মহিলা সমাজ

শীতের সকাল

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১১-২০১৯ ইং ০০:১৬:২৯ | সংবাদটি ৫০৬ বার পঠিত


বছরে ছয় ঋতুর মধ্যে হেমন্তের পরে শীতের আগমন ঘটে। হেমন্তের অবসরে উত্তুরে ঠান্ডা বাতাস বইতে থাকে এবং পৌষের শুরু থেকে শীত ক্রমে জেঁকে বসে-
‘হিম হিম শীত শীত / শীত বুঝি এলো রে। / কনকনে ঠা-ায়, / দম বুঝি গেলো রে।
পৌষ ও মাঘ এ দু’মাস শীতকাল। জানুয়ারীর মাঝামাঝিতে বছরে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে। এদেশের প্রত্যেকটা ঋতুই তার আপন বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। শীতের শুরুতে যে সকাল শীতের শেষে সে সকাল একরকম হয় না। শীতের মাঝামাঝি স্বতন্ত্র সাজের প্রকৃত সাজই শীতের সকাল। ষড়-ঋতুর পঞ্চম এবং উষ্ণতর গ্রীষ্মের বিপরীতে শীতলতর ঋতু। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতের ঠা-া অনুভূত হয়। শীতের রাত হয় দীর্ঘ, দিন হয় ছোট। শীতের সকাল মানব মনে এক বিচিত্র অনুভূতির সঞ্চার হয়। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শীত আসে। পাতা ঝরা, কুয়াশা মুড়া সকালে মন যেনো বিষণœ হয়ে ওঠে। শীতকে তখন মনে হয় উদাসী বাউল।
শীতের সকাল খুবই আরামদায়ক। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে হয় না। চোখে থাকে ঘুমের রেশ। শীতের সকালে প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই সুন্দর। টুপটুপ করে শেষ রাত্রে শিশির ঝরতে থাকে। গাছ লতাপাতাগুলো শিশির সিক্ত হয়ে ওঠে।
কুয়াশার চাদরে সারা শহর ঢেকে যায়। হিম শীতল বাতাসে শির শির করে বনের গাছপালাগুলো। শীতল বাতাস পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যায়। পাতাগুলো তখন কেঁপে ওঠে।
শিশির ঝরা সকালে মিষ্টি রোদ মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করে। সূর্য একেবারে দক্ষিণ দিকে হেলে এগুতে থাকে। ঘন কুয়াশার কারণে দূরের গাছপালা ঘরবাড়ী রাস্তাঘাট দেখা যায় না। টিনের চাল গাছের ডাল গড়িয়ে টুপটাপ শিশির ঝরতে থাকে সারা রাত।
শিশির ঝরা শীতের সকালে পাখীদের কোলাহল কম দেখা যায়। তবে হলুদ সর্ষে ক্ষেতে যখন, হলুদ ফুল ফোটে তখন অলির গুঞ্জনে মুখরিত থাকে সর্ষে ক্ষেতগুলো। এ সময় গাঁদা ও সূর্যমুখী ফুল বেশি ফোটে।
শীতের মৌসুমে খেজুর গাছগুলোতে রসের হাঁড়ি ঝুলানো হয়। সারা রাত খেজুরের মিষ্টি রসে হাঁড়িগুলো পূর্ণ হয়। খেজুরের রসের লোভনীয় মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভাসতে থাকে।
শীতের সকালে রকমারী পিঠা পুলি তৈরি করা হয়। গ্রামের প্রতিটি ঘরে ধুম পড়ে যায় পিঠা পুলি তৈরির। বিশেষ করে খেজুরের রসের পিঠা খুব যতœ করে বানানো হয়ে থাকে।
গ্রামের মেয়েরা নিজেদের হাতে তৈরি পিঠা পুলিতে তারা তাদের কুশলতার পরিচয় দেয় পিঠা তৈরির মাধ্যমে। শীতের সকালে ভাঁপা পিঠা খাওয়ার আনন্দটুকুই আলাদা। গ্রাম ছাড়াও এ সময়ে শহরের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে নানা রকম পিঠা পুলির আয়োজন থাকে।
শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়েও ভাঁপা পিঠা বানিয়ে এ সময় বিক্রি করা হয়। শহরের মানুষ তখন এ পিঠার স্বাদ নিতে ভুল করে না। রস পিঠা, তেলের পিঠা, ভাঁপা পুলিসহ আরো নানা রকম পিঠা পুলি বাসা বাড়িতে সকালের নাস্তায় প্রাধান্য পায়। ছেলে বুড়ো সবাই এ পিঠা খেতে পছন্দ করে।
শীতে টাটকা শাক সবজি চাষ হয়। শীতের মৌসুমে টাটকা শাক সবজিতে বাজারগুলো পরিপূর্ণ থাকে। নানা জাতের কপি টমেটো, গাজর, বরবটি, পালং শাক, লাল শাক, মুলো, আলু, পেঁয়াজ এগুলো সবই শীতের ফসল। শীত ঋতুতে শাক সবজি খেতেও ভালো লাগে। তাছাড়া বিকেলের নাস্তায় শীত মৌসুমে সবজিগুলোর অনেক কদর থাকে।
শহরে শীত আসে খুশীর মেজাজে শহরকে নানা রঙে সাজাতে। শীতের মৌসুমে খেলাধুলার আসর জমে ওঠে। শীত মানুষকে ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে যায়। বনভোজনের হাত-ছানিতে সবাই ছুটে চলে এক শহর থেকে অন্য শহরে। চিড়িয়াখানা সহ অন্যান্য জায়গায় চলে জনগণের ঘুরাঘুরি। ফলে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে শহর।
শীতের সকালগুলোর রূপ শহরে ভিন্ন। এখানে উত্তরের শীতল বাতাস বয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু তার সাথে খেজুরের রস কিংবা নলের গুড়ের মন মাতানো গন্ধ পুলকিত করে না।
শহরে শীতের সকাল থাকে অফিসমুখী মানুষের ছুটাছুটি, প্রকৃতির রূপ আর সুষমা ইটের কাঠিন্যের মধ্যে মানুষের সময় কাটে যান্ত্রিক সভ্যতায়। শহরবাসীরা তখন তাতে থাকে অভ্যস্ত।
এখানে গ্রামের মতো কুয়াশার ¯িœগ্ধ জৌলুস থাকে না। শহরে শীতের রাজপথ কুন্ঠিত হলেও ছোট-ছোট দোকানগুলোর গরম চা সকালে যাত্রীদের উদ্যমী করে তোলে।
সত্যিকার অর্থে শীতের সকাল গ্রামীণ প্রকৃতিতেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শীতের গ্রাম বাংলার চিত্রগুলো। মাঠে মাঠে ধান কাটা, কিষাণের মাঠের পথে যাওয়া, রাখালের মাঠে গরু চড়ানোর সময়ে বাঁশিতে মিষ্টি সুর ভেসে বেড়ানো এবং গাঁয়ের বধূদের কলসী কাঁখে ঘাটে যাওয়া।
ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা হাত-পা গুটিয়ে রৌদ্রের পরশ পেতে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেই গ্রাম-বাংলার শীতের সকালের রূপ-বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।
গ্রামের মানুষদের শীতের সকাল কাটে আগুনের কুন্ডকে কেন্দ্র করে। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে খড়কুটো দিয়ে আগুনের কুন্ড তৈরি করে গাঁয়ের মানুষ তার চারদিকে বসে আগুনের উত্তাপ উপভোগ করে শরীর গরম রাখে। সবাই মিলে উত্তাপ নিতে নিতে গল্পগুজবে মশগুল থাকে।
এক সময় কুয়াশা কেটে রোদ উঁকি দেয়। সে দুর্লভ রোদ উপভোগের জন্য শিশু কিশোরদের মধ্যে উৎসাহের সীমা থাকে না। আসলে শীতের সকালের যে প্রধান আকর্ষণ খেজুর রস বা রসের পায়েস ও পিঠেপুলি তার জন্য শহর ছেড়ে দূরে গ্রামবাংলায় যেতে চেষ্টা করে শহরে মানুষ। সেখানে শীতের সকাল তার সৌন্দর্যে ও মাধুর্যে অনবদ্য।
শীতের সকাল আমাদের মনে বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দেয়। পাতা-ঝরা, কুয়াশা ভরা শীতের সকাল আমাদের মনে যে প্রাণের সঞ্চার করে তা আমাদের কাছে বড় পাওনা। সূর্য ওঠার পর কুয়াশা কেটে গেলে যে সুন্দর দিনের সূচনা হয় তা আমাদেরকে প্রাণ চঞ্চল জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শীতের সকালের সৌন্দর্য সবার দেখার সৌভাগ্য হয় না। শীতের সকাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনুপম শোভা।
শীত মানুষের নিরানন্দকে সরিয়ে আনন্দ খুশির ছোঁয়া বইয়ে দেয় প্রতিটি মানব মনে। শীতকাল মানুষকে আনন্দ মুখর করে তোলে নানা মেলা, নানা পার্বন মিলে শীতকাল তাই আমাদের সকলের কাছে অতি প্রিয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT