ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঐতিহ্যবাহী পালকী

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১১-২০১৯ ইং ০০:০৮:২১ | সংবাদটি ২৫৯ বার পঠিত

পালকী আমাদের দেশের জাতি ধর্ম, সংস্কৃতি সবার কাছে সমান পছন্দনীয়। এটি আমাদের দেশের প্রাচীন হাজারো বছরের পুরানো ঐতিহ্য।
গ্রামবাংলার হাজারো বছরের প্রাচীন বিয়ের ঐতিহ্য পালকী কাঠের তৈরি। পালকী দেখতে প্রায় মাঝারি ধরনের সিন্ধুকের মতো। গ্রাম-গঞ্জে বিয়ে অনুষ্ঠানে পালকীর কদর বেশি।
পালকী নিয়ে আমাদের দেশের কবিরা শত শত কবিতা লিখেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লিখা পালকী নিয়ে সুন্দর কবিতা-
‘পালকী চলে পালকী চলে
গগন তলে আগুন জ্বলে
স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গাঁয়ে
যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা...
তাছাড়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীর পুরুষ কবিতায় সুন্দর ছন্দবদ্ধ কবিতা-
‘মনে করো যেনো বিদেশ ঘুরে
মা কে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছো পালকীতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে...।
পালকী শব্দটি সংস্কৃত পলাঙ্ক বা পটঙ্গ থেকে উদ্ধৃত। হিন্দি ও বাংলায় এটি পালকী নামে পরিচিত। পর্তুগীজরা এর নাম দেয় শিবিকা পালাঙ্গুনি। অনেক জায়গায় এই যানকে ডুলি শিবিকা বলা হয়।
বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এবং চতুর্দশ শতকের পর্যটক জন ম্যাগনোলি ভ্রমণের সময় পালকী ব্যবহার করতেন বলে জানা গেছে।
স¤্রাট আকবরের রাজত্বকালে এবং পরবর্তী সময়ে কোষাধ্যক্ষদের যাতায়াতের অন্যতম বাহন ছিলো পালকী।
বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শুভ অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য পালকী ব্যবহারের প্রথা চালু ছিলো। বেহারা যখন পালকী বহন করতো তখন তারা নির্দিষ্ট ছন্দের তালে তালে তাল মিলিয়ে নেচে গেয়ে পা ফেলতো। তার অনুভূতি এখনো উপলব্ধি করে বৃদ্ধরা।
গ্রামীণ আঁকাবাঁকা মেঠো পথে কখনো আলপথে বর-কনে পালকিতে করে উভয়ের শ্বশুর বাড়িতে আসা-যাওয়ার আনন্দঘন একটা দারুণ সময় ছিলো সে সময়।
গাঁও গেরামের পথে পালকীতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, উঁকি ঝুঁকি দিয়ে মন জুড়াতো গায়ের বধূ। কখনো বা মা চাচীরা সাথে উঠতি বয়সের চঞ্চল মেয়েরাও এতে বাদ পড়তো না।
ঐতিহ্যবাহী পালকী মানুষের জীবনে বর-কনের জন্য প্রধান বাহন হলেও এটি ছিলো মূলত রাজ-রাজাদের একমাত্র বাহন।
পালকী রাজা-বাদশাহদের জন্য চেয়ারের মতো করে নির্মাণ শৈলিতে তৈরি করা হতো। আধুনিক আমলে গাড়ির প্রচলন ছিলো না বলে অভিজাত শ্রেণির লোকেরা পালকীতেই চড়ে যাতায়াত করতেন। পালকীর অপর নাম ছিলো পালঙ্ক। এপাড়-ওপাড় দু-বাংলায় এটা পালকী নামেই পরিচিত। তবে কোন কোন জায়গায় পালকীকে ডুলি বা শিবিকা হিসেবে চেনে। পালকী বিভিন্ন আকৃতি ও ডিজাইনের হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোট পালকী (ডুলি) দুজনে বহন করে। সবচেয়ে বড় পালকী বহন করে চার থেকে আট জন বাহক। পালকী বাহকদের বলা হয় বেহেরা বা কাহার। হাড়ি, শাল, দুলে, বাগদি, বাউরি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক পালকী বহন করে।
ছুতারেরা সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ, গাম কাঠ প্রভৃতি দিয়ে পালকী তৈরি করে। বট গাছের বড় ঝুরি দিয়ে কাঠের তৈরি পালকির বাঁট, বহন করার দন্ড তৈরি করা হয়।
পালকী সচরাচর তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- সাধারণ পালকী, আয়না পালকী, ময়ূরপক্সক্ষী পালকী সাধারণ পালকী আয়তাকার। চারিদিকে কাঠ দিয়ে আবৃত এবং ছাদ ঢালু। এর দু’দিকে দুটি দরজা থাকে। আয়না পালকীতে আয়না লাগানো এবং ভিতরে চেয়ারের মতো দুটি আসন ও টেবিল থাকে। ময়ূরপক্সক্ষী পালকী আয়তনে বড়। ভিতরে দুটি চেয়ার, একটি টেবিল ও একটি তাক থাকে। এ পালকির বাটটি বাঁকানো এবং বাইরেট কাঠের তৈরি পাখি, পুতুল ও লতাপাতার নঁকশা থাকে। পালকী বাহকেরা আগে ও পরে, পালকী বাহকের ছত্রটিকে সুন্দর করে সাজানো হয়।
মানুষ বহনের ঐতিহ্যবাহী পালকী ১ বা ২ জন যাত্রী নিয়ে ২, ৪ বা ৮ জন বাহক এটিকে কাঁধে তুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়।
বাংলার সতেরো ও আঠারো শতকের ইউরোপিয় বণিকেরা হাঁটে বাজারে তাদের মাল-পত্র বহনে পালকী ব্যবহার করতো। তারা পালকী ব্যবহারে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যে, কোম্পানীর একজন স্বল্প বেতনের সাধারণ কর্মচারী ও এদেশের যাতায়াতের জন্য পালকী রাখতো ও তার ব্যয়ভার বহন করতো।
বস্তুত: সে যুগের পালকী ছিলো এ যুগের মোটর গাড়ির অনুরূপ। স্টীমার ও রেলগাড়ি আবির্ভাবের পূর্বে ভারতের গর্ভনর জেনারেল পালকীতে চড়ে যাতায়াত করতেন।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে ডাক ও যাত্রী বহনের জন্য ডাক বিভাগ স্টেজ পালকী চালু করলেও এই প্রথা উনিশ শতকের শেষের নাগাদ প্রচলিত ছিলো। দূরের যাত্রীরা স্টেজ পালকীতে টিকেট ক্রয় করতো।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজরা পালকীতে চড়া বন্ধ করে দেয়। তবে উনিশ শতকের শেষাবধি স্থানীয় বাবুরা এবং অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ যাতায়াতের জন্য পালকিই ব্যবহার করতেন।
উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাস- প্রথা বিলোপের পর বিহার, উড়িষ্যা, ছোট নাগপুর এবং মধ্য প্রদেশ থেকে পালকী বাহকরা বাংলায় আসতে থাকে। বহু সাঁওতাল পালকী বাহকের কাজ নেয়।
শুষ্ক মৌসুমে তারা নিজেদের এলাকা থেকে এদেশে আসতো এবং বর্ষা মৌসুমে আবার চলে যেতো।
প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-বাদশারা এবং জমিদার শ্রেণি ছাড়া বেহারাদের প্রতি তেমন একটা-সুনজর ছিলো না। কোন রকমে বেহারাদের জীবন ও জীবিকা চলতো।
সে সময়ে স্থায়ী বেহারা রাখা ছিলো খুবই ব্যয় সাধ্য। প্রাচীনকালে বাহকদের সাজ-পোশাকেও ছিলো রকমারী পাঁগড়ি, পাশাপাশি গানে থাকতো লাল রং এর ব্যয় সাধ্য জোব্বা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ অবস্থানকালে তার জমিদারী কাচারী পরিদর্শনের সময় যে পালকী ব্যবহার করতেন তা এখনো কুঠি বাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে।
সে যুগে স্বচ্ছল পরিবারে নিজস্ব পালকী থাকতো এবং তাদের ভৃত্যরাই তা বহন করতো। সাধারণ মানুষ পালকী ভাড়া করতো।
আবহমান বাংলার একটি ঐতিহ্যের নাম পালকী। যা বাঁশ, কাঠ, টিন ও লোহার শিক দিয়ে তৈরি। বর-কনের এ বাহন এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নতি সাধনের ফলে পালকির ব্যবহার প্রায় উঠে যায়।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেল ও স্টীমার চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পালকীর ব্যবহার কমতে থাকে।
১৯৩০ এর দশকে শহরাঞ্চলে রিক্সা প্রচলনের ফলে পালকীর ব্যবহার প্রায় উঠে যায়। পালকীর স্থান এখন জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য।
গ্রাম-গঞ্জ শহর বন্দরে এখন আর পালকী বহনের দৃশ্য দেখা যায় না। পালকীর সেই ঐতিহ্যময় ব্যবহার ক্রমে গ্রাস করেছে যান্ত্রিক সভ্যতার বিদেশী নানান রং এর বাহারী জাতি।
পালকী বহনের দৃশ্য এখন যেনো স্বপ্ন। হারিয়ে গেছে পালকী বহনের ছদ্মমাখা সুন্দর গান। তবে প্রকৃতি থেকে একেবারে বিলীন না হলেও এ বাহনটি কোথা না কোথাও টিকে আছে। বর্তমানে পালকী বাংলাদেশের অতীত, ঐতিহ্যের নিদর্শক হিসেবেই এখন পরিচিত।

 

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • শতাব্দীর বন্দরে জামেয়া রেঙ্গা
  • রেফারেণ্ডাম ও সিলেটে বঙ্গবন্ধু
  • বিজয়োল্লাসের মধ্যে বিষাদের ভয়াল স্মৃতি
  • জগন্নাথপুর উপজেলা সমিতি
  • ঢাকার আকাশে প্রথম নারী
  • বঙ্গভঙ্গের সূচনার ইতিহাস
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • Developed by: Sparkle IT