পাঁচ মিশালী

পাহাড় জলের দেশে

ড. মোহাম্মদ শামীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৯ ইং ০১:২২:০৮ | সংবাদটি ৩৪০ বার পঠিত

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত CEDP এর আওতায় Post-graduate Certificate in Education কোর্সে Cohort-5- এর একজন সদস্য হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এক-দুই বছর মেয়াদী কোর্সটি University of Nottingham Malaysia (UNMC) ক্যাম্পাসে সম্পন্ন করতে হবে। দুই পর্যায়ে UNMC- তে ছয় সপ্তাহ ক্লাস করতে হবে, বাদবাকি কাজ অনলাইনে সম্পন্ন হবে। বিষয়টি দেখভাল করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও CEDP (BD-UNMC) কর্তৃপক্ষ। ভ্রমণ ভালবাসেনা এমন গাড়ল কোথাও নিশ্চয় পাওয়া যাবে না। আমার আনন্দ তখন কে দেখে; খুশিতে বাগবাগ অবস্থা। মালয়েশিয়ার মতো একটি অনিন্দসুন্দর দেশে ইউরোপের একটি ভাল ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাওয়ার সুযোগে যে কেউ-ই উল্লসিত হবে। এক জায়গায় থাকতে থাকতে মনে মনে যেন বিষিয়ে উঠেছিলাম। দেশের বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্য কোনো একটি সুযোগ খোঁজছিলাম এবং সেটি পড়তে গেলে খুবই ভাল। সে সুযোগ এখন আসায় তর যেন আর সইছিল না। যাই হোক সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ আমাদের মহাযাত্রার তারিখ ঘোষিত হল। সকালে NAEM-এ ব্রিফিং সেশন হল, তাতে দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণ আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে টানা কয়েক ঘন্টা বক্তৃতা করলেন, আমরাও বাধ্য শিশুর মতো শুনে গেলাম। সবাইকে study allowence এর চেক ও বিমানের টিকেট দেওয়া হল। Cohort 5- এর সদস্য প্রায় একশত জন, লাট না হলেও বহর তো বটেই।
বিমান এয়ার এশিয়া (AL), ফ্লাইট ঐদিন রাত ১২.৩০ মি.। AL বিমানের বাইরের সাজগোজ দেখতে বেশ, যেন লালরঙা বেলবেট পড়ে, আলতা-লিপিস্টিক গায়ে মেখে নববধূ লাজবদনে দাঁড়িয়ে আছে। বিমান সময়মতোই ঘোৎ ঘোৎ শব্দে রানওয়েতে দৌড় শুরু করল। সাড়ে তিন-চার ঘন্টার নাতিদীর্ঘ ভ্রমণ হলেও বিমানের আটসাট আসন ব্যবস্থার কারণে সেটি সুখকর হল না। না পা ছড়ানো যায়, না মাথা হেলানো যায়। বিমান কোম্পানী কেন এমন ছিঁচকে চিন্তা করল তা বুঝলাম না। কিছুক্ষণ পর বিমানবালা সহাস্যবদনে রাতের খাবার পরিবেশন করলেন। পেটে বেজায় ক্ষিদে ছিল তাই সকলেই এদিক সেদিক না তাকিয়ে অল্প খাবার নিমিষেই শেষ করলাম। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা ওড়ার পর বিমান কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (KL-2) অবতরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
পাইলটের ঘোষণা শুনে জানালায় উঁকিবাকি শুরু হল, মালয়েশিয়া দেখার জন্য। আমি প্রায় সারাক্ষণই জানালায় উঁকিবাকি করে সময় পার করেছি। বিমান যখন অবতরণ করল তখন স্থানীয় সময় সাড়ে পাঁচটা, ঢাকায় তখন রাত সাড়ে তিনটা। সরকারি পাসপোর্ট থাকায় আমাদের ভিসা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ইমিগ্রেশনের কাজ খুব দ্রুতই শেষ হল। অনেক কাউন্টার ও অফিসার থাকায় কাজ দ্রুতই হল। অবশ্য প্রায় একশজনের ইমিগ্রেশন শেষ হতে দেড়-দুই ঘন্টা তো লাগলই। ইতোমধ্যে UNMC থেকে তিনজন মহিলা হোস্ট আমাদেরকে বেশ অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসে উপস্থিত হলেন। ইমিগ্রেশন শেষ হলে আমরা KL থেকে Keluar অর্থাৎ Exit করা শুরু করলাম। কিন্তু UNMC থেকে আমাদেরকে নেওয়ার বাস তখনও এসে পৌঁছায় নি। আমাদেরকে খালি পেটে আরো প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল। অবশেষে UNMC-এর লগোখচিত উন্নতমানের তিনখানা নাদুসনুদুস এসি বাস এসে পৌঁছালো। ইতোমধ্যে ঘড়ি প্রায় দশটা বেজেছে।
তেরটি রাজ্য এবং তিনটি ঐক্যবদ্ধ প্রদেশ নিয়ে গঠিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দেশ মালয়েশিয়া। এটি একদিকে পাহাড়ের দেশ, আবার সাগরেরও দেশ; গোটা দেশই পাহাড়-টিলার ওপর, আর চারদিকে সাগর বেষ্টন করে আছে। দক্ষিণ চীন সাগর দ্বারা দেশটি দুই ভাগে বিভক্ত, মালয়েশিয়া উপদ্বীপ এবং পূর্ব মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার স্থল সীমান্তে রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, এবং ব্রুনাই; সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন এর সাথে (Malaysia Wikipedia)। গোটা দেশ পাম বাগানে ভরপুর, পাম এদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। যেদিকেই চোখ মেলা হোক শুধু সবুজ আর সবুজ। আয়তন ৩,২৯,৮৪৫ বর্গকিমি, জনসংখ্যা ৩২, ৭৭২, ১০০ (২০১৯)। দাপ্তরিকভাবে মালয়েশিয়া সেক্যুলার রাষ্ট্র হলেও ইসলাম এর আনুষ্ঠানিক ধর্ম। মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩% ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পাশাপাশি ১৯.৮% বৌদ্ধ, ৯.২% খ্রিষ্টান, ৬.৩% হিন্দু এবং বাকিরা অন্যান্য ধর্ম পালন করে থাকে। সকল ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে থাকেন। জনসংখ্যার প্রায় ৬৯% মালয়া যারা ভূমিপুত্র ও আদিবাসী হিসেবে পরিচিত, এরাই মূল মালয়েশিয়ান। বাদবাকি প্রায় ২৩ % চায়নিজ মালয়েশিয়ান, ৭% ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য। মালয়েশিয়ানদের নিজস্ব বর্ণমালা নেই। বিভিন্ন দেশের শব্দকে জোড়াতালি দিয়ে ত-ট-ড উচ্চারণে কথা বলে। ইংরেজরা তাদের শাসন-শোষণ করেছে, এজন্য বোধহয় মালয়েশিয়ানরা ইংরেজির ওপর খেপেছে বেশি। মালয়ায় লেখা হয়-Pharmacy-কে Farmasi, May-কে Mei, June-কে Jun, August-কে Ogos, July- কে Julai, October-কে Oktober, December-কে Disember ইত্যাদি।   
KL-2 থেকে গাড়ি আমাদেরকে নিয়ে UNMC-এর পথে যাত্রা শুরু করল। গাড়ি KL-2 এর ওভারব্রিজে উঠলে মালয়েশিয়ার রূপ-গুণ আস্তে আস্তে আমাদের চোখে পড়তে শুরু করল। সত্যি বলছি, প্রশস্ত সুন্দর রাস্তা আর দুইপাশের পামবাগানের সবুজ দৃশ্য যেন সহসাই সব ক্লান্তি, শ্রান্তি দূর করে দিল। আমাদের UNMC মফস্বল শহর সিমেনিতে, KL থেকে প্রায় ষাট কিমি.। UNMC -এর হোস্টেলে যখন পৌঁছালাম তখন সকাল প্রায় এগারটা। আনুষ্ঠানিকতা সেড়ে বরাদ্দকৃত কক্ষে গিয়ে কোনোমতে নাস্তা করে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। এদিন আমাদের বিশ্রাম তাই আর বের হলাম না। UNMC-এর হোস্টেলগুলো দেখার মতো। আমার রুম বরাদ্দ হল রাওয়া হলে। প্রত্যেকের জন্য একটি করে রুম। রুমে এসি, ফিজ, এট্যাস্ট বাথ, গ্রিজার সবই আছে। গোটা হোস্টেল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, কোথাও একটু ময়লা বা দুর্গন্ধ নেই। রাতে কোনো গেইটই বন্ধ করা হয় না, নিরাপত্তা শতভাগ। সবগুলো হোস্টেলই পাশাপাশি অবস্থিত। দূর থেকে মনে হবে তেমন বেশি আবাসনের ব্যবস্থা নেই, কিন্তু ভিতরে ঢুকলে অবাক হতে হয়। এতো সুন্দর পরিকল্পনা করে হোস্টেলগুলো বানানো হয়েছে যে একেকটিতে অন্তত সাড়ে তিন-চারশ রুম রয়েছে। প্রত্যেক রুমেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা আছে। প্রতিদিন সকাল সকাল পরিচ্ছন্নকর্মীরা হোস্টেল ও তার আশপাশ খুব যতœ করে পরিষ্কার করে যায়, গোটা ক্যাম্পাসেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে। পাশেই আছে হোস্টেল ব্যবস্থাপনা অফিস বিল্ডিং-এতে আছে ব্যবস্থাপনা কক্ষ, কাপড় ধোয়ার মেশিন কক্ষ, বিশ্রাম কক্ষ- বিশ্রাম কাম নীরব আড্ডা কক্ষও বলা যায়, ইত্যাদি। অভিযোগ দিলে যথারীতি তা সম্পন্ন করা হয়, কোনো এদিক সেদিক হয় না। হোস্টেলের আবাসন ব্যবস্থা যদিও single basis, তবে একই হোস্টেলে ছেলেরাও থাকে, মেয়েরাও থাকে।
পরদিন পনেরো সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হল, সকাল নয়টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। অতি সংক্ষেপে পরিচিতি পর্বের পর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিল্ডিং ও এদের সেবাসমূহ আমাদেরকে ঘুরিয়ে দেখানো হল। UNMC-এর ক্যাম্পাস অত্যস্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, কোথাও ময়লা জমতে দেওয়া হয় না। গোটা ক্যাম্পাসটাই পাহাড়ের ওপর, পাহাড়-টিলা কেটে কেটে পরিকল্পনামতো সব করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় যখন তখন বৃষ্টি নামে, এজন্য ক্যাম্পাসে শেড টেনে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং বৃষ্টির দোহাই দিয়ে দেরিতে অফিসে বা ক্লাসে যাওয়ার রাস্তা আপনার জন্য বন্ধ। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পিয়ন-টিয়ন দেখিনি। প্রত্যেকে যার যার কাজ আঞ্জাম দেয়, সিস্টেম সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট সার্ভিস সেন্টার তো আছেই। কোনো শিক্ষককে ক্লাসে দেরিতে আসতে দেখিনি। শ্রেণিকক্ষগুলো অত্যন্ত পরিপাটি যা অত্যন্ত যতœ করে তৈরি করা হয়েছে। শতভাগ পরিচ্ছন্ন, আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ। Professional Course, Training-এর শ্রেণিকক্ষের চারপাশের গোটা দেয়ালটাই হোয়াইটবোর্ড করে তৈরি করা হয়েছে যেন প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায়। প্রত্যেক ফ্লোরে পর্যাপ্ত ওয়াশরুম রয়েছে যা সর্বদাই আপনি তকতকে ঝকঝকে পাবেন। আলাদা করে একটি ওয়াশরুম রাখা হয়েছে, ওপরে লেখা রয়েছে- Only for Disable Person। সুতরাং সেদিকে যাওয়া মানা, ঘুণাক্ষরে ওদিক কেউ মাড়ায়ও না, আমাদের মতো নয় যে তারপরও বেয়াড়ার মতো ঢুকে যাবে। উঁকি দিয়ে দেখলাম তাতে ডিসএবলদের দিকে শতভাগ খেয়াল রেখে বানানো হয়েছে। ওয়ামরুমের ভিতরেও প্রয়োজনমতো প্রযুক্তির ছায়া পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে স্থানে স্থানে রিল্যাক্সের জন্য মোলায়েম আসন পাতা আছে, আছে কড়িডোরের এমাথায় সেমাথায় ফাস্টফুড ও চা-কফির সুন্দর ব্যবস্থা। তবে মাগনা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, রিংগিট পে করে নিয়ে ক্লাসের ফাঁকে আরামছে পান করতে পারেন। এক রিংগিট দিয়ে আমাদের চারকাপের সমান কফি আপনি খেতে পারবেন। নানা রঙের কফি। লাইট কফি, কোল্ড কফি, হট কফি, গ্রিন কফি, ব্ল্যাক কফি আপনি পানির দরে টেস্ট করতে পারেন। তবে আমার মতো আনাড়িপনা করে কোল্ড কফির বাটন চাপলে এক রিংগিট জলে যাবে। মালয়েশিয়ায় সবকিছুই এসিময়, গাড়ি, বাড়ি, দোকানপাট, অফিস, শ্রেণিকক্ষ সবকিছুই এসি। ফলে নানা স্বাধের কোল্ড ড্রিঙ্কস আর টেস্ট করার সুযোগ হল না। একুশ দিনের মধ্যে কখনও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি, শুনেছি বিগত পাঁচ বছরে নাকি কখনও যায় নি, অবশ্য বিশেষ প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা।
রোদ-বৃষ্টি-মেঘলা-এই নিয়ে মালয়েশিয়া। বৃষ্টি নামে যখন তখন। এই রোদ, এই বৃষ্টি, আবার আচমকাই ঘোমটা টেনে মুখ ভার করে আকাশ মেঘলা ও কালো হয়ে যায়। সারা বছর তাপমাত্রা গড়ে ৩০ ডিগ্রি থাকে, রাতে সেটি ২০-২২ ডিগ্রি থাকে। অনেকে বলেন, এক ঋতুর দেশ, তবে গ্রীষ্ম-বর্ষা মিলেই মালয়েশিয়া। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দিনরাত প্রায় সমান, সাড়ে সাতটায় সূর্য ওটে, প্রায় একই সময় অস্ত যায়। একদিন বিকেলে অন্ধকার দেখে মাগরিব মনে করে আসরের ওয়াক্তে মাগরিবের নামাজ পড়েছি। কিন্তু সূর্য অস্ত যাচ্ছে না দেখে সন্দেহ হল। সহপাঠী অধ্যাপক সফিককে ফোন দিলাম, সে তখন কুয়ালালামপুর মালয়া ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। সে বলল, সূর্য সাড়ে সাতটায় অস্ত যাবে, তুমি আসরের ওয়াক্তে মাগরিবের নামাজ পড়েছ! নতুন আদমিদের জন্য এধরনের ঘটনা স্বাভাবিক। তখন ইন্দোনেশিয়ায় আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের কারণে অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের আকাশ এমনিতেই ধোয়াচ্ছন্ন ছিল।
সবুজ শ্যামল শান্ত শহর সিমেনি। মফস্বল শহর বটে, তবে নাগরিক সুবিধা সবই আছে। শুধু এতেই বুঝবেন- সিমেনির পাড়ার রাস্তাগুলোও দুই লেনের, যেন আমাদের হাইওয়ে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর অত্যন্ত পরিপাটি। মালয়েশিয়ায় বাড়িঘর একই এলাকায় একই ধাচের, সিমেনিতেও। প্রত্যেক বাড়ির সামনে দুই-একটা গাড়ি আছে। বিকাল পাঁচটায় ক্লাস শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে করে আশেপাশে ঘুরতে বের হলাম, প্রথম দিন এই সিমেনির টেসকো মার্কেটে, টেসকো নামের মার্কেট বিভিন্ন স্থানেই আছে। মফস্বল শহরের মার্কেট হলেও তাতে আপনি গোষ্ঠীসুদ্ধ সবই পাবেন। এদিন গোটাকয় ঘন্টা শুধু ঘোরলাম, কিছুই কিনলাম না, কারণ পরে তো কিনা যাবে। মাগরিবের ওয়াক্ত হলে সিমেনির ইসলামিক সেন্টারে গেলাম। এখানকার সব মসজিদে খাবারের ব্যবস্থা থাকে, একেবারে হালকা নাস্তা থেকে, জুমাবারে পেটভর্তি মুরগি পোলাও পর্যন্ত। দুই জুমাবারে সিমেনির পাড়ার মসজিদে ফলের জুস, কলা, মুরগি-ভাত, সুটকি, পানি পেয়েছি। দুপুরের খাবারটা আপনি বিনা পয়সায় সহজেই সেরে দিতে পারেন। খাবার গ্রহণে কোনো প্রতিযোগিতা, ধাক্কাধাক্কি, ফাস্ট হওয়ার পায়তারা কিংবা সুযোগমতো দশজনেরটা একাই সাবাড় করা বা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কেউ করে না। আমরাও শান্ত-সুবোধ থাকার চেষ্টা করেছি, তা না হলে দেশের বদনাম হবে। তিন শুক্রবারের মধ্যে একটি পড়েছি এই ইসলামিক সেন্টারে, দুটি সিমেনির পাড়ার মসজিদে। এখানে শাফেঈ মাযহাব অনুসরণ করা হয়। এ নিয়ে এরা কাদা ছোড়াছুড়ি করে না।
বাসায় ফেরার জন্য টেসকোর এক প্রান্তে বসে বাসের অপেক্ষা করছিলাম। এসময় দুই বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হল, বাড়ি উত্তরবঙ্গে। যেচেই আলাপ জমালাম, তারাও খুব আগ্রহ দেখাল। শত হোক দেশি তো! বলল, দীর্ঘদিন থেকে এখানে আছে, সিমেনির টেসকো মার্কেটে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। একজন অবিবাহিত। জিজ্ঞেস করলাম, স্থায়ী হচ্ছ না কেন? বলল, এখানে বিয়ে না করলে স্থায়ী হওয়া যায় না। কুমারকে বললাম, এতে অসুবিধা কি, তোমার তো রাস্তা পরিষ্কার? অকুমারের বেলা না হয় একটু ঝামেলা আছে বুঝলাম। আর দুই দেশে দুই পরিবার থাকাও তো অসম্ভব নয়, এতে কী আর মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যাবে? যাবে যাবে, আলবৎ যাবে, বাড়িতে কিয়ামত ঘটে যাবে। দুই বিয়ে বরদাশত্ করা হয় না, অনিবার্য প্রয়োজন হলেও। কুমার বলল, বিয়ে দিতে এরা এখন আর বিশ্বাস করে না। কেন? বলল, আগে অনেকে এই সুযোগ নিয়ে পরে বউ রেখে কেটে পরেছে। এখন বিয়ে করলে এখানকার সহায়-সম্বল সব বউয়ের দখলে থাকতে হবে। এখন বিয়ের পর ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে কি করব? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার জানা ছিল না। ওদিকে আমার টঘগঈ-এর নাদুসনুদুস গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে, গোটা একুশ দিন যোগাযোগে যারা প্রধান ভরসা ছিল। তাদেরকে শুভ কামনা করে চলে আসতে হল।
মালয়েশিয়ায় গাড়ি সস্তা, বিশ-পঁচিশ হাজার রিংগিটে সুন্দর গাড়ি পাওয়া যায়। ফলে সকলেরই গাড়ি আছে। ওদের নীতি হল, সবাই সুখী হবে, সবাই ভিআইপি, নয়তো কেউই নয়। ওদের ট্রেনে সবার জন্য এক ক্লাস, ফাস্ট-থার্ড বলে কিছু নেই। এর ফলে মানুষে মানুষে বিভেদ-রেষারেষির পথ হ্রাস পায়, কেউ নিজেকে অভাগা, অন্যকে সবভাগা মনে করার সুযোগ কমে আসে। এমন না, যেমন অনেক দেশে আছে, আমরা ক্ষমতাসীনরা গাড়ি-বাড়ি সব ভোগ করব, বাচ্চাদের বিদেশে পড়াব, অসুখ হলেই বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাব- বাকি তোমরা পারবা না। কেউ বারোমাস মুরগি-পোলাও খায়, অনুন্নত দেশে থেকে উন্নত দেশের মতো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। আর অন্যরা (সিংহভাগ) শুধু বেগার খেটে মরে, কোনো মতে বেঁচে থাকে। একই যোগ্যতা নিয়ে সমমর্যাদার চাকরিতে ঢুকে কেউ তরতর করে গ্রেড পেয়ে ফার্স্ট গ্রেডে যায়, কারো বারো বছরেও গ্রেড পরিবর্তন হয় না, সারা জীবন একই গ্রেডে ঘুরে মরে; একজন নিত্য পাজারো হাকিয়ে বেড়ায় আর অন্যরা রিক্সাও পায় না। নীতি নির্ধারণী পদে থাকার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও কুটকৌশলে একই মর্যাদার, বরং অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাশীল হওয়া সত্ত্বেও অন্যদেরকে দাবিয়ে রাখার ষোলআনা চেষ্টা করা হয়। দেখা যায়, অনেক অনেক শিক্ষিত, সৎ ও যোগ্য হয়ে, সর্বোচ্চ মর্যাদার চাকরি করেও, ধান্ধাবাজি না জানার কারণে কিছুই পায় না, মনে হয় যেন পেটেভাতে খাটছে। কিন্তু ধান্ধাবাজির জোরে অযোগ্যরা তরতর উন্নতি বাগাতে থাকে। বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী তোষণ, বাকিদের মরণ। অন্যদিকে পিয়ন হওয়ারও যোগ্যতা নেই, সততার বালাই নেই, অথচ রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক। এসব শুধু কিছু দেশেই সম্ভব। এ অবস্থায় মানুষ সুশিক্ষিত ও সজ্জন হয়ে কী কারণে বিপদ ডেকে আনবে? কখনও বাচ্চারা তাদের মাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা এত শিক্ষিত হয়ে, বিসিএস ক্যাডার হয়েও বাড়ি-গাড়ি নাই কেন? আর বাড়িওয়ালার তেমন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কোটি টাকার পাজারো হাকিয়ে বেড়ায়? নিজের বাড়ি-গাড়ি থাকা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অনিবার্য ন্যূনতম প্রয়োজন। চোখের সম্মুখে প্রয়োজন পূরণের এই যে অক্ষমতা ও দুর্ভোগ হজম, বাস্তব অস্বাভাবিক চিত্র-এদেরকে এর কী ব্যাখ্যা আমি দেব? সমাজতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে জানি, যে সমাজে এতো আন্তঃবৈষম্য-সেটি কোনো সুস্থ সমাজ নয়; এটি সমাজে মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, অসন্তোষ, হতাশা ও অপরাধের জন্ম দেয় এবং পরিশেষে উন্নয়নকে বানচাল করে দেয়। (অসমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT