মহিলা সমাজ

পোশাকের শালীনতা

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১১-২০১৯ ইং ০০:১৮:১৩ | সংবাদটি ১৬৮ বার পঠিত

মহান আল্লাহ নিজে সুন্দর, তিনি পছন্দও করেন সুন্দর। আর তাই তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সুন্দর আকৃতিতে। অতঃপর এই সুন্দর আকৃতির মানুষগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তিনি সুন্দর পোশাকের ব্যবস্থা করেছেন।
পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্য দিয়ে আমাদের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। এই পোশাকের একটি বড় প্রভাব মানুষের স্বভাব ও আচরণের উপর পড়ে। এটা কী অস্বীকার করা যাবে যে, কিছু পোশাক অন্তরে অহংকার ও আত্মগরিমা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে কিছু পোশাক বিনয় ও ন¤্রতা জাগ্রত করে। কিছু পোশাক নিঃসন্দেহে ভালো কাজে ও ভালো ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে আবার কিছু পোশাক মন্দ ও অকল্যাণের দিকে আকর্ষণ করে। ইসলাম পুরুষ ও নারীর পোশাক পরিচ্ছদ সম্পর্কে যথাযথ উপদেশ ও নির্দেশনা দান করেছে। ইসলাম যথোপযুক্ত পোশাকের মাধ্যমে দুটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রথমতঃ মানবদেহ ঠিকমতো আচ্ছাদন করা। কারণ বিশ্রীভাবে দেহ সৌষ্ঠভ প্রদর্শন ঠিক নয়। দ্বিতীয়তঃ সৌন্দর্যায়ন ও ভূষণ বাড়িয়ে তোলা। শরীর ঠিকমতো ঢেকে রাখা ও ভূষণের মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিৎ। যদি এই ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যায় তাহলে শয়তানের পথ অনুসরণ করা হবে। রাসুলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ‘পুরুষের স্ত্রীলোকের মত পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ এবং স্ত্রীলোকের পুরুষের মত পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ।’ (কিতাবুল লেবাস সহীহ আল বুখারী)
পোশাক এমন হতে হবে যা পুরোপুরি সতর আবৃত করে। পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত আর নারীর পুরো শরীর সতর। আর পোশাকের প্রধান উদ্দেশ্যই হল সতর ঢাকা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বনী আদম। আমি তোমাদের জন্য অবতীর্ণ করেছি পোশাক, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্য দান করে।’ (সূরা আরাফ-২৬) পোশাক-আশাক ও সাজ-সজ্জার বিষয়ে সমাজে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও ফ্যাশনের বড় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যখন যে ফ্যাশন বের হচ্ছে তখন তা নির্বিচারে অনুকরণকেই ‘আধুনিকতা’ মনে করা হচ্ছে। এ সবই ভুল। বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত। হাদিস শরিফে এসেছে ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে সে তাদের দলভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ ২/৫৫৯)
পোশাক ব্যবহারে জাঁকজমক ও আড়ম্বর নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ জাঁকজমকপূর্ণ (গর্বিত) লোককে পছন্দ করেন না।’ (সূরা হাদীদ-২৩)
মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জাঁকজমক বা গর্ব দেখানোর জন্য তার পোশাক জমি পর্যন্ত স্পর্শ করায় (বিনা কারণে লম্বা করে) আল্লাহ শেষ বিচারের দিনে তার দিকে তাকাবেন না।’ (কিতাবুল লিবাস, সহীহ আল বুখারী)
আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সহনশীলতার খুব অভাব পরিলক্ষিত হয়। পাশাপাশি পোশাকের ব্যবহারে অশালীনতা দেখা যায়।
বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় নানাবিধ পাপকাজের আধিক্য দৃশ্যমান হয়। তার মধ্যে পোশাক-পরিচ্ছদের শালীনতার অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অশালীনতা এক প্রকার অশ্লীলতারই নামান্তর। যেসব কুকর্ম ধৃষ্টতা সহকারে প্রকাশ্যে করা হয় সেগুলোকে অশ্লীল বলা হয়। অর্থাৎ অশ্লীলতার দ্বারা নির্লজ্জ ও কুরুচিপূর্ণ কথা ও কাজকে বোঝানো হয়। অশ্লীল কথা, কর্ম ও অপরাধ অশ্লীলতার অন্তর্ভুক্ত। এটি সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করে, সমাজকে কলুষিত করে। সমাজ তখনই কলুষিত হয় যখন নানা ধরনের পাপ কাজ অর্থাৎ অনায় কাজ বেড়ে যায়।
আল্লাহতায়ালা অশ্লীলতাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন- ‘বলুন, আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা।’ (সূরা: আল-আ’রাফ আয়াত-৩৩)
পোশাক হবে ভারসাম্যপূর্ণ উত্তম পোশাক। হযরত আবুল আহওয়াস (রা:) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি মহানবীর দরবারে এলাম তখন আমার পরনে ছিল অতি নি¤œমানের কাপড়। এটা দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি সম্পদ আছে? আমি বললাম জ্বী, আমার সম্পদ আছে। তিনি আবার জিজ্ঞাস করলেন কি কি সম্পদ আছে। আমি বললাম উট, গরু, ছাগল, ঘোড়া, গোলাম ইত্যাদি। সবধরনের সম্পদই আল্লাহ আমাকে দান করেছেন। তখন তিনি বললেন, যখন আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন তখন তোমার উপর তাঁর নিয়ামতের নিদর্শন থাকা চাই। (আবু দাউদ: ২/৫৬২, তিরমিযী ২/১০৯ ও নাসাঈ: ২/২৫২)
আমরা যদি ইসলাম প্রদত্ত পোশাক পরিচ্ছেদের বিধান পালন করি এবং সেই অনুযায়ী চলি, তাহলে অবশ্যই তা পুরুষ ও নারীর সম্ভ্রম নিশ্চিত করবে এবং একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। পোশাক একদিকে যেমন আমাদের দেহকে আবৃত রেখে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। অপরদিকে তেমনি রুচিবোধের পরিচয় বহন করে এই পোশাক। মার্জিত পোশাক মার্জিত রুচি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। অশালীন পোশাক পরিধান করা মোটেই উচিৎ নয়। কেননা এই ধরনের পোশাক পড়ে যখন আমরা বিশেষ করে মেয়েরা বাইরে বের হই তখন এর একটি নেতিবাচক প্রভাব সমাজের উপর পড়ে। ব্যক্তি চরিত্রের মাধুর্য বিকশিত হয় নানাবিধ সৎ গুণাবলী তথা আচরণের দ্বারা। তাছাড়া অন্যের কাছে একজন মানুষের গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হল তার আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, কথাবার্তা সর্বোপরি স্বভাব-চরিত্র। তাহলে আমাকেই নির্ধারণ করতে হবে আমি কেমন ব্যবহার পারিপার্শ্বিক মানুষের কাছ থেকে আশা করছি।
সম্মান পেতে হলে মার্জিত ব্যবহার, চলাফেরা, শালীন পোশাক পরিধান করা একান্ত প্রয়োজন। একজন মানুষের আচরণ কখনও এমন হওয়া উচিত নয় যার দ্বারা সমাজ কলুষিত হয় এবং সে নিজেও অন্যের কাছে ছোট হয়। তাই আসুন, পোশাক পরিধানে যতœবান হই এবং সমাজ থেকে অশ্লীলতা দূর করে সমাজকে ইসলামী আদর্শ সমাজ হিসেবে গড়ে তুলি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT