্ন জাগানিয়া অনুভূতিতে ভর্তি হই। স্কুল, ছাত্র, শিক্ষক, পরিবেশ এক নতুন জগৎ। আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিলো, শৃঙ্খলা খেলাধুলা নীতিমালা ইত্যাদি। আমার মনে পড়ে, আমার শিক্ষক পাঠদানে খুব কঠোর ছিলেন। আবার খেলাধুলায় ছাত্রদেরকে নিয়ে স্কুলের আঙিনায় বা ফুটবল মাঠে অংশগ্রহণ করতেন। সেখানে আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন। তাদের সামনেই সিনিয়রদের কে দেখে দেখে খেলাধুলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম। সবুর স্যার ভালো ফুটবল খেলতেন। তাদের উৎসাহ ও প্রেরণায় আমি ও এ্যাথলেট হয়েছিলাম। জুনিয়র ও সিনিয়র উভয় ভাগেই স্কুল চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলাম। স্কুল পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে তিন বার ‘অল পাকিস্তান অলিম্পিকে’ অংশ গ্রহণের গৌরব অর্জন করেছিলাম। এর বহু আগে সবুর স্যার ভাদেশ্বর স্কুল থেকে অন্য কোনো জায়গায় চাকুরী নিয়ে চলে যান। আমি ১৯৫৬ সালে ক্লাস নাইন থেকে ‘স্কুল ট্রান্সফার সার্টিফিকেট’ নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমায় বিন্দু বাসিনী হাইস্কুলে ভর্তি হই। আশানুরূপ পারদর্শিতা ছাড়া ১৯৫৮ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ভাদেশ্বর হাইস্কুলে আমার সহপাঠি ১৯৫৮ সালের মেট্রিক পরীক্ষার্থী ব্যাচে আতাউর রহমান, ওয়ালীউজ্জামান, আমজাদ আহমদ, আলাউদ্দিন, মাহমুদ আলী, মুজিবুর রহমান, শেখ আজহারুল ইসলাম, মুশিবুর রহমান, আব্দুল কাদির, আজাদ সিরাজ, মিনু, চিনু, সুয়া, মসুদ, ছনাই, স্বদেশ আরো অনেকে ছিলেন। মেয়েদের মধ্যে রোকেয়া, অফা, রেজিয়া, পিয়া প্রমুখ। মনে পড়ে ইরফান ভাইকে। আমার শিক্ষক সবুর স্যার, আব্দুর রহমান স্যার, ফাত্তাহ মৌলভী স্যার, ইমামুদ্দিন স্যার, আফতাব উদ্দিন স্যার, আখল মিয়া স্যার, সবাই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আল্লাহর কাছে তাদের মাগফিরাত প্রার্থনা করি।
দুর্ভাগ্য যে, স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে, স্কুলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, যতো অর্জন, রেকর্ড, দলিল ইত্যাদি যতেœর সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় নাই। কালের গর্ভে অনেক তথ্যাদি হারিয়ে গেছে। আমার লিখা, এই প্রতিবেদন, কোন গবেষণামূলক প্রতিবেদন নয়। ইতিহাস তো নয়ই। এর সব উপাদান একাধিক ব্যক্তির স্মৃতিচারণ ও বিশিষ্ট লেখক আতাউর রহমান সাহেবের লিখা ‘ভাদেশ্বর এক সমৃদ্ধ জনপদ’ হতে উদ্ধৃত। ভাদেশ্বর তথা দেশখ্যাত বহু জ্ঞানী গুণীর জন্ম এই জনপদে। তাদের জন্ম, কর্ম, ব্যক্তি জীবনের কোনো গবেষণা হয় নাই বিধায় আমাদের সব খ্যাতি, গৌরব বিলীন হয়ে যাবে কালের পরিক্রমায়। এই ক্রান্তি লগ্নে, এই জনপদের মানুষ অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে নারী শিক্ষার প্রতিষ্ঠাতা গৌছ আহমদ কে। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আব্দুল মতিন চৌধুরী, সাহিত্যিক আব্দুল মালেক চৌধুরী, কবি আর্জুমন্দ আলী, খান বাহাদুর মোহাম্মদ মাহমুদ চৌধুরী, সলমান চৌধুরী, মৌলানা মবশ্বির আলী, শাহ আব্দুল্লাহ (রহ.) কে।
ভাদেশ্বর হাইস্কুল পরিচালনায় যে সব মহৎ ব্যক্তিরা অবদান রেখেছেন, তাদের নামের তালিকা (সাল ও পদবী ছাড়া) ধারাবাহিক নয়। প্রথম উপদেষ্টা-খান বাহাদুর মোহাম্মদ মাহমুদ চৌধুরী, সভাপতি-খান বাহাদুর নূর উদ্দিন চৌধুরী, সেক্রেটারি-গোলাম সামদানী চৌধুরী। এদের পরবর্তী সময়ে মোশাহিদ উদ্দিন চৌধুরী, আব্দুল মোনিম চৌধুরী, আহাদ উদ্দিন চৌধুরী, সালমান চৌধুরী, নাজিম উদ্দিন ওসূল চৌধুরী, আশরাফ আলী, আব্দুল মালিক চৌধুরী, শামসউদ্দিন চৌধুরী, মোহাম্মদ আহমদ চৌধুরী, জোবেদ আহমদ চৌধুরী ও মোখলেস উদ্দিন প্রমুখ।
প্রথম যারা হেডমাস্টার ছিলেন-সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী, বাবু দিগেন্দ্র মজুমদার, রমেশ চন্দ্র সেন গুপ্ত, সৈয়দ রকিবুদ্দিন (ভারপ্রাপ্ত) জিতেন্দ্রনাথ মুখার্জী, সুরেশ চন্দ্র হোম চৌধুরী, যতীন্দ্র মোহন দেব চৌধুরী, আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, মফিজুর রহমান প্রমুখ। অসমাপ্ত।
এই প্রতিষ্ঠান গত দশ বছরে কাঠামোগত উন্নয়নে এক বিরল উপমা সৃষ্টি করেছে। সিলেট ৬ আসনের এমপি বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার অবদানে চারতলা ভিত্তি বিশিষ্ট দুইটি দালানের একটি শেষ হয়ে ক্লাস চলছে। নুরুল ইসলাম নাহিদ একাডেমি ভবনে। অন্যটির প্রথম তলার নির্মাণ চলছে। অন্যদিকে ভাদেশ্বরের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ এজাজ রুসুল চৌধুরী, জহির আহমদ চৌধুরী, আমজাদ আহমদ চৌধুরী পরিবার ট্রাস্ট, শফিকা চৌধুরী ও জুনেদ আহমদ সাহেবের মেয়ে প্রদত্ত দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণ তহবিল, আমেরিকা প্রবাসী তছির আলী ফাউন্ডেশনের পক্ষে মনসুর আহমদ আইউব। এছাড়া আরো ২ লক্ষ টাকা ডোনেশনে অন্তত ৩০ জন আজীবন সদস্যের তালিকায় নাম লিখা আছে। বর্তমানে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ১৩৬৫ জন। স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা ২৭ জন। কলেজে ১৩ জন। নাসির উদ্দিন স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুনীল চন্দ্র দাস।
বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মাসুম চৌধুরী ও পরিষদ বর্গের উদ্যোগে ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানে শতবর্ষের ইতিবাচক অর্জন তুলে ধরার লক্ষ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় প্রস্তুতি চলছে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT