পাঁচ মিশালী

খুলনার ডায়েরি

রাসেল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৯ ইং ০০:৩০:১২ | সংবাদটি ৭৬২ বার পঠিত
Image

ভাই আব্দুল্লাহ ওমর বায়েজিদ ২০১৯-২০ সেশনে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় সফলতার স্বাক্ষর রেখে খুলনা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়। তার কল্যাণে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিভাগীয় শহর ও খুলনার কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন সুযোগ হয়। শিল্পনগরী খুলনা সাদা সোনার শহর নামে খ্যাত। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারও খুলনা।
সেদিন ছিল ২৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার। পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দিনের আলো ফোটার সাথে পদ্মা নদী পার হওয়া এক অসম্ভব ভাললাগার জন্ম দেয়। দূষণমুক্ত শহরে প্রবেশ দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। খুলনা যানজটবিহীন শান্ত ও পরিচ্ছন্ন নগরী।
সন্ধ্যার দিকে কৃত্রিম আলোয় উজ্জ্বল শহরের রাস্তায় বের হই। নিরিবিলি শহর। প্রথমে চোখে পড়ে খুলনার আধুনিক রেলস্টেশন। এতো পরিচ্ছন্ন রেলস্টেশন আর রেল লাইন আর কোথাও দেখা হয়নি। রেল সেবার উন্নত মান নিয়ে যেন এই স্টেশন উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ট্রেন ছেড়ে যায়।
স্টেশন থেকে ৮-১০ মিনিট হাঁটার পর রয়্যাল মোড়। শহরের প্রাণ কেন্দ্র হচ্ছে এই মোড়। এখানে চিংড়ি চত্বর ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভাস্কর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। মোড়ে Welcome to the land of Tigers এই বাণীতে পর্যটকদের স্বাগত জানায় খুলনা সিটি। সেদিনের মত নিস্তব্ধ রাত আর আমাদের ক্লান্তি একই সাথে পাল্লা দিয়ে শেষ হয়।
পরের দিন সকালে আমাদের প্রধান কাজ শুরু করি অর্থাৎ বায়েজিদের মেডিক্যাল ভর্তি কার্যক্রম। বায়েজিদ সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার লুদরপুর গ্রামের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাইদ ও উত্তর সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শোহাদা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে। আমাদের সাথে আরো ছিলেন বায়েজিদের ছোট মামা জগন্নাথপুরের মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জায়েদ হোসাইন।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে ভর্তি কার্যক্রম। কলেজের কয়েকজন সিনিয়র ছাত্র ভর্তিতে সহায়তা করেন। খুলনায় আসার পূর্বে জেনেছিলাম যে, সামুদ্রিক খাবারের পাশাপাশি ‘গরুর চুঁই ঝাল’ অনেক বিখ্যাত। প্রথম দিন আমরা সামুদ্রিক মাছ ইলিশ, ভেটকি, গলদা চিংড়ির স্বাদ নেই। দ্বিতীয় দিন ভর্তি কার্যক্রমের পর আমরা চুঁই ঝাল এর স্বাদ নিতে জিরো পয়েন্টে যাই। সত্যি অসাধারণ স্বাদ।
দুপুরের খাবারের পর জিরো পয়েন্ট থেকে ইজি বাইকে ৫-৭ মিনিট পর সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাই। এই সোনাডাঙ্গা থেকে সব স্থানের বাস পাওয়া যায়। আমরা এখান থেকে বাগেরহাটের বাসে উঠি।
প্রায় ১ ঘন্টা পর ষাট গম্বুজ মসজিদের প্রধান ফটকে পৌঁছাই। বাস থেকে নেমে মনে হয়েছিল শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোন জীবন্ত স্থিরচিত্র। নির্ধারিত প্রবেশ ফি জমা দিয়ে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশ ফি ক্ষেত্র বিশেষ বিভিন্ন। বিদেশীদের জন্য সর্বোচ্চ ফি নির্ধারিত।
মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রথমে বাগেরহাট যাদুঘর অবস্থিত। যাদুঘরে পঞ্চদশ শতকে গড়ে ওঠা খলিফাতাবাদ শহরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা রয়েছে। ইউকিপিডিয়ার তথ্যমতে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আবেদন জানালে ইউনেস্কো-বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে সংরক্ষণ ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৫ সালে এটি নির্মিত হয়।
যাদুঘর থেকে কয়েক কদম পরেই ষাট গম্বুজ মসজিদ। বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলির মধ্যে বৃহত্তম এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন এই মসজিদ। খান জাহান আলী (র.) এটি নির্মাণ করেন। মসজিদের বাইরের দিক থেকে বিশাল কর্ণার টাওয়ার ও দৃষ্টিনন্দন ৭৭টি গম্বুজ। সারা বছর পর্যটক মসজিদটি পরিদর্শন করে থাকেন। এক কথায় অসাধারণ ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটি আমাদের গৌরব শত শত বছর ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীময়।
মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে ঘোড়া দীঘির অবস্থান। জানা যায়, খাঁন জাহান আলী (র.) মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি দীঘি খনন করতেন। ঘোড়া দীঘি তারই একটি। কথিত আছে যে, খননের পূর্বে একটি ঘোড়া এক দৌঁড়ে যত দূরত্ব অতিক্রম করেছিল সেই মাপ অনুযায়ী এই দীঘি খনন করা হয়। দীঘির বড়ই সৌন্দর্য্য। টলটলে পানি নিয়ে এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে।
যাদুঘর, মসজিদ ও দীঘি পরিদর্শনের পর ইজি বাইকে ১০-১৫ মিনিট দূরত্বে খাঁন জাহান আলী (র.) এর মাজার অবস্থিত। মাজার এক গম্বুজ বিশিষ্ট। মাজার সৌধটি তিনি নিজে তৈরী করেছিলেন। খাঁন জাহান আলী (র.) ইন্তেকালের পর তাঁর নির্মিত সৌধে তাঁকে সমাহিত করা হয়। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করে অসংখ্য লোক তাঁর মাজার জেয়ারত করেন। আমরাও জেয়ারত করলাম।
মাজারের দক্ষিণ দিকে খাঞ্জেলী দীঘি অবস্থিত। এ দীঘির পানি সুপেয় । জানা যায় অনেকে রোগপীড়া থেকে নিরাময়ের জন্য এ দীঘির পানি পান করেন এবং দীঘিতে গোসল করে থাকেন। দীঘিতে কুমিরেরও বসবাস রয়েছে। কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড় নামক কুমিরের বংশধররা দীঘিতে বসবাস করে আসছে।
বাগেরহাট পর্ব শেষ করে আমরা রাতের দিকে হোটেলে ফিরলাম। আসা যাওয়ার পথে দৃষ্টিনন্দন রূপসা সেতু চোখে পড়ে যার পোশাকি নাম খানজাহান আলী সেতু। কথিত আছে রূপচাঁদ সাহা কর্তৃক একটি খাল খনন করা হয়েছিল। এটি এখন বিশাল রূপসা নদী। রূপসা সেতুর জ্যোৎস্নাস্নাত সন্ধ্যার অপরূপ দৃশ্য মনোমুগ্ধকর।
এবারের গন্তব্য মংলা সমুদ্র বন্দর। দিনটি ছিল ৩১শে অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। মংলা দেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। এটি খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। সোনাডাঙ্গা থেকে বাসে প্রায় ১ ঘন্টা ২০ মিনিট সময় লাগে। মংলা বন্দর পরিদর্শনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আমরা বন্দরে প্রবেশ করি। ১ম দেখা সমুদ্র বন্দর তাই উচ্ছ্বাস একটু বেশি ছিল। বিশাল বিশাল কন্টেইনার সারি সারি করে সাজানো। সকল সুবিধা সম্বলিত একটি আদর্শ বন্দর। প্রায় দেড় ঘন্টা জেটি পরিদর্শন করি। বন্দরের পরিচ্ছন্নতা ছিল দেখার মত। জেটি পরিদর্শন শেষে দুপুরে শহরে ফিরলাম।
দুপুরের খাবারের পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) দেখতে বের হই। কুয়েট ফুলবাড়ীগেটে অবস্থিত। যা শহর থেকে ১৪ কি.মি. উত্তরে। প্রধান সড়ক থেকে ইংরেজি অক্ষরে ক ট ঊ ঞ লেখাটি আগন্তুকদের শতভাগ আকৃষ্ট করে। পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসটি বিভিন্ন অনুষদ, ইনস্টিটিউট, আবাসিক হল, শিক্ষার্থী কল্যাণ কেন্দ্র, সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়া, মুক্ত মঞ্চ, জিমনেসিয়াম, সুইমিং পুল, কনফারেন্স রুম এবং গণমাধ্যম কেন্দ্রসহ কেন্দ্রীয় কম্পিউটার সেন্টার, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কেন্দ্রীয় মিলনায়তন দিয়ে সাজানো। কুয়েটে রয়েছে দেখার মত দুটি স্থাপত্য নিদর্শন। যার একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং অপরটি দুর্বার বাংলা। কুয়েটে আবার একটি পদ্ম পুকুরও রয়েছে। আমরা প্রায় দুই ঘন্টা কুয়েটে অবস্থান করি। কুয়েটের যাওয়া-আসার পথে চোখে পড়বে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতীকী জাহাজের মোড়, শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগার, বাংলাদেশ বেতার খুলনার আঞ্চলিক কেন্দ্র, শতবর্ষী বি. এল কলেজ মোড়সহ অন্যান্য। সেদিন রাতে আমরা সামুদ্রিক মাছের দ্বিতীয় পর্ব শেষ করি।
১লা নভেম্বর, শুক্রবার আমরা সিলেটের পথে রওনা দেই। বাস প্রায় ৩ঘন্টায় মাওয়া ফেরিঘাটে পৌঁছে। লঞ্চ বা ফেরি দিয়ে পদ্মা পার হতে হয়। আমরা লঞ্চে উঠি। লঞ্চে উঠার কিছু সময় পর নির্মাণাধীন জাতীয় স্থাপনা পদ্মা সেতু চোখে পড়ে। বিশাল জায়গা নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। বড় গৌরবের বিষয়। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা স্প্যানগুলো বীরের জাতির উন্নয়নের সাথে বেঁচে থাকার বহিঃপ্রকাশ। পদ্মা সেতু দ্রুত বাস্তবায়ন হোক এটাই প্রত্যাশা। এটি আমাদের অহংকার এবং বিশাল বিজয়। পদ্মা নদীতে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন দেখতে দেখতে পদ্মার ইলিশের স্বাদ নিলাম। পদ্মা নদী পার হতে প্রায় ৪০ মিনিট লেগেছিল। পরের গন্তব্য ঢাকা। ঢাকা থেকে বাসে করে সিলেট।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT