ধর্ম ও জীবন

দেন মোহর নিয়ে যত কথা

কাজী সাহেদ বিন জাফর প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১১-২০১৯ ইং ০০:৩২:৪৪ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

আমাদের সমাজে আরেকটি কুপ্রথা প্রচলিত যে, স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেলে মসজিদের ইমাম, গ্রাম বা মহল্লার মাতব্বর ও আত্মীয়-স্বজন মিলে স্বামীর মরদেহ নিয়ে হাজির হয়। স্ত্রীকে অন্দর থেকে ডেকে বের করে আনেন মৃত স্বামীর সামনে। বলেন দেনমোহর ও আনুসাঙ্গিক ঋণ বা দাবী মাফ করে দেবার জন্য। অন্যথায় সে কবরের আজাব ও আখেরাতের শাস্তি হতে মুক্তি পাবেনা।
হায়রে নির্বোধের দল! ব্যক্তিটা এতটা কাল স্ত্রীর সাথে অতিবাহিত করাল সে একবারও স্ত্রীর দাবী হতে মুক্তির উপায় ভুলেও চাওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। এখন তোমাদের দরদ উৎলে উঠল, এমন এক সময়! যখন স্ত্রী স্বামী হারা বেদনায় গগনবিদারী আর্থ চিৎকারে কান্নায় বিভোর, ছেলে মেয়ে থাকলেও তাদের লালন পালনের দায়ে খোদার আরশে আহাজারীতে মগ্ন, একবার হুশ ফিরে আসলেও তিন বার বেহুশ হচ্ছে বুক ফাটা বেদনায়,
যে নারীটি তার জীবনের সবচেয়ে আপন সাথী হারিয়ে অস্থিরতায় কাতরাচ্ছে, ঠিক ঐ সময় স্ত্রীর হক বা ঋণ বিনষ্টের পাঁয়তারায় ভিত্তিহীন ও বানুয়াটি অজুহাত নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করে বসে। স্ত্রীর তার শরিয়া নির্ধারিত প্রাপ্য পাওনা হতে বঞ্চিত করার কোটকৌশল করে। তাদের এইটুকুন বোধ শক্তি নেই যে, শান্তি, স্থির, মুক্ত মন ও সুস্থতা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া বা নেওয়া উচিত নয়। এসময় মাফ চাইলেও মাফ হবার নয়। কারণ সে মর্মপীড়ায় কাতর। এত সব ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত ধারণা হতে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি তাদের এতই বাঁধে, তাহলে তাদের পকেট থেকে দিলেই স্ত্রীর পাওনা শোধ হয়ে যায়। আর তা না হলে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ হতে আদায় করে দিবেন। আর যদি সম্পদ নাই থাকে তবে তো বিবাহ না করার নির্দেশ এসেছে করুনায় বিবাহ করার মতো সম্পদ অর্জন না করা পর্যন্ত সংযম অবলম্বন ও রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। তার প্রবৃত্তিকে আয়ত্বে রাখার জন্য। যদি বিবাহ করে স্ত্রীকে মানবিক দিক দিয়ে প্রতিপালন না করতে পারেন।
ইসলামি শরিয়তে বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এতো অধিক যে, যদি তা সঠিক ধারা নিয়মে যথাযথ দায়ীত্বে পালন করে যায়। শরিয়ার ভাষায় উলামাগণের অভিমত-‘নফল এবাদতে ডুবে তাকার চেয়েও উত্তম।’ হাদিসের ভাষায়-বান্দা যখন বিবাহ করল তখন তার বাকী অর্ধেক ঈমান পূরণ হলো। যেন বিবাহ ব্যতিত ঈমান আশংকার মধ্যে থাকে।
বিবাহের বেলায় যে কয়জন নারী তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে, তারা ব্যতীত সকল নারীকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হতে যাকে ইচ্ছা মোহরের বিনিময়ে দু’জন সাক্ষীর সামনে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারো আলোচনা ও সম্মতির সাপেক্ষে।
তাদেরকে মোহরের বিনিময়ে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর বাণী ‘তোমরা স্ত্রীদের (মোহর) আদায় কর উদার মনে’। আল্লাহর এ-বাণীতে প্রমাণ করে স্ত্রীদের মোহর ফরজের মতো মনে করে আদায় করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজকের সমাজে অহরহ মোহর ধার্য করে বিবাহ হচ্ছে ঠিক, কিন্তু পরিশোধের বেলায় অধিকাংশ পুরুষই উদাসীন। স্ত্রীদের এই একটা হক হকই মনে করেনা। অথচ হযরত মোহাম্মদ (সা:) এরশাদ করেছেন ‘যে কোনো ব্যক্তি অল্প বা বেশী মোহর ধার্য করে: বিবাহ করে এবং তার অন্তরে স্ত্রীর প্রাপ্য মোহর আদায় করার ইচ্ছা থাকে না, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে তার সাক্ষাত হবে এমতাবস্থায়, সে যেন জিনাকারী (মসনাদ আহমদ)।
এরূপ আরেকটি হাদিস-‘যে ব্যক্তি মোহর ধার্য করে কোনো মেয়েকে বিয়ে করল। আল্লাহ তা’ জানে, অথচ (মোহর) এটা পরিশোধ করার ইচ্ছা তার নেই, সে ব্যক্তি আল্লাহর নামে তার স্ত্রীকে প্রতারিত করল। এমন ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন ব্যভিচারি রূপে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে’।
হাদিসের আলোকে সহজেই অনুমান করা গেল, মোহর ধার্য করা যাই হোক না কেন, পরিশোধ না করা নিয়তে থাকলে, তা-হবে খিয়ানতকারী ও ব্যভিচারী বলে সাব্যস্ত হয়ে যাবে। উল্লেখিত হাদিস কিন্তু তা’ই প্রমাণ করে। আর কোরানের আয়াত প্রমাণ করে বিবাহ সংগঠিত হয় আল্লাহর দায়িত্বে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় কোরান ও হাদিসের ভাষায় এতো কঠোরভাবে সতর্কতা থাকার পরও অধিকাংশ বিবাহের মোহরানা আদায় হয় না বলে আমার বিশ্বাস। তা না করে স্বামীর মরদেহ স্ত্রী সামনে নিয়ে মাফ চাওয়াটার রেওয়াজ বা কুপ্রথা কেন চালু করে রেখেছে যার ফলে চলমান সমাজে এতো উশৃঙ্খল অনিয়ম বিরাজ করছে। কারণ শুরুতেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বসি। জমি যতই উর্বর হোক না কেন। উন্নত বীজ বুনতে না পারলে যেমন ভালো ফসলের আশা করা যায় না। তেমনি মোহরও ইচ্ছাকৃত অনাদায়েও জিনা হতেও যদি বাঁচা যায়না। তা’হলে এ ধরনের বৈবাহিক ধারা নিয়মে যে সকল সন্তান জগতে আসছে, যদি ও ওরা মাছুম তথাপি পিতার দায়ে দায়ী সন্তানদের দিয়ে এ সমাজ কী করতে পারে।
সেই ধারণা মাথায় রেখে ইসলামি শরিয়তের দলিল (রাসুল (সা:) এর বাণী) দশ দিরহাম এর কমে কোনো মোহর নেই। আর আকলি দলিল হলো-সর্বনি¤œ যৌনাঙ্গের (সম্পর্কিত স্থানের) মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য এইটুকু পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত, যা দ্বারা সম্পর্কিত স্থানের মর্যাদা প্রকাশিত হয়। ইসলামি চিন্তাবিদগণের ভাষায়-চুরির নেসাব বা পরিমাণ হলো ১০ দিরহাম বা ২ তোলা রূপার মূল্য পরিমাণ সম্পদ চুরি কেউ করলে তার হাত কেটে দেওয়া হয়। এতে প্রতিয়মান হয়। মানুষের একটি অঙ্গের সর্বনি¤œ মূল্য ১০ দিরহাম নির্ধারণ করেছে। সুতরাং বিবাহের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গ ব্যবহারের মূল্য সর্বনি¤œ ধরা হয় ১০ দিরহাম।
আর যদি মোহর ও প্রতিপালনের অসমর্থ যে বা যারা তাদের প্রতি বিবাহ না করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে। আল্লাহর বাণী-যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’ (সূরা নূর-৩৩) এতে প্রমাণিত হয় বিবাহের ও বিবাহের পরবর্তী যাবতীয় ব্যয় বহন করার ক্ষমতা না আসা পর্যন্ত কোনো পুরুষ বিবাহ না করতে। তার প্রতি আল্লাহর এই আয়াত ইঙ্গিত বহন করে।
আর এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলের বাণী-‘তোমাদের মধ্যে যে বা যারা বিবাহের যোগ্যতা রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ (পরনারী হতে) দৃষ্টি নিচু রাখে এবং যৌন জীবনকে সংযত করে। আর সে বা যারা বিবাহের (ব্যয়ভার বহনের) সামর্থ রাখে না। সে যেন রোযা রাখে। নিশ্চয় রোজা তার জন্য ঢাল হবে’ (বুখারী মুসলিম)। এতে প্রমাণিত হলো বিবাহের মোহর ও ব্যয়ভার বহন করার ক্ষতা না থাকলে রোজা ও সংযম অবলম্বন করা নির্দেশ এসেছে। তবুও বিবাহ করতে কথা বলা হয়নি। অথচ আমরা বিবাহ করছি, মোহর দিচ্ছিনা। এটাও একটা প্রতারণা। আর এই প্রতারণায় হক মারার সামাজিক কৌশল সমাজ জীবনে চালু রয়েছে যা আমাদের শরিয়ত বিপরীত। বিবাহের আলাপে ঐক্যমতে পৌঁছলেই আসে লেনদেনের সেই আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ে এর পক্ষ দাবী কষে বসে আমাদের চৌদ্দগোষ্ঠী বিরাট নাম করা বংশের লোক, খায়খতির ও জবরদস্ত। সবে মিলে ৫০০ লোক নিয়ে বরযাত্রা করে আসবে। তাদেরকে সমাদরে পানাহার করে দিতে হবে। যাতে ভদ্রতার কোনো প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে। তা শুনে মেয়ে পক্ষ বা মেয়ের পিতা ভাবে, মেয়ে জন্ম দিয়ে কী দায়ে পড়েছে।
মেয়ের বিবাহে তার পিতা বরের জীবন যাপনের জন্য ঘরসাজানো আসবাবপত্র সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহ প্রায় ৪/৫ লক্ষ টাকা খরচ করে দিতে হয়। যা বরপক্ষ জন্মেও কোনোদিন ক্রয় করে ব্যবহার করে দেখিনি অথচ ছেলের বিবাহে এসব চেয়ে বসে। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে? মেয়ে পক্ষের ক্ষমতা আছে কিনা তা একবার ভেবেও দেখে না। এটা একটা জুলুম এটাও একটা যৌতুক। যা ছালন হারাম কিন্তু শিরা বা ঝোল পাক বলে দেদারছে খাচ্ছে। অসামাজিক প্রথায়। এই কূ-প্রথা সমাজ হতে দূর না করা পর্যন্ত মেয়ে জন্ম দিয়ে যে, কী পরিমাণ আজাবের সম্মুখীন হচ্ছে, তা বলে বুঝানো মুশকিল।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম ও তিরমিজি
  • নবীজিকে ভালোবাসার দাবী সমূহ
  • বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী (রহ.)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • কুরআন চর্চা অপরিহার্য  কেন 
  • একদিন নবীজির বাড়িতে
  • বেহেস্তের সিঁড়ি নামাজ
  • দেন মোহর নিয়ে যত কথা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • মানব সভ্যতায় মহানবীর অবদান
  • মানব সভ্যতায় মুহাম্মদ (সা.) এর অবদান
  • দেনমোহর নিয়ে যতো কথা
  •   উম্মাহাতুল মুমিনীন
  • ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম
  • তাফসিরুল কোরআন
  • রাসূল (সা.) এর প্রতি মুহব্বত ও আহলে বাইত প্রসঙ্গ
  • মহানবীর প্রতি ভালোবাসা
  • Developed by: Sparkle IT