পাঁচ মিশালী

প্রাথমিক স্তরে কর্মকেন্দ্রিক শিখন

তানজিলা আফরোজ তামান্না প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৯ ইং ০১:৩৫:৪৮ | সংবাদটি ৫৭১ বার পঠিত
Image

প্রাথমিক শিক্ষায় সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আর এর সফল বাস্তবায়ন হয় একজন শিক্ষকের শ্রেণিপাঠদানের মধ্য দিয়ে। কাজেই একটি কার্যকর পাঠদান কর্মসূচী পরিচালনায় শিক্ষকের ক্যারিশম্যাটিক ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি শিখনে শিশুর পারষ্পরিক নির্ভরশীলতার সক্রিয় ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর ঠিক এখানটাতেই কর্মকেন্দ্রিক শিখনের বিষয়টি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
এখন আমরা দেখব শিখন মূলত কী? শিখন মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণভাবে শিখন হল ব্যক্তির নতুন কোন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যার মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণে তুলনামূলক স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে। অন্যকথায় অভিজ্ঞতার ফলে আমাদের আচরণে যে পরিবর্তনের ছাপ লাগে তাই শিখন। অনুশীলন, দৈহিক ও মানসিক পরিপক্কতা, প্রেষণা ও বল বৃদ্ধি শিখনের প্রয়োজনীয় শর্ত। এছাড়াও পর্যবেক্ষণ মনোযোগ, আগ্রহ ও অনুরাগ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ, প্রতিযোগীতামূলক মনোভাব ও ফল লাভে জ্ঞান শিখনে অপরিহার্য বিষয়।
এক কথায় নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য প্রাণির আচরণের মাধ্যমে যে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটায় তাকে শিখন (Learning) বলা হয়। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের ফলে আচরণের যে, অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তন সাধিত হয় তাকে শিখন বলে। আর শিশুর শিখন স্থায়ীকরণে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা (Activity Based Learning) হল এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী তাদের শেখার প্রক্রিয়াটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে। অর্থাৎ সে নিজে কাজ করার মাধ্যমে শিখবে। যেমন-ঞঁনব বিষষ শব্দটি শেখার ক্ষেত্রে একটি নলকূপে “Tube well ” শব্দটি একটি কার্ডে লিখে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। শিক্ষার্থীরা দলে দলে এসে নলকূপে ঝুলানো “Tube well ” শব্দটি দেখে খাতায় লিখে নিয়ে যাবে এবং শিখবে। এভাবে হাতে কলমে শিখার পদ্ধতিই হলো ABL। এটি শিখনের ক্ষেত্রে একটি শিশু বান্ধব প্রক্রিয়া।
কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার শুরু ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি সময়ে একজন বৃটিশ নাগরিক ডেবিড হার্সবার্গ ভারতে এসে স্থির হওয়ার সিন্ধান্ত নেন। তিনি ছিলেন একজন অভিনব চিন্তাবিদ এবং ক্যারিশম্যাটিক নেতা। ১৯৪৪ তিনি “নীলবাগ” স্কুল খোলেন। নীলবাগ হার্সবার্গের একটি উদ্ভাবনী ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এবং সুপরিকল্পিত শিক্ষামূলক উপকরণ শেখানোর সৃজনশীল পদ্ধতির জন্য পরিচিত ছিল। তার স্ত্রী ডোরিন ও পুত্র নিকোলাসের সাথে হার্সবার্গ একটি পাঠ্যক্রম গড়ে তুলেছিলেন। যার মধ্যে সংগীত, সেলাই, রাজমিস্ত্রী, উদ্যনের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সাধারণ বিষয় ইংরেজি, গণিত, সংস্কৃত এবং তেলেগু অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই শিক্ষা সামগ্রীগুলো স্কেচ- অঙ্কন এবং মাঝে মাঝে হাস্যরসের সাথে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে হার্সবার্গ নীলবাগে একটি দুর্দান্ত গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য যোগ্য ছিল।
Activity Based Learning-ABL পদ্ধতির মূল বৈশিষ্টটি হল এটি শিশুর শিখনে শিশুবান্ধব সহায়তা ব্যবহার করে এবং একটি শিশুকে তার প্রবণতা এবং দক্ষতা অনুযায়ী অধ্যয়ন করতে দেয়। কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা তথা ABL শিশু কেন্দ্রিক, শিশু বান্ধব শিক্ষার এক মডেল হিসাবে কাজ করে।
এ পদ্ধতিতে মূল ফোকাস থাকে শিক্ষার্থীর উপর। একটি গান, ছবি আঁকা, শব্দ শেখাতে ভূমিকা রাখতে পারে । আবার গাণিতিক সমস্যা সমাধানে, বাক্য গঠনে এমনকি বিজ্ঞানেও কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে আমাদের প্রাথমিক স্তরের বইগুলোতে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- English For Today, Class Five- - বইতে Birds on  strings পাঠটি পুরোটাই কর্মকেন্দ্রিক। এখানে শিক্ষার্থীদের পাখি বানিয়ে হ্যাংগারে ঝুলানোর পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। বাস্তবে যখন শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে করে তখন তারা একই সাথে যেমন মজা করে তেমনি লেসনটিও ভালভাবে আয়ত্ত করে। এরকম আরোও কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে-চতুর্থ শ্রেণির বিজ্ঞানে প্লাস্টিকের বোতলে মেঘ তৈরি (পৃষ্ঠা-৭২), কাগজের ঠোঙা তৈরি, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে কর্ম অনুশীলন নামে অনুশীলনীতে বেশ কিছু কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার কাজ বর্ণিত হয়েছে। যেমন-পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে খবরের কাগজ সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি, প্রাণীদের তালিকা তৈরি ইত্যাদি রয়েছে। গণিত, শারীরিক শিক্ষা ও চারুকলায়ও হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে শিখানোর ক্ষেত্র ব্যাপক। এমনিভাবে প্রাথমিক শ্রেণির বই গুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এ বই গুলোতে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রতিফলন রয়েছে।
কর্মকেন্দ্রিক শিখনে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা, কথা বলা, ছবি আঁকা, ভাগ করে নেয়া, দক্ষতা প্রকাশ, স্বতন্ত্রভাবে প্রশ্ন করার সাথে জড়িত। এতে শিখনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছে তা গুরুত্বপূূর্ণ।
“বনওয়েল” এবং “আইসনের” মতে শিক্ষার্থীদের কেবল শুনার চেয়ে আরোও বেশি কিছু করতে হবে। শিক্ষার্থীরা প্রচলিত বক্তৃতা পদ্ধতির চেয়ে সক্রিয় শিক্ষা কৌশল গুলো পছন্দ করে। এ পদ্ধতিতে-
১। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে আরো জোর দেয়া হয়। ২। শিক্ষার্থীরা উচ্চ চিন্তায় জড়িত হয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি যদি প্রাথমিকে একজন শিক্ষক হয়ে থাকেন, তবে কিভাবে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিশুর শিখন নিশ্চিত করবেন? যেমন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষার্থীকে মাঠে ছেড়ে দিতে পারি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সে সংশ্লিষ্ট উপাদান খুঁজে বের করবে। আবার বাংলাতে পাঠ সংশ্লিষ্ট অভিনয় করতে দিয়ে কিংবা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে কোন খবরের যেমন-মুক্তিযুদ্ধের উপর বিভিন্ন পেপার কাটিং সংগ্রহ করে একটি কাগজে আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে পারে। এজন্য নি¤েœাক্ত কিছু কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। যথা-
১। চিন্তা করা, জোড়ায় বা দলে ভাগ করে কাজ দেয়া, ২। পাজল তৈরি করতে দেয়া (বাংলায়), ৩। বিভিন্ন খেলা যেমন-বিঙ্গো, শব্দজট ইত্যাদি দেয়া, ৪। তাদের অন্য থেকে জ্ঞান আহরণে উৎসাহিত করা।
তবে শিশুর শিখন নিশ্চিত করণে আপনাকেও যথেষ্ট দক্ষ ও কুশলী হতে হবে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এজন্য পাঠ্য বিষয়টি উত্তমরূপে আয়ত্ত করা আবশ্যক। এরপর আপনি চিন্তা করবেন কোন কাজটি তাদের দিয়ে করালে তাদের পাঠ বুঝতে সহজ হবে এবং সেই সাথে শিখনফলও অর্জিত হবে। যেমন- “বড় রাজা ছোট রাজা” (চতুর্থ শ্রেণি-বাংলা) আপনি তাদেরকে রাজার বেশে অভিনয় করিয়ে বিষয়টি সহজবোধ্য করতে পারেন। কিংবা A visit to the liberation war museum ( English for Today-Class Five)| । এই লেসন পরবর্তী কার্যক্রম হিসাবে তাদের থেকে লেখা আনিয়ে একটি ইংরেজি দেয়ালিকা প্রকাশ করতে পারেন।
এইভাবে প্রথমত শিক্ষক হিসাবে আপনাকে যেমন পড়তে হবে তেমনি হতে হবে সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী। সেই সাথে করতে হবে নিয়মিত অনুশীলন। তবেই পাঠদানের ক্ষেত্রে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষাদান (ABL) পদ্ধতিতে সফলতা আসবে।
সর্বোপরি শিশুর শিখন নিশ্চিত করণে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মূল্যায়ন এবং শিখন কার্যকরী করার এটি একটি শিশুবান্ধব প্রক্রিয়া।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT