পাঁচ মিশালী

বোরো ধানের বীজতলা তৈরি ও পরিচর্যা

বিপ্রজিৎ কুমার দেব প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৯ ইং ০০:৩৩:০০ | সংবাদটি ১০১৭ বার পঠিত
Image

বোরো ধানের ফলন বেশি পেতে হলে বীজ বপন থেকে শুরু করে চারা মূল জমিতে লাগানোর পূর্ব পর্যন্ত তার নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়ে থাকে। তার জন্য বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে বীজ বপন ও চারার যতœ সঠিক সময়ে করতে হয়। এতে ধানের ফলন যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি অনেক রোগ ও পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই মান সম্পন্ন ও রোগজীবাণু মুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। মান সম্পন্ন ভাল চারা তৈরী করতে হলে অবশ্যই আদর্শ বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। আসুন আমরা আদর্শ বীজতলা তৈরি সম্পর্কে জেনে নেই।
বীজতলা তৈরি পদ্ধতি:
বোরো ধানের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিজা বা কাদাময় বীজতলা তৈরি করাই উত্তম। আদর্শ বীজতলা হচ্ছে যার দৈর্ঘ্য ৩ মিটার ও প্রস্থ ১ মিটার আকৃতির বেড। যার দুই বেডের মাঝে ২৫৩০ সেন্টিমিটারের নালা থাকবে। তবে জমির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী বেডকে কম বেশী করা যেতে পারে। বীজতলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করা উচিত। প্রয়োজনে কিছু রাসায়নিক সার দেওয়া যেতে পারে। দোঁআশ ও এঁটেল দোঁআশ মাটি বীজতলার জন্য উত্তম। বীজতলার জমি সবসময় উর্বর হওয়া প্রয়োজন। যদি জমি অনুর্বর হয় তাহলে প্রতি বর্গমিটার জমিতে দুই কেজি হারে জৈব সার (পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার বা ভার্মি কম্পোষ্ট বা ট্রাইকো কম্পোষ্ট) সুন্দর ভাবে পুরো জায়গাতে ছড়িয়ে দিতে হবে। এর পর ৫-৬ সেন্টিমিটার পানি দিয়ে দু’তিনটি চাষ ও মই দিয়ে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে এবং পানি ভালভাবে আটকিয়ে রাখতে হবে। জমির আগাছা, খড়খুটা ইত্যাদি পচে গেলে আবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা করে জমি তৈরি করতে হবে। তারপর আদর্শ বীজতলার মাপ অনুযায়ী বেড তৈরি করতে হবে। এক টুকরো জমিতে কয়েকটি বেড হতে পারে। নির্ধারিত জমির দু’পাশের নালা থেকে মাটি তুলে বেডের উপর রাখতে হবে। এরপর বেডের উপরের মাটি বাঁশ বা কাঠের চেপটা লাঠি দিয়ে সমান করে নিতে হবে। আদর্শ বীজতলার দু’বেডের মাঝে যে নালা তৈরী হয় তা খুবই প্রয়োজনীয়। এ নালা যেমন সেচের কাজে লাগে তেমনি পানি নিষ্কাষণও সহজে করা যায়। প্রয়োজনে সার , ঔষুধ ইত্যাদি প্রয়োগ করা সহজ হয়। বেড় তৈরীর ৩/৪ ঘন্টা পর বীজ বোনা উচিত। বীজতলায় বীজ বপনের ক্ষেত্রে উফশী জাতের বীজ হার হবে ৩-৪ কেজি/শতক। হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে ৫০ গ্রাম হারে বীজ বপন করতে হবে। বেশী ঘন হলে চারা দূর্বল হয়ে যায়। আর বেশী পাতলা করে বীজ বুনলে আগাছা বেশী জন্মায়। তাই বীজ বপনের সময় সম হারে বীজ বপন করতে হবে।
বীজতলার পরিচর্যা :
বোরো ধানের বীজতলায় সবসময় নালা ভর্তি পানি রাখা উচিত। বোরো মৌসুমে শীতের জন্য চারার বাড়বাড়তি ব্যহত হয়, চারা হলুদ হয়ে যায় আস্তে আস্তে শুকিয়ে মারা যায়। এ কারণে শৈত প্রবাহের সময় বীজতলা সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। তখন বীজতলায় ৩-৫ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। সকালে রাতের পানি বের করে নতুন করে পানি দিতে হবে তার জন্য নলকূপের পানি প্রয়োগ করা সবচেয়ে ভালও। প্রতিদিন ভোর বেলায় কাঠি দিয়ে কুয়াশা ঝরিয়ে দিতে হবে। বীজতলার চারা গাছ হলদে হয়ে গেলে প্রতি বর্গমিটারে ৭ গ্রাম (প্রতি শতকে ২৮০ গ্রাম) করে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করলেই চলে। ইউরিয়া প্রয়োগের পর চারা সবুজ না হলে প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম (প্রতি শতকে ৪০০ গ্রাম) করে জিপসাম সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের সময় বীজতলায় ছিপছিপে পানি রাখা উচিত।
বীজতলার ক্ষতিকর পোকা ও রোগের প্রতিকার :
থ্রিপস পোকা : এটি বীজতলায় ধানের চারা কে বেশী আক্রমণ করে থাকে। এর আক্রমণে সূর্যেরআলো উঠার পর পাতা সূচের মত সুঁচালো হয়ে যায়, তার কিনারা সাদা হয়ে যায়, বীজতলায় চারার উপর হাত বুলালে হাতের তালুতে ছোট ছোট কালো রং এর পোকা দেখা যায়।
দমন ব্যবস্থা : পানি দিয়ে বীজতলা ভাসিয়ে দেওয়া। আর সম্ভব না হলে সকাল সন্ধ্যায় ঝাঝরি দিয়ে বেশি করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৭ গ্রাম ইউরিয়া সার ভালভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে।
পামরী পোকা : এর আক্রমণে পাতা সাদা হয়ে যায় এবং মনে হয় ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে পাতা সাদা হয়ে নামতে থাকে। এটি ধানের পাতার ভিতরের ক্লোরোফিল খেয়ে ফেলে।
দমন ব্যবস্থা-সকালে বিকালে দুইবার হাতজাল দিয়ে সুইপিং করে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলা, পোকার ডিম নষ্ট করা। বেশী আক্রমণ হলে রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
পাতা মাছি : পাতা মাছির আক্রমণে পাতায় সাদা সাদা দাগ দেখা যায় ।
দমন ব্যবস্থা : সকালে বিকালে দুইবার হাতজাল দিয়ে সুইপিং করে পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।
উড়চুঙ্গা: এটি চারার শিকড় কাটে বিধায় গাছ লাল হয়ে যায় এবং শুকিয়ে খড়ের মত হয়ে যায়।
দমন ব্যবস্থা : পানি সেচ দিয়ে জমি ভাসিয়ে দিতে হবে। এতে পোকা বেরিয়ে আসলে মেরে ফেলতে হবে।
বাদামী দাগ রোগ : ধানের চারার পাতায় ছোট ছোট বাদামী রং এর দাগ চোখে পড়ে এবং দাগের আকৃতি আলপিনের মাথার মত মনে হয়।
দমন ব্যবস্থা : পানি সেচ দিতে হবে এবং ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
চারা পোড়া বা ঝলসানো রোগ : এটির আক্রমণে চারা গাছের পাতা পোড়ে যাওয়ার মত মনে হয়।
দমন ব্যবস্থা : রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ২ মি.লি লিটার অজোঅক্সিষ্ট্রবিন বা পাইরাক্লোস্টবিন জাতিয় ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বিকেলে বীজতলায় স্প্রে করতে হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT