পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৯ ইং ০০:২৮:০৬ | সংবাদটি ৫৬৭ বার পঠিত
Image

১৯৭৫ সাল। আমরা এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষা শেষে রেজাল্টের জন্য বাসাবাড়ি ও লজিং বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। লজিং বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে ফলাফল প্রকাশের খবরাখবর জানার জন্য কলেজে যাওয়া আসা করতাম। আমি তখন সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে তিন বছর মেয়াদি ‘ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসী’ কোর্সে অধ্যয়ন করছিলাম। তাই প্রায় প্রতিদিনই লজিং থেকে শহরে আসা যাওয়া করতে হতো। দেশের সাধারণ মানুষ তখন নতুন স্বাধীন দেশটিকে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু তৎকালীন কিছু দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও ক্ষমতা লোভী রাজনীতিবিদ দেশকে ক্রমান্বয়ে নিচে নামানোর চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে শান্তিপ্রিয় দেশবাসীকে সাথে নিয়ে দেশদরদী ও ক্ষমাশীল প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এহেন বৈরী ভাবাপন্ন জাতীয় নেতাদের অভাব, অভিযোগ, আবদার, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিসহ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন সামাল দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশটিকে ক্রমান্বয়ে পুনর্গঠন ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। তখনকার সময় সেটি অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না যে, দেশের আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বত্র দুর্নীতিতে মহামারি সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুকে বলতে শোনা যেতো ‘মানুষ পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি’। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেও এই চোর ও দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করতে পারেননি। কেননা বঙ্গবন্ধু দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে অনেকটা একা ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই চোর ও দুর্নীতিবাজরাই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
সুদীর্ঘ নয় মাস রাজাকার আর পাকিস্তানী শত্রুদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বাঙালিদের হাজার বছরের ধৈর্যের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন হল বাংলার স্বাধীনতা। গৌরবময় এই স্বাধীনতাকে স্বাধীনতা বিরোধীরা মেনে নিতে পারছিল না। তাই সদ্য স্বাধীন দেশে তারা নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চালিয়ে যেতে থাকে। দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের সেই নীল নকশা শেষ পর্যন্ত তারা বাস্তবায়ন করেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। তখন বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ের সাথে চেয়ে চেয়ে দেখেছিল, বাংলাদেশীরা তাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বীর পুরুষ, বাংলার স্থপতি ও স্বপ্নদ্রষ্টা এবং জাতির পিতাকে কী নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করলো।
যার ডাকে সাড়ে সাত কোটি দেশবাসী তখন একত্রিত হয়ে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশটিকে স্বাধীন করেছিল। সেই অবিসংবাদিত নেতার বুকেই গুলি চালিয়েছিল কিছু বিপথগামী কুলাঙ্গার। তখন বাংলার আকাশ বাতাস মিলেমিশে একাকার হয়েছিল শ্রাবণের অশ্রুধারায়। তখন বঙ্গপিতা বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর আকাশের মর্মছেড়া অশ্রু ধারায় প্লাবন বইছিল বাংলায়।
আসলে আমরা বারবার ইতিহাসের পাতায় ফিরে যেতে বাধ্য হই কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে বরং ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজেরাই ইতিহাসের অতল গহ্বরে চলে যেতে বাধ্য হই। নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে চাইলে বলতে হয়, বাংলার বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর আলী খানদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বাংলার তখনকার দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হলে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। সে সময়কার ইংরেজ বাহিনীর প্রধান লর্ড ক্লাইভ রাজধানী মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করার বর্ণনা দিতে গিয়ে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বোর্ড অব ডাইরেক্টরদের কাছে বলেছিলেন, রাজধানী মুর্শিদাবাদে প্রবেশ কালে যে বিশাল জনতা আমার সেনাবাহিনীকে অভ্যর্থনা জানাতে রাস্তার উভয় পাশে দাঁড়িয়েছিল, এই বিপুল জনসংখ্যা ইচ্ছা করলে আমাকে ও আমার ইংরেজ বাহিনীকে পিষে মেরে ফেলতে পারতো, কিন্তু বাংলার মানুষ ক্ষমতার মসনদে কে আসলো, দেশি কি বিদেশি তা নিয়ে তারা ভাবে না বরং তারা জানতে চায় তাদের সম্পদ আর জমির খাজনা কাকে দিতে হবে’। ক্ষমতালোভী মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই কিন্তু দেশবাসীকে ২২৫ বছর ইংরেজ ও পাকিস্তানীদের পরাধীনতা ও শোষণ নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। দীর্ঘ পরাধীনতার সময় মাঝে মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সামান্য প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ দেখা গেলেও মীরজাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতক উত্তরসুরীদের কারণে বাঙালিদের পরাধীনতার ইতিহাস দীর্ঘ কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবে ইতিহাস রচিত হয়েছিল। সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের গ্লানি থেকে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে যে বীর সেনানী ও মহানায়ক দেশের পরাধীনতার জিঞ্জির ছিন্ন করে দেশ ও জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল সেই মহান নেতা ও জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে আমরা পুনরায় জাতির ইতিহাসে আরও একটি কলঙ্কিত ইতিহাসই শুধু নয়, নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি করেছি। যা ছিল নির্দয়, অমানবিক ও জঘন্য।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার ছিল ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়। সেদিন সুবেহ সাদিকের সময় যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের নিজ বাসায় স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল তাঁর বক্ষ। তখন যেন প্রকৃতির অশ্রুপাতের সাথে আর্দ্র বাতাসেও করুণ অশ্রুতে কাঁদছিল সমগ্র বাংলাদেশ। ঘাতকদের নির্মম অস্ত্রের ধ্বনিতে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল, এহেন শোকাবহ ঘটনার আকস্মিকতায়। হয়তো যুগ থেকে যুগান্তর চলতে থাকবে এই শোকাবহ ঘটনার অশ্রু বন্যা। ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ রাসেলের মর্মস্পর্শী আর্তিতে একজন সৈনিকের মনে ¯েœহের পরশ লাগায় সে তাকে বাড়ির গেইটের সেন্ট্রিবক্সে লুকিয়ে রেখেছিল কিন্তু আধা ঘন্টা পর একজন মেজর সেখানে রাসেলকে দেখতে পেয়ে তাকে সেখান থেকে দোতলায় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় রিভলবারের গুলিতে হত্যা করেছিল। মৃত্যুর পূর্বে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র রাসেল বলেছিল, ‘আল্লাহর দোহাই আমাকে আপনারা জানে মারবেন না, আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আপনারা আমাকে জার্মানীতে আমার আপুর কাছে পাঠিয়ে দিন’ মৃত্যুর আগে খুনীদের নিকট এমন আকুতি ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের। যা ছিল নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং ইতিহাসের বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় একটি নিষ্ঠুর ঘটনা। ১৯৭৫ সালের এ দিনটিতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। পাকিস্তানী শাসকরা বাঙালি জাতি সত্ত্বাকে নিশ্চিহ্ন করতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাক সেনারা যেভাবে ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ভারী অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালিয়েছিল তেমনি তাদের অনুসারী বিশ্বাসঘাতক কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য, রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করেছিল। শুধু কি তাই, কয়েক মাস পর অর্থাৎ নভেম্বরের তিন তারিখ একই ষড়যন্ত্রের নীল নকশা বাস্তবায়নে রাতের আঁধারে জাতীয় চার নেতাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এহেন হত্যাকান্ড শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা ভেঙে রাতের আঁধারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসেই প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, ‘আপনারা মুক্তিযুদ্ধ করে বীরত্বের সাথে দেশ স্বাধীন করেছেন, এখন আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে ফিরে যান। দেশ গঠনের যুদ্ধে নিষ্ঠার সাথে কাজ করুন এবং দেশকে পুনঃগঠনে সহযোগিতা করুন।’ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ হবে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র। দেশটিতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। থাকবে না দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও হিংসা হানাহানি। স্বপ্নের সেই সুখী ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ার কাক্সিক্ষত প্রত্যাশায় বিরাট হোচট খায় তখন, যখন বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মম, নির্দয়, অমানবিক, জঘন্য ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। তখন কিন্তু দারুনভাবে থমকে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। তখনকার সেই চরম দুর্দিনে, দেশে সামরিক শাসন থাকায় সিলেটসহ বাংলার সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়েছিল এবং প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল লজিং-এ অবস্থানরত ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ নেতৃত্ব শূন্যতার কারণেও কিন্তু প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে প্রতিবাদের ভাষা শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে, দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধুরই জ্যেষ্ঠ কন্যা, দেশ বরেণ্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত ও নির্দেশিত পথ ধরে দেশকে সফল ও সঠিকভাবে পরিচালনা ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ধারাবাহিক তিন বার দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের সঠিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা প্রশংসনীয়ভাবে কাক্সিক্ষত লক্ষ পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুসহ দৃশ্যমান অগ্রগতি ও উন্নয়নের কারণে বর্তমানে দেশটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে, যা জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম এই হত্যাকান্ডটি সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়ার একটি নির্মম পরিণাম। যে মানুষটি পরম মমতায় দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতো, যে মানুষ কখনো দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল না, বরং ছিলেন শুভাকাঙ্খি। সেই অবিসংবাদিত নেতাকে এমন নির্মমভাবে স্বপরিবারে হত্যা করা জাতির জন্য ছিল বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা হলেও তিনি জাতির কাছে চির অমর ও মৃত্যুহীন। কেননা তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির অভিসংবাদিত নেতা, জাতি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন তিনি থাকবেন অমর, অক্ষয় ও চিরঞ্জীব। সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে তিনি জাতিসত্বার প্রেরণা যোগাতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলেই পাক শাসকের নির্মম শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি ও প্রেরণা পেয়েছিল দেশবাসী। তাই তিনি বাঙালি জাতির জাতীয় চেতনায় থাকবেন অম্লান অক্ষয়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত গোটা জাতি ও দেশ। তাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার হৃদয়ে অম্লান, তাই তো এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে। কবি মুনিরুল ইসলামের কবিতায়-কে জ্বেলেছে লক্ষ প্রাণে / স্বদেশ প্রেমের আগুন / কে এনেছে বাংলাদেশে / স্বাধীনতার ফাগুন? / তিনি হলেন শেখ মুজিবুর / সবার মনে দাগুন / তাঁর জন্য প্রভুর কাছে / হাজার রহমত মাগুন।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT