শিশু মেলা

আগুনের দহন

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৩:০৪ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত

অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমুতে যাবে চল।
না আব্বু আরও একটু পড়া বাকি, তুমি যাও, আমি আসছি।
আতাউর এভাবেই বাবাকে জবাব দেয়। আতাউরের বয়স যখন চার, তখন তার মা মারা যান। এই সময়ে বড় বোন জাকিয়ার বয়স ছিল আট। এখন জাকিয়া অনার্সে পড়ছে। আর আতাউর এসএসসি পরীক্ষার্থী।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর রফিক সাহেব আর বিয়ে করেন নি। স্ত্রীর প্রতি অগাধ ভালবাসা সন্তানদের প্রতি অপরিসীম স্নেহ তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেয়নি। তিনি ঝুকি নিতে চাননি। নিজেই কষ্ট স্বীকার করে নিয়েছেন। রফিক সাহেব একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিধবা এক চাচাতো বোন সংসার দেখেন। তিনিও নিজের সন্তানের মত করেই দুটো ছেলেমেয়েকে আগলে রাখেন। এ নিয়ে রফিক সাহেবের কোন চিন্তা করতে হয় না।
একটু পরে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। রাত একটার দিকে রফিক সাহেব এক ভীতিকর স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে উঠেন। তার চিৎকারে ঘরের সকলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আতাউর জাকিয়া বাবাকে চিৎকারের কথা জিজ্ঞাসা করে। রফিক সাহেব বলেন, তোমরা চিন্তা করোনা, স্বপ্ন দেখছিলাম। যাও সবাই ঘুমিয়ে পড়।
কি আর ঘুমাবে পাশের বাড়ি থেকে সত্যিই আগুন আগুন বলে অনেক চিৎকারের আওয়াজ আসছে। এই আওয়াজে আশপাশের সকলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সবাই কলস বালতি নিয়ে আগুন নিভাতে ছুটছে। রফিক সাহেব একটি বালতি নিয়ে ছুটছেন।
আতাউরও বলে, বাবা আমিও যাব।
চল দেরী করা যাবে না। আগুনের শিখা যেমন দেখা যাচ্ছে তাড়াতাড়ি নিভাতে না পারলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আতাউরও ছোট একটি বালতি নিয়ে নেয়। তারা যেতে যেতে অনেক মানুষও চলে এসেছে। যে যেভাবে পারে পানি এনে ঢালছে।
তারা গিয়ে দেখে বাড়ির খড়ের ডিবিতে আগুন লেগেছে। সাথের গোয়াল ঘরেও আগুন পৌছে গেছে। সবাই চাচ্ছে খড়ের ডিবিকে কাৎ করে বাড়ির পাশে ফেলে দিতে যাতে আগুন আর ছড়াতে না পারে। একটু পরে সকলের চেষ্টায় আগুন নিভানো হয়। কিন্তু ততক্ষণে গোয়াল ঘরটাও পুড়ে গেছে। গোয়াল ঘর থেকে তিনটি গাভী বের করা গেছে। একটি বাছুর বের করা যায় নি। তার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নেভানোর পর সবাই দেখে বাছুরটি একেবারে চামড়া ছুলে বিভৎস রূপ ধারন করেছে। এক ভীতিকর দৃশ্য।
আগুন নিভানোর পর বলাবলি শুরু হয় কিভাবে আগুন লাগল। অনেকের ধারনা যেহেতু খড়ের ডিবি রাস্তার পাশে কেউ হয়তো যাওয়ার সময় বেখেয়ালে সিগারেট খেয়ে অংশ ফেলে গেছে। অথবা ইচ্ছা করেই এই কাজ করেছে। এই কথার ফাঁকে বাড়ির মালিক সামাদ সকলকে লক্ষ্য করে বলেন, যেই আমার এই ক্ষতি করুক আল্লাহ তাকে সঠিক বুঝ দান করুন। আপনারা সকলে আমার যে উপকার করেছেন আমি আপনাদের প্রতিদান দিতে পারব না। আপনাদের জন্য দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সবচেয়ে উত্তম প্রতিদান দিন।
সকলের বাড়ি ফিরতে রাত তিনটা বেজে যায়। রফিক সাহেব আর দেরী না করে হাত মুখ ধুয়ে সকলকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত বেশী নেই দুই ঘন্টা পরেই ফজরের আজান হবে। সর্তকতা হিসেবে ঘুমানোর আগে মোবাইলে এলার্ম দিয়ে শুয়েছেন যাতে ফজর জামাত কোন ভাবেই খোয়া না যায়। ফজর অবশ্যই কষ্টকর নামাজ। এই নামাজে ইমানদার আর মুনাফেক যাচাই হয়। আর কষ্টকর বিধায় আল্লাহ তায়ালা মাত্র দুই রাকাত ফরজ নামাজ দিয়েছেন যে, বান্দা অনেক কষ্ট করে ঘুম থেকে জাগবে। নামাজ বেশী হলে তার আরো কষ্ট হবে। তাই মেহেরবান মাওলা মেহেরবানী করে মাত্র দুই রাকার ফরজ নামাজ দিয়েছেন। অথচ এই সময়ে মানুষ সবচেয়ে বেশী অবসর থাকে। কিন্তু ঘুম তাড়ানো খুব কষ্টের কাজ আবার যদি হয় শীতের রাত তবে তো কথাই নেই। রফিক সাহেব এই ব্যাপারে খুব সতর্ক।
আজ শুক্রবার। কারো স্কুল নেই। নাস্তার সময় সবাই একসাথে নাস্তা করতে বসেছে। এমননিতেই কোন তাড়া না থাকলে রফিক সাহেব সকলকে নিয়ে নাস্তা করেন। পরিবারের সকলে একসাথে খাবার খেলে কি যে এক আনন্দ আর বরকত। এর মধ্যে আতাউর বাবাকে প্রশ্ন করে বাবা গত রাতে তুমি স্বপ্নে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে উঠলে আর একটু পরেই সামাদ চাচার বাড়িতে সত্যি আগুন লেগে গেল। কি আশ্চর্য ব্যাপার?
না আমি তো আর তোমার সামাদ চাচার বাড়ির আগুন দেখিনি। আমি দেখেছি কোথাও কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালানো হয়েছে। আগুনের তাপ অনেক দূর থেকে গায়ে এসে লাগছে। এখানে কাকে নাকি আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে। দূর থেকে পোকামাকড় আনন্দে আগুনে এসে ঝাপ দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেতো জানে না এই আগুন তার মরণ। খানিক পরেই বাতাস শুরু হয়। বাতাসের ঝাপটায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে, কয়েকজনের কাপড়ে আগুন লেগে যায়। অনেক কষ্টে কাপড়ের আগুন নিভানো হয়। আমার দিকেও আগুন এসে পড়ে আমি আগুন আগুন বলে চিৎকার করে জেগে উঠি।
বাবা কি ভীতিকর? জাকিয়া বলে উঠে।
ভীতিকর তো বটেই।
তবে এর চেয়ে আরো ভীতিকর আছে। একটু বুঝিয়ে বললে আশা করি তোমরা বুঝবে।
এই দেখ সামাদের বাড়িতে যে আগুন লেগেছে রাত গভীর হলেও গ্রামের মানুষের একে অপরের প্রতি মায়া মমতা চিৎকার শোনার সাথে সাথে সবাই দৌড়ে এসেছে খুব সহজে আগুন নেভানো গেছে। যদি কেউ না আসত, আগুন নিভানো না যেত কতক্ষণেই সামাদের পুরো বাড়ি শেষ হয়ে যেত। তার পরিবারের সব স্বপ্ন কবর হয়ে যেত।
জি বাবা ।
আর গরুর বাছুরটা তো আতাউর দেখেছ পুড়ে কী হয়েছে।
জি বাবা।
এখন বল কোন আগুনের যদি এর চেয়ে সত্তর গুণ বেশী তাপ হয়। সত্তর গুণ বেশী পুড়ানোর শক্তি থাকে এরূপ আগুন যদি সামাদের বাড়িতে লাগত তাহলে কেউ কি তার আশপাশ যেতে পারত, না পানি ঢালতে পারত?
না বাবা।
এমন আগুনে যদি তোমাকে আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ফেলে দেওয়া হয়। তোমার আমার অবস্থা তখন কেমন হবে। তখন সামাদের বাড়ির মত গ্রামের মানুষ কিন্তু দৌড়িয়েও আসবে না। কেউ আগুন নিভানোর জন্য পানি ঢালবে না, আফসোস করবে না, শান্তনাও দিবে না।
একটু আগুনে সামাদের খড়ের ডিবি মুহূর্তেই শেষ। গরুর বাছুরের পুড়ে কি অবস্থা? এই দুনিয়ার আগুন থেকে জাহান্নামের আগুনের সত্তর গুণ বেশী তাপ। এই আগুনই আমরা মুহূর্তের জন্য সহ্য করতে পারি না। পরকালে আমরা কিভাবে আগুনের দহন সহ্য করব। তাই সবার আগে পরকাল নিয়ে ভাবতে হবে। নিজের জীবনও গড়ে তুলতে হবে পরকাল কেন্দ্রিক। এই তোমাদের মা আমাদের ছেড়ে কত দিন চলে গেছেন। আমরা তার কোন খবর রাখতে পারি না। খবর নিতে পারি না। শুধু তার জন্য দোয়া করতে পারি। তার জন্য আর কিছুই করতে পারি না। আমিও যখন চলে যাব তোমরাও আমার জন্য দোয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। সব স্বপ্ন সব আশা সব সাধ এখানেই থেকে যাবে।
রফিক সাহেব আবেগঘনভাবে এই কথাগুলো বলেন, বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি ঝড়তে থাকে। দুই সন্তানের চোখেও পানি চলে আসে। রফিক সাহেব তাদের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, তোমরা যদি দ্বীনদার হও তবে আশা করি তোমার মা সহ আমরা একসাথে জান্নাতে থাকব। যেখানে শুধু সুখ আর সুখ। কোন দুঃখ আর আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।
বাবা সত্যিই কি আমরা মাকে পাব?
অবশ্যই।
তবে শর্ত আমি চলে গেলেও তোমরা ইসলাম মেনে চলবে।
বাবা তুমি দোয়া করো।
হে আল্লাহ তুমি কবুল করো। আমিন।
ওরা দুই ভাই বোন বলে ওঠে আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT