ইতিহাস ও ঐতিহ্য

স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১১-২০১৯ ইং ০০:০৭:৪৯ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

সময়ের দাবি ও প্রয়োজনের সাথে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বৃটিশ আমলের শেষ দশকের বাস্তবতা বর্তমান প্রজন্ম প্রত্যক্ষ করেনি। তবে প্রবীণদের লেখা, বক্তব্য এবং ইতিহাস থেকে তা জানা যায়। এ সময়টা বিশেষভাবে আলোচিত এ জন্য যে, বৃটিশ শাসনের অবসানে মুসলমান জনগোষ্ঠীর দাবির অনুকূলে একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। এ রাষ্ট্রের জন্ম ছিল ঐ সময়ের দাবি। জনমতকে উপেক্ষা করে নয়, পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল জনমতের অনুকূলে জন-আকাক্ষার স্বীকৃতি দিয়েই। তাই ভারত-বিভক্তি এবং এ অঞ্চলের জনগণের পাকিস্তানভুক্তির বিষয়টি বিচার করতে হবে ঐ সময়ের নিরিখে। কারণ রাজনীতি সময়ের দাবিকে ভিত্তি করেই চলে। সময়ের দাবিতেই ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। এক সময় এ দেশ পাকিস্তান ছিল বলেই পাকিস্তানপ্রীতি প্রদর্শন যেমন অযৌক্তিক, তেমনি পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে বলেই পাকিস্তানকে চিরশত্রু গণ্য করা সমীচীন নয়। ইতিহাসের বাস্তবতাকে নির্মোহ দৃষ্টিতে গ্রহণ করতে না পারলে নিরপেক্ষ ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়।
ভারতবর্ষে মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা ছিলেন শাসক। দীর্ঘ মুসলিম শাসন আমলে ধর্মীয় সম্প্রীতি কোথাও ব্যাহত হয়নি। মুসলমান শাসনকালে উচ্চ রাজপদে হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ও মর্যাদা মুসলমান শাসকদের উদারতার নজীর হয়ে আছে। এই শাসকশ্রেণীই ইংরেজ শাসন আমলে এক অবমাননাকর অবস্থায় পতিত হয়। হিন্দু জনগোষ্ঠী নতুন শাসকশ্রেণীর সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। চাকরী, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে তারা প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন। পক্ষান্তরে মুসলমানরা সব কিছু হারিয়ে চরম দুর্গতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকেন। এ ঘোর যখন কাটে তখন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনগ্রসর মুসলমানরা অংশ নিতে আগ্রহী হলে অবসর শ্রেণী পথ আগলে রাখতে চেষ্টা শুরু করেন। তারা মুসলমানকে চাষাভূষা শ্রমিক রায়ত স্তরেই চেপে রাখতে সচেষ্ট হন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে মুসলিম জনগণের এগিয়ে আসার এই সময়েই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির জন্ম হয়। হিন্দু সমাজ তখন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। মুসলমান সমাজের উত্থানের পথে তারা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বিঘœ সৃষ্টি করতে থাকেন। তাই পরাধীনতা থেকে মুক্তি আন্দোলনের সাথে অনগ্রসর মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির তাড়নাও প্রবল হয়ে ওঠে। মুসলমানদের সামনে তখন বাধা দু'টি। ইংরেজ শাসন এবং হিন্দু জমিদার মহাজনদের শোষণ। জাত্যভিমানী, শ্রেণী বৈষম্যের লালনকারী হিন্দু অভিজাত শ্রেণীর অবজ্ঞা এবং আর্থিক শোষণ-মুক্তির লক্ষ্যে তখনকার মুসলমান নেতৃবৃন্দ পৃথক রাষ্ট্রকেই রক্ষাকবচরূপে ধরে নেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪০ খ্রীষ্টাব্দে ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, সাব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাব পেশ করেন। ঐতিহাসিক এ প্রস্তাবে বলা হয়ঃ
Resolved that it is the considered view of this session of the All India Muslim League that no constitutional plan would be workable in this country or acceptable to the Muslims unless it is designed on following basic principle, namely, that geographically contiguous units are demarkated into regions which should be so constituted, with such territorial re-adjustments as may be necessary that the areas in which the Muslims are numerically in a majority, as in the north western and Eastern zones of India, should be grouped to constitute Independent states' in which the constituent units shall be autonomous and sovereign. অর্থাৎ নিখিল ভারত মুসলিমলীগের এই অধিবেশনের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, কোনো শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা এ দেশে কার্যকরী হবে না, কিংবা তা মুসলমানদের গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তা নিম্নলিখিত মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়। যথাঃ ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন ইউনিটগুলো নিয়ে আবশ্যক মত আঞ্চলিক পুনর্গঠন দ্বারা কতকগুলো বিভাগ গঠন করতে হবে। যে সকল অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল, সে সকল অঞ্চল একত্রিত করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং এ সকল রাষ্ট্রের অন্তর্গত ইউনিটগুলো হবে স্বায়ত্ত্বশাসিত ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
এ প্রস্তাবের পক্ষে সমগ্র ভারতে সাড়া পড়ে যায়। এ অঞ্চলের লোকজন পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে হয়তো সংঘবদ্ধ হতে পারতেন। কিন্তু তখনকার প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ মানুষ ভারতে মুসলমানদের একটি মাত্র স্বতন্ত্র আবাসভূমির পক্ষে ছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে অখ- ভারত সমর্থকও ছিলেন। কিন্তু তাদের চেয়ে ভারত বিভক্তির সমর্থক ছিলেন বেশি। ইতিহাসের এই ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক দিক থেকে অগ্রসর আসাম প্রদেশভুক্ত সিলেট বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।
লাহোর প্রস্তাবের পরই সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানের স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে কংগ্রেস ভারত ছাড় বা 'কুইট ইন্ডিয়া' প্রস্তাব গ্রহণ করে। সিলেটে কংগ্রেসী নেতৃবৃন্দও দলে দলে কারাবরণ করেন। বৃটিশ বিরোধী শতবর্ষব্যাপী মনোভাব লাহোর প্রস্তাবের পর সিলেটে পাকিস্তান বা মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি গঠনের লক্ষ্যে নতুন মোড় নেয়। অনেক মুসলিম নেতাও অবশ্য কংগ্রেস বা অখ- ভারত সমর্থক ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলিম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মদনীর প্রভাব সিলেটে ছিল অপরিসীম। আলিম সমাজের অনেকেই ছিলেন তার ভক্ত। কিন্তু অখ- ভারতের পক্ষে তার সমর্থন সত্ত্বেও সিলেটবাসী গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলায়) যোগ দেয়।
সিলেট ঐ সময়ে ছিল আসাম প্রদেশের একটি জেলা। আসামে তখন কংগ্রেস দলীয় সরকার। তাই ভারত বিভাগ পরিকল্পনা ঘোষণার পর সিলেটের অনেক মুসলিম লীগ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৬ খ্রী. এর ২রা মার্চ মুহম্মদ আলী জিন্নাহ আসেন সিলেটে। কালীঘাট রোডে আজমল আলী চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান করেন। বিকাল ৫ টায় শাহী ঈদগাহে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। পরদিন সকালে জিন্নাহ হযরত শাহজালালের দরগা জিয়ারত করে শিলং রওয়ানা হন। তাঁর সাথে যান আব্দুল মতিন চৌধুরী।
নতুন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে সর্বভারতীয় পর্যায়ে সিলেটের দু'জন কৃতিসন্তানের নাম বহুল পরিচিত। একজন আব্দুল মতিন চৌধুরী, অপরজন আলতাফ হোসেন। মতিন চৌধুরী ছিলেন জিন্নাহর প্রিয়ভাজন। তাঁকে জিন্নাহর ডান হাত বলা হতো। আলতাফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির লেকচারার রূপে কর্মজীবন শুরু করেন। সাংবাদিকতায় আসার পর মুহম্মদ আলী জিন্নাহ তাকে মুসলিম লীগের মুখপত্র 'দি ডন' পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করেন। প্রথমে দিল্লী ও পরে করাচী থেকে প্রকাশিত 'ডন' পত্রিকায় ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৫ খ্রী, পর্যন্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বভারতীয় রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় এই দুই কৃতি ব্যক্তিত্বের সুখ্যাতি ছিল। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সেক্রেটারী মাহমুদ আলীর অবদান ও উল্লেখযোগ্য। মাওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া এ সময় ‘কেন পাকিস্তান চাই' নামে একখানা পুস্তিকা রচনা করেন। এম, এ, বারী (ধলা বারী) কোর্ট বিল্ডিং থেকে বৃটিশ পতাকা নামিয়ে জঙ্গী পাকিস্তানী রূপে খ্যাতি লাভ করেন। এ সময়ে সিলেটে ডাঃ আব্দুল মজিদ, এ. এ. আব্দুল হাফিজ (এডভোকেট), সাংবাদিক রজিউর রহমান, খেলাফত আন্দোলনে দীর্ঘদিন কারাবরণকারী মাওলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। সিলেটে গণভোট শিরোনামে আলোচনায় তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের নেতা ও কর্মীরা পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভিন্ন ধারার রাজনীতির সূচনা করেন।
সিলেটে গণভোট
শ্রীহট্টে মধ্যমা নাস্তি। বহুল উচ্চারিত এ প্রবচনটি সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রেও পুরোপুরি প্রযোজ্য। ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ৬ ও ৭ জুলাই ঐতিহাসিক এমনি দু'টি দিন । সিলেট অঞ্চল এ উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সব সময় রেখেছে স্বতন্ত্র ভূমিকা। স্থাপন করেছে ব্যতিক্রমী নজির। সিপাহী বিদ্রোহেরও (১৮৫৭) অনেক আগে ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র মুখোমুখি সংঘর্ষের ইতিহাস রচিত হয়েছে সিলেটে। 'লিন্ডসে' তার আত্মজীবনীতে ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সিলেটের সংগ্রামী এ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বর্তমান। ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে স্বতন্ত্র আবাসভূমি গঠনের আন্দোলনেও দেখা যায় সিলেট পয়লা কাতারে । বাংলাদেশের একমাত্র সিলেট জেলাই ঐ সময় পৃথক সংগ্রাম করে অন্তর্ভুক্ত হয় পাকিস্তানের। ১৯৪৭-এর ৬ ও ৭ জুলাই'র গণভোট বা রেফারেন্ডাম তাই একই সাথে ঐতিহাসিক এবং সিলেটের স্বাতন্ত্রের পরিচায়ক, ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়।
সিলেট ১৯৪৭-এর আগে থেকেই আসাম প্রদেশের একটি জেলা ছিল। আসামের দু'টি বিভাগে ১২টি জেলার মধ্যে সুরমা ভ্যালিতে ছিল ৫টি জেলা। সমগ্র প্রদেশের নেতৃত্বে সিলেট ছিল অগ্রগণ্য এবং আসামে মুসলিম প্রভাব ছিল বেশি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে (ধর্মের নয় ধর্মাবলম্বীর ভিত্তিতে) ভারত বিভক্তির সিদ্ধান্তের ফলে আসাম প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাসমূহ অন্যান্য জেলার মত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে-এটাই ছিল স্বাভাবিক কিন্তু কংগ্রেস সুযোগ নিতে চাইলো। বিভাগ-পূর্ব নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দু'জন প্রার্থী সিলেট থেকে এবং একজন হাইলাকান্দি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন (গোলাপগঞ্জের মাওলানা আব্দুর রশিদ, জৈন্তাপুরের মাওলানা ইব্রাহিম চতুলী ও হাইলাকান্দির আব্দুল মুতলিব)। তাদের সমর্থনে আসাম প্রদেশে তখন ক্ষমতাসীন ছিল কংগ্রেস দল। এই প্রেক্ষিতে কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সমর্থকগণ ভারতের সাথে থাকার দাবি করেন। এর প্রতিবাদ করেন সিলেটের জনগণ। গোলাপগঞ্জের আব্দুল মতিন চৌধুরী এ পর্যায়ে রাখেন বিশেষ ভূমিকা। জননেতা মতিন চৌধুরী জিন্নাহর ডানহাত' রূপে পরিচিত ছিলেন। তাঁর এবং সিলেটের অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় তৈরি হয় গণভোটের প্রেক্ষাপট। বৃটিশ সরকার ৪৭ এর ৩ জুনের ঘোষণায় সিলেটে রেফারে-ামের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। ঘোষণাটি ছিল এইঃ

Though Assam is predominantly a nonmuslim province, the district of Sylhet is contiguous to Bengal is predominantly Muslim. There has been a demand that the event of the partition of Bengal, Sylhet should be partitioned. A referendum will be held in the Sylhet district under the aegis of the Governor General and consultation with the Assam provincial Government to decide whether district of Sylher should continue to form part of the Assam province or should be amalgamated with the new province to eastern Bengal if that province agrees. If the referendum result is in favour of amalgamation with eastern Bengal, a Boundary Commission with terms of reference similar to those for the Panjabs and Bengal will be set up to demarkate Muslim-majority areas of Sylhet district and contiguous Muslim majority areas of adjoining district which will then be transfer to eastern Bengal. The rest of Assam province will incase constituent assembly.
এ ঘোষণা মতে, সিলেট আসামে থাকবে নাকি পাকিস্তানে যোগ দেবে- এ প্রশ্নে জনমত যাচাইর আয়োজনটি ছিল সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণভোটে সিলেটবাসীর মতামত ভিন্ন হলে সিলেটের ইতিহাস এবং বর্তমান অবস্থান হতো সম্পূর্ণ অন্য রকম। সিলেটের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ এবং জনগণ এটি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই '৪৭-এর জুন মাস থেকেই সিলেট রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। ৬ ও ৭ জুলাই সোম ও মঙ্গলবার গণভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়। কমিশনার নিযুক্ত হন মিঃ এইচ, এ, ষ্ট্রক। সিলেটের জেলা প্রশাসক মিঃ ডাম ব্রেকের তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা হয় গণভোট। গণভোট উপলক্ষে পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে গঠিত হয়েছিল সিলেট রেফারেন্ডাম বোর্ড। এ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল মতিন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ এডভোকেট।
পাকিস্তানের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্যে বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্র শুরু হয় তোড়জোড়। জেলার পাঁচটি সাবডিভিশন-সিলেট সদর, করিমগঞ্জ, হবিগঞ্জ, দক্ষিণ সিলেট (পরে মৌলভীবাজার) ও সুনামগঞ্জ মেতে ওঠে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক তরঙ্গে। অপর পক্ষেও জোর তৎপরতা। পাকিস্তানের পক্ষে সিলেটের বাইরে থেকেও নেতারা ছুটে এলেন সিলেটে। লিয়াকত আলী, সোহরাওয়ার্দী, চৌধুরী খালিকুজ্জামান, মাওলানা আজাদ সুবহানী এমনকি তরুণ শেখ মুজিবও এলেন। আসাম মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের সাথে একযোগে তারা ছুটে বেড়ালেন সিলেটের স্থানে স্থানে। দৈনিক আজাদ, মর্নিং নিউজ, সিলেটের যুগভেরী, আসাম হেরাল্্ড আল ইসলাহ, মাওলানা রজিউর রহমান, শাহেদ আলীর প্রভাতী পত্রিকা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। লেখকরাও সক্রিয় ছিলেন। মাওলানা ভাসানী, আব্দুল মতিন চৌধুরী, আব্দুল হামিদ, দেওয়ান বাসিত, দেওয়ান আজরফ, মাহমুদ আলী, আজমল আলী চৌধুরী, ডাঃ মজিদসহ অন্যান্য নেতা ও কর্মীরা ঝাপিয়ে পড়লেন ময়দানে। তরুণ ছাত্রদের মধ্যে চৌধুরী এ.টি.এম মাসউদ, কাজী মুহিবুর, তসদ্দুক আহমদ, ফজলুর রহমান, যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে দেওয়ান ফরিদ গাজী, সা'দত খান, ধলাবারী, কালা মিয়া, মনির উদ্দিন, আব্দুল হামিদ প্রমুখ অগণিত ছাত্র-যুবক বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। ছুটলেন ঘরে ঘরে। সিলেটে আব্দুস সালাম, করিমগঞ্জে মেকাই মিয়া মৌলভীবাজারে কাজী আব্দুর রকিব, সুনামগঞ্জে আবু হানিফা আহমদ প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত হলো মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী।
জমজমাট প্রচারণা। পাকিস্তানের পক্ষে প্রতীক কুড়াল। অপরপক্ষে ঘর। সিলেটে শ্লোগান উঠলো 'আসামে আর থাকবো না গুলি খেয়ে মরবো না, কংগ্রেস সরকার জুলুম করে, নামাজেতে গুলি করে, ভূতের ঘরে কুড়াল মার' ইত্যাদি। অপরপক্ষে শ্লোগান ছিল-পূর্ববংগে যাব না, নালি শাক খাব না। জবাবে শ্লোগান তৈরি হলো- 'আসামে আর থাকবো না, মশার কামড় খাব না' ইত্যাদি। সভা-সমাবেশ, শ্লোগান আর কর্মীদের ছুটাছুটিতে সে এক অভূতপূর্ব জাগরণ। (চলবে)

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT