উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : ব্যাংক ঋণ

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৯ ইং ০০:২৬:৩৯ | সংবাদটি ১৩৩ বার পঠিত

যতটুকু মনে পড়ে কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি। আবার অনেকে এক পা বাড়িয়ে বলে বসেন ‘সব শালারা কবি হতে চায়’। এটা জানা কথা কবিতা লিখার শত চেষ্টা করেও অনেকের পক্ষেই কবি হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমরা তো সবাই বিশ্বাস করি চাইলেই রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল হওয়া যায় না। আর কবি হতে চাওয়াটাইতো অপরাধ নয়? যারাই কবিতা লিখার ব্যর্থ চেষ্টা করেন তারা ভালো একটা কিছু হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারাতো মাস্তান ধর্ষক ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ বা দেশের জনগণের টাকা লুটপাটকারী কোন ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হওয়ার চেষ্টা করেননি! শুধু কবি কেন, অনেকেই চান সাংবাদিক হতে! ভালো সাংবাদিক। যদিও অনেক বিজ্ঞজন বলে থাকেন ‘ভালো সাংবাদিকের বন্ধু থাকেন না’। আর বন্ধু থাকে না বলে কি জগতে ভালো সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা থেমে গেছে? থেমে যায়নি।
আর বন্ধু? কার বন্ধু হতে যাবেন একজন ভালো সাংবাদিক? চোর, গুন্ডা, ক্যাসিনো ব্যবসায়ী, ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ, ন্যায়নীতি ভ্রষ্ট কোন রাজনীতিবিদ, জ্ঞানপাপী কোন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বা ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুটপাটকারী কোন নির্লজ্জ ঋণ খেলাপির বন্ধু? দেশের ষোল-সতেরো কোটি মানুষের মধ্যে ওরা তো আসলে গুটিকয়। ওদের-র বন্ধু হওয়া তো ভালো সাংবাদিকই নয়, কারো বন্ধু হওয়াই কাম্য নয়। ওদের সত্যিকার শত্রু হতে পারলেই দেশের সিংহভাগ গ্রামবাসী মানুষের বন্ধু হওয়া যায়। ৩.১১.২০১৯ তারিখের দৈনিক সংবাদ পত্রিকার একটি শিরোনাম-‘ব্যাংকিং কার্যক্রমে বৈষম্য, গ্রামে ঋণ দিতে চায় না ব্যাংকগুলো।’
আমানত সংগ্রহের তুলনায় ঋণ দিচ্ছে কম, চড়া সুদে এনজিওর ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে গ্রামের মানুষ।’ এই শিরোনামটির সাংবাদিক জনাব রেজাউল করিম। আমরা ধরে নিতে পারি তিনি একজন ভালো সাংবাদিক। গ্রামের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের বন্ধু হতে গিয়ে তিনি শত্রু হয়ে গণ্য হলেন লুটেরা ঋণ খেলাপিদের! এমন শত্রু ক’জন হতে পারেন? এতো লজ্জার নয় গৌরবের।
সাংবাদিক রেজাউল করিম একটা সত্য কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে দেশের ব্যাংকগুলো অর্থাৎ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নীরব সম্মতিতে মাঠ পর্যায়ের ব্যাংকের কর্মকর্তাগণ গ্রামে ঋণ দিতে চরম অনিহা প্রকাশ করে আসছেন। গ্রামের একজন দরিদ্র মানুষ তথা কৃষক ব্যাংকে ঋণ নিতে গেলে ব্যাংকারগণ নানা অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেন। গ্রামের সহজ সরল মানুষকে ঋণ না দিয়ে এনজিও থেকে সহজে ঋণ নিতে পরামর্শ দেন। ব্যাংকের ঋণ না পেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে মানুষ শতকরা ২৪/২৫ টাকা সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এতে কিছুতেই লাভবান হতে পারছেন না গ্রাম্য মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৯ সালের জানুয়ারি-মার্চ মাসে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২০.৮৯ শতাংশ সংগ্রহ করা হয়েছে গ্রাম থেকে, কিন্তু ঋণ দেয়া হয়েছে মাত্র ১০.২০ শতাংশ। অপরদিকে শহর থেকে মোট আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে ৭৯.১১ শতাংশ, কিন্তু ঋণ দেয়া হয়েছে ৮৯.৮০ শতাংশ এটা কতো বড় বৈষম্য তা কি চিন্ত করা যায়! দেশে এ নিয়ে কেউ চিন্তা ভাবনা করেন বলে তো প্রতীয়মান হয় না। আর এটা কোন নতুন বিষয়ও নয়। যুগ যুগ ধরে এমনটি হয়ে আসছে। বলা হয়ে থাকে ব্যাংক ম্যানেজারগণ গ্রামে ঋণ দিচ্ছেন না। সব দোষ যেন শাখা ম্যানেজারের। কিন্তু আসলে কি তাই? ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে শাখা ম্যানেজারদের কি ক্ষমতা আছে ঋণ না দেবার! অফিস পাড়ায় একটি কথা আছে ‘উপরের নির্দেশ’। সত্যিকথা বলতে কি উপরের অলিখিত নির্দেশই যত অঘটন ঘটায়। এটাও সত্যি যে ব্যাংকে এমন কিছু নিয়ম-কানুন করা হয়েছে যা গ্রামের মানুষ পূরণ করতে পারে না। আর এজন্য শাখা ম্যানেজারগণের পক্ষে ঋণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কিছু কিছু শাখা ম্যানেজারও আছেন যারা গ্রামের মানুষের সাথে লেনদেন করতে আগ্রহী নন। যদিও গ্রামের মাটির গন্ধ এখনও তাদের শরীর থেকে দূর হয়ে যায়নি! এমনটি উপরওয়ালাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও আমরা ‘সাব’ হওয়া মাত্রই ‘অতীত ইতিহাস ভুলে যাই। এটা দুঃখজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভর জনাব আতিউর রহমান একবার বোধ হয় আবেগ তাড়িত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন-‘কৃষকরা জাতীয় বীর’। কথায় বলে বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা।
বাস্তবে কি তাই? বসুন্ধরা তো দূরের কথা আমাদের কৃষক বীরেরা তো দেশের ব্যাংক পাড়াও ভোগ করতে পারছেন না! এটা কি জাতির জন্য কলঙ্কের নয়? অথচ ‘আমারও দেশেরও মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন’ ...... গানটি গাইতে ও শুনতে আমরা খুবই ভালবাসি। আসলে সব কিছুই স্ববিরোধী। শহুরে ভোগ-লালসা-আরাম-আয়েস আর দ্রুততার সঙ্গে তথাকথিত বড়লোক হবার কামনা-বাসনা-খায়েস এর কাছে মাটির গন্ধ বারবার হার মানে। পরাজিত। পরাভূত।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায় গ্রামের ৭৪ শতাংশ মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা পান না। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে এনজিও থেকে ঋণ নেয় ২৮ শতাংশ মানুষ। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু এনজিওর সুদের হার ২৪ থেকে ২৭ শতাংশ। যারা এনজিও থেকে ঋণ পান না তারা একান্ত বাঁচার তাগিদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সুদের হারে। গ্রামের মানুষ যদি ব্যাংকঋণ না-ই পেলো সেখানে ব্যাংকের সুদের হার কম জেনে লাভটা কি? এ প্রসঙ্গে ড. আতিউর রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন যে শহরে দেয়ার পর অনেক ঋণ ফেরত আসে না। কিন্তু গ্রামের ঋণ ফেরত আসে। বলা হচ্ছিল ভালো সাংবাদিকের কথা। এখন একজন ভালো সাংবাদিক যদি প্রশ্ন করেন-‘তাহলে গ্রামের মানুষকে শহরের মানুষের মতো ঋণ দেয়া হচ্ছে না কেন? তখন ব্যাংকের নীতি নির্ধারক মহোদয়গণ অবশ্যই খানিকটা হলেও বিব্রতবোধ করবেন এবং সেই ভালো সাংবাদিক ভাইটিকে অবশ্যই মনে প্রাণে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবেন না। এক্ষেত্রে সব কথার শেষ কথা হলো, নীতি নির্ধারকগণ যদি আন্তরিকভাবে গ্রামের মানুষকে ঋণ দেবার নীতি গ্রহণ করেন তখন শাখা ম্যানেজারগণ ঋণ দিতে বাধ্য। সত্যিকথা বলতে কি শাখা ম্যানেজার, এজিএম, ডিজিএম, জিএম সবাই ব্যাংকের সার্কুলারের হাতে বন্দী। সবাই এক পথের পথিক। তফাৎ শুধু পদ-পদবী আর বেতন কাঠামোর। বাংলাদেশ ব্যাংকও বোধ হয় সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে না। রাষ্ট্রীয় নীতিই গ্রামের মানুষকে এনজিও আর সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। বাকিরা সবাই রাবার স্টাম্প। কাউকে দোষ দিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় নাই। কারণ গ্রামের মানুষের ব্যাংক ঋণের অবস্থা খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক পাড়ায় অবলোপন নামে একটি শব্দ খুবই শুনা যায়। কিন্তু আমরা যারা গ্রামের মানুষ ‘অবলোপন’ কাকে বলে কিছুই জানি না। এই শব্দটি শহরের ব্যাংকগুলোতেই আলোচ্য বিষয়। আর শহরের ব্যাংকগুলোর যে সমস্ত শাখায় শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে সেখানেই অবলোপন শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার। আর চুনোপুটি নয়, রাঘব বোয়াল মার্কা লুটেরা ঋণখেলাপিদের কাছে শব্দটি বড়োই আদরের। এ প্রসঙ্গে ৮.১১.২০১৯ তারিখের দৈনিক যুগান্তর একটি খুবই চাঞ্চল্যকর খবরের শিরোনাম লিখে এবং তা হলো-‘গভর্নরের সঙ্গে এবিবির বৈঠক, খেলাপি ঋণের তথ্য গোপনের ফন্দি, খেলাপি ঋণ অন্তত ৩ বছর হিসাবে দেখানো বাধ্যতামূলক হলেও এখন দাবি সঙ্গে সঙ্গেই অবলোপনের, এটি হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র-অভিমত বিশ্লেষকদের।’ প্রতিবেদনটি লিখেছেন সাংবাদিক হামিদ বিশ্বাস। এতে করে সাংবাদিক হামিদ বিশ্বাসের বন্ধুর সংখ্যা বাড়বে না কমবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো তিনি একটা সত্য প্রকাশে সচেষ্ট হয়েছেন। যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। ধ্বংসের হাত থেকে ব্যাংকগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা। ব্যাংকের অবলোপন নীতিমালা অনুসারে একটা ঋণ খেলাপি হলে সেটা আদায়ের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে হয়। ঋণ খেলাপির বিরুদ্ধে মামলা করতে হয়। এভাবে ৫ বছর চেষ্টা করতে হতো। এরপর সেই সময়সীমা ৫ বছর থেকে তিন বছর করা হয় এবং ব্যাংকগুলো যেকোন খেলাপি ঋণ অন্তত তিন বছর হিসাবে দেখাতে বাধ্য। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সদস্যগণ সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি করছে কোন ঋণ খেলাপি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা অবলোপন করতে হবে। অভিজ্ঞতা বলে একবার ঋণ অবলোপন হলে তা আদায়ের খুব বেশি চেষ্টা করা হয় না। আদায়ও হয় না। এমনি অবস্থায় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের দাবিটিকে কি দেশের আর্থিক খাতের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে ধরে নেয়া যায়?
সম্প্রতি কোন একটি ব্যাংকের এমডি নাকি বলেছেন ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে খেলাপি ঋণ কম থাকা প্রয়োজন। আর সেটা নাকি অবলোপনের মাধ্যমে। হায়রে স্বাস্থ্য চিন্তা! ব্যাংকের হাতুড়ে ডাক্তার দ্বারা কি ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা যায়? হাতুড়ে ডাক্তার তো রোগী মারে। ব্যাংকের ডাক্তারগণ যেন ব্যাংক নামক রোগীটির স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে!
বলা হচ্ছিল ভালো সাংবাদিকের বন্ধু প্রসঙ্গে। প্রয়াত সুবীর নন্দীর একটি গানের কলি-‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’। ক্ষতি কি তাতে? ভালো সাংবাদিকরাতো লুটপাটকারী একটি চক্রের হাত থেকে ব্যাংককে বাঁচাতে গিয়ে তাদের প্রকৃত চেহারা বা উদ্দেশ্য জাতির সামনে তুলে ধরে। তাই তারা ভালো সাংবাদিকটিকে বন্ধু না ভেবে শত্রু বলেইতো গণ্য করবেন!
এটাইতো স্বাভাবিক। দরকারটা কি এমন বন্ধুর? তফাজ্জল হোসেন মানিক, জহুর হোসেন চৌধুরী বা আহমেদুল কবীর সাহেবরাতো শত্রু ছিলেন পাকিদের, বন্ধু ছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির। আজ গ্রামের মানুষসহ সারাদেশের সকল মানুষই তো দেশের ভালো সাংবাদিকের বন্ধু। দেশের ভালো সাংবাদিক বন্ধুগণ দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরুন। বন্ধু আপনাদের সমগ্র জাতি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • Developed by: Sparkle IT