পাঁচ মিশালী

শীতকালীন সবজির পরিচর্যা

বিপ্রজিৎ কুমার দেব প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৯ ইং ০০:৫১:২৫ | সংবাদটি ২৯৫ বার পঠিত

ফসল হিসেবে সবজির ভুমিকা সবচেয়ে বেশী। কারণ সবজি আমাদের সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ সবল দেহের জন্য একজন পূর্ণ বয়ষ্ক লোকের ১৮০-২৫০ গ্রাম শাক সবজি খাওয়া দরকার। সবজি চাষ করতে অন্য ফসলের চেয়ে বেশী যতেœর প্রয়োজন হয়। সবজি চাষ করা যেমন সহজ তেমনি তার যতœ করাও প্রয়োজন। সবজি ফসলের পরিচর্যার উপর নির্ভর করে ফলনের পার্থক্য হয়ে থাকে। ভাল ফলন পেতে হলে সবজি চাষে সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। তা নাহলে সব পরিশ্রম ব্যর্থতায় পরিণত হবে। তাই সবজি চাষের সাথে পরিচর্যা অতোপ্রোতভাবে জরিত। শীতকালে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশী সবজি চাষ করা হয়ে থাকে। তখন প্রায় সবাই বাড়ির আঙ্গিনায় বা মাঠে কিছু না কিছু শাক সবজি চাষ করে থাকে। এ সময় ছেলে, মেয়ে, বুড়ো সবাই সবজি চাষে মনোযোগ দিয়ে থাকে। শীতকালে সবজি চাষ করা ও টাটকা শাক সবজি নিজ হাতে তুলে আনা মনের মাঝে আনন্দের এক শিহরণ জাগায়। শীতকালে সাধারণত আমরা শিম, আলু, টমেটো, বরবটি, বেগুন, মূলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, শসা, ক্রিড়া, লালশাক, লাইশাক, মরিচ, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি শাক সবজির চাষ করে থাকি। এসব সবজি চাষ করতে হলে কিছু পরিচর্যা করতে হয়। সবজি এমন এক ধরনের ফসল যাতে প্রতিদিন পরিচর্যার প্রয়োজন হয়ে থাকে, অন্যতায় ভাল ফলন আসে না। সবজি চাষের ক্ষেত্রে বিশেষ যে সব পরিচর্যা করতে হয় তা হল পানি সেচ, নিড়ানী দেয়া, আগাছা দমন, মালচিং করা, সার প্রয়োগ, গোঁড়ায় মাটি তোলা, বাউনি দেয়া, পরাগায়ন করা, রোগ ও পোকামাকড় দমন ।
পানি সেচ :- শীতকালে সবজি চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পানি সেচ। পানি সেচ ব্যাবস্থা ভাল না হলে সবজি চাষ করা সম্ভব নয়। তার জন্য যথেষ্ট পানি সেচের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। শীতকালে সব সবজিই পানির উপর নির্ভরশীল। কারণ এসময় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হ্রাস পায়। পানি সেচের জন্য নদী, খাল,ক্ষুদ্র জলাশয়, নলকুপ, পাম্প ইত্যাদির উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে। সবজির জাত ও মাটির অবস্থা বোঝে পানি সেচ প্রদান করতে হয়। কারণ কোন কোন সবজি গাছে বেশী পরিমাণ পানির প্রয়োজন আবার কোন কোন গাছে কম পরিমাণ পানির দরকার হয়ে থাকে। সেচ প্রধান পদ্ধতির উপর নির্ভর করে পানির পরিমাণ কম বেশী হয়ে থাকে। যেমন-আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি ইত্যাদি ফসলে নালা করে সেচ দিতে হয় এতে পানির পরিমাণ বেশী লাগে। আবার শীম, টমেটো, শাক, বেগুন ইত্যাদি ফসলে ঝাঝরি ও মাদায় বা সরাসরি শিকড়ে পানি সেচ দেয়া যায় এতে পানির পরিমাণ কম লাগে।
নিড়ানী দেয়া বা মাটি আলগা করা :- সবজি চাষে পানি সেচের পর গাছের গোঁড়ায় মাটি শক্ত হয়ে গেলে নিড়ানী দিতে হয়। এতে মাটি আলগা হয়, বাতাস চলাচল করে এবং শিকড় বিস্তার ভাল হয়ে থাকে। মাটি নিড়ানোর জন্য আচড়া, নিড়ানী বা খুরপি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আগাছা দমন :- সবজি ফসলে আগাছা দমন করে রাখতে হয়। কারণ আগাছা সবজি ফসলের সাথে পানি, আলো ও খাদ্য উপাদান নিয়ে প্রতিযোগীতা করে থাকে। এতে ভাল ফলন পাওয়া যায় না। আগাছা সব ধরনের ফসলের প্রধান শত্রু। কোন ভাবেই সবজি ফসলে আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না। আগাছা দমনের জন্য আচড়া, বিঁদা, খন্তা ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
মালচিং করা :- সবজি ফসলে মালচিং করে পানি সেচের পরিমাণ কমানো যায়। এতে একদিকে যেমন পানি কম লাগে অন্যদিকে আগাছা দমন হয়ে থাকে। মালচিং হচ্ছে খড়কুটা,কছুরিপানা, পচনশীল দ্রব্য দিয়ে মাটি ঢেকে দেয়া। যাতে পানি বাস্পায়িত কম হয় এবং আগাছা না জন্মাতে পারে। মালচিং দ্রব্যের মধ্যে পচনশীল দ্রব্য (খড়কুটা,কছুরিপানা ইত্যাদি) দিয়ে করা ভাল। কারণ এক সাথে মালচিং হয় আবার পচে জৈব দ্রব্য মাটিতে যোগ হয়ে থাকে। যা মাটির উরর্বরতা বৃদ্ধি ও পরিবেশের জন্য ভাল।
সার প্রয়োগ :- সবজি চাষের জন্য প্রচুর পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া সুষম সার ব্যবহার করা খুবই প্রয়োজন। শীতকালীন সবজির বেশীর ভাগ স্বল্পমেয়দী যার কারণে শেষ চাষের সময় সব ধরনের সার ব্যবহার করা দরকার। তবে কিছু দীর্ঘমেয়াদী সবজির ক্ষেত্রে ২-৩ বারে প্রয়োগ করতে হয়। তার পরও যদি কোন কারণে কোন উপাদানের ঘাটতি দেখাদেয় তাহলে নির্দিষ্ট ঘাটতির কারণ জেনে ঐ উপাদানের নির্দিষ্ট সার ব্যবহার করতে হবে। এর প্রয়োগ পদ্ধতি হতে পারে মূলপ্রয়োগ বা ফলিয়ার স্প্রে। গাছের বয়স ও ফসল ভেদে সারের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ করা উচিত।
গোঁড়ায় মাটি তোলা (আর্থিং আপ) :- সবজির কোন কোন ফসল রয়েছে যাদের বড় হওয়ার সাথে সাথে গোড়ায় মাটি তোলে দিতে হয়। যেমন আলু, গাজর, মূলা, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি ইত্যাদি ফসলের গোড়ায় মাটি তোলে দিতে হয়। গোড়ায় মাটি তোলে দেয়ার ফলে এসব ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়।
বাউনি দেয়া :- লতা জাতীয় সবজি ফসলে সঠিক বাউনি দেয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ লতানো সবজি বাউনির উপর ফলন অনেকাংশে নির্ভর করে থাকে। বাউনি পছন্দকারী সবজি মধ্যে রয়েছে শিম, শসা, করলা, লাউ ইত্যাদি। বাউনি সাধারণত বাঁশের ঝাঁকা বা চটি ও দড়ি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে।
পরাগায়ন :- যেসব সবজি ফসল পরাগায়নের মাধ্যমে ফল উৎপাদন করে থাকে সে সব ফসলের জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পারাগায়নের ব্যবস্থা করতে হয়। প্রাকৃতিক পরাগায়নের জন্য প্রজাপতি, বোলতা, মৌমাছি এসব পতঙ্গ আসার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য সকাল বেলা পাখির পালকের সাহায্য রোগজীবাণু মুক্ত উপায়ে হাত দিয়ে করা যেতে পারে। পরাগায়ন যদি সঠিকভাবে না হয় তাহলে ফসল হবে না। লাউ ও কুমড়া জাতীয় ফসলের পরাগায়নের মাধ্যেমে ফলন বেশী করা সম্ভব।
রোগ ও পোকামাকড় দমন :- সবজি ফসলে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। রোগের মধ্যে ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া জনিত রোগ হয়ে থাকে। সবজি ফসলে যে সব রোগ বেশী দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে ছত্রাক জনিত গোঁড়া পচা, ঢলেপড়া, এন্ত্রাকনোজ, ফল পচা ইত্যাদি। ব্যাক্টেরিয়া জনিত গোঁড়া পচা, ঢলে পড়া ইত্যাদি। ভাইরাস জনিত মোজাইক রোগ। তাছাড়া আরো বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা যায়। এসব রোগ দমনের জন্য নির্ধারিত কারণ নির্ণয় করে দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। সবজি ফসলে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধরনের পোকা দেখা যায়। যে সব পোকা বেশী দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে জাব পোকা, মাকড়সা, পাতা খেকো লেদাপোকা, মাছি পোকা, শিকড়ের কাটুই পোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকা ইত্যাদি। যত সম্ভব পোকা মাকড় দমনের জন্য বিষ ব্যবহার না করা ভাল এতে আমরা বিষমুক্ত সবজি পাবো। দমনের জন্য জৈবদমন পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আর যদি রাসায়নিক ঔষধ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাহলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে পরামর্শ করে সঠিক ঔষধ সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করা উত্তম।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT