উপ সম্পাদকীয়

একটি বর্ণনাতীত ভাষ্য

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৯ ইং ০০:৫০:১৭ | সংবাদটি ১৭২ বার পঠিত

আমাদের দেশে রেলযাত্রা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্ববাহী। ইতিহাস সৃষ্টিতে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অবদান রেখেছে বর্ণনাতীতভাবে। সকল ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিবর্তনে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে বিশেষভাবে আমাদের বাংলাদেশে। এতদঅঞ্চল যখন ছিলো যুক্ত বাংলা বা আসাম এলাকার অধীন তখনো রেল ব্যবস্থা ছিলো প্রধানতম মাধ্যম। আমাদের সিলেট অঞ্চলটি ইংরেজ জামানায় আসাম রাজ্যটির অধিভুক্ত অঞ্চল হিসাবে পরিগনিত হতো। আমাদের সুপরিচিত সুরমা মেইল নামক ট্রেনটি তখন পরিচালিত হতো আসামের বদরপুর থেকে একেবারে গোয়ালন্দঘাট পর্যন্ত। কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাটিকে তখন ব্যবহার করা হতো সুবিধাটি নিশ্চিত করতে। কারণ হিসাবে বলা যায় বিপুল পরিমাণ পণ্যরাশি আর অযুত সংখ্যক যাত্রী পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতো সুরমা মেইল সহ আরো কয়েকটি ট্রেন।
ইদানিং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সেকশনটি সংস্কার এবং পুনরুজ্জীবনের কর্মযজ্ঞ চলছে বলে শুনতে পাই। অন্যদিকে সিলেট-আখাউড়া সেকশনটির অবস্থা হয়েছে যাচ্ছে তাই। বার বার লাইনচ্যুতি, দুর্ঘটনা এই সেকশনটিকে যেন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত করছে। ঢাকা চট্টগ্রাম সহ নানা জায়গায় সুরম্য রেলভবন, অট্টালিকা সাহেব সুবোদের জন্য বিরাটাকার আবাসগৃহ যেমন আমাদের মন কাড়ে তেমনি এই সেকশনের যাত্রী সাধারণ রেলভ্রমণের কথা মনে করে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে শংকিত হয়ে পড়েন। সাশ্রয়ী আর নিরাপদ রেলভ্রমণ যেন বৃহত্তর সিলেটবাসীর জন্য হয়ে উঠেছে এক নিদারুন ঠাট্টা স্বরূপ। বাঁশের ছিলকা ব্যবহার করে রেলপাত ঠিক রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নাটবল্টু উধাও হয়েছে বেশ আগে। অতি আবশ্যকীয় পাথরের অভাবে রেলপাতগুলি ধাবমান ট্রেন-এর চাকার নীচে আর্তনাদ করে চলেছে অবিরত, কেউ দেখার নেই, কেউ শোনার নেই। এ জাতীয় ভয়াবহ অবস্থা বাস্তবে বিরাজ করছে সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনে। বাংলাদেশ রেলওয়ে বড় গলায় দাবী করে থাকে এই সেকশনটি দেশের রেলখাতে প্রধানতম রাজস্ব অর্জনকারী খাত আবার এটা উল্লেখ করেন না যে এই সেকশনটি সবচাইতে অবহেলিত একটি রেলঅঞ্চল। অনেক দাবী-দাওয়া অনেক মানববন্ধন এর পরও রেল বিভাগের সদয় দৃষ্টি লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে সেকশনটি। লাইনচ্যুতি, অব্যাহত দুর্ঘটনা এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে কিন্তু কুম্ভকর্ণের ঘুমটি যে ভাঙ্গছে না। ইদানিং আবার যুক্ত রয়েছে রেল বিভাগের সবচাইতে নড়বড়ে প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী রেলবগিগুলির সমাহার ঘটানো হয়েছে এই সেকশনের ট্রেনগুলিতে। ফলশ্রুতিতে যা হবার তাইই হচ্ছে। চলতে চলতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আর না হয় পুরাতন প্রায় অচল রেলবগিগুলি উল্টে পড়ছে। আজকাল প্রাণ হাতে নিয়ে এই এলাকার মানুষজনদের ট্রেনযাত্রী হতে হচ্ছে যেটি কোনভাবেই কাম্য নয়। এখন বোধহয় সময় এসেছে দাবী জানাবার যেন এই সেকশনটিতে ট্রেন চলাচল আপাতত স্থগিত রাখা হোক যাত্রী সাধারণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের স্বার্থে। আজ সকলের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। বৃহত্তর সিলেটবাসী চেম্বার অব কমার্স নেতৃবৃন্দ এমনকি মন্ত্রীবর্গ পর্যন্ত এই এলাকার রেল যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপর্যস্ত অবস্থা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোন ফলোৎপাদক সাড়া পান নাই। হা হতোষ্মী। কথাছিল উভয়মুখী ব্রডগেজ লাইন বসবে। বলা হলো আঁকাবাকা ও উঁচু-নীচু এলাকার জন্য এটি কষ্টকর হবে। যুক্তি দেয়া হলো এমনতরো এলাকা বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশেও রয়েছে। পাহাড় টিলা কেটে না হয় এগুলির নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে রেল লাইন বসাবার জন্য। আবার শোনা গেলো লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পশুপাখীর নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কথা। আমার কলামে বললাম এই এলাকাটি নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হোক এবং এখানে উড়াল রেলপথ বসানো হলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কে শোনে কার কথা। বারবার বলা হচ্ছে সাশ্রয়ী আর জনপ্রিয় বাহন হিসাবে বাংলাদেশ রেল সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। এমনতরো অবস্থা হলে দেশের অলাভজনক খাতগুলির মধ্যে শীর্ষস্থানীয় একটি হিসাবে এই রেল ব্যবস্থাটির অবস্থান কেন! এটি সকলের প্রশ্ন। এতোটি রেলস্টেশন কেন বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্য একটি কলামে বলেছিলাম সিলেট অঞ্চলের বরমচাল স্টেশন এলাকা থেকে কৌনিকভাবে সরাসরি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া পর্যন্ত একটি রেললাইন বসানোর ব্যবস্থা করলে সময়, অর্থ আর বাণিজ্যিক স্বার্থ সবকিছুরই সাশ্রয় হতো এবং তখনই সাশ্রয়ী আর জনপ্রিয় বাহন হিসাবে বাংলাদেশ রেল ব্যবস্থাকে স্বাগত জানাতো এই এলাকার মানুষ। জানিনা আর কতো দুর্ভোগ রয়েছে এই সেকশনটির যাত্রী সাধারণের ললাট লিখন হিসাবে।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কটি নিয়ে মাদারীর খেল যেন শেষ হচ্ছে না। কোন সময় শোনা যায় সত্ত্বর ছয় লেন বা চার লেন এ রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে এই তথাকথিত মহাসড়কটি। আঁকাবাকা, বিপদসংকূল আর ভঙ্গুর অবস্থার এই আঞ্চলিক সড়কটিকে মহাসড়ক বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে এতোকাল। ইদানিং এলাকা, অঞ্চল এবং অর্থনীতি সবকিছু সম্পূরক অবস্থানে চলে আসায় এই মহাসড়কটি নিয়ে ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। আক্ষেপের সুরেও অনেকে বলেছেন এই বৃহত্তর এলাকাটিতে এতো হোমরা চোমরা সেই অতীতকাল থেকে ক্ষমতার দন্ড ব্যবহার করেও আপন এলাকার উন্নয়নে ব্রতী হলেন না কেন এটির রহস্য উন্মোচন করা প্রয়োজন। যাই হোক গা গরম করা সংবাদ হিসাবে ঘোষিত হলো অচিরেই চার লেন বিশিষ্ট একটি মহাসড়কে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক সড়কটি। প্রয়োজনীয় অর্থকড়ির আঞ্জামও করা হয়েছে। চিন্তা নাই কেল্লা ফতে। এখন আলামত দেখে বুঝা যায় কাজটি যাতে ঝুলে পড়ে সেই ব্যবস্থাটি করতে সচেষ্ট রয়েছে একটি মহল। সব ধরনের মাপজোক, জরিপ কর্ম আর প্রয়োজনের নিরিখে সবকিছু নির্ধারণ করার পরেই সব সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় এবং সেটি যথারীতি হয়েছেও। এখন শোনা যায় আবারও এই জাতীয় কর্মসমূহ সম্পাদিত হওয়ার পর কাজটি শুরু হবে অর্থাৎ গন্তব্য অনিশ্চিত।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি কোন পর্যায়ে আছে সেটি নিয়মিত ব্যবহারকারী যাত্রী সাধারণের কাছ থেকে অবহিত হওয়া বেহন্তর। আমার পরিবারের সদস্যবৃন্দ অহরহ সিলেট-ঢাকা আসা যাওয়া করছেন এই বিমানবন্দরটি দিয়ে এবং সেটি জরুরী প্রয়োজন পড়ে বলেই। আমি নিজেও এই পথের যাত্রী হই অবস্থার প্রেক্ষিতে। এই বিমানবন্দরটির হালহকিকত, ব্যবস্থাপনা আর নিরাপত্তার অবস্থা দর্শন করে এটিকে কোন পর্যায়ের বিমানবন্দর হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় ধন্ধে পড়ে যাই। এটির অবস্থা না ঘরকা, না ঘাটকা পর্যায়ের। এটিকে আন্তর্জাতিক বা আভ্যন্তরীন কোন মানের বিমানবন্দর হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মতামত আহবান করা উচিত বলে মনে করি। এমনিতে শোনা যায় বিরাট অংকের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রায় সোনায় মোড়ানো একটি বিমানবন্দর বোধ হয় আমরা পেতে যাচ্ছি কারণ আমরা তো সোনার ডিম পাড়া হাঁস জাতীয় কিছু একটা বিশেষণে আপ্যায়িত। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরটির রূপায়ন, বাস্তবায়ন আর পরিকল্পনা প্রণয়ন কোন ধরণের বা কি মাপের হবে সেটি এখনও ধোঁয়াশা ব্যতিত আর কিছুই নয়। বাস্তবতা বলছে এটি আভ্যন্তরীণ আর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এই দুটো অবস্থানের মাঝামাঝি কোন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে। অন্যদিকে টাউট, বাটপার, চোর-হ্যাচড় আর সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সেবা গ্রহণকারী রূপে আস্ফালন গৃহ প্রত্যাগত প্রবাসীদের মনে যেন এক ধরণের বিবমিষা সৃষ্টিতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করে থাকে। কোন ধরণের সহযোগীতা যেমন নাই তেমনি উটকো লোকদের বখশিস দাবী করা যেন এখানে একটি নিয়মিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা তো আরেকটি উপরি পাওনা।
পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে ভরাট হয়ে পড়া সুরমা নদীটি একেবারে অকার্যকর হয়ে পড়ায় এই অঞ্চলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়েছে বেশী। যদি এই নদীটি বড় আকারের খনন প্রক্রিয়ার অধীনে আনা যায় অবশ্যই জাতীয় অর্থনীতিতে এটি বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। আগের মতো পণ্যবাহী জলযান যেমন সুরমার বুকচিরে চলাচল করবে তেমনি ওয়াটার ট্যাক্সি বা ছোট আকারের লঞ্চের চলাচল বাড়বে। অধিক শক্তিশালী জলযান দূরদূরান্তরে যেমন ভ্রমণ পিয়াসীদের নিয়ে যেতে পারবে তেমনি পর্যটনের ক্ষেত্রে এটি আরেকটি মাত্রা যুক্ত করবে বলে আমার বিশ্বাস। আজকাল অধিক শক্তিসম্পন্ন দ্রুতগতির জলযান দূরপাল্লার সড়কযান সমূহের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। তৃতীয়মাত্রার যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসাবে রাজধানীকে যুক্ত করতে এই নৌপথটিও ব্যবহৃত হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসাবে। নদীপথে পণ্য পরিবহন যেমন সাশ্রয়ী তেমনি সড়কপথকে ঝঞ্ঝাট মুক্ত রাখতে হবে সহায়ক।
আমাদের সিলেট মহানগরী দেশের সবচাইতে ছোট আকারের একটি জনপদ। এখানেও যদি ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলা করতে গায়ে গা লাগিয়ে চলতে হয় তাহলে সেটি হবে অনভিপ্রেত। কাজিরবাজার সেতুমুখ থেকে রিকাবীবাজার পর্যন্ত যতোটুকু ফুটপাত আছে সেগুলি যেমন অপ্রশস্ত আর অপরিকল্পিত তেমনি বিপদসংকূলও বটে। অবিলম্বে পুরো নগরীর ফুটপাতগুলি প্রশস্ত, পথচারীবান্ধব এবং হকারমুক্ত করা হোক। নগরীর বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা দখলকারী অবৈধ ট্যাক্সিস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা হোক। রাস্তা প্রশস্তকরণ কর্মে নানা জায়গায় অবৈধ পক্ষপাত বা অর্থের বিনিময়ে ছাড় প্রদানের অভিযোগ শোনা যায়। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হোক। দুদককে ক্রিয়াশীল করা হোক এ ব্যাপারে। খেদমতে খালক নিস্ত।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়
  • ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য
  • বকুল ফুলের মালা
  • লিবিয়ায় তুরস্কের সেনা মোতায়েনের কারণ
  • প্রসঙ্গ ফসলের ন্যায্যমূল্য
  • প্রসঙ্গ : ভিক্ষাবৃত্তি
  • নৈতিক অবক্ষয় প্রতিকার
  • অসহায় প্রবীণদের দেখাশোনার দায়িত্ব কে নেবে?
  • আজকের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
  • একাডেমিক শিক্ষা বনাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
  • শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কী হবে?
  • বাংলাদেশের শীতকাল
  • মাটির উৎকর্ষ ও সংরক্ষণ সাধন সরকার
  • নারী নিপীড়ন প্রসঙ্গ
  • আপন শ্রম ও মেধা ভাগ্য নির্মাণের নিয়ামক
  • ফেসবুক ও আমাদের সন্তান
  • পুলিশ জনগণের বন্ধু
  • প্রাথমিক শিক্ষার এক দশক : পরিপ্রেক্ষিত
  • শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতা
  • বিপন্ন নদনদী ও খালবিল
  • Developed by: Sparkle IT