ধর্ম ও জীবন

হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী (রহ.)

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-১১-২০১৯ ইং ০১:১৫:২৩ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

রাসুল (সা.) ও পয়গাম্বরদের মাধ্যমে নাজিল হওয়া চারখানি স্বর্গীয় গ্রন্থের অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কুরআন। ইসলাম ধর্মের যাবতীয় বিষয় এবং মুসলমানদের জীবন বিধান আল কুরআন। আল্লাহ প্রেরিত গ্রন্থ কুরআনের পর দুনিয়ার বিশুদ্ধতম কিতাব হাদীস সংকলন বুখারী শরিফ। কুরআনের রচয়িতা মহান আল্লাহ স্বয়ং। কুরআন নাজিল হয় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। আবার কুরআনের বিভিন্ন বাণী ও ঘটনার প্রচার বা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নবী করীম (সা.) যা কিছু বলেছেন তা হাদীসের অন্তর্গত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) যাবতীয় বাণী, উপদেশ, বক্তৃতা, জীবনাচার এবং যে কোনো বিষয়ের অনুমোদন বা সম্মতি বা নিষেধকে হাদীস হিসেবে গণ্য করা হয়। হাদীস সংগ্রহকারীদের অন্যতম এবং যার সংগৃহীত হাদীস বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তিনি ইমাম বুখারী (রহ.)। এটা তাঁর সংক্ষিপ্ত নাম। আসল নাম হলো ইমাম আল জুফি আল বুখারী। প্রধান প্রধান হাদীস সংগ্রহকারী সকলের সংক্ষিপ্ত নামানুসারে তাঁদের সংগৃহীত হাদীসের নাম হয়েছে।
ইমাম বুখারী (রহ.)’র হাদীস গ্রন্থের নাম সহি আল বুখারী। ইমাম বুখারী (রহ.)’র জন্ম মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের বুখারাঞ্চলের রাজধানী বুখারা শহরে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পনেরটি রাষ্ট্রের একটি ছিলো উজবেকিস্তান।
ইমাম বুখারী (রহ.)’র পিতা ইসমাইল ইবনে ইব্রাহীমও হাদীস সংগ্রহকারী ছিলেন। তিনি ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর শিষ্য ছিলেন। ইমাম বুখারী (রহ.) কিশোরকালে মাত্র এগারো বছর বয়সেই অনেক হাদীস মুখস্থ করে ফেলেন এবং সেই সাথে প্রভূত ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেন। বাল্যকালে পিতাকে হারানোর পর ষোল বছর বয়সে তিনি মায়ের সঙ্গে সপরিবারে পবিত্র মক্কানগরীতে চলে যান। মক্কায় পৌঁছে তিনি প্রথমে হজ্ব পালন করেন। অতঃপর শুরু হয় তাঁর বিশুদ্ধ হাদীসের সন্ধান ও সংগ্রহ কাজ। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকা সে সময়ের বিভিন্ন অঞ্চল তিনি সফর করেন এবং সঠিক শুদ্ধ একশতটি হাদীস উল্লেখ করে তিনি তা সংশোধন করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.) জ্ঞানের জন্য নিবেদিত ছিলেন। তিনি জ্ঞান ও হাদীসের সন্ধানে অন্তত ১০৮০ জন শিক্ষকের সাহায্য নিয়েছেন। এই শিক্ষকের অন্যতম ছিলেন বাগদাদের ইমাম আহাম্মদ বিন হানবাল (রহ.)। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, এ রকম ছাত্রের সংখ্যা বেশুমার। ধারণা করা হয় যে, এ সংখ্যা কমপক্ষে ৯০ হাজার হবে যাদের অন্যতম তিন হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম (রহ.), ইমাম তিরমিজি (রহ.) এবং ইমাম নিসাহ (রহ.)।
ইমাম বুখারী (রহ.) একজন দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন এবং ছিলেন বড় দাতাও। পৈত্রিক সূত্রে তিনি অনেক ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন। তিনি গরিব দুঃখী মানুষের মধ্যে সব বিলিয়ে দিয়ে অতি সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন এলাকার প্রায় এক হাজার জন ইমাম ও ইসলামী চিন্তাবিদের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ ইসলামী রীতি-নীতি, ফতোয়া ও হাদীসের সন্ধান লাভ করেন। তিনি মক্কায় দুই বছর এবং চার বছর মদিনায় জ্ঞানচর্চা করেন। ইমাম বুখারী (রহ.) অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। সংগৃহীত হাদীস লিখে রাখার প্রয়োজনবোধ করতেন না। কারণ স্মৃতিতে এসকল হাদীস স্থায়ীভাবে গেঁথে গিয়েছিলো। অবাক লাগে ভাবতে, প্রথম দিকে তিনি সত্তর হাজার হাদীস মুখস্থ করেন এবং পরবর্তীতে এই সংখ্যা তিন লাখে উন্নীত হয়। ইমাম বুখারী (রহ.) সম্পর্কে এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ইরাকের বাগদাদ নগরীতে তাঁর মেধা পরীক্ষার জন্য একশতটি হাদীস সামান্য পরিবর্তন করে তাঁর সামনে হাজির করা হয়। তিনি অবলীলায় সবক’টি হাদীসের ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধন করে দেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) কোনো হাদীসের খোঁজ পেলে তা যাচাই-বাছাই পরীক্ষা না করে গ্রহণ করতেন না। সন্ধান করে খোঁজে কুড়িয়ে পাওয়া হাদীস তিনি মক্কা বা মদিনায় বসে লিখতেন এবং সব সময় হাদীস লিখার আগে নফল নামাজ পড়ে হাদীসের বিশুদ্ধতার জন্য আল্লাহর দরবারে সাহায্য কামনা করতেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি ষোল বছরে ছয়খানারও অধিক বই সম্পাদন করেন। তাঁর অন্যতম প্রধান বই হলো ‘সহী আল বুখারী’ বা বুখারী শরীফ’। তাঁর এই বুখারী শরীফে ৭২৫২টি হাদীস স্থান পেয়েছে।
ইমাম বুখারী (রহ.) শেষ জীবনে তাঁর জন্মভূমি বুখারায় ফিরে যান এবং এখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করেন। ইমাম বুখারী (রহ.) খুব স্বাধীনচেতা ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। বুখারার তৎকালীন শাসক তার সন্তানকে এই মাদ্রাসায় পৃথকভাবে পড়াতে বলেছিলেন। বুখারী (রহ.) তা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এ জন্য তাঁকে বুখারা শহর ছেড়ে ত্রিশ মাইল দূরে খারতাংক নামক গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়। ৮৭০ সালে ৬২ বছর বয়সে এই নিভৃত গ্রামে তিনি ইন্তেকাল করেন। অনেক পরে ১৯৯৮ সালে এখানে একটি মসজিদ, স্মৃতিসৌধ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম মুসলিম ও তিরমিজি
  • নবীজিকে ভালোবাসার দাবী সমূহ
  • বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী (র:)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী (রহ.)
  • জৈন্তা অঞ্চলে হিফজুল কোরআন পরিক্রমা
  • কুরআন চর্চা অপরিহার্য  কেন 
  • একদিন নবীজির বাড়িতে
  • বেহেস্তের সিঁড়ি নামাজ
  • দেন মোহর নিয়ে যত কথা
  • তাফসিরুল কোরআন
  • মানব সভ্যতায় মহানবীর অবদান
  • মানব সভ্যতায় মুহাম্মদ (সা.) এর অবদান
  • দেনমোহর নিয়ে যতো কথা
  •   উম্মাহাতুল মুমিনীন
  • ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম
  • তাফসিরুল কোরআন
  • রাসূল (সা.) এর প্রতি মুহব্বত ও আহলে বাইত প্রসঙ্গ
  • মহানবীর প্রতি ভালোবাসা
  • Developed by: Sparkle IT